বিষয়ের ভূমিকা

জীববিজ্ঞানের জগতে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং মৌলিক প্রশ্নগুলির মধ্যে একটি হলো—কীভাবে একটি জীব তার বৈশিষ্ট্যগুলি পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত করে? কেন আমরা আমাদের বাবা-মায়ের মতো দেখতে হই? এই সব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের কোষের নিউক্লিয়াসের গভীরে, এক বিশেষ অণুর মধ্যে। এই অধ্যায়ে, আমরা সেই আণবিক জগতের রহস্য উদ্ঘাটন করব। আমরা জানব বংশগতির মূল ভিত্তি ডিএনএ (DNA), আরএনএ (RNA) এবং প্রোটিনের গঠন ও কাজ সম্পর্কে।

দ্বাদশ শ্রেণির জীববিজ্ঞানের এই ষষ্ঠ অধ্যায়, 'বংশগতির আণবিক ভিত্তি' বা 'Molecular Basis of Inheritance', আমাদের সেই আণবিক স্তরে নিয়ে যায় যেখানে জীবনের নীলনকশা লেখা আছে। গ্রেগর মেন্ডেল বংশগতির সূত্র আবিষ্কার করলেও, তিনি এর পেছনের ভৌত বা রাসায়নিক কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেননি। প্রায় একশ বছর পর, বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন যে ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড বা ডিএনএ (DNA) হলো সেই বংশগতি পদার্থ যা সমস্ত জেনেটিক তথ্য বহন করে।

এই অধ্যায়ে আমরা শিখব:

  • ডিএনএ এবং আরএনএ-এর গঠন।
  • কীভাবে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছিলেন যে ডিএনএ-ই জেনেটিক উপাদান।
  • ডিএনএ কীভাবে নিজের অনুলিপি বা রেপ্লিকা তৈরি করে (Replication)।
  • ডিএনএ থেকে তথ্য কীভাবে আরএনএ-তে স্থানান্তরিত হয় (Transcription)।
  • আরএনএ থেকে কীভাবে প্রোটিন তৈরি হয় (Translation)।
  • জিনগত সংকেত বা জেনেটিক কোড কী।
  • কীভাবে কোষ তার জিনের প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করে (Regulation of Gene Expression)।

এই অধ্যায়ের জ্ঞান শুধুমাত্র পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং আধুনিক জীববিজ্ঞানের ভিত্তি বুঝতে, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি এবং বিভিন্ন জিনগত রোগের কারণ জানতেও অপরিহার্য। চলুন, জীবনের এই আণবিক রহস্যের গভীরে প্রবেশ করি।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. ডিএনএ (DNA): জীবনের নীলনকশা

ডিএনএ বা ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড হলো একটি দীর্ঘ পলিমার যা নিউক্লিওটাইড নামক মনোমার একক দিয়ে তৈরি। এটিই পৃথিবীর প্রায় সমস্ত জীবের প্রধান জেনেটিক উপাদান। একে জীবনের 'ব্লুপ্রিন্ট' বা নীলনকশা বলা হয়, কারণ একটি জীবের গঠন, কাজ এবং বংশবৃদ্ধির সমস্ত নির্দেশাবলী এতে কোড করা থাকে।

ক) একটি পলি-নিউক্লিওটাইড শৃঙ্খলের গঠন

একটি নিউক্লিওটাইডের তিনটি উপাদান থাকে:

  • নাইট্রোজেনঘটিত বেস (Nitrogenous Base): এগুলি দুই প্রকারের – পিউরিন (অ্যাডেনিন-A, গুয়ানিন-G) এবং পিরিমিডিন (সাইটোসিন-C, থাইমিন-T)। আরএনএ-তে থাইমিনের পরিবর্তে ইউরাসিল (U) থাকে।
  • পেন্টোজ শর্করা (Pentose Sugar): ডিএনএ-তে এটি ডিঅক্সিরাইবোজ শর্করা এবং আরএনএ-তে এটি রাইবোজ শর্করা।
  • ফসফেট গ্রুপ (Phosphate Group): এটি শৃঙ্খলটিকে একটি ঋণাত্মক চার্জ প্রদান করে।

দুটি নিউক্লিওটাইড একে অপরের সাথে একটি ফসফোডাইস্টার বন্ড (Phosphodiester bond) দ্বারা যুক্ত থাকে। এই বন্ডটি একটি নিউক্লিওটাইডের শর্করার ৩' কার্বনের সাথে পরবর্তী নিউক্লিওটাইডের ফসফেটের ৫' কার্বনের মধ্যে গঠিত হয়। এইভাবে একটি দীর্ঘ শৃঙ্খল তৈরি হয় যার একদিকে একটি মুক্ত ৫' ফসফেট গ্রুপ এবং অন্যদিকে একটি মুক্ত ৩' হাইড্রক্সিল (OH) গ্রুপ থাকে। একেই শৃঙ্খলের ৫'→৩' পোলারিটি বলা হয়।

খ) ওয়াটসন ও ক্রিকের ডাবল হেলিক্স মডেল

১৯৫৩ সালে জেমস ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিক, রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন এবং মরিস উইলকিন্সের এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন তথ্যের উপর ভিত্তি করে ডিএনএ-এর দ্বি-তন্ত্রী বা ডাবল হেলিক্স মডেল প্রস্তাব করেন, যা আণবিক জীববিজ্ঞানে একটি বিপ্লব এনেছিল। এই মডেলের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হলো:

  • ডিএনএ দুটি পলি-নিউক্লিওটাইড শৃঙ্খল দ্বারা গঠিত, যা একটি অক্ষের চারপাশে সর্পিল আকারে পেঁচিয়ে থাকে এবং একটি ডান-হাতি হেলিক্স (Right-handed helix) তৈরি করে।
  • দুটি শৃঙ্খল একে অপরের পরিপূরক (complementary) এবং বিপরীত সমান্তরাল (antiparallel)। অর্থাৎ, একটি শৃঙ্খলের পোলারিটি যদি ৫'→৩' হয়, তবে অন্যটির পোলারিটি হবে ৩'→৫'।
  • শৃঙ্খল দুটির মূল কাঠামোটি শর্করা এবং ফসফেট দিয়ে তৈরি (Sugar-phosphate backbone), এবং নাইট্রোজেন বেসগুলি ভেতরের দিকে অভিক্ষিপ্ত থাকে।
  • দুটি শৃঙ্খলের বেসগুলি হাইড্রোজেন বন্ড দ্বারা যুক্ত থাকে। অ্যাডেনিন (A) সর্বদা থাইমিনের (T) সাথে দুটি হাইড্রোজেন বন্ড দ্বারা এবং গুয়ানিন (G) সর্বদা সাইটোসিনের (C) সাথে তিনটি হাইড্রোজেন বন্ড দ্বারা যুক্ত হয়। একে চারগাফের সূত্র (Chargaff's Rule) বলা হয়।
  • হেলিক্সের প্রতিটি সম্পূর্ণ প্যাঁচের (turn) দৈর্ঘ্য ৩৪ অ্যাংস্ট্রম (Å) বা ৩.৪ ন্যানোমিটার (nm) এবং এতে প্রায় ১০টি বেস পেয়ার থাকে। এর ফলে, দুটি বেস পেয়ারের মধ্যে দূরত্ব হয় প্রায় ৩.৪ Å।
  • হেলিক্সের ব্যাস প্রায় ২০ Å। এই স্থির ব্যাস বজায় থাকে কারণ একটি পিউরিন সর্বদা একটি পিরিমিডিনের সাথে জোড় বাঁধে।

এই ডাবল হেলিক্স মডেলটি ডিএনএ-এর প্রতিলিপিকরণ এবং তথ্যের সংরক্ষণের প্রক্রিয়াকে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছিল।

২. জেনেটিক উপাদানের অনুসন্ধান

মেন্ডেলের সময় থেকেই বিজ্ঞানীরা জানতেন যে বংশগতির জন্য কিছু 'ফ্যাক্টর' দায়ী, কিন্তু সেই ফ্যাক্টরের রাসায়নিক প্রকৃতি কী, তা অজানা ছিল। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা প্রোটিনকেই জেনেটিক উপাদান বলে মনে করতেন, কারণ প্রোটিনের গঠনগত বৈচিত্র্য অনেক বেশি। কিন্তু কয়েকটি যুগান্তকারী পরীক্ষা প্রমাণ করে যে ডিএনএ-ই হলো প্রকৃত জেনেটিক উপাদান।

ক) গ্রিফিথের রূপান্তর ভবন পরীক্ষা (Transforming Principle)

১৯২৮ সালে ফ্রেডরিক গ্রিফিথ স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনি (Streptococcus pneumoniae) ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ করার সময় একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন। এই ব্যাকটেরিয়ার দুটি স্ট্রেন ছিল:

  • S-স্ট্রেন (Smooth): এর কোষের বাইরে পলিস্যাকারাইডের একটি মসৃণ আবরণ (capsule) ছিল, যা এটিকে ইঁদুরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে রক্ষা করত। তাই এটি ছিল রোগ সৃষ্টিকারী বা ভিরুলেন্ট (virulent)।
  • R-স্ট্রেন (Rough): এর বাইরে কোনো আবরণ ছিল না, তাই কোষগুলি অমসৃণ ছিল এবং এটি রোগ সৃষ্টি করতে পারত না বা নন-ভিরুলেন্ট (non-virulent) ছিল।

গ্রিফিথ চারটি ধাপে পরীক্ষা করেন:

  1. জীবন্ত S-স্ট্রেন ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করালে ইঁদুরটি নিউমোনিয়ায় মারা যায়।
  2. জীবন্ত R-স্ট্রেন প্রবেশ করালে ইঁদুরটি বেঁচে থাকে।
  3. তাপ দিয়ে মেরে ফেলা S-স্ট্রেন (Heat-killed S-strain) প্রবেশ করালে ইঁদুরটি বেঁচে থাকে।
  4. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ: তাপ দিয়ে মেরে ফেলা S-স্ট্রেনের সাথে জীবন্ত R-স্ট্রেন মিশিয়ে ইঁদুরের দেহে প্রবেশ করালে ইঁদুরটি মারা যায়! মৃত ইঁদুরের রক্তে জীবন্ত S-স্ট্রেন ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়।

গ্রিফিথ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, মৃত S-স্ট্রেন থেকে কোনো একটি 'রূপান্তরকারী পদার্থ' (Transforming Principle) জীবন্ত R-স্ট্রেন ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে প্রবেশ করে তাকে S-স্ট্রেনে রূপান্তরিত করেছে। কিন্তু এই পদার্থটি ডিএনএ, আরএনএ না প্রোটিন, তা তিনি বলতে পারেননি।

খ) অ্যাভারি, ম্যাকলিওড এবং ম্যাককার্টির পরীক্ষা

১৯৪৪ সালে, ওসওয়াল্ড অ্যাভারি, কলিন ম্যাকলিওড এবং ম্যাকলিন ম্যাককার্টি গ্রিফিথের পরীক্ষার 'রূপান্তরকারী পদার্থ'টিকে শনাক্ত করার জন্য কাজ করেন। তারা তাপ-মৃত S-স্ট্রেন ব্যাকটেরিয়া থেকে ডিএনএ, আরএনএ এবং প্রোটিনকে বিশুদ্ধভাবে আলাদা করেন এবং প্রত্যেকটিকে আলাদাভাবে R-স্ট্রেনের সাথে মেশান। তারা দেখেন যে, শুধুমাত্র ডিএনএ যোগ করলেই R-স্ট্রেন S-স্ট্রেনে রূপান্তরিত হচ্ছে। যখন তারা ডিএনএ-কে নষ্ট করার এনজাইম (DNase) যোগ করেন, তখন রূপান্তর বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু প্রোটিন বা আরএনএ নষ্ট করার এনজাইম (Protease বা RNase) যোগ করলে রূপান্তরে কোনো বাধা হয় না। এটি প্রায় নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে ডিএনএ-ই হলো জেনেটিক উপাদান।

গ) হার্শে ও চেজের পরীক্ষা (The Blender Experiment)

১৯৫২ সালে আলফ্রেড হার্শে এবং মার্থা চেজ একটি চূড়ান্ত প্রমাণ দেন। তারা ব্যাকটেরিওফাজ (Bacteriophage) নামক ভাইরাস নিয়ে কাজ করেন, যা ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে। একটি ফাজের দুটি প্রধান অংশ – বাইরের প্রোটিন আবরণ (Protein coat) এবং ভেতরের ডিএনএ।

তারা দুটি ভিন্ন মাধ্যমে ফাজ তৈরি করেন:

  • একটিতে তেজস্ক্রিয় সালফার (³⁵S) ব্যবহার করা হয়, যা শুধুমাত্র প্রোটিনে (মিথিওনিন এবং সিস্টাইন অ্যামিনো অ্যাসিডে) প্রবেশ করে, ডিএনএ-তে নয়।
  • অন্যটিতে তেজস্ক্রিয় ফসফরাস (³²P) ব্যবহার করা হয়, যা শুধুমাত্র ডিএনএ-তে (ফসফেট গ্রুপের কারণে) প্রবেশ করে, প্রোটিনে নয়।

এরপর তারা এই তেজস্ক্রিয় ফাজগুলিকে ই. কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করতে দেন। আক্রমণের কিছুক্ষণ পর, তারা একটি ব্লেন্ডারে মিশ্রণটিকে নাড়িয়ে ফাজ এবং ব্যাকটেরিয়াকে আলাদা করেন এবং সেন্ট্রিফিউজ করে ভারী ব্যাকটেরিয়া কোষগুলিকে নিচে থিতিয়ে ফেলেন।

ফলাফল:

  • যে ক্ষেত্রে ³⁵S যুক্ত প্রোটিন ব্যবহার করা হয়েছিল, তেজস্ক্রিয়তা ব্যাকটেরিয়ার বাইরে, অর্থাৎ ওপরের তরলে (সুপারন্যাট্যান্ট) পাওয়া যায়।
  • যে ক্ষেত্রে ³²P যুক্ত ডিএনএ ব্যবহার করা হয়েছিল, তেজস্ক্রিয়তা ব্যাকটেরিয়ার কোষের ভেতরে পাওয়া যায়।

এই পরীক্ষাটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে শুধুমাত্র ডিএনএ ভাইরাসের থেকে ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে প্রবেশ করে এবং নতুন ভাইরাস তৈরির নির্দেশ দেয়। সুতরাং, ডিএনএ-ই হলো জেনেটিক উপাদান।

৩. প্রতিলিপিকরণ বা রেপ্লিকেশন (Replication)

কোষ বিভাজনের আগে একটি কোষকে তার সমস্ত ডিএনএ-এর একটি হুবহু অনুলিপি তৈরি করতে হয়, যাতে অপত্য কোষগুলিও সম্পূর্ণ জেনেটিক তথ্য পায়। ডিএনএ থেকে ডিএনএ তৈরির এই প্রক্রিয়াকে প্রতিলিপিকরণ বা রেপ্লিকেশন বলে। ওয়াটসন ও ক্রিক তাদের মডেল প্রস্তাব করার সময়ই বলেছিলেন যে, ডিএনএ-এর পরিপূরক বেস-পেয়ারিং ব্যবস্থাটিই প্রতিলিপিকরণের একটি সহজ পদ্ধতির ইঙ্গিত দেয়।

ক) অর্ধ-সংরক্ষণশীল মডেল (Semi-conservative Model)

এই মডেল অনুসারে, প্রতিলিপিকরণের সময় ডিএনএ-এর দুটি শৃঙ্খল আলাদা হয়ে যায় এবং প্রতিটি শৃঙ্খল একটি নতুন পরিপূরক শৃঙ্খল তৈরির জন্য ছাঁচ (template) হিসেবে কাজ করে। এর ফলে, প্রতিটি নতুন ডিএনএ অণুতে একটি পুরনো (মাতৃ) শৃঙ্খল এবং একটি নতুন (অপত্য) শৃঙ্খল থাকে। এই কারণেই একে অর্ধ-সংরক্ষণশীল বলা হয়।

ম্যাথিউ মেসেলসন এবং ফ্র্যাঙ্কলিন স্টাহল ১৯৫৮ সালে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে এই মডেলটি প্রমাণ করেন। তারা ভারী নাইট্রোজেনের আইসোটোপ (¹⁵N) ব্যবহার করে এই পরীক্ষাটি করেছিলেন।

খ) প্রতিলিপিকরণের প্রক্রিয়া ও উৎসেচক

প্রতিলিপিকরণ একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া এবং এর জন্য অনেক উৎসেচক ও প্রোটিনের প্রয়োজন হয়।

  1. সূচনা (Initiation): প্রতিলিপিকরণ ডিএনএ-এর একটি নির্দিষ্ট স্থান থেকে শুরু হয়, যাকে 'রেপ্লিকেশন অরিজিন' (Origin of Replication বা Ori) বলা হয়। হেলিকেজ (Helicase) নামক উৎসেচক ডিএনএ-এর দুটি শৃঙ্খলকে আলাদা করে, যা একটি Y-আকৃতির 'রেপ্লিকেশন ফর্ক' (Replication Fork) তৈরি করে।
  2. শৃঙ্খল প্রসারণ (Elongation): ডিএনএ পলিমারেজ (DNA Polymerase) নামক প্রধান উৎসেচকটি নতুন নিউক্লিওটাইড যোগ করে নতুন শৃঙ্খল তৈরি করে। তবে এর দুটি সীমাবদ্ধতা আছে: (১) এটি শুধুমাত্র ৫'→৩' দিকে নতুন শৃঙ্খল তৈরি করতে পারে, এবং (২) এটি নিজে থেকে শুরু করতে পারে না, এর জন্য একটি ছোট আরএনএ প্রাইমার (RNA Primer) প্রয়োজন হয়, যা প্রাইমেজ (Primase) নামক উৎসেচক তৈরি করে।
  3. যেহেতু দুটি শৃঙ্খল বিপরীত সমান্তরাল, তাই প্রতিলিপিকরণ দুটি ভিন্ন উপায়ে ঘটে:
    • লিডিং স্ট্র্যান্ড (Leading Strand): যে ছাঁচটির পোলারিটি ৩'→৫', সেখানে নতুন শৃঙ্খলটি (৫'→৩') একটানা বা নিরবচ্ছিন্নভাবে তৈরি হয়। একে লিডিং স্ট্র্যান্ড বলে।
    • ল্যাগিং স্ট্র্যান্ড (Lagging Strand): অন্য ছাঁচটির (পোলারিটি ৫'→৩') ক্ষেত্রে, নতুন শৃঙ্খলটি ছোট ছোট খণ্ডে (ওকাজাকি খণ্ড বা Okazaki fragments) তৈরি হয়, কারণ পলিমারেজকে রেপ্লিকেশন ফর্কের বিপরীত দিকে কাজ করতে হয়। এই খণ্ডগুলিকে পরে ডিএনএ লাইগেজ (DNA Ligase) নামক উৎসেচক জোড়া লাগিয়ে দেয়।
  4. সমাপ্তি (Termination): যখন পুরো ডিএনএ অণুটি প্রতিলিপিকৃত হয়ে যায়, তখন প্রক্রিয়াটি বন্ধ হয়ে যায় এবং দুটি নতুন ডিএনএ অণু তৈরি হয়।

প্রোক্যারিওটিক কোষে একটি মাত্র রেপ্লিকেশন অরিজিন থাকলেও, ইউক্যারিওটিক কোষে দীর্ঘ ডিএনএ অণুর প্রতিলিপিকরণ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য একাধিক অরিজিন থাকে।

৪. ট্রান্সক্রিপশন বা অনুলিপিকরণ (Transcription)

ডিএনএ-তে থাকা জিনগত তথ্যকে প্রোটিন তৈরির জন্য ব্যবহার করতে হলে, প্রথমে সেই তথ্যের একটি কার্যক্ষম অনুলিপি বা 'কপি' তৈরি করতে হয়। ডিএনএ থেকে আরএনএ (সাধারণত মেসেঞ্জার আরএনএ বা mRNA) তৈরির এই প্রক্রিয়াকে ট্রান্সক্রিপশন বা অনুলিপিকরণ বলে। ডিএনএ হলো কোষের নিউক্লিয়াসের মধ্যে সুরক্ষিত থাকা মাস্টার ব্লুপ্রিন্ট, আর mRNA হলো সেই ব্লুপ্রিন্টের একটি ফটোকপি যা রাইবোসোমে প্রোটিন তৈরির জন্য পাঠানো হয়।

ক) ট্রান্সক্রিপশন ইউনিট

ডিএনএ-এর যে অংশটুকু ট্রান্সক্রিপশনে অংশ নেয়, তাকে ট্রান্সক্রিপশন ইউনিট বলে। এর তিনটি অংশ:

  • প্রোমোটার (Promoter): এটি জিনের শুরুতে অবস্থিত একটি ডিএনএ সিকোয়েন্স যেখানে আরএনএ পলিমারেজ উৎসেচক এসে যুক্ত হয় এবং ট্রান্সক্রিপশন শুরু করে।
  • গঠনগত জিন (Structural Gene): এটি ডিএনএ-এর সেই অংশ যা আসলে mRNA-তে অনুলিপিত হয় এবং একটি পলিপেপটাইড বা প্রোটিনের জন্য কোড বহন করে।
  • টার্মিনেটর (Terminator): এটি জিনের শেষে অবস্থিত একটি ডিএনএ সিকোয়েন্স যা ট্রান্সক্রিপশন প্রক্রিয়া শেষ করার সংকেত দেয়।

ডিএনএ-এর দুটি শৃঙ্খলের মধ্যে শুধুমাত্র একটিই ট্রান্সক্রিপশনের জন্য ছাঁচ হিসেবে কাজ করে, একে টেমপ্লেট স্ট্র্যান্ড (Template Strand) বা অ্যান্টি-সেন্স স্ট্র্যান্ড বলে (পোলারিটি ৩'→৫')। অন্য শৃঙ্খলটিকে কোডিং স্ট্র্যান্ড (Coding Strand) বা সেন্স স্ট্র্যান্ড বলে (পোলারিটি ৫'→৩')। নবগঠিত আরএনএ-এর সিকোয়েন্স কোডিং স্ট্র্যান্ডের মতোই হয়, শুধু থাইমিনের (T) জায়গায় ইউরাসিল (U) থাকে।

খ) ট্রান্সক্রিপশনের প্রক্রিয়া

এই প্রক্রিয়ার প্রধান উৎসেচক হলো আরএনএ পলিমারেজ (RNA Polymerase)

  1. সূচনা (Initiation): আরএনএ পলিমারেজ প্রোমোটার অঞ্চলে যুক্ত হয় এবং ডিএনএ-এর শৃঙ্খল দুটিকে খুলে দেয়।
  2. প্রসারণ (Elongation): উৎসেচকটি টেমপ্লেট স্ট্র্যান্ড বরাবর ৩'→৫' দিকে অগ্রসর হয় এবং পরিপূরক রাইবোনিউক্লিওটাইড যোগ করে ৫'→৩' দিকে একটি আরএনএ শৃঙ্খল তৈরি করে।
  3. সমাপ্তি (Termination): যখন পলিমারেজ টার্মিনেটর সিকোয়েন্সে পৌঁছায়, তখন নবগঠিত আরএনএ এবং উৎসেচকটি ডিএনএ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ইউক্যারিওটিক কোষে প্রক্রিয়াটি আরও জটিল। এখানে প্রাথমিক ট্রান্সক্রিপ্ট বা hnRNA (heterogeneous nuclear RNA) তৈরি হয়, যার মধ্যে কোডিং অংশ (এক্সন - Exon) এবং নন-কোডিং অংশ (ইনট্রন - Intron) উভয়ই থাকে। এরপর স্প্লাইসিং (Splicing) নামক প্রক্রিয়ায় ইনট্রনগুলিকে কেটে বাদ দেওয়া হয় এবং এক্সনগুলিকে জোড়া লাগানো হয়। এছাড়াও, mRNA-এর ৫' প্রান্তে একটি ক্যাপ (Capping) এবং ৩' প্রান্তে একটি পলি-এ টেইল (Tailing) যুক্ত করা হয়। এই পরিবর্তনের পর পরিণত mRNA নিউক্লিয়াস থেকে সাইটোপ্লাজমে বেরিয়ে আসে।

৫. জেনেটিক কোড (Genetic Code)

ডিএনএ এবং mRNA-তে থাকা নিউক্লিওটাইডের ক্রম (sequence) কীভাবে প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিডের ক্রম নির্ধারণ করে? এই সম্পর্কটিই হলো জেনেটিক কোড। এটি হলো সেই 'ভাষা' যা দিয়ে কোষ জিনগত তথ্যকে 'পড়ে' এবং প্রোটিন তৈরি করে।

জেনেটিক কোডের বৈশিষ্ট্য:

  • ট্রিপলেট কোডন (Triplet Codon): তিনটি নিউক্লিওটাইড বেস মিলে একটি কোডন তৈরি করে, যা একটি নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিডকে নির্দেশ করে। যেমন, AUG কোডনটি মিথিওনিন অ্যামিনো অ্যাসিডকে নির্দেশ করে।
  • সর্বজনীন (Universal): প্রায় সমস্ত জীবে (ব্যাকটেরিয়া থেকে মানুষ) একই কোডন একই অ্যামিনো অ্যাসিডকে নির্দেশ করে। যেমন, UUU সর্বদা ফিনাইলঅ্যালানিনকে কোড করে।
  • অপজাত বা ডিজেনারেট (Degenerate): একটি অ্যামিনো অ্যাসিড একাধিক কোডন দ্বারা নির্দেশিত হতে পারে। যেমন, লিউসিন ছয়টি ভিন্ন কোডন দ্বারা কোডেড হয়। মোট ৬৪টি সম্ভাব্য কোডন আছে (৪³), যার মধ্যে ৬১টি অ্যামিনো অ্যাসিডকে কোড করে এবং ৩টি (UAA, UAG, UGA) হলো স্টপ কোডন, যা প্রোটিন সংশ্লেষণ থামানোর সংকেত দেয়।
  • অ-অস্পষ্ট (Unambiguous) এবং নির্দিষ্ট (Specific): একটি নির্দিষ্ট কোডন সর্বদা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিডকেই নির্দেশ করে, অন্য কোনোটিকে নয়।
  • কমা-বিহীন (Commaless): কোডনগুলি mRNA-তে একটানা পড়া হয়, এদের মধ্যে কোনো বিরাম বা ফাঁক থাকে না।
  • সূচনা কোডন (Initiation Codon): AUG কোডনের দুটি কাজ – এটি মিথিওনিনকে কোড করে এবং এটি প্রোটিন সংশ্লেষণ শুরু করার সংকেত দেয়।

৬. ট্রান্সলেশন বা অনুবাদ (Translation)

mRNA-তে থাকা জেনেটিক কোডকে ব্যবহার করে অ্যামিনো অ্যাসিডের একটি শৃঙ্খল বা পলিপেপটাইড (যা পরে প্রোটিনে পরিণত হয়) তৈরির প্রক্রিয়াকে ট্রান্সলেশন বা অনুবাদ বলে। এই প্রক্রিয়াটি কোষের সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত রাইবোসোম (Ribosome)-এ ঘটে।

প্রয়োজনীয় উপাদান:

  • mRNA (মেসেঞ্জার আরএনএ): এটি টেমপ্লেট বা ছাঁচ হিসেবে কাজ করে, যার উপর কোডনগুলি লেখা থাকে।
  • tRNA (ট্রান্সফার আরএনএ): এটি 'অ্যাডাপ্টার অণু' হিসেবে কাজ করে। এর একটি প্রান্তে অ্যান্টি-কোডন (Anticodon) থাকে যা mRNA-এর কোডনের সাথে পরিপূরকভাবে যুক্ত হয়, এবং অন্য প্রান্তে সংশ্লিষ্ট অ্যামিনো অ্যাসিড যুক্ত থাকে।
  • রাইবোসোম (Ribosome): এটি প্রোটিন তৈরির 'কারখানা'। এর দুটি সাবইউনিট (ছোট ও বড়) থাকে। এটি mRNA-কে ধরে রাখে এবং tRNA-এর সাহায্যে অ্যামিনো অ্যাসিডগুলির মধ্যে পেপটাইড বন্ড তৈরি করে।

ট্রান্সলেশনের প্রক্রিয়া

  1. সূচনা (Initiation): রাইবোসোমের ছোট সাবইউনিটটি mRNA-এর ৫' প্রান্তের সূচনা কোডন (AUG)-এ যুক্ত হয়। এরপর মিথিওনিন বহনকারী প্রথম tRNA (অ্যান্টিকোডন UAC সহ) এসে AUG কোডনের সাথে যুক্ত হয়। সবশেষে রাইবোসোমের বড় সাবইউনিটটি এসে যুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ সূচনা কমপ্লেক্স তৈরি করে।
  2. প্রসারণ (Elongation): পরবর্তী কোডনের জন্য উপযুক্ত অ্যামিনো অ্যাসিড বহনকারী tRNA রাইবোসোমের A-সাইটে এসে যুক্ত হয়। এরপর P-সাইটে থাকা অ্যামিনো অ্যাসিড এবং A-সাইটে থাকা অ্যামিনো অ্যাসিডের মধ্যে একটি পেপটাইড বন্ড তৈরি হয়। রাইবোসোমটি mRNA বরাবর এক কোডন এগিয়ে যায়, ফলে খালি tRNA E-সাইট থেকে বেরিয়ে যায় এবং নতুন পলিপেপটাইড বহনকারী tRNA P-সাইটে চলে আসে। এই চক্রটি চলতে থাকে এবং পলিপেপটাইড শৃঙ্খলটি দীর্ঘ হতে থাকে।
  3. সমাপ্তি (Termination): যখন রাইবোসোম mRNA-এর উপর কোনো স্টপ কোডন (UAA, UAG, বা UGA)-এ পৌঁছায়, তখন কোনো tRNA যুক্ত হয় না। পরিবর্তে, একটি 'রিলিজ ফ্যাক্টর' (Release Factor) এসে যুক্ত হয় এবং পলিপেপটাইড শৃঙ্খলটিকে রাইবোসোম থেকে মুক্ত করে। এরপর রাইবোসোমের সাবইউনিটগুলিও আলাদা হয়ে যায়।

৭. জিন এক্সপ্রেশনের নিয়ন্ত্রণ (Regulation of Gene Expression)

একটি কোষে হাজার হাজার জিন থাকলেও, সব জিন সবসময় সক্রিয় থাকে না। কোষ শুধুমাত্র প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট জিনগুলিকে 'অন' বা 'অফ' করে। জিনগত তথ্যের প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করার এই প্রক্রিয়াকে জিন এক্সপ্রেশনের নিয়ন্ত্রণ বলে। এটি কোষকে পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে এবং শক্তি সঞ্চয় করতে সাহায্য করে।

প্রোক্যারিওটিক কোষে, এই নিয়ন্ত্রণ প্রধানত ট্রান্সক্রিপশন স্তরেই ঘটে। এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো ল্যাক ওপেরন (Lac Operon) মডেল, যা ফ্রাঁসোয়া জ্যাকব এবং জ্যাক মনো ১৯৬১ সালে প্রস্তাব করেন।

ল্যাক ওপেরন মডেল (ই. কোলাই)

ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার প্রধান শক্তির উৎস হলো গ্লুকোজ। কিন্তু পরিবেশে গ্লুকোজ না থাকলে এবং ল্যাকটোজ শর্করা উপস্থিত থাকলে, ব্যাকটেরিয়া ল্যাকটোজকে ভাঙার জন্য প্রয়োজনীয় তিনটি উৎসেচক তৈরি করে। এই তিনটি উৎসেচকের জিনগুলি একসাথে একটি নিয়ন্ত্রক ইউনিটের অধীনে থাকে, যাকে ল্যাক ওপেরন বলে।

ল্যাক ওপেরনের অংশগুলি:

  • গঠনগত জিন (Structural Genes): z, y, এবং a – যারা যথাক্রমে β-গ্যালাক্টোসাইডেজ, পারমিয়েজ এবং ট্রান্সঅ্যাসিটিলেজ উৎসেচক তৈরি করে।
  • অপারেটর (Operator - O): এটি একটি ডিএনএ সিকোয়েন্স যা রিপ্রেসার প্রোটিনের সাথে যুক্ত হতে পারে।
  • প্রোমোটার (Promoter - P): এখানে আরএনএ পলিমারেজ যুক্ত হয়।
  • নিয়ন্ত্রক জিন (Regulator Gene - i): এটি একটি রিপ্রেসার প্রোটিন (Repressor protein) তৈরি করে।

কার্যপদ্ধতি:

  • ল্যাকটোজের অনুপস্থিতিতে (সিস্টেম 'অফ'): নিয়ন্ত্রক জিন (i) একটি সক্রিয় রিপ্রেসার প্রোটিন তৈরি করে। এই রিপ্রেসারটি অপারেটর (O) অঞ্চলে গিয়ে শক্তভাবে যুক্ত হয়। এর ফলে, আরএনএ পলিমারেজ প্রোমোটার অঞ্চলে যুক্ত হলেও এগোতে পারে না এবং গঠনগত জিনগুলির ট্রান্সক্রিপশন বন্ধ থাকে।
  • ল্যাকটোজের উপস্থিতিতে (সিস্টেম 'অন'): যখন কোষে ল্যাকটোজ প্রবেশ করে, তখন এটি (বা এর উপজাত অ্যালোল্যাকটোজ) ইন্ডুসার (Inducer) বা প্রবর্তক হিসেবে কাজ করে। এটি রিপ্রেসার প্রোটিনের সাথে যুক্ত হয়ে তার গঠন পরিবর্তন করে দেয়। ফলে, পরিবর্তিত রিপ্রেসারটি আর অপারেটরের সাথে যুক্ত হতে পারে না। অপারেটর মুক্ত থাকায়, আরএনএ পলিমারেজ সহজেই গঠনগত জিনগুলির ট্রান্সক্রিপশন ঘটাতে পারে এবং ল্যাকটোজকে ভাঙার জন্য প্রয়োজনীয় উৎসেচকগুলি তৈরি হয়।

এটি একটি নেগেটিভ রেগুলেশনের উদাহরণ, কারণ রিপ্রেসারের উপস্থিতিতে সিস্টেমটি বন্ধ থাকে। ইউক্যারিওটিক কোষে জিন নিয়ন্ত্রণ আরও অনেক বেশি জটিল এবং বিভিন্ন স্তরে (যেমন ক্রোমাটিন গঠন, ট্রান্সক্রিপশন, আরএনএ প্রসেসিং, ট্রান্সলেশন) ঘটে থাকে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: ডিএনএ এবং আরএনএ-এর মধ্যে প্রধান কাঠামোগত এবং কার্যকরী পার্থক্যগুলি কী কী?

উত্তর: ডিএনএ এবং আরএনএ উভয়ই নিউক্লিক অ্যাসিড হলেও এদের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে:

  • শর্করা: ডিএনএ-তে ডিঅক্সিরাইবোজ শর্করা থাকে, আরএনএ-তে রাইবোজ শর্করা থাকে। রাইবোজের ২' কার্বনে একটি অতিরিক্ত হাইড্রক্সিল (-OH) গ্রুপ থাকে যা এটিকে বেশি সক্রিয় এবং কম স্থিতিশীল করে তোলে।
  • বেস: ডিএনএ-তে নাইট্রোজেন বেসগুলি হলো অ্যাডেনিন (A), গুয়ানিন (G), সাইটোসিন (C) এবং থাইমিন (T)। আরএনএ-তে থাইমিনের পরিবর্তে ইউরাসিল (U) থাকে।
  • গঠন: ডিএনএ সাধারণত একটি দ্বি-তন্ত্রী বা ডাবল-স্ট্র্যান্ডেড হেলিক্স গঠন করে। আরএনএ সাধারণত এক-তন্ত্রী বা সিঙ্গেল-স্ট্র্যান্ডেড হয়, যদিও এটি নিজের উপর ভাঁজ হয়ে বিভিন্ন গঠন তৈরি করতে পারে।
  • স্থিতিশীলতা: ডিএনএ-এর ডাবল হেলিক্স গঠন এবং ডিঅক্সিরাইবোজ শর্করার কারণে এটি রাসায়নিকভাবে অনেক বেশি স্থিতিশীল। আরএনএ কম স্থিতিশীল এবং সহজেই ভেঙে যায়।
  • কাজ: ডিএনএ-এর প্রধান কাজ হলো দীর্ঘমেয়াদী জিনগত তথ্য সংরক্ষণ করা। আরএনএ-এর বিভিন্ন কাজ রয়েছে, যেমন mRNA জিনগত বার্তা বহন করে, tRNA অ্যামিনো অ্যাসিড স্থানান্তর করে এবং rRNA রাইবোসোমের গঠনগত ও অনুঘটকীয় ভূমিকা পালন করে।

প্রশ্ন ২: আণবিক জীববিজ্ঞানের সেন্ট্রাল ডগমা (Central Dogma) বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: সেন্ট্রাল ডগমা হলো আণবিক জীববিজ্ঞানের একটি মৌলিক ধারণা যা ফ্রান্সিস ক্রিক প্রথম প্রস্তাব করেন। এটি একটি কোষে জিনগত তথ্যের একমুখী প্রবাহকে বর্ণনা করে। মূল ধারণাটি হলো: ডিএনএ (DNA) → আরএনএ (RNA) → প্রোটিন (Protein)

এর অর্থ হলো:

  1. ডিএনএ তার নিজের অনুলিপি তৈরি করতে পারে (প্রতিলিপিকরণ বা Replication)।
  2. ডিএনএ-তে থাকা জিনগত তথ্য আরএনএ-তে অনুলিপিত হয় (ট্রান্সক্রিপশন বা Transcription)।
  3. আরএনএ-তে থাকা তথ্য ব্যবহার করে প্রোটিন সংশ্লেষিত হয় (ট্রান্সলেশন বা Translation)।

সহজ কথায়, জিনগত তথ্যের মাস্টার কপি (ডিএনএ) থেকে একটি কার্যক্ষম কপি (আরএনএ) তৈরি হয়, এবং সেই কপি ব্যবহার করে কোষের কার্যকরী অণু (প্রোটিন) তৈরি হয়। যদিও পরে রেট্রোভাইরাসের ক্ষেত্রে রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন (RNA → DNA) আবিষ্কৃত হয়েছে, তবুও সেন্ট্রাল ডগমা আজও জীববিজ্ঞানের একটি কেন্দ্রীয় নীতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্রশ্ন ৩: জেনেটিক কোডকে 'ডিজেনারেট' বা 'অপজাত' বলা হয় কেন? এর সুবিধা কী?

উত্তর: জেনেটিক কোডকে 'ডিজেনারেট' বা 'অপজাত' বলা হয় কারণ একাধিক কোডন একই অ্যামিনো অ্যাসিডকে নির্দেশ করতে পারে। মোট ৬৪টি কোডনের মধ্যে ৬১টি কোডন মাত্র ২০টি অ্যামিনো অ্যাসিডকে কোড করে। এর মানে হলো, গড়ে প্রতিটি অ্যামিনো অ্যাসিডের জন্য তিনটি কোডন রয়েছে (যদিও কিছু অ্যামিনো অ্যাসিডের জন্য একটি এবং কিছুর জন্য ছয়টি পর্যন্ত কোডন থাকে)।

উদাহরণস্বরূপ, লিউসিন অ্যামিনো অ্যাসিডটিকে CUU, CUC, CUA, এবং CUG – এই চারটি কোডন দ্বারা কোড করা যায়।

এর সুবিধা: এই ডিজেনারেসি একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। ডিএনএ-তে যদি কোনো পয়েন্ট মিউটেশন বা একক বেসের পরিবর্তন ঘটে, বিশেষ করে কোডনের তৃতীয় অবস্থানে, তাহলেও অনেক সময় অ্যামিনো অ্যাসিডটি পরিবর্তিত হয় না। যেমন, CUU মিউটেট হয়ে CUC হয়ে গেলেও, উভয় ক্ষেত্রেই লিউসিনই প্রোটিনে যুক্ত হবে। একে 'সাইলেন্ট মিউটেশন' (Silent Mutation) বলা হয়। এর ফলে, ক্ষতিকারক মিউটেশনের প্রভাব কমে যায় এবং জিনগত তথ্যের স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়ে আমরা বংশগতির আণবিক ভিত্তি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেছি। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখার জন্য তুলে ধরা হলো:

  • ডিএনএ (DNA): এটি একটি ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিওটাইডের দ্বি-তন্ত্রী পলিমার যা জীবনের জিনগত তথ্য বহন করে। এর গঠন ওয়াটসন ও ক্রিকের ডাবল হেলিক্স মডেল দ্বারা ব্যাখ্যা করা হয়।
  • জেনেটিক উপাদান: গ্রিফিথ, অ্যাভারি এবং হার্শে-চেজের পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে ডিএনএ-ই হলো বংশগতি পদার্থ, প্রোটিন নয়।
  • প্রতিলিপিকরণ (Replication): এটি একটি অর্ধ-সংরক্ষণশীল প্রক্রিয়া যেখানে ডিএনএ পলিমারেজ উৎসেচকের সাহায্যে ডিএনএ নিজের হুবহু অনুলিপি তৈরি করে।
  • ট্রান্সক্রিপশন (Transcription): এটি ডিএনএ থেকে আরএনএ তৈরির প্রক্রিয়া, যা আরএনএ পলিমারেজ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
  • ট্রান্সলেশন (Translation): এটি mRNA-এর কোডন অনুসারে রাইবোসোমে প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়া, যেখানে tRNA অ্যামিনো অ্যাসিড বহন করে আনে।
  • জেনেটিক কোড: এটি ট্রিপলেট, সর্বজনীন এবং ডিজেনারেট। এটি নিউক্লিওটাইডের ভাষাকে অ্যামিনো অ্যাসিডের ভাষায় অনুবাদ করে।
  • জিন নিয়ন্ত্রণ: কোষ তার প্রয়োজন অনুযায়ী জিনের প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করে। ল্যাক ওপেরন মডেল প্রোক্যারিওটিক কোষে এই নিয়ন্ত্রণের একটি ক্লাসিক উদাহরণ।

এই প্রক্রিয়াগুলি সম্মিলিতভাবে 'সেন্ট্রাল ডগমা' গঠন করে, যা জীবজগতের সমস্ত তথ্যের প্রবাহ এবং প্রকাশের মূল ভিত্তি।