বিষয়ের ভূমিকা
আজকের আলোচনায় আমরা ফিরে যাব ইতিহাসের সেই অধ্যায়ে, যখন ভারত ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। ব্রিটিশরা শুধুমাত্র আমাদের দেশ শাসন করতেই আসেনি; তাদের একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল এখানকার মানুষদের নিজেদের মতো করে 'সভ্য' করে তোলা। তারা মনে করত, ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতি অনুন্নত এবং তাদের দায়িত্ব হলো এই 'অসভ্য' জাতিকে আলোর পথ দেখানো। আর এই 'সভ্যতা' শেখানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল শিক্ষা।
অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের সপ্তম অধ্যায়, “দেশীয়দের 'সভ্য' করা, জাতিকে শিক্ষিত করা”, ঠিক এই বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করে। এই অধ্যায়ে আমরা জানব, ব্রিটিশরা ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কী ভেবেছিল, কীভাবে তারা নিজেদের মতো করে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছিল এবং তার ফলে আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার কী হয়েছিল। আমরা আরও দেখব, এই নতুন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ভারতীয় مفکر (চিন্তাবিদ) এবং নেতারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন এবং একটি জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন। চলুন, এই আকর্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক যাত্রায় প্রবেশ করা যাক এবং দেখি কীভাবে শিক্ষার মাধ্যমে একটি গোটা জাতিকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
ব্রিটিশদের শিক্ষা নীতি রাতারাতি তৈরি হয়নি। সময়ের সাথে সাথে তাদের চিন্তাভাবনা এবং উদ্দেশ্য পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলিকে বুঝতে হলে আমাদের কয়েকটি ধাপে আলোচনা করতে হবে।
প্রাচ্যবাদের ঐতিহ্য (The Tradition of Orientalism)
ভারতে আসার পর সব ব্রিটিশ ಅಧಿಕಾರಿই যে ভারতীয় সংস্কৃতিকে ঘৃণা বা অবজ্ঞার চোখে দেখতেন, তা কিন্তু নয়। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে অনেক ব্রিটিশ ಅಧಿಕಾರಿ ও পণ্ডিত ছিলেন যাঁরা ভারতের প্রাচীন ভাষা, সাহিত্য, আইন এবং দর্শনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁদের বলা হতো প্রাচ্যবাদী বা ওরিয়েন্টালিস্ট (Orientalist)।
এই প্রাচ্যবাদীদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন স্যার উইলিয়াম জোন্স (Sir William Jones)। তিনি ছিলেন একজন ভাষাবিদ এবং ১৭৮৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের জুনিয়র জজ হিসেবে কলকাতায় আসেন। তিনি সংস্কৃত, ফারসি এবং অন্যান্য ভারতীয় ভাষা শিখেছিলেন। তিনি এবং তাঁর মতো অন্যান্য পণ্ডিতরা যেমন হেনরি টমাস কোলব্রুক (Henry Thomas Colebrooke) এবং ন্যাথানিয়েল হ্যালহেড (Nathaniel Halhed) বিশ্বাস করতেন যে, ভারতের আসল গৌরব তার প্রাচীন শাস্ত্র এবং ঐতিহ্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে।
- এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল: ১৭৮৪ সালে উইলিয়াম জোন্স কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ভারতের প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি, এবং বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করা। তারা প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ করে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে শুরু করেন।
- প্রাচ্যবাদী প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা: প্রাচ্যবাদীরা মনে করতেন যে, ভারতীয়দের তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও ভাষাতেই শিক্ষা দেওয়া উচিত। এই ধারণা থেকেই ব্রিটিশরা কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। যেমন:
- কলকাতা মাদ্রাসা (১৭৮১): গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এটি প্রতিষ্ঠা করেন আরবি, ফারসি এবং ইসলামিক আইন অধ্যয়নের জন্য।
- বেনারস সংস্কৃত কলেজ (১৭৯১): জোনাথন ডানকান এটি প্রতিষ্ঠা করেন হিন্দু আইন ও দর্শন চর্চার জন্য।
প্রাচ্যবাদীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল দুটো: প্রথমত, ভারতের প্রাচীন জ্ঞানভান্ডারকে আবিষ্কার করা এবং দ্বিতীয়ত, ভারতীয়দের ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে তাদের মন জয় করা, যা শাসনকার্যকে সহজ করবে। তারা মনে করত, স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতি না বুঝলে এদেশের মানুষকে শাসন করা সম্ভব নয়।
'প্রাচ্যের গুরুতর ভুল' (Grave Errors of the East)
উনিশ শতকের শুরু থেকেই প্রাচ্যবাদী ধারণার তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। ব্রিটিশদের মধ্যে একটি নতুন গোষ্ঠী প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, যারা প্রাচ্য সংস্কৃতিকে পুরোপুরি অকেজো এবং অবৈজ্ঞানিক বলে মনে করত। এদের বলা হতো অ্যাংলিসিস্ট (Anglicist) বা পাশ্চাত্যবাদী।
এই সমালোচকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জেমস মিল (James Mill)। তিনি তাঁর বিখ্যাত বই "A History of British India"-তে ভারতীয় সভ্যতাকে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি বলেন, প্রাচ্যের জ্ঞান সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ, অবৈজ্ঞানিক এবং স্বৈরাচারকে সমর্থন করে। তাঁর মতে, ভারতীয়দের 'সভ্য' করতে হলে ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষা দেওয়া অপরিহার্য।
এই সময়ে খ্রিস্টান মিশনারিরাও ভারতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁরাও মনে করতেন যে, ভারতীয়দের ধর্ম ও সংস্কৃতি কুসংস্কারে পূর্ণ এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার মাধ্যমেই তাদের 'উদ্ধার' করা সম্ভব। শ্রীরামপুরে মিশনারি উইলিয়াম কেরি (William Carey) একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন এবং স্থানীয় ভাষায় বাইবেল অনুবাদসহ বিভিন্ন গ্রন্থ ছাপতে শুরু করেন।
এই অ্যাংলিসিস্টদের মূল যুক্তি ছিল:
- জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভাব: তাঁদের মতে, ভারতীয় শাস্ত্রে কোনো বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা নেই, বরং এটি কল্পকাহিনী এবং কুসংস্কারে ভরা।
- অব্যবহারিক শিক্ষা: তাঁরা প্রশ্ন তোলেন যে, আরবি বা সংস্কৃত শিখে আধুনিক যুগে টিকে থাকা সম্ভব নয়। বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজন ইংরেজি এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞান।
- 'উন্নয়ন'-এর ধারণা: তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে, ভারতকে যদি প্রগতির পথে নিয়ে যেতে হয়, তবে পাশ্চাত্য শিক্ষাই একমাত্র পথ।
ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন: মেকলের মিনিট (Macaulay's Minute)
প্রাচ্যবাদী এবং পাশ্চাত্যবাদীদের মধ্যে এই বিতর্ক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় ১৮৩০-এর দশকে। এই বিতর্কের অবসান ঘটান টমাস ব্যাবিংটন মেকলে (Thomas Babington Macaulay), যিনি ভারতের জেনারেল কমিটির সভাপতি ছিলেন। ১৮৩৫ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত 'মিনিট অন ইন্ডিয়ান এডুকেশন' (Minute on Indian Education) পেশ করেন, যা মেকলের মিনিট নামে পরিচিত।
মেকলে ছিলেন একজন ঘোর অ্যাংলিসিস্ট। তিনি ভারতীয় জ্ঞান ও সাহিত্যকে চূড়ান্ত অবজ্ঞার চোখে দেখতেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি ছিল:
"A single shelf of a good European library was worth the whole native literature of India and Arabia."
অর্থাৎ, "একটি ভালো ইউরোপীয় লাইব্রেরির একটিমাত্র তাক ভারত ও আরবের সমগ্র সাহিত্যের চেয়ে বেশি মূল্যবান।"
মেকলের মিনিটের মূল প্রস্তাবনাগুলি ছিল:
- শিক্ষার মাধ্যম: শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষাকেই চূড়ান্ত করা হয়। তিনি যুক্তি দেন যে, ইংরেজি হলো আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা এবং এটি ভারতীয়দের বিশ্ব সম্পর্কে জানতে সাহায্য করবে।
- অর্থ বরাদ্দ: তিনি বলেন, সরকারের উচিত প্রাচ্য ভাষার প্রতিষ্ঠানগুলিতে অর্থ ব্যয় না করে সেই অর্থ ইংরেজি শিক্ষা প্রসারে ব্যবহার করা।
- নতুন精英 শ্রেণি তৈরি: মেকলের মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একদল ভারতীয় তৈরি করা, যারা জন্ম ও বর্ণে ভারতীয় হলেও রুচি, মতামত, নৈতিকতা এবং বুদ্ধিতে হবে ইংরেজ। এই শিক্ষিত শ্রেণি ব্রিটিশ সরকার এবং সাধারণ ভারতীয়দের মধ্যে দোভাষীর কাজ করবে। এই নীতিকে ‘চুইয়ে পড়া নীতি’ (Downward Filtration Theory) বলা হয়, যেখানে মনে করা হতো উচ্চবিত্তদের মধ্যে শিক্ষা ছড়িয়ে দিলে তা ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
মেকলের প্রস্তাবনা তৎকালীন গভর্নর-জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক গ্রহণ করেন এবং ১৮৩৫ সালের ইংরেজি শিক্ষা আইন (English Education Act of 1835) পাশ হয়। এর মাধ্যমে ভারতে সরকারিভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষার যুগ শুরু হয় এবং প্রাচ্যবাদী প্রতিষ্ঠানগুলির গুরুত্ব কমতে থাকে।
বাণিজ্য ও প্রশাসনের জন্য শিক্ষা (Education for Commerce and Administration)
ব্রিটিশরা শুধুমাত্র 'সভ্যতা' শেখানোর মহান দায়িত্ববোধ থেকে ইংরেজি শিক্ষা চালু করেনি। এর পেছনে ছিল সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য।
১৮৫৪ সালে, কোর্ট অফ ডিরেক্টরস-এর সভাপতি স্যার চার্লস উড (Sir Charles Wood) ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা পাঠান, যা উডের ডেসপ্যাচ (Wood's Despatch) নামে পরিচিত। এটিকে প্রায়শই 'ভারতে ইংরেজি শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা' (Magna Carta of English Education in India) বলা হয়।
উডের ডেসপ্যাচের মূল উদ্দেশ্য ও সুপারিশগুলি ছিল:
- প্রশাসনিক সুবিধা: ব্রিটিশদের বিশাল সাম্রাজ্য চালানোর জন্য প্রচুর সংখ্যক কেরানি, হিসাবরক্ষক এবং নিম্নপদস্থ কর্মচারীর প্রয়োজন ছিল। ইংল্যান্ড থেকে এত লোক আনা ব্যয়বহুল ছিল। তাই তারা চেয়েছিল সস্তায় ভারতীয় কর্মচারী নিয়োগ করতে, যারা ইংরেজি জানে এবং ব্রিটিশ প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত।
- অর্থনৈতিক লাভ: ব্রিটিশরা মনে করত, পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয়দের রুচি ও জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন হবে। তারা ব্রিটিশ পণ্য, যেমন পোশাক, বই এবং অন্যান্য সামগ্রী ব্যবহার করতে আগ্রহী হবে, যা ইংল্যান্ডের কলকারখানার জন্য একটি বড় বাজার তৈরি করবে।
- একটি নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা: উডের ডেসপ্যাচে একটি সুসংগঠিত শিক্ষা ব্যবস্থার রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল।
- প্রতিটি প্রদেশে একটি করে শিক্ষা দপ্তর (Department of Public Instruction) খোলা হবে।
- লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে কলকাতা, বোম্বে এবং মাদ্রাজে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে (এবং ১৮৫৭ সালে তা করাও হয়েছিল)।
- উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হবে ইংরেজি, কিন্তু প্রাথমিক স্তরে স্থানীয় বা দেশীয় ভাষার (vernacular) গুরুত্বও স্বীকার করা হয়েছিল।
- শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠান তৈরি এবং নারীশিক্ষার প্রসারের কথাও বলা হয়েছিল।
উডের ডেসপ্যাচ ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, যা আজও অনেকাংশে বিদ্যমান। কিন্তু এর মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্বার্থ রক্ষা করা।
স্থানীয় বিদ্যালয়গুলির কী হল? (What Happened to the Local Schools?)
ব্রিটিশদের এই নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করার আগে ভারতে নিজস্ব একটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু ছিল। এই ব্যবস্থাটি ছিল মূলত অনানুষ্ঠানিক এবং নমনীয়।
স্কটিশ মিশনারি উইলিয়াম অ্যাডাম (William Adam) ১৮৩০-এর দশকে বাংলা ও বিহারের গ্রামাঞ্চল পরিদর্শন করে দেশীয় বিদ্যালয়গুলির উপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। তাঁর প্রতিবেদন থেকে আমরা তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে পারি:
- পাঠশালা ও মক্তব: হিন্দুদের জন্য পাঠশালা এবং মুসলিমদের জন্য মক্তব ছিল। এগুলি সাধারণত কোনো মন্দিরের বারান্দায়, কোনো গাছের নিচে বা শিক্ষকের (গুরু) বাড়িতে চলত।
- নমনীয় ব্যবস্থা: এখানে কোনো নির্দিষ্ট নিয়মকানুন ছিল না। কোনো নির্দিষ্ট ফি, ছাপানো বই, আলাদা ক্লাসরুম, বেঞ্চ বা চেয়ার, বাৎসরিক পরীক্ষা বা রুটিন ছিল না।
- শিক্ষাদান পদ্ধতি: গুরু যা শেখানোর প্রয়োজন মনে করতেন, তাই শেখাতেন। শিক্ষা ছিল মূলত মৌখিক। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী শিখত। ফসল কাটার সময় ক্লাস বন্ধ থাকত, যাতে গ্রামের শিশুরা ক্ষেতে কাজ করতে পারে।
১৮৫৪ সালের পর ব্রিটিশ সরকার দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তাদের 'উন্নতি'-র ধারণা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
- নতুন নিয়মকানুন: সরকার বেশ কিছু নতুন নিয়ম চালু করে। প্রতিটি গুরুকে সরকারের কাছে তাদের পাঠশালার বিবরণ জমা দিতে বলা হয়।
- সরকারি পণ্ডিত নিয়োগ: চার-পাঁচটি স্কুলের দায়িত্বে একজন করে সরকারি পণ্ডিত নিয়োগ করা হয়। তাঁদের কাজ ছিল পাঠশালা পরিদর্শন করা এবং শিক্ষার মান উন্নত করা।
- পাঠ্যপুস্তক ও পরীক্ষা: নতুন পাঠ্যপুস্তকের উপর ভিত্তি করে শিক্ষাদান শুরু হয় এবং বাৎসরিক পরীক্ষা চালু করা হয়।
- অনুদান ব্যবস্থা: যে সমস্ত পাঠশালা এই নতুন নিয়ম মেনে চলত, তারা সরকারি অনুদান পেত। আর যারা স্বাধীনভাবে চলতে চাইত, তারা কোনো সরকারি সাহায্য পেত না।
এর ফল হয়েছিল মারাত্মক। নতুন নিয়মকানুনের চাপে দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাসে আসা এবং ফি দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। নমনীয় ব্যবস্থাটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ফসল কাটার সময় তারা আর স্কুলে আসতে পারত না। ফলে, সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত পাঠশালাগুলির কাছে ঐতিহ্যবাহী পাঠশালাগুলি প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।
জাতীয় শিক্ষার এজেন্ডা (The Agenda for a National Education)
ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ভারতীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে অনেক ভারতীয় চিন্তাবিদ এবং নেতা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার কথা ভাবতে শুরু করেন, যা হবে truly Indian বা genuinely national।
তাঁরা মনে করতেন, ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থা ভারতীয়দের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে দুজন মহান ব্যক্তিত্বের চিন্তাভাবনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
মহাত্মা গান্ধীর (Mahatma Gandhi) ভাবনা
মহাত্মা গান্ধী ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষার একজন কঠোর সমালোচক। তিনি মনে করতেন:
- দাসত্বের প্রতীক: ইংরেজি শিক্ষা ভারতীয়দের মনে দাসত্বের মনোভাব তৈরি করেছে। এটি আমাদের নিজেদের সংস্কৃতিকে ঘৃণা করতে শিখিয়েছে এবং পাশ্চাত্য সভ্যতাকে শ্রেষ্ঠ বলে ভাবতে বাধ্য করেছে।
- বিচ্ছিন্নতা তৈরি: ইংরেজি ভাষা শিক্ষিত ভারতীয়দের সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। শিক্ষিতরা তাদের নিজেদের দেশের মানুষের সমস্যা ও অনুভূতি বুঝতে পারে না।
- পুথিগত ও অবাস্তব: এই শিক্ষা ব্যবস্থা শুধুমাত্র বই পড়া এবং লেখার উপর জোর দেয়, জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার উপর নয়। এটি শিক্ষার্থীদের কোনো বৃত্তিমূলক বা হাতের কাজ শেখায় না।
গান্ধী একটি বিকল্প শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখতেন, যার নাম তিনি দিয়েছিলেন 'নঈ তালিম' বা বুনিয়াদি শিক্ষা (Basic Education)। এর মূল কথা ছিল:
- মাতৃভাষায় শিক্ষা: সমস্ত শিক্ষা মাতৃভাষায় হওয়া উচিত, যা চিন্তাভাবনাকে সহজ ও স্বাভাবিক করে তুলবে।
- হাতের কাজের মাধ্যমে শিক্ষা: তিনি মনে করতেন, শিশুদের কোনো একটি হস্তশিল্প (যেমন সুতো কাটা, বুনন, কাঠের কাজ) শেখানো উচিত এবং সমস্ত জ্ঞান সেই কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত করে শেখানো উচিত। এতে তারা ছোট থেকেই স্বনির্ভর হতে শিখবে এবং শ্রমের মর্যাদা বুঝবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (Rabindranath Tagore) ভাবনা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থার কঠোর সমালোচক ছিলেন। তিনি যখন ছোট ছিলেন, তখন স্কুলের দমবন্ধ করা পরিবেশ তাঁর কাছে জেলখানার মতো মনে হতো। তিনি এমন একটি স্কুলের স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে শিশুরা প্রকৃতির সান্নিধ্যে আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারবে।
এই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে তিনি ১৯০১ সালে কলকাতার বাইরে একটি গ্রামীণ পরিবেশে শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন।
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা ভাবনার মূল দিকগুলি হলো:
- সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতা: তিনি মনে করতেন, শিশুদের মধ্যে স্বাভাবিক কৌতূহল এবং সৃজনশীলতা থাকে। প্রচলিত স্কুল ব্যবস্থা সেই গুণগুলিকে নষ্ট করে দেয়। শান্তিনিকেতনে তিনি শিশুদের মুক্ত পরিবেশে তাদের নিজস্ব আগ্রহ অনুযায়ী শেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
- প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ: তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ শিশুর বিকাশের জন্য অপরিহার্য। তাই শান্তিনিকেতনের বেশিরভাগ ক্লাস হতো গাছের তলায়, খোলা মাঠে।
- প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন: গান্ধীর মতো রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য সভ্যতাকে পুরোপুরি বর্জন করার পক্ষে ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, ভারতের নিজস্ব ঐতিহ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের সেরা দিকগুলির একটি সুন্দর সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন। শান্তিনিকেতনে তিনি কলা, সঙ্গীত, নৃত্য এবং বিজ্ঞানের সহাবস্থানে বিশ্বাসী ছিলেন।
গান্ধী এবং রবীন্দ্রনাথের মধ্যে কিছু বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও, তাঁরা দুজনেই একমত ছিলেন যে, একটি স্বাধীন দেশের জন্য তার নিজস্ব জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য, যা দেশের সংস্কৃতি এবং প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: প্রাচ্যবাদী (Orientalist) ও অ্যাংলিসিস্টদের (Anglicist) মধ্যে মূল পার্থক্য কী ছিল?
উত্তর: প্রাচ্যবাদী ও অ্যাংলিসিস্টদের মধ্যে মূল পার্থক্য ছিল ভারতে শিক্ষার মাধ্যম ও বিষয়বস্তু নিয়ে।
- প্রাচ্যবাদীরা (যেমন উইলিয়াম জোন্স) ভারতের প্রাচীন ভাষা (সংস্কৃত, ফারসি) এবং শাস্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁরা মনে করতেন, ভারতীয়দের তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও ভাষাতেই শিক্ষা দেওয়া উচিত।
- অ্যাংলিসিস্টরা (যেমন টমাস মেকলে) ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানকে অকেজো ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন বলে মনে করতেন। তাঁরা ভারতে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও দর্শন শেখানোর পক্ষে ছিলেন। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশদের অনুগত একটি শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি করা।
প্রশ্ন ২: উডের ডেসপ্যাচ (Wood's Despatch) ১৮৫৪-কে কেন ভারতীয় শিক্ষার 'ম্যাগনা কার্টা' বলা হয়?
উত্তর: উডের ডেসপ্যাচকে ভারতীয় শিক্ষার 'ম্যাগনা কার্টা' বা মহাসনদ বলা হয় কারণ এটিই প্রথম ভারতে একটি সুসংগঠিত এবং ব্যাপক শিক্ষা ব্যবস্থার রূপরেখা দিয়েছিল। এর প্রধান কারণগুলি হলো:
- এটি প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত একটি সম্পূর্ণ শিক্ষা কাঠামো তৈরি করার সুপারিশ করে।
- প্রতিটি প্রদেশে একটি করে শিক্ষা দপ্তর তৈরির কথা বলে, যা শিক্ষার প্রসারে নজর রাখবে।
- কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে, যা উচ্চশিক্ষার প্রসারে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল।
- এটি ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি দেশীয় ভাষার গুরুত্বও স্বীকার করে এবং প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে দেশীয় ভাষাকে ব্যবহারের কথা বলে।
- শিক্ষক প্রশিক্ষণ, নারীশিক্ষা এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষার উপরও গুরুত্ব আরোপ করে।
প্রশ্ন ৩: মহাত্মা গান্ধী কেন ইংরেজি শিক্ষার তীব্র বিরোধী ছিলেন?
উত্তর: মহাত্মা গান্ধী ইংরেজি শিক্ষার তীব্র বিরোধী ছিলেন কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে এটি ভারতীয়দের আত্মমর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাঁর বিরোধিতার মূল কারণগুলি হলো:
- মানসিক দাসত্ব: তিনি মনে করতেন, ইংরেজি শিক্ষা ভারতীয়দের মনে হীনম্মন্যতা তৈরি করে এবং তাদের বিশ্বাস করতে শেখায় যে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও জ্ঞান ভারতীয় সংস্কৃতির চেয়ে উন্নত। এটি এক ধরনের মানসিক দাসত্ব তৈরি করে।
- জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতা: ইংরেজি ভাষা একটি প্রাচীর তৈরি করে, যা শিক্ষিত শ্রেণিকে দেশের সাধারণ, অশিক্ষিত জনগণ থেকে আলাদা করে দেয়। এর ফলে শিক্ষিতরা দেশের মূল সমস্যাগুলি বুঝতে পারে না।
- অবাস্তব শিক্ষা: এটি ছিল পুঁথিগত শিক্ষা, যা শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করত না বা কোনো হাতের কাজ শেখাত না। ফলে, শিক্ষিতরা স্বনির্ভর হতে পারত না।
- সৃজনশীলতার অভাব: গান্ধী মনে করতেন, বিদেশি ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করতে হলে মুখস্থবিদ্যার উপর জোর দিতে হয়, যা শিশুর স্বাভাবিক সৃজনশীলতা এবং চিন্তাশক্তিকে নষ্ট করে দেয়।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায় থেকে আমরা ব্রিটিশ ভারতে শিক্ষা ব্যবস্থার বিবর্তন এবং তার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পারলাম। মূল বিষয়গুলি সংক্ষেপে মনে রাখার জন্য নিচে দেওয়া হলো:
- প্রাচ্যবাদ: ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিকে, উইলিয়াম জোন্সের মতো প্রাচ্যবাদীরা ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতির উপর জোর দিয়েছিলেন এবং কলকাতা মাদ্রাসা ও বেনারস সংস্কৃত কলেজের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন।
- অ্যাংলিসিজম: উনিশ শতকের শুরুতে জেমস মিল এবং টমাস মেকলের মতো অ্যাংলিসিস্টরা প্রাচ্য শিক্ষাকে 'ত্রুটিপূর্ণ' বলে সমালোচনা করেন এবং ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য শিক্ষার দাবি জানান।
- মেকলের মিনিট (১৮৩৫): মেকলের বিখ্যাত রিপোর্টের ভিত্তিতে ভারতে সরকারিভাবে ইংরেজিকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল এমন একটি ভারতীয় শ্রেণি তৈরি করা যারা রক্তে ভারতীয় হলেও চিন্তায় ও রুচিতে ইংরেজ হবে।
- উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪): এটি ভারতে একটি নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে, যার মধ্যে ছিল শিক্ষা দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং প্রাথমিক স্তরে দেশীয় ভাষার ব্যবহার। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ প্রশাসন ও বাণিজ্যের সুবিধা করা।
- দেশীয় শিক্ষার পতন: ব্রিটিশদের নতুন, কঠোর নিয়মকানুনের ফলে ভারতের ঐতিহ্যবাহী ও নমনীয় পাঠশালা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়।
- জাতীয় শিক্ষার অন্বেষণ: ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া হিসেবে মহাত্মা গান্ধী (বুনিয়াদি শিক্ষা) এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শান্তিনিকেতন) মতো ব্যক্তিত্বরা একটি বিকল্প জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা ভারতীয় সংস্কৃতি ও প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।
সুতরাং, আমরা দেখতে পাই যে ব্রিটিশদের শিক্ষা নীতি শুধুমাত্র জ্ঞান বিতরণের একটি মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, যা ভারতীয় সমাজ ও মানসিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিল। এর বিরুদ্ধে ভারতীয়দের প্রতিরোধ এবং নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।