বিষয়ের ভূমিকা

আমাদের বাসভূমি পৃথিবী এক অসাধারণ ও গতিশীল গ্রহ। বাইরে থেকে পৃথিবীকে আমরা যতটা শান্ত ও স্থির দেখি, এর অভ্যন্তরীণ গঠন ততটাই জটিল এবং বৈচিত্র্যময়। NCERT একাদশ শ্রেণির ভূগোলের 'ভৌত ভূগোলের মূলনীতি' (Fundamentals of Physical Geography) পাঠ্যবইয়ের ৩য় অধ্যায় "পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন" (Interior of the Earth)-এ পৃথিবীর পেটের ভেতরের অজানা রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে। মানুষ সরাসরি পৃথিবীর কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে না, কারণ পৃথিবীর ব্যাসার্ধ প্রায় ৬,৩৭আই কিলোমিটার ($R \approx 6371 \text{ km}$)। তাই ভূবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ প্রমাণের ভিত্তিতে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোর চিত্র তৈরি করেছেন। এই অধ্যায়ে আমরা ভূত্বক, গুরুমণ্ডল, কেন্দ্রমণ্ডল এবং ভূকম্পীয় তরঙ্গের মাধ্যমে পৃথিবীর রহস্যময় অভ্যন্তরীণ গঠন বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন জানার উৎসসমূহ

পৃথিবীর গভীরতম অংশ সম্পর্কে জানার জন্য ভূবিজ্ঞানীরা মূল উৎসগুলোকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন: প্রত্যক্ষ উৎস এবং পরোক্ষ উৎস।

  • প্রত্যক্ষ উৎস (Direct Sources):
    • খনিকাজ ও গভীরে ড্রিলিং: দক্ষিণ আফ্রিকার সোনার খনিগুলোতে সর্বোচ্চ ৩-৪ কিমি পর্যন্ত খনন করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া আর্কটিক মহাসাগরের কোলা উপদ্বীপে 'Kola Superdeep Borehole' প্রজেক্টের মাধ্যমে প্রায় ১২ কিমি গভীর পর্যন্ত ড্রিল করা সম্ভব হয়েছে।
    • আগ্নেয়গিরির উদগীরণ: অগ্নুৎপাতের সময় পৃথিবীর গভীর থেকে তরল ম্যাগমা বাইরে বেরিয়ে আসে, যা বিশ্লেষণ করে অভ্যন্তরীণ উপাদানের রাসায়নিক গঠন জানা যায়।
  • পরোক্ষ উৎস (Indirect Sources):
    • তাপমাত্রা, চাপ ও ঘনত্ব: গভীরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে পৃথিবীর অভ্যন্তরে তাপমাত্রা, চাপ এবং শিলার ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়।
    • উল্কাপাত (Meteorites): মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে পতিত উল্কাগুলোর গঠন পৃথিবীর মতো একই প্রাথমিক পদার্থ দিয়ে তৈরি, যা থেকে অভ্যন্তরের গঠন বোঝা যায়।
    • মহাকর্ষ ও চৌম্বক ক্ষেত্র: পৃথিবীর বিভিন্ন অক্ষাংশে মহাকর্ষীয় বলের তারতম্য (Gravity Anomaly) এবং চৌম্বক ক্ষেত্রের উপস্থিতি অভ্যন্তরের পদার্থের ঘনত্ব ও গঠন নির্দেশ করে।
    • ভূকম্পীয় তরঙ্গ (Seismic Waves): এটি পৃথিবীর ভেতরটা জানার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরোক্ষ মাধ্যম।

২. ভূকম্পীয় তরঙ্গ ও ছায়া বলয় (Shadow Zones)

ভূমিকম্পের ফলে যে বিপুল পরিমাণ শক্তি নির্গত হয় তা তরঙ্গ আকারে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ভূকম্পীয় তরঙ্গ প্রধানত দুই প্রকার:

  • কায়িক তরঙ্গ (Body Waves): যা পৃথিবীর অভ্যন্তর দিয়ে চলাচল করে। এগুলো আবার দুই প্রকার:
    • P-তরঙ্গ (Primary Waves): এগুলো অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ। এরা কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় — তিনটি মাধ্যমের মধ্য দিয়েই যেতে পারে এবং এদের গতিবেগ সবচেয়ে বেশি।
    • S-তরঙ্গ (Secondary Waves): এগুলো অনুপ্রস্থ তরঙ্গ। এরা কেবল কঠিন মাধ্যমের মধ্য দিয়েই যেতে পারে, তরল মাধ্যমে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়।
  • পৃষ্ঠ তরঙ্গ (Surface Waves): এগুলো পৃথিবীর উপরিভাগ দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং ভূপৃষ্ঠে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়।

ভূকম্পীয় ছায়া বলয় (Shadow Zone): ভূকম্পীয় তরঙ্গ পৃথিবীর সব জায়গায় পৌঁছাতে পারে না। ভূকম্পলেখ চিত্রে (Seismograph) যেসব অঞ্চলে নির্দিষ্ট তরঙ্গ ধরা পড়ে না, সেগুলোকে ছায়া বলয় বলে। S-তরঙ্গ কেন্দ্রমণ্ডলের তরল অংশের মধ্য দিয়ে যেতে পারে না বলে ১০৫° এর পর আর কোনো S-তরঙ্গ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে, P-তরঙ্গ প্রতিসরণের কারণে ১০৫° থেকে ১৪০° এর মধ্যে কোনো P-তরঙ্গ পাওয়া যায় না।

৩. পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ স্তরবিন্যাস

রাসায়নিক ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পৃথিবীকে তিনটি প্রধান স্তরে ভাগ করা হয়:

  • ১. ভূত্বক (Crust): এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বাইরের ও পাতলা ভঙ্গুর স্তর।
    • মহাদেশীয় ভূত্বক: গড়ে ৩৫ কিমি পুরু এবং মূলত গ্রানাইট শিলা দ্বারা গঠিত। এতে সিলিকন ও অ্যালুমিনিয়াম বেশি থাকায় একে SIAL বলা হয়।
    • মহাসাগরীয় ভূত্বক: এটি পাতলা (গড়ে ৫ কিমি) এবং ব্যাসাল্ট শিলা দ্বারা গঠিত। এতে সিলিকন ও ম্যাগনেসিয়াম বেশি থাকায় একে SIMA বলা হয়।
  • ২. গুরুমণ্ডল (Mantle): ভূত্বকের নিচ থেকে প্রায় ২,৯০০ কিমি গভীরতা পর্যন্ত গুরুমণ্ডল বিস্তৃত।
    • অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার (Asthenosphere): গুরুমণ্ডলের উপরের অংশ (প্রায় ৪০০ কিমি পর্যন্ত) আংশিক গলিত ও নমনীয় অবস্থায় থাকে। অগ্নুৎপাতের সময় তরল ম্যাগমা এখান থেকেই আসে।
    • শিলামণ্ডল (Lithosphere): ভূত্বক এবং গুরুমণ্ডলের উপরিভাগ মিলে গঠিত হয় শিলামণ্ডল (পুরুত্ব ১০ থেকে ২০০ কিমি)।
  • ৩. কেন্দ্রমণ্ডল (Core): গুরুমণ্ডলের তলদেশ থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র (৬,৩৭১ কিমি) পর্যন্ত কেন্দ্রমণ্ডল বিস্তৃত।
    • বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল (Outer Core): এটি তরল অবস্থায় রয়েছে (S-তরঙ্গ এখানে প্রবেশ করতে পারে না)।
    • অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল (Inner Core): অত্যধিক চাপের কারণে এটি কঠিন অবস্থায় থাকে।
    • কেন্দ্রমণ্ডল প্রধানত নিকেল (Ni) ও লোহা (Fe) দ্বারা গঠিত, তাই একে NIFE বলা হয়।

৪. ভূ-অভ্যন্তরীণ আগ্নেয় শিলারূপ (Intrusive Igneous Landforms)

ভূগর্ভের ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর আগেই জমাট বেঁধে নানা রূপ ধারণ করে:

  • ব্যাথোলিথ (Batholith): ভূগর্ভের গভীরে বিশাল আকার নিয়ে জমাট বাঁধা গম্বুজাকৃতির আগ্নেয় শিলা।
  • লাকোলিথ (Lacolith): ছাতার মতো বা গম্বুজাকৃতির শিলাদেহ যা স্তরীভূত শিলাকে উঁচু করে তোলে।
  • সিল (Sill): শিলাস্তরের সমান্তরালে ম্যাগমা জমাট বাঁধলে তাকে সিল বলে।
  • ডাইক (Dyke): শিলাস্তরের ফাটলে উল্লম্বভাবে ম্যাগমা জমাট বেঁধে প্রাচীরের মতো গঠিত হলে তাকে ডাইক বলে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: S-তরঙ্গ কেন পৃথিবীর বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলের ভেতর দিয়ে যেতে পারে না?

উত্তর: S-তরঙ্গ বা গৌণ তরঙ্গ কেবল কঠিন মাধ্যমের মধ্য দিয়েই বিস্তার লাভ করতে পারে। পৃথিবীর বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল তরল অবস্থায় থাকার কারণে S-তরঙ্গ এই স্তরে প্রবেশ করতে পারে না এবং বিলুপ্ত হয়ে যায়।

প্রশ্ন ২: SIAL এবং SIMA-এর মধ্যে মূল পার্থক্য কী?

উত্তর: SIAL (সিলিকন + অ্যালুমিনিয়াম) হলো মহাদেশীয় ভূত্বক যা গ্রানাইট শিলায় গঠিত ও হালকা। অন্যদিকে SIMA (সিলিকন + ম্যাগনেসিয়াম) হলো মহাসাগরীয় ভূত্বক যা ভারী ব্যাসাল্ট শিলায় গঠিত।

প্রশ্ন ৩: অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার বলতে কী বোঝায় এবং এর কাজ কী?

উত্তর: গুরুমণ্ডলের উপরের দিকে প্রায় ৪০০ কিমি গভীরতা পর্যন্ত অবস্থিত আংশিক গলিত, নমনীয় স্তরকে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার বলে। এটি টেকটোনিক প্লেটগুলোর চলাচলে সাহায্য করে এবং অগ্নুৎপাতের ম্যাগমার প্রধান উৎস।

প্রশ্ন ৪: ভূকম্পীয় ছায়া বলয় (Shadow Zone) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: ভূমিকম্পের পর পৃথিবীর কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে ভূকম্পলেখ চিত্রে কোনো তরঙ্গ নিবন্ধিত হয় না। ১০৫° থেকে ১৪০° অঞ্চলের মধ্যে P এবং S উভয় তরঙ্গের অনুপস্থিতির কারণে তৈরি হওয়া এলাকাকে ভূকম্পীয় ছায়া বলয় বলে।

সারসংক্ষেপ

  • পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে জানার প্রধান পরোক্ষ উৎস হলো ভূকম্পীয় তরঙ্গ (P ও S তরঙ্গ)।
  • P-তরঙ্গ কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় সব মাধ্যমে চলে; S-তরঙ্গ কেবল কঠিন মাধ্যমে চলে।
  • পৃথিবীর তিনটি প্রধান স্তর: ভূত্বক (Crust), গুরুমণ্ডল (Mantle), এবং কেন্দ্রমণ্ডল (Core)।
  • ভূত্বক SIAL ও SIMA দ্বারা, গুরুমণ্ডল অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার দ্বারা এবং কেন্দ্রমণ্ডল NIFE (নিকেল ও লোহা) দ্বারা গঠিত।
  • ম্যাগমা ভূগর্ভে জমাট বেঁধে ব্যাথোলিথ, লাকোলিথ, সিল ও ডাইকের মতো বিভিন্ন আকৃতি তৈরি করে।