বিষয়ের ভূমিকা
আমরা কেন শ্বাস নিই? কখনো কি ভেবে দেখেছেন যে দৌড়ানোর সময় আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি কেন বেড়ে যায়? বা কেন আমরা দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকতে পারি না? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে, যাকে বলা হয় শ্বসন (Respiration)। সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞানের এই দশম অধ্যায়টি আমাদের শরীরের সেই নিগূঢ় রহস্য উন্মোচন করবে যা আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে।
প্রতিটি জীবন্ত প্রাণীর অস্তিত্ব টিকে থাকে কোষের (Cell) কার্যকলাপের ওপর। এই কোষগুলো প্রতিনিয়ত বিভিন্ন কাজ যেমন পুষ্টি সংগ্রহ, পরিবহন, রেচন এবং প্রজনন সম্পন্ন করে। এই কাজগুলো করার জন্য শক্তির প্রয়োজন হয়। এমনকি যখন আমরা ঘুমাই বা পড়াশোনা করি, তখনও আমাদের শরীরের ভেতরে শক্তি ব্যয় হতে থাকে। এই শক্তি কোথা থেকে আসে? আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি, তার মধ্যেই এই শক্তি সঞ্চিত থাকে। শ্বসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সেই খাদ্য থেকে শক্তি নির্গত হয়। তাই শ্বাস নেওয়া কেবল বাতাসের আদান-প্রদান নয়, বরং এটি জীবনধারণের এক মৌলিক প্রক্রিয়া।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. শ্বসন কী এবং কেন এটি প্রয়োজনীয়?
শ্বসন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোষের ভেতরে খাদ্যের (গ্লুকোজ) ভাঙন ঘটে এবং শক্তি নির্গত হয়। যেহেতু এই প্রক্রিয়াটি কোষের অভ্যন্তরে ঘটে, তাই একে কোষীয় শ্বসন (Cellular Respiration) বলা হয়। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রতি মুহূর্তে যে শক্তির প্রয়োজন হয়, তা এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অর্জিত হয়।
২. শ্বসনের প্রকারভেদ: সবাত ও অবাত শ্বসন
অক্সিজেনের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে শ্বসনকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- সবাত শ্বসন (Aerobic Respiration): যখন গ্লুকোজ অক্সিজেনের উপস্থিতিতে ভেঙে কার্বন ডাই-অক্সাইড, জল এবং শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, তখন তাকে সবাত শ্বসন বলে। অধিকাংশ উচ্চশ্রেণির প্রাণী ও উদ্ভিদে এই প্রক্রিয়াটি ঘটে।
সমীকরণ: গ্লুকোজ + অক্সিজেন → কার্বন ডাই-অক্সাইড + জল + শক্তি - অবাত শ্বসন (Anaerobic Respiration): অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে যখন খাদ্য ভেঙে শক্তি উৎপন্ন হয়, তখন তাকে অবাত শ্বসন বলে। ইস্টের মতো কিছু অণুজীব অক্সিজেনের সাহায্য ছাড়াই বেঁচে থাকতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রেও অনেক সময় পেশিকোষে সাময়িকভাবে অবাত শ্বসন ঘটে।
সমীকরণ: গ্লুকোজ → অ্যালকোহল + কার্বন ডাই-অক্সাইড + শক্তি (ইস্টের ক্ষেত্রে)
৩. আমাদের পেশিতে অবাত শ্বসন এবং পেশির টান (Muscle Cramps)
আমরা যখন খুব পরিশ্রমের কাজ করি বা দ্রুত দৌড়াই, তখন আমাদের শরীরের প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। কিন্তু রক্ত তখন পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে না। এই ঘাটতি মেটাতে আমাদের পেশিকোষগুলো অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতেই খাদ্য ভাঙতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় গ্লুকোজ আংশিকভাবে ভেঙে ল্যাকটিক অ্যাসিড (Lactic Acid) তৈরি করে। এই ল্যাকটিক অ্যাসিড পেশিতে জমা হওয়ার ফলেই আমরা পেশির টান বা 'ক্র্যাম্প' অনুভব করি। গরম জলে স্নান করলে বা ম্যাসাজ করলে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পায় এবং এই অ্যাসিড দ্রুত অপসারিত হয়, ফলে আমরা আরাম বোধ করি।
৪. শ্বাসক্রিয়া (Breathing) কী?
শ্বাসক্রিয়া হলো শ্বসন প্রক্রিয়ার একটি বাহ্যিক ধাপ। এটি মূলত পরিবেশ থেকে অক্সিজেন সমৃদ্ধ বাতাস গ্রহণ এবং শরীর থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড সমৃদ্ধ বাতাস বর্জন করার প্রক্রিয়া।
- প্রশ্বাস (Inhalation): বায়ুমণ্ডল থেকে বাতাস শরীরের ভেতরে নেওয়ার প্রক্রিয়া।
- নিঃশ্বাস (Exhalation): শরীর থেকে দূষিত বাতাস বাইরে বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়া।
- শ্বসন হার (Breathing Rate): একজন ব্যক্তি প্রতি মিনিটে যতবার শ্বাস নেন, তাকেই শ্বসন হার বলা হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্বাভাবিক অবস্থায় গড় শ্বসন হার প্রতি মিনিটে ১৫-১৮ বার।
৫. আমরা কীভাবে শ্বাস নিই? (মানুষের শ্বসনতন্ত্র)
মানুষের শ্বসনতন্ত্র বেশ জটিল এবং এটি সুন্দরভাবে কাজ করে। এর প্রধান অংশগুলো হলো নাসারন্ধ্র, নাসা গহ্বর, শ্বাসনালী এবং ফুসফুস।
- শ্বাস নেওয়ার পদ্ধতি: বাতাস প্রথমে আমাদের নাসারন্ধ্র দিয়ে ভেতরে ঢোকে। নাসা গহ্বরের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় বাতাসের ধূলিকণা লোমে আটকে যায়। এরপর বাতাস শ্বাসনালী দিয়ে ফুসফুসে পৌঁছায়।
- মধ্যচ্ছদা (Diaphragm): আমাদের বুক ও পেটের মাঝখানে একটি পেশিবহুল পর্দা থাকে যাকে মধ্যচ্ছদা বলে। শ্বাস নেওয়ার সময় এটি নিচে নেমে যায় এবং পাঁজরের হাড়গুলো বাইরের দিকে প্রসারিত হয়। এর ফলে ফুসফুসের আয়তন বাড়ে এবং বাতাস ভেতরে ঢোকে। আবার শ্বাস ছাড়ার সময় মধ্যচ্ছদা ও পাজর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, ফলে বাতাস বাইরে বেরিয়ে যায়।
৬. অন্যান্য প্রাণীর শ্বাসকার্য
মানুষের মতো সব প্রাণীর ফুসফুস থাকে না। প্রকৃতিতে বিভিন্ন প্রাণী বিভিন্নভাবে শ্বাস নেয়:
- তেলাপোকা ও পতঙ্গ: এদের শরীরে ছোট ছোট ছিদ্র থাকে যাকে স্পাইরাকল (Spiracles) বলা হয়। বাতাসের আদান-প্রদান এই ছিদ্র এবং শ্বাসনালীর নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ঘটে।
- কেঁচো: কেঁচো তার সিক্ত ও পিচ্ছিল চামড়ার (Skin) মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করে।
- মাছ: মাছের ফুসফুস নেই, পরিবর্তে এদের ফুলকা (Gills) থাকে। ফুলকাগুলো জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন রক্তে মিশিয়ে দিতে সাহায্য করে।
- ব্যাঙ: ব্যাঙ ডাঙায় থাকার সময় ফুসফুস দিয়ে এবং জলের নিচে ভিজে চামড়া দিয়ে শ্বাস নিতে পারে।
৭. উদ্ভিদের শ্বসন প্রক্রিয়া
প্রাণীদের মতো উদ্ভিদেরও বেঁচে থাকার জন্য শক্তির প্রয়োজন। তারাও বাতাস থেকে অক্সিজেন নেয় এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে।
- পত্ররন্ধ্র (Stomata): উদ্ভিদের পাতার গায়ে অসংখ্য সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকে যার মাধ্যমে গ্যাসের আদান-প্রদান ঘটে।
- মূলের শ্বসন: উদ্ভিদের মূল মাটির কণার ফাঁকে থাকা বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে। একারণেই টবে বেশি জল দিলে গাছের শিকড় পচে যায়, কারণ বাতাস চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. ভারী ব্যায়াম করার পর কেন আমাদের পেশিতে ব্যথা হয়?
ভারী ব্যায়াম করার সময় পেশিকোষে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। তখন গ্লুকোজের আংশিক ভাঙন ঘটে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি হয়। এই ল্যাকটিক অ্যাসিড জমা হওয়ার কারণেই পেশিতে ব্যথার সৃষ্টি হয়।
২. ইস্টকে কেন পাউরুটি শিল্পে ব্যবহার করা হয়?
ইস্ট হলো এক প্রকার এককোষী ছত্রাক যা অবাত শ্বসন চালায়। এই প্রক্রিয়ায় তারা কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। ময়দার সাথে ইস্ট মেশালে এই গ্যাস পাউরুটিকে ফুলিয়ে নরম ও ফাঁপা করতে সাহায্য করে।
৩. ধূমপান করলে ফুসফুসের কী ক্ষতি হয়?
ধূমপান ফুসফুসের অ্যালভিওলাই বা বায়ুথলিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি ক্যান্সার ও শ্বাসকষ্টজনিত নানা রোগের কারণ হতে পারে। এর ফলে শরীরের অক্সিজেন নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়।
সারসংক্ষেপ
- শ্বসন জীবনের এক অপরিহার্য প্রক্রিয়া যা আমাদের প্রতিটি কোষে শক্তি জোগায়।
- অক্সিজেন ব্যবহার করে শ্বসন হলো সবাত এবং অক্সিজেন ছাড়া হলো অবাত শ্বসন।
- মানুষ ফুসফুসের সাহায্যে শ্বাস নেয়, যেখানে মধ্যচ্ছদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- বিভিন্ন প্রাণীর শ্বসন অঙ্গ আলাদা হয়, যেমন—মাছের ফুলকা এবং পতঙ্গের স্পাইরাকল।
- উদ্ভিদও কোষীয় শ্বসন চালায় এবং তাদের প্রধান অঙ্গ হলো পাতার পত্ররন্ধ্র।
- নিয়মিত প্রাণায়াম ও ব্যায়াম আমাদের ফুসফুসের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং শরীরকে সুস্থ রাখে।