ঘটনার প্রেক্ষাপট
সাল ১৯৫৯। সোভিয়েত ইউনিয়নের কনকনে শীতের রাত। উরাল পর্বতমালার গভীরে, যেখানে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ৩০ ডিগ্রি নিচে নেমে যায়, সেখানে একদল তরুণ অভিযাত্রী যাত্রা শুরু করেছিল। ইগর দিয়াতলভের নেতৃত্বে এই দলে ছিলেন নয়জন অভিজ্ঞ স্কি-হাইকার, প্রত্যেকেই উরাল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্রছাত্রী। তাদের লক্ষ্য ছিল ওটোরটেন পর্বতের চূড়া জয় করা, যা স্থানীয় মানসি উপজাতির ভাষায় এর অর্থ 'সেখানে যেও না'। এই আপাত সরল অভিযানটি যে ইতিহাসের অন্যতম শীতল এবং অমীমাংসিত রহস্যে পরিণত হবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
অভিযানের শুরুতে দশজন সদস্য থাকলেও, ইউরি ইউদিন নামে একজন অসুস্থতার কারণে ফিরে আসতে বাধ্য হন। এই সিদ্ধান্তটি অজান্তেই তার জীবন বাঁচিয়ে দেয়। বাকি নয়জন তাদের যাত্রা চালিয়ে যান। ১ ফেব্রুয়ারী, দলটি 'খোলাত সিয়াকল' বা 'মৃতের পাহাড়' (Mountain of the Dead) নামক এক পর্বতের ঢালে তাদের শেষ শিবির স্থাপন করে। দিয়াতলভের ডায়েরি এবং ছবি থেকে জানা যায়, তাদের মনোবল ছিল তুঙ্গে। কিন্তু সেই রাতের পর তাদের সাথে আর কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
রহস্যের জাল
যখন নির্দিষ্ট সময়ে দলটি ফিরে এলো না, তখন অনুসন্ধান শুরু হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি, উদ্ধারকারী দল তাদের পরিত্যক্ত শিবিরটি খুঁজে পায়। দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর এবং ভয়ঙ্কর। তাবুগুলো ভেতর থেকে ধারালো কিছু দিয়ে কাটা হয়েছিল, যেন কেউ আতঙ্কিত হয়ে বাইরে বেরোনোর চেষ্টা করেছে। অভিযাত্রীদের সমস্ত জিনিসপত্র, জুতো এবং গরম পোশাক তাবুর ভেতরেই পড়ে ছিল। বরফের উপর খালি পায়ের ছাপগুলো নিকটবর্তী বনের দিকে চলে গেছে।
তদন্ত যত এগোতে থাকল, রহস্য আরও ঘনীভূত হতে শুরু করল। ক্যাম্প থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে, একটি বিশাল পাইন গাছের নিচে দুটি মৃতদেহ পাওয়া যায়। তাদের পরনে ছিল শুধুমাত্র অন্তর্বাস। কাছাকাছি একটি নিভে যাওয়া আগুনের চিহ্ন ছিল। গাছটির ডালপালা পাঁচ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত ভাঙা ছিল, যা থেকে অনুমান করা হয় কেউ হয়তো উপরে ওঠার চেষ্টা করেছিল।
গাছ এবং ক্যাম্পের মাঝামাঝি পাওয়া গেল আরও তিনটি দেহ, যার মধ্যে দলনেতা ইগর দিয়াতলভও ছিলেন। তাদের ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল তারা ক্যাম্পে ফিরে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর আবিষ্কারটি ঘটে দুই মাস পরে, যখন বরফ গলতে শুরু করে। একটি গিরিখাতের গভীরে, চার মিটার বরফের নিচে বাকি চারটি মৃতদেহ পাওয়া যায়। এই দেহগুলোতে ভয়াবহ আঘাতের চিহ্ন ছিল। একজনের মাথার খুলি ভেঙে গিয়েছিল, দুজনের পাঁজরের হাড় এমনভাবে ভেঙেছিল যা একটি মারাত্মক গাড়ি দুর্ঘটনার আঘাতের সাথে তুলনীয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং বীভৎস ছিল লুডমিলা ডুবিনিনার দেহটি; তার চোখ এবং জিহ্বা অনুপস্থিত ছিল।
তদন্তে আরও কিছু অদ্ভুত তথ্য উঠে আসে। কিছু পোশাক পরীক্ষা করে তাতে উচ্চ মাত্রার তেজস্ক্রিয়তার উপস্থিতি পাওয়া যায়। কিন্তু ঘটনাস্থলে কোনো বহিরাগত বা আক্রমণের কোনো চিহ্ন ছিল না। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এমন কী ঘটেছিল সেই রাতে যা এই অভিজ্ঞ পর্বতারোহীদের প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যে প্রায় নগ্ন অবস্থায় তাবু কেটে পালাতে বাধ্য করেছিল? কী কারণে তারা এমন ভয়ংকর আঘাত পেয়েছিল?
সত্যের উন্মোচন
সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ এই ঘটনার তদন্ত শেষে একটি সংক্ষিপ্ত এবং রহস্যময় সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। তারা জানায়, অভিযাত্রীরা এক 'অপ্রতিরোধ্য প্রাকৃতিক শক্তির' (compelling natural force) কারণে মারা গিয়েছিল। এরপর মামলাটি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং আগামী তিন বছরের জন্য এলাকাটি সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
বছরের পর বছর ধরে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানা তত্ত্ব তৈরি হয়েছে। কেউ বলেছেন, এটি ছিল তুষারধসের ঘটনা, কিন্তু ক্যাম্পের অবস্থান এবং আঘাতের ধরন সেই তত্ত্বকে পুরোপুরি সমর্থন করে না। আবার কেউ সোভিয়েত গোপন সামরিক পরীক্ষার দিকে আঙুল তুলেছে, যা তেজস্ক্রিয়তার উপস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে পারে। এছাড়াও রয়েছে ইনফ্রাসাউন্ড (শব্দোত্তর তরঙ্গ) তত্ত্ব, যা মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে, এমনকি ভিনগ্রহের প্রাণী বা ইয়েতির আক্রমণের মতো কল্পনাপ্রসূত তত্ত্বও উঠে এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে, ২০২১ সালের একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা একটি নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন। তারা কম্পিউটার মডেলিংয়ের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, ‘স্ল্যাব অ্যাভাল্যাঞ্চ’ বা তুষারের চাঁই ধসে পড়ার ফলেই এই ঘটনা ঘটতে পারে। তাদের মতে, পর্বতের ঢালে জমে থাকা বরফের একটি স্তর হঠাৎ করে রাতে তাদের তাবুর উপর নেমে আসে, যা তাদের আতঙ্কিত করে এবং গুরুতর আঘাতের কারণ হয়।
যদিও এই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাটি অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়, কিছু রহস্যের সমাধান এখনও হয়নি। যেমন, লুডমিলার জিহ্বা এবং চোখ উধাও হওয়ার কারণ কী? কেন তাদের পোশাকে তেজস্ক্রিয়তা ছিল? দিয়াতলভ পাসের সেই রাতের ঘটনা আজও ইতিহাস এবং বিজ্ঞানের জগতে এক শিহরণ জাগানো রহস্য হয়েই রয়ে গেছে, যা আমাদের প্রকৃতির বিশাল এবং অজানা শক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়।
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)