ঘটনার প্রেক্ষাপট

দ্বাদশ শতাব্দীর ইংল্যান্ড। রাজা স্টিফেনের শাসনামলে সাফোকের উলপিট গ্রাম ছিল আর পাঁচটা সাধারণ গ্রামের মতোই শান্ত, স্নিগ্ধ। গ্রামের নামটা এসেছিল পুরনো ইংরেজি শব্দ "wulf-pytt" থেকে, যার মানে নেকড়ে ধরার গর্ত। গ্রামের জীবন চলত প্রকৃতির নিয়ম মেনে—শস্য বোনা, ফসল কাটা আর প্রার্থনা। সেই размерен জীবনেই একদিন এমন এক রহস্যের আবির্ভাব ঘটল, যা আজও ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়।

সময়টা ছিল ফসল কাটার ভরা মৌসুম। গ্রামের কৃষকেরা মাঠে ব্যস্ত। হঠাৎ গ্রামের পাশে থাকা নেকড়ে-গর্তগুলোর কাছ থেকে উঠে এল দুটি শিশু—একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে। কিন্তু তাদের দেখে উলপিটের বাসিন্দাদের রক্ত হিম হয়ে গেল। তাদের গায়ের রঙ মানুষের মতো নয়, বরং কচি পাতার মতো সবুজ! তাদের পরনের পোশাক ছিল অদ্ভুত, আগে কেউ কখনও দেখেনি। আর তারা কথা বলছিল এমন এক ভাষায়, যা গ্রামের কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না। এই অদ্ভুত শিশুরা কোথা থেকে এল? ওরা কারা? আতঙ্ক আর বিস্ময়ের এক শীতল স্রোত বয়ে গেল শান্ত উলপিট গ্রামের উপর দিয়ে।

রহস্যের জাল

শিশু দুটিকে উদ্ধার করে স্থানীয় জমিদার স্যার রিচার্ড ডি কেইনের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকা ভাই-বোন কিছুতেই স্বাভাবিক খাবার মুখে তুলছিল না। বেশ কয়েকদিন না খেয়ে থাকার পর, যখন তাদের সামনে কাঁচা শিম আনা হলো, তারা যেন প্রাণের সন্ধান পেল। গোগ্রাসে শুধু শিমের বীচিই খেতে লাগল তারা। বেশ কিছুদিন তাদের একমাত্র খাবার ছিল এই শিম।

ধীরে ধীরে তারা গ্রামের জীবনের সাথে অভ্যস্ত হতে শুরু করল। গ্রামের খাবার খেতে শেখার পর তাদের গায়ের সবুজ রঙ ফিকে হয়ে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। কিন্তু এই নতুন পরিবেশ ছেলেটির স্বাস্থ্যের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। সে ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তাদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার কিছুদিন পরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

কিন্তু মেয়েটি বেঁচে যায়। সে ইংরেজি ভাষা শিখতে শুরু করে এবং একসময় তার অতীত জীবনের এক অবিশ্বাস্য গল্প শোনায়। তার কথা অনুযায়ী, তারা এসেছিল 'সেন্ট মার্টিন'স ল্যান্ড' নামের এক অদ্ভুত জায়গা থেকে। সেখানে নাকি কখনও দিনের উজ্জ্বল আলো পৌঁছায় না, সবসময় গোধূলির মতো আবছা আলোয় ঢাকা থাকে চারপাশ। সেখানকার সবকিছুর রঙই নাকি সবুজ। সে জানায়, একদিন তারা তাদের বাবার গবাদি পশুদের অনুসরণ করতে করতে একটি গুহায় প্রবেশ করে। গুহার ভেতর তারা ঘণ্টার মতো এক অদ্ভুত শব্দ শুনতে পায় এবং সেই শব্দ অনুসরণ করতে করতে একসময় উলপিটের মাঠে এসে পৌঁছায়। এই অবিশ্বাস্য কাহিনী রহস্যের আগুনে নতুন করে ঘি ঢালল। তারা কি সত্যিই কোনো ভূগর্ভস্থ জগৎ থেকে এসেছিল?

সত্যের উন্মোচন

এই সবুজ শিশুদের রহস্য নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলেছে নানা জল্পনা-কল্পনা। কেউ বলেছে ওরা ভিনগ্রহের প্রাণী, কেউ বলেছে ওরা অন্য কোনো মাত্রার জগতের বাসিন্দা। তবে ইতিহাসবিদরা এর কিছু বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্বটি হলো, শিশু দুটি ছিল ফ্ল্যান্ডার্স (বর্তমান বেলজিয়ামের অংশ) থেকে আসা অভিবাসীর সন্তান। সেই সময় রাজা দ্বিতীয় হেনরির অত্যাচারে বহু ফ্লেমিশভাষী মানুষ ইংল্যান্ডে পালিয়ে এসেছিলেন এবং তাদের উপর নির্মম অত্যাচার চালানো হয়েছিল। ঐতিহাসিক পল হ্যারিসের মতে, ১১৭৩ সালের দিকে ফ্লেমিশ বিদ্রোহীদের সাথে রাজার সৈন্যদের এক ভয়ংকর যুদ্ধ হয়। সম্ভবত, সেই সময় কোনো ফ্লেমিশ পরিবার প্রাণভয়ে পালিয়ে এসে কাছাকাছি কোনো জঙ্গলের গুহায় আশ্রয় নেয়। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর অনাথ শিশু দুটি খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে উলপিটে চলে আসে। তাদের অদ্ভুত পোশাক ছিল আসলে ফ্লেমিশ পোশাক, যা ইংরেজদের কাছে অজানা ছিল। আর তাদের ভাষাও ছিল ফ্লেমিশ।

কিন্তু তাদের গায়ের রঙ সবুজ ছিল কেন? এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘদিন ধরে অপুষ্টিতে ভোগার কারণে তাদের শরীরে এক বিশেষ ধরনের রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া দেখা দিয়েছিল, যাকে বলা হয় "ক্লোরোসিস" বা 'গ্রিন সিকনেস'। এই রোগের ফলে রোগীর ত্বকে সবুজাভ আভা দেখা দেয়। পরে সুষম খাবার পাওয়ায় মেয়েটির শরীর থেকে এই সমস্যা দূর হয়ে যায় এবং তার গায়ের রঙ স্বাভাবিক হয়ে আসে।

মেয়েটি বড় হয়ে 'আগনেস বার' নাম নিয়ে নর্ফোকের এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেছিল বলে জানা যায়। যদিও এই ব্যাখ্যাটি সবচেয়ে منطقی, তবুও সেন্ট মার্টিন'স ল্যান্ডের সেই গোধূলি মাখা রহস্যময় জগতের গল্প আজও মানুষের মনে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগায়। উলপিটের সবুজ শিশুরা কি সত্যিই ছিল ইতিহাসের এক নির্মম শিকার, নাকি তাদের গল্পে লুকিয়ে আছে আমাদের চেনা জগতের বাইরের কোনো অজানা অধ্যায়? সেই উত্তর আজও সময়ের গর্ভে নিহিত।

(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)