ঘটনার প্রেক্ষাপট

১৯৬৬ সালের ২০শে আগস্ট, ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর নিটেরোই শহরের ভিন্টেম পাহাড়ের ঢালে এক কিশোর তার ঘুড়ি ওড়াচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় অদ্ভুত এক দৃশ্যে। সবুজ ঘাসের উপর পাশাপাশি পড়ে আছে দুটি নিথর দেহ। পুলিশের কাছে খবর পৌঁছালে, দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে পরদিন সকালে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। দৃশ্যটা ছিল হিমশীতল এবং অবিশ্বাস্যভাবে অদ্ভুত।

দুজন পুরুষ, পরনে তাদের পরিপাটি ফরমাল স্যুট এবং ওয়াটারপ্রুফ কোট। কিন্তু তাদের মুখ ঢাকা ছিল দুটি অদ্ভুতদর্শন সিসার মুখোশে, যা দিয়ে কেবল চোখ দুটো ঢাকা যায়, অনেকটা রেডিয়েশন থেকে বাঁচতে যেমনটা ব্যবহার করা হয়। মৃতদেহ দুটির পাশে পড়েছিল একটি খালি জলের বোতল, দুটি তোয়ালে এবং একটি ছোট নোটবুক। অবাক করা বিষয় হলো, তাদের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না, ছিল না কোনো ধস্তাধস্তির লক্ষণও। যেন স্বেচ্ছায়, কোনো এক অজানা আহ্বানে তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।

রহস্যের জাল

তদন্ত শুরু হলে মৃতদেহ দুটি শনাক্ত করা হয়। তারা ছিলেন মানোয়েল পেরেরা দা ক্রুজ এবং মিগুয়েল হোসে ভিয়ানা, পেশায় ইলেকট্রনিক্স টেকনিশিয়ান। তারা রিও থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের শহর Campos dos Goytacazes-এর বাসিন্দা ছিলেন। পরিবারকে তারা জানিয়েছিলেন যে, কাজের জন্য কিছু সরঞ্জাম কিনতে যাচ্ছেন। কিন্তু তারা নিজেদের শহর থেকে এত দূরে এই জনমানবহীন পাহাড়ে কী করছিলেন?

সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে ছিল সেই নোটবুকটির ভেতরে। তাতে সাংকেতিক ভাষায় লেখা ছিল কয়েকটি নির্দেশ: “১৬:৩০-এ নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত থাকতে হবে। ১৮:৩০-এ ক্যাপসুল গ্রহণ করতে হবে, প্রভাব শুরু হলে ধাতু রক্ষা করতে হবে এবং সংকেতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।” কী এই ক্যাপসুল? কিসের সংকেত? আর কেনই বা ধাতু রক্ষা করার কথা বলা হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলো তদন্তকারীদের আরও গভীর এক ধাঁধার মধ্যে ফেলে দেয়।

তদন্তে জানা যায়, মানোয়েল ও মিগুয়েল দুজনেই আধ্যাত্মিকতাবাদ এবং ভিনগ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তাদের এক বন্ধু পুলিশকে জানান যে, তারা ‘বৈজ্ঞানিক আধ্যাত্মিকতাবাদী’ নামে একটি দলের সদস্য ছিলেন, যারা মহাজাগতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করত। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, তারা হয়তো কোনো সাইকেডেলিক ড্রাগ বা ‘ক্যাপসুল’ গ্রহণ করেছিলেন, যা তাদের অন্য জগতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে সাহায্য করবে বলে বিশ্বাস করতেন। আর সেই সংযোগের মুহূর্তে তীব্র আলোকরশ্মি থেকে চোখ বাঁচাতে তারা সিসার মুখোশ পরেছিলেন। কিন্তু সেই সংযোগ কি স্থাপিত হয়েছিল? নাকি অতিরিক্ত ড্রাগের প্রভাবে তাদের মৃত্যু হয়?

রহস্য আরও ঘনীভূত হয় যখন স্থানীয় কিছু বাসিন্দা দাবি করেন যে, ওই রাতে তারা ভিন্টেম পাহাড়ের আকাশে একটি অদ্ভুত উজ্জ্বল, কমলা রঙের উড়ন্ত বস্তু (UFO) দেখেছিলেন। কেউ কেউ আবার দাবি করেন, দেহ দুটি যেখানে পাওয়া গিয়েছিল, সেখান থেকে নীল আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হতে দেখেছিলেন। তাহলে কি তারা সত্যিই কোনো ভিনগ্রহের সংকেত পেয়েছিলেন? সেই সংকেতই কি তাদের মৃত্যুর কারণ?

সত্যের উন্মোচন

দুর্ভাগ্যবশত, এই রহস্যের কোনো নির্দিষ্ট সমাধান মেলেনি। মৃতদেহ দুটির ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হলেও, অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো এতটাই পচে গিয়েছিল যে মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া না গেলেও, তার স্বপক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ মেলেনি।

সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্বটি হলো, তারা আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ হিসেবে কোনো অজানা ড্রাগ বা ক্যাপসুল গ্রহণ করেছিলেন, যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তাদের দুজনেরই হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, এক মহাজাগতিক সংযোগ ঘটবে, যার জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু সেই সংযোগের আগেই হয়তো তাদের শরীর বিষাক্ত মাদকের প্রভাব সহ্য করতে পারেনি।

কিন্তু অনেক প্রশ্ন আজও উত্তরহীন। যদি এটা নিছকই ড্রাগ ওভারডোজ হয়, তাহলে সেই ক্যাপসুলগুলো গেল কোথায়? স্থানীয়দের দেখা সেই রহস্যময় আলো বা UFO-এর ব্যাখ্যাই বা কী? কেনই বা নোটবুকে ‘ধাতু রক্ষা’ করার মতো অদ্ভুত নির্দেশ লেখা ছিল? অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও, ভিন্টেম পাহাড়ের সিসার মুখোশের রহস্য আজও অমীমাংসিত। মানোয়েল ও মিগুয়েলের সেই শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা – তা কি ছিল আধ্যাত্মিক মোক্ষলাভের, নাকি এক ভয়ঙ্কর ভুলের?

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)