বিষয়ের ভূমিকা

বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এটি শুধুমাত্র ফ্রান্সের সমাজ ও রাজনীতিকে আমূল বদলে দেয়নি, বরং সারা বিশ্বের কাছে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার (Liberty, Equality, and Fraternity) মহান বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। নবম শ্রেণির ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের এই প্রথম অধ্যায়টি আমাদের শেখায় কীভাবে একটি শোষিত সমাজ ব্যবস্থা থেকে সাধারণ মানুষ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এই অধ্যায়ে আমরা জানব ফরাসি সমাজের কাঠামো, বিপ্লবের কারণ, বাস্তিল দুর্গের পতন এবং নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্থান সম্পর্কে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. আঠারো শতকের শেষে ফরাসি সমাজ (The French Society During the Late 18th Century)

১৭৭৪ সালে বুঁর্বো রাজবংশের লুই XVI (ষোড়শ লুই) ফ্রান্সের সিংহাসনে বসেন। সেই সময় ফরাসি সমাজ তিনটি স্তরে বা 'এস্টেট'-এ বিভক্ত ছিল:

  • প্রথম এস্টেট (First Estate): যাজক সম্প্রদায় বা গির্জার কর্তাব্যক্তিরা এই স্তরে ছিলেন। তারা কর প্রদানের হাত থেকে রেহাই পেতেন এবং অনেক বিশেষ সুবিধ ভোগ করতেন।
  • দ্বিতীয় এস্টেট (Second Estate): অভিজাত সম্প্রদায় বা ভূস্বামীরা এই স্তরে ছিলেন। তারাও করমুক্ত ছিলেন এবং কৃষকদের কাছ থেকে সামন্ততান্ত্রিক কর আদায় করতেন।
  • তৃতীয় এস্টেট (Third Estate): সমাজের বাকি ৯০ শতাংশ মানুষ এই স্তরে ছিলেন। এর মধ্যে ছিলেন ব্যবসায়ী, আইনজীবী, কৃষক, কারিগর এবং ভূমিহীন শ্রমিক। রাষ্ট্রের সমস্ত করের বোঝা এই তৃতীয় এস্টেটের ওপরই ছিল।

২. জীবনধারণের সংকট ও ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা

ফ্রান্সের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়, কিন্তু উৎপাদন সেই হারে বাড়েনি। এর ফলে রুটির দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। দরিদ্র মানুষ চরম খাদ্য সংকটে পড়ে, যাকে 'জীবনধারণের সংকট' (Subsistence Crisis) বলা হয়। অন্যদিকে, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তা করার ফলে ফ্রান্সের ঋণের বোঝা ২ বিলিয়ন লিভর ছাড়িয়ে যায়। এই বিশাল ব্যয়ভার সামলাতে রাজা ষোড়শ লুই কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, যা জনগণের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

৩. বিপ্লবের সূত্রপাত: এস্টেটস জেনারেল ও জাতীয় সভা

১৭৮৯ সালের ৫ মে রাজা কর বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য 'এস্টেটস জেনারেল'-এর সভা ডাকেন। তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা দাবি করেন যে, ভোট হবে মাথা পিছু (One person one vote), কেবল এস্টেট ভিত্তিক নয়। রাজা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা নিজেদের 'জাতীয় সভা' (National Assembly) হিসেবে ঘোষণা করেন এবং ইনডোর টেনিস কোর্টে সমবেত হয়ে শপথ নেন যে, যতদিন না ফ্রান্সের জন্য একটি সংবিধান তৈরি হচ্ছে, ততদিন তারা সরবেন না। এটিই ইতিহাসে 'টেনিস কোর্ট শপথ' নামে পরিচিত।

৪. বাস্তিল দুর্গের পতন এবং বিপ্লবের অগ্রগতি

১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সের ইতিহাসে এক রক্তক্ষয়ী ও স্মরণীয় দিন। প্যারিসের উত্তেজিত জনতা রাজকীয় অত্যাচারের প্রতীক বাস্তিল দুর্গ (Bastille) আক্রমণ করে তা ধ্বংস করে দেয়। এই ঘটনা রাজতন্ত্রের পতন এবং জনগণের শক্তির জয় হিসেবে চিহ্নিত হয়। গ্রামাঞ্চলেও কৃষকরা সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে। অবশেষে ৪ আগস্ট ১৭৮৯ রাতে জাতীয় সভা সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং কর বিলোপ করার ডিক্রি জারি করে।

৫. ফ্রান্স কীভাবে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে পরিণত হল?

১৭৯১ সালে জাতীয় সভা একটি সংবিধান প্রণয়ন করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল রাজার ক্ষমতা সীমিত করা। এখন থেকে আইন প্রণয়ন, প্রয়োগ এবং বিচার বিভাগ পৃথক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য 'মানুষ ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণা' (Declaration of the Rights of Man and Citizen) প্রচার করা হয়। তবে ভোটের অধিকার কেবল সক্রিয় নাগরিকদের (যারা নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিতেন) মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

৬. সন্ত্রাসের রাজত্ব (The Reign of Terror)

১৭৯৩ থেকে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত সময়কালকে ফ্রান্সে 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' বলা হয়। জ্যাকোবিন ক্লাবের নেতা ম্যাক্সিমিলিয়ান রোবেসপিয়ার এই সময় কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। রাজপরিবার ও বিপ্লব বিরোধীদের 'গিলোটিন' নামক যন্ত্রে শিরচ্ছেদ করা হত। শেষ পর্যন্ত রোবেসপিয়ার নিজেই গিলোটিনের শিকার হন এবং এক চরম অস্থিরতার সৃষ্টি হয়।

৭. নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্থান

জ্যাকোবিন শাসনের পতনের পর ফ্রান্সে 'ডিরেক্টরি' শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়। কিন্তু ডিরেক্টরি সদস্যদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল শুরু হলে সামরিক শাসক নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সেই সুযোগ গ্রহণ করেন। ১৮০৪ সালে তিনি নিজেকে ফ্রান্সের সম্রাট ঘোষণা করেন। যদিও তিনি একনায়ক ছিলেন, তবুও তিনি আইনি কোড (Napoleonic Code) এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: টেনিস কোর্ট শপথ কী?
উত্তর: ১৭৮৯ সালের ২০ জুন তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা একটি ইনডোর টেনিস কোর্টে জমায়েত হয়ে শপথ নেন যে, যতক্ষণ না তারা ফ্রান্সের জন্য একটি সংবিধান রচনা করছেন, ততক্ষণ তারা এই সভা ত্যাগ করবেন না। একেই টেনিস কোর্ট শপথ বলা হয়।

প্রশ্ন ২: ফরাসি বিপ্লবের তিনটি প্রধান আদর্শ কী ছিল?
উত্তর: ফরাসি বিপ্লবের তিনটি প্রধান আদর্শ ছিল— সাম্য (Equality), মৈত্রী (Fraternity) এবং স্বাধীনতা (Liberty)।

প্রশ্ন ৩: গিলোটিন কী?
উত্তর: গিলোটিন হল একটি যন্ত্র যা দিয়ে অপরাধীদের শিরচ্ছেদ করা হত। এর উদ্ভাবক ছিলেন ডক্টর গিলোটিন। এটি দুটি খুঁটি এবং একটি ধারালো ব্লেড নিয়ে গঠিত ছিল।

প্রশ্ন ৪: বাস্তিল দুর্গের পতনের গুরুত্ব কী?
উত্তর: বাস্তিল দুর্গের পতন ছিল রাজার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের প্রথম বড় জয়। এটি ফরাসি বিপ্লবের আনুষ্ঠানিক সূচনা এবং সামন্ততন্ত্রের পতনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

সারসংক্ষেপ

  • ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব শুরু হয় যা রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায়।
  • সমাজ তিনটি এস্টেটে বিভক্ত ছিল, যেখানে তৃতীয় এস্টেট সমস্ত কর দিত।
  • বাস্তিল দুর্গের পতন (১৪ জুলাই ১৭৮৯) বিপ্লবের একটি প্রধান মাইলফলক।
  • সংবিধান রচনার মাধ্যমে ফ্রান্স সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়।
  • রোবেসপিয়ারের নেতৃত্বে সন্ত্রাসের রাজত্ব চলে যা পরে নেপোলিয়নের উত্থানে সাহায্য করে।
  • এই বিপ্লব বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ধারণাকে ছড়িয়ে দেয়।