বিষয়ের ভূমিকা

মহাকর্ষ বা গ্র্যাভিটেশন (Gravitation) হলো পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম একটি মৌলিক ও রোমাঞ্চকর ধারণা। আমরা পৃথিবী পৃষ্ঠে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছি, উপরের দিকে ছুড়ে দেওয়া বল আবার মাটিতে ফিরে আসছে, এবং চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে অবিরাম ঘুরে চলেছে—এই সমস্ত ঘটনার পেছনে রয়েছে একটিমাত্র রহস্যময় বল, যা মহাকর্ষ নামে পরিচিত। নবম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ের দশম অধ্যায়ে মহাকর্ষ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে এই মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে এবং এর ফলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কী প্রভাব পড়ে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য মহাকর্ষের ধারণা পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ উচ্চতর শ্রেণীতে বলবিদ্যা বা মেকানিক্স বুঝতে এটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

মহাকর্ষ অধ্যায়ের মূল বিষয়বস্তুগুলোকে সহজ করে বোঝার জন্য আমরা সেগুলোকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাগে ভাগ করতে পারি:

১. মহাকর্ষ সূত্র বা নিউটনের সার্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র

স্যার আইজ্যাক নিউটন প্রথম মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুর মধ্যকার আকর্ষণের কথা বৈজ্ঞানিক যুক্তিসহ উপস্থাপন করেন। একে নিউটনের সার্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র বলা হয়। সূত্রটি অনুসারে, মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা একে অপরকে একটি বল দ্বারা আকর্ষণ করে এবং এই বলের মান কণা দুটির ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক। এই বল কণা দুটিকে সংযোগকারী সরলরেখা বরাবর ক্রিয়া করে। গাণিতিক রূপটি নিম্নরূপ:

$$F = G \frac{m_1 m_2}{d^2}$$

এখানে $F$ হলো মহাকর্ষ বল, $m_1$ ও $m_2$ হলো দুটি বস্তুর ভর, $d$ হলো তাদের মধ্যকার দূরত্ব এবং $G$ হলো সার্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক (Universal Gravitational Constant)।

২. মুক্ত পতন বা Free Fall

যখন কোনো বস্তু শুধুমাত্র পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের প্রভাবে উপর থেকে নিচে পড়ে, তখন সেই পতনকে মুক্ত পতন বলে। এই পতনের সময় বস্তুর ওপর বাতাসের বাধা ধরা হয় না। মুক্ত পতনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, পতনের সময় বস্তুর বেগের পরিবর্তন ঘটে অর্থাৎ বস্তুটি ত্বরণ লাভ করে। এই ত্বরণকে অভিকর্ষজ ত্বরণ ($g$) বলা হয়। মজার বিষয় হলো, ভর যাই হোক না কেন, যেকোনো বস্তু নির্দিষ্ট উচ্চতা থেকে একই সময়ে মাটিতে পড়বে যদি সেখানে কোনো বায়ুর বাধা না থাকে।

৩. ভর (Mass) এবং ওজন (Weight)

দৈনন্দিন জীবনে আমরা ভর এবং ওজন একই অর্থে ব্যবহার করলেও পদার্থবিজ্ঞানে এদের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে:

  • ভর (Mass): কোনো বস্তুতে পদার্থের মোট পরিমাণের পরিমাপ হলো ভর। এটি একটি ধ্রুবক রাশি এবং স্থানভেদে এর কোনো পরিবর্তন হয় না। এর এসআই একক কিলোগ্রাম (kg)।
  • ওজন (Weight): যে বল দ্বারা পৃথিবী কোনো বস্তুকে তার কেন্দ্রের দিকে টানে, তাকে ওই বস্তুর ওজন বলে। ওজন হলো বল, তাই এর একক নিউটন (N)। ওজন স্থানভেদে পরিবর্তিত হতে পারে, যেমন চাঁদে কোনো বস্তুর ওজন পৃথিবীর ওজনের ছয় ভাগের এক ভাগ।

৪. প্লবতা এবং আর্কিমিডিসের নীতি

মহাকর্ষ অধ্যায়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আরেকটি ধারণা হলো তরলের চাপ এবং প্লবতা। যখন কোনো বস্তুকে তরলে ডুবিয়ে দেওয়া হয়, তখন তরল ওই বস্তুর ওপর একটি ঊর্ধ্বমুখী বল প্রয়োগ করে, যাকে প্লবতা (Buoyancy) বলে। আর্কিমিডিসের নীতি অনুসারে, কোনো বস্তুকে তরলে আংশিক বা সম্পূর্ণ ডোবালে বস্তুটি যে পরিমাণ তরল অপসারিত করে, তার সমান ওজনের ঊর্ধ্বমুখী বল বস্তুটির ওপর প্রযুক্ত হয়।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: সার্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক ($G$)-কে কেন সার্বজনীন বলা হয়?

উত্তর: মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানে, দুটি বস্তুর প্রকৃতি বা তাদের মধ্যবর্তী মাধ্যমের উপস্থিতি যাই হোক না কেন, $G$-এর মান সর্বদা নির্দিষ্ট থাকে। এই কারণে একে সার্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক বলা হয়। এর মান হলো $6.673 \times 10^{-11} \text{ N m}^2 \text{ kg}^{-2}$।

প্রশ্ন ২: ভর এবং ওজনের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

উত্তর: ভর হলো বস্তুর ভেতর থাকা পদার্থের পরিমাণ, যা স্থান পরিবর্তন করলেও বদলায় না। অন্যদিকে, ওজন হলো পৃথিবীর আকর্ষণ বল, যা স্থানভেদে (যেমন পৃথিবী থেকে চাঁদে গেলে) পরিবর্তিত হয়। ভরের একক কিলোগ্রাম এবং ওজনের একক নিউটন।

প্রশ্ন ৩: মুক্ত পতন কাকে বলে?

উত্তর: কোনো বাধা ছাড়া শুধুমাত্র অভিকর্ষ বলের প্রভাবে যখন কোনো বস্তু ওপর থেকে নিচে পড়ে, তখন তাকে মুক্ত পতন বলে।

সারসংক্ষেপ

  • মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু অন্য বস্তুকে আকর্ষণ করে, একে মহাকর্ষ বলে।
  • নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী, বল ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
  • পৃথিবীর আকর্ষণের কারণে যে ত্বরণ সৃষ্টি হয় তাকে অভিকর্ষজ ত্বরণ ($g$) বলে।
  • ভর ধ্রুবক হলেও ওজন স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়।
  • তরলে নিমজ্জিত বস্তুর ওপর ঊর্ধ্বমুখী প্লবতা বল কাজ করে।