বিষয়ের ভূমিকা

দ্বাদশ শ্রেণি ইতিহাসের পাঠ্যক্রমের নবম অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি আমাদের ঔপনিবেশিক আমলে গ্রামীণ ভারতের সমাজব্যবস্থা, ভূমিরাজস্ব নীতি এবং কৃষকদের সংগ্রামের একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে। ব্রিটিশ শাসন কীভাবে বাংলার জমিদার শ্রেণি এবং সাধারণ কৃষকদের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এনেছিল, তা এই আলোচনার মূল বিষয়বস্তু।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও জমিদারদের উত্থান

১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন। এই ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল:

  • জমির মালিকানা জমিদারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
  • একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ খাজনা সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হতো।
  • সূর্যাস্ত আইনের মাধ্যমে খাজনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে জমিদারি নিলাম করা হতো।

২. জোতদারদের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা

ঊনবিংশ শতাব্দীতে জমিদারদের পাশাপাশি গ্রামীণ সমাজে 'জোতদার' নামক এক নতুন ক্ষমতাশালী শ্রেণির উদ্ভব হয়। জোতদাররা গ্রামের ভেতর থেকেই উঠে এসেছিল এবং তারা গ্রামের স্থানীয় অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল।

৩. পঞ্চম রিপোর্ট (The Fifth Report)

১৮১৩ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি রিপোর্ট পেশ করা হয়, যা ইতিহাসে 'পঞ্চম রিপোর্ট' নামে পরিচিত। এটি কোম্পানির প্রশাসনিক ত্রুটি এবং গ্রামীণ শোষণের দলিল হিসেবে গণ্য হয়।

৪. দামিন-ই-কোহ এবং সাঁওতাল বিদ্রোহ

ব্রিটিশরা পাহাড়িয়াদের নিয়ন্ত্রণ করতে সাঁওতালদের চাষবাসের জন্য উৎসাহিত করে। রাজমহল পাহাড়ের পাদদেশে এই এলাকা 'দামিন-ই-কোহ' নামে পরিচিত হয়। কিন্তু জমিদার ও মহাজনদের অত্যাচারে সাঁওতালরা অতিষ্ঠ হয়ে সিধু ও কানহুর নেতৃত্বে ১৮৫৫ সালে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

১. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কে, কবে প্রবর্তন করেন?

উত্তর: ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন।

২. সূর্যাস্ত আইন কী?

উত্তর: চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অনুযায়ী, নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের আগে খাজনা জমা দিতে ব্যর্থ হলে জমিদারির অধিকার হারিয়ে যেত। একেই সূর্যাস্ত আইন বলা হয়।

৩. সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রধান কারণ কী ছিল?

উত্তর: জমিদারদের উচ্চহারে খাজনা, মহাজনদের শোষণ এবং ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক নীতিই সাঁওতাল বিদ্রোহের মূল কারণ ছিল।

সারসংক্ষেপ

  • চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত গ্রামীণ সমাজে বড় পরিবর্তন আনে।
  • জমিদার ও জোতদার শ্রেণির ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায়।
  • উপনিবেশবাদ গ্রামীণ অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তোলে।
  • সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কৃষকদের অন্যতম বড় প্রতিরোধ।