বিষয়ের ভূমিকা

বিজ্ঞান এক অদ্ভুত বিস্ময়। আমাদের চারপাশের জগত এবং জীববৈচিত্র্যকে বুঝতে হলে বিজ্ঞান পাঠের বিকল্প নেই। দশম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ের অন্যতম রোমাঞ্চকর এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হলো অধ্যায় ৯: বংশগতি ও বিবর্তন (Heredity and Evolution)। এই অধ্যায়ে আমরা জানতে পারি কীভাবে পিতামাতার বৈশিষ্ট্যগুলি তাদের সন্তানে স্থানান্তরিত হয় এবং কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন প্রজাতির জীবের জন্ম ও বিকাশ ঘটেছে। বাংলায় এই জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলিকে সহজভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরাই এই নিবন্ধের মূল লক্ষ্য। আপনি যদি মাধ্যমিক বা দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী হন, তবে এই আলোচনা আপনার পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং জীবনের সাধারণ জ্ঞান বৃদ্ধিতে দারুণভাবে সাহায্য করবে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

বংশগতি ও বিবর্তন অধ্যায়ে মূলত কয়েকটি প্রধান বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। নিচে সেগুলি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. বংশগতি বা হেরিডিটি (Heredity) কী?

সহজ কথায়, যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পিতামাতার শারীরিক বা মানসিক বৈশিষ্ট্যগুলি সন্তান-সন্ততিতে সঞ্চারিত হয়, তাকে বংশগতি বলে। আমরা প্রায়ই বলে থাকি, "ছেলেটির চোখ তার বাবার মতো" বা "মেয়েটির গায়ের রং তার মায়ের মতো"—এগুলি সবই বংশগতির ফল। এই স্থানান্তরের মূল বাহক হলো জিন (Gene) এবং ডিএনএ (DNA)।

  • বৈশিষ্ট্য বা চরিত্র: জীবের যেকোনো দৃশ্যমান বা অদৃশ্য লক্ষণ, যেমন চোখের রঙ, চুলের প্রকৃতি ইত্যাদি।
  • ভ্যারিয়েশন বা প্রকরণ: একই পিতামাতার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ভাইবোনের মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যায়, তাকে প্রকরণ বলে। যৌন প্রজননের সময় জিনের সামান্য পরিবর্তনের কারণে এটি ঘটে।

২. গ্রেগর জোহান মেন্ডেল এবং বংশগতির সূত্র

আধুনিক জিনতত্ত্বের জনক বলা হয় গ্রেগর জোহান মেন্ডেলকে (Gregor Johann Mendel)। তিনি মঠের বাগানে মটরশুঁটি গাছ নিয়ে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বংশগতির দুটি প্রধান সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন।

  • মেন্ডেলের প্রথম সূত্র বা পৃথক্করণের সূত্র: সংকরণ পরীক্ষার ফলাফল থেকে মেন্ডেল দেখেন যে জনু থেকে পরবর্তী জনুতে বৈশিষ্ট্যগুলি মিশ্রিত হয় না, বরং আলাদাভাবে বজায় থাকে।
  • মেন্ডেলের দ্বিতীয় সূত্র বা স্বাধীন বিন্যাসের সূত্র: একাধিক বিপরীত বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে থাকলে তারা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল না থেকে স্বাধীনভাবে বিন্যস্ত হতে পারে।

মেন্ডেল তার পরীক্ষার জন্য মটর গাছ (Pisum sativum) বেছে নিয়েছিলেন কারণ এই গাছ সহজে চাষ করা যায়, এর জীবনকাল সংক্ষিপ্ত এবং এতে বিভিন্ন বিপরীত বৈশিষ্ট্য দেখা যায় (যেমন লম্বা ও খর্ব গাছ, গোল ও কুঞ্চিত বীজ)।

৩. লিঙ্গ নির্ধারণ (Sex Determination)

মানুষের ক্ষেত্রে একটি নতুন সন্তানে ছেলে বা মেয়ে হওয়ার বিষয়টি কীভাবে নির্ধারিত হয়, তা অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। মানুষের কোষে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে। এর মধ্যে ২২ জোড়াকে অটোজোম (Autosome) বলে যা শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে। শেষ জোড়া অর্থাৎ ২৩তম জোড়াকে সেক্স ক্রোমোজোম (Sex Chromosome) বলে।

  • নারীদের ক্ষেত্রে সেক্স ক্রোমোজোম দুটিই একরকম হয়, যা XX নামে পরিচিত।
  • পুরুষদের ক্ষেত্রে একটি বড় ক্রোমোজোম X এবং অন্যটি ছোট Y ক্রোমোজোম হয়, অর্থাৎ XY

সন্তান ছেলে হবে না মেয়ে হবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে পিতার কাছ থেকে আসা শুক্রাণুর প্রকৃতির ওপর। পিতা যদি X ক্রোমোজোম যুক্ত শুক্রাণু দেন, তবে কন্যা সন্তান জন্মায়, আর Y ক্রোমোজোম যুক্ত শুক্রাণু দিলে পুত্র সন্তান জন্মায়।

৪. বিবর্তন (Evolution)

বিবর্তন হলো এমন একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সহজ বা আদিম জীব থেকে ধীরে ধীরে জটিল ও উন্নত জীবের সৃষ্টি হয়েছে। এটি একদিন বা এক বছরে ঘটে না, এর জন্য লক্ষ লক্ষ বছর সময় লাগে। চার্লস ডারউইন (Charles Darwin) এবং আলফ্রেড ওয়ালেস বিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক নির্বাচন (Natural Selection) বা যোগ্যতমের উদ্বর্তন তত্ত্ব প্রবর্তন করেছিলেন।

  • জীবাশ্ম (Fossils): প্রাচীনকালের মৃত উদ্ভিদ বা প্রাণীর দেহাবশেষ যা পাথরে বা মাটিতে সংরক্ষিত থাকে, তাকে জীবাশ্ম বলে। জীবাশ্ম প্রমাণ করে যে অতীতে কেমন জীব বাস করত এবং আজকের জীব কীভাবে তাদের থেকে বিবর্তিত হয়েছে।
  • সমসংস্থ অঙ্গ (Homologous Organs): যে অঙ্গগুলির উৎপত্তি ও গঠন একই কিন্তু কাজ আলাদা, তাদের সমসংস্থ অঙ্গ বলে (যেমন পাখির ডানা এবং মানুষের হাত)।
  • সমবৃত্তীয় অঙ্গ (Analogous Organs): যে অঙ্গগুলির গঠন ও উৎপত্তি আলাদা কিন্তু কাজ এক, তাদের সমবৃত্তীয় অঙ্গ বলে (যেমন পাখির ডানা এবং পতঙ্গের ডানা)।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতি ও ধারণার স্পষ্টতার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর নিচে দেওয়া হলো:

প্রশ্ন ১: জিন (Gene) কাকে বলে?

উত্তর: জিন হলো ডিএনএ (DNA)-এর একটি নির্দিষ্ট অংশ যা জীবের বংশগত বৈশিষ্ট্যগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বহন করে নিয়ে যায়। জিনকে বংশগতির একক বলা হয়।

প্রশ্ন ২: মেন্ডেল তাঁর পরীক্ষার জন্য কেন মটর গাছ বেছে নিয়েছিলেন?

উত্তর: মেন্ডেল মটর গাছ বেছে নিয়েছিলেন কারণ: (ক) মটর গাছ সহজে চাষ করা যায় ও জীবনকাল কম। (খ) এদের মধ্যে অনেক পরিষ্কার বিপরীত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। (গ) এদের স্বপরাগযোগ ও ইতৰপরাগযোগ সহজে ঘটানো যায়।

প্রশ্ন ৩: সমসংস্থ অঙ্গ বিবর্তনের পক্ষে কী প্রমাণ দেয়?

উত্তর: সমসংস্থ অঙ্গগুলির গঠন এক হলেও পরিবেশের চাহিদায় তারা আলাদা কাজ করার জন্য অভিযোজিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে বিভিন্ন জীব একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়েছে (অপসারী বিবর্তন বা Divergent Evolution)।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায় থেকে আমরা যা শিখলাম তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক:

  • পিতামাতার বৈশিষ্ট্য সন্তানের দেহে স্থানান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে বংশগতি বলে।
  • গ্রেগর জোহান মেন্ডেল জিনতত্ত্বের জনক এবং তিনি মটর গাছ নিয়ে বিখ্যাত পরীক্ষা করেন।
  • মানুষের লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য X এবং Y ক্রোমোজোম দায়ী।
  • বিবর্তন হলো একটি দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সহজ জীব থেকে জটিল জীবের উৎপত্তি হয়।
  • জীবাশ্ম এবং সমসংস্থ অঙ্গগুলি বিবর্তনের সত্যতার পক্ষে অত্যন্ত জোরালো প্রমাণ সরবরাহ করে।