বিষয়ের ভূমিকা
আমরা যে গতিশীল গ্রহটিতে বসবাস করি, তা হলো আমাদের পৃথিবী। বাইরে থেকে পৃথিবীকে আমরা যেমন দেখতে পাই, এর ভেতরের রূপটি কিন্তু তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। পৃথিবী প্রতিনিয়ত ভেতরের ও বাইরের দিক থেকে পরিবর্তিত হচ্ছে। ঠিক একটি পেঁয়াজের মতো, পৃথিবীও একের পর এক স্তরে গঠিত। আমাদের পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগ কী দিয়ে তৈরি এবং কীভাবে এর প্রক্রিয়াগুলো চালিত হয়, তা জানা ভৌগোলিক অনুসন্ধানের একটি অত্যন্ত চমৎকার বিষয়। NCERT-এর সপ্তম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায় 'আমাদের পৃথিবীর অন্দরে' (Inside Our Earth) আমাদের এই রহস্যময় ভূ-অভ্যন্তরের সফরে নিয়ে যায়। এই নিবন্ধে আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন স্তর, শিলা এবং খনিজের সহজ ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা আলোচনা করব।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন (Layers of the Earth)
পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ অংশ প্রধানত তিনটি প্রধান ঘনীভূত স্তরে বিভক্ত। স্তরগুলি হলো:
- ভূত্বক (Crust): পৃথিবীর সবচেয়ে বাইরের এবং পাতলা স্তরটিকে ভূত্বক বলা হয়। এটি স্থলভাগে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার এবং মহাসাগরের তলদেশে মাত্র ৫ কিলোমিটার বিস্তৃত। মহাদেশীয় ভূত্বক প্রধানত সিলিকা (Silica) এবং অ্যালুমিনা (Alumina) দ্বারা গঠিত, তাই একে সংক্ষেপে 'শিয়াল' (SiAl) বলা হয়। অন্যদিকে, মহাসাগরীয় ভূত্বক প্রধানত সিলিকা এবং ম্যাগনেসিয়াম (Magnesium) দ্বারা গঠিত, যাকে সংক্ষেপে 'সিমা' (SiMa) বলা হয়।
- গুরুমণ্ডল (Mantle): ভূত্বকের ঠিক নিচেই অবস্থিত বিশাল স্তরটি হলো গুরুমণ্ডল। এটি প্রায় ২,৯০০ কিলোমিটার গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই স্তরের ঊর্ধ্বাংশ কিছুটা গলিত অবস্থায় থাকে, যাকে আমরা ম্যাগমা বলে থাকি।
- কেন্দ্রমণ্ডল (Core): পৃথিবীর সবচেয়ে ভেতরের স্তরটি হলো কেন্দ্রমণ্ডল, যার ব্যাসার্ধ প্রায় ৩,৫০০ কিলোমিটার। এই স্তরটি মূলত অত্যন্ত ভারী ধাতু যেমন নিকেল (Nickel) এবং লোহা (Iron/Ferrum) দ্বারা গঠিত। সেইজন্য একে সংক্ষেপে 'নিফে' (NiFe) বলা হয়। তীব্র চাপ ও উচ্চ তাপমাত্রার কারণে কেন্দ্রমণ্ডলের ভেতরের অংশ অত্যন্ত উত্তপ্ত থাকে।
২. শিলা ও খনিজ (Rocks and Minerals)
পৃথিবীর ভূত্বক বিভিন্ন ধরনের শিলা দ্বারা গঠিত। প্রাকৃতিক উপায়ে গঠিত খনিজ পদার্থের যেকোনো কঠিন মিশ্রণকে শিলা বলা হয়। শিলার রং, গঠন ও উৎপত্তি অনুসারে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:
- আগ্নেয় শিলা (Igneous Rocks): 'Igneous' শব্দটি ল্যাটিন শব্দ 'Ignis' থেকে এসেছে, যার অর্থ 'আগুন'। ভূ-অভ্যন্তরের উত্তপ্ত গলিত ম্যাগমা যখন বাইরে বেরিয়ে আসে বা ভেতরেই ঠান্ডা হয়ে জমাট বাঁধে, তখন আগ্নেয় শিলা তৈরি হয়। একে প্রাথমিক শিলাও বলা হয়। এটি দুই ধরনের:
- উদ্বেধী আগ্নেয় শিলা (Intrusive Rocks): ম্যাগমা যখন ভূত্বকের ভেতরেই ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে জমাট বাঁধে (যেমন: গ্রানাইট)।
- নিঃসারী আগ্নেয় শিলা (Extrusive Rocks): লাভা ভূ-পৃষ্ঠে এসে দ্রুত ঠান্ডা হয়ে কঠিন শিলায় পরিণত হয় (যেমন: ব্যাসাল্ট)। দাক্ষিণাত্যের মালভূমি ব্যাসাল্ট শিলা দিয়ে তৈরি। - পাললিক শিলা (Sedimentary Rocks): 'Sedimentary' শব্দটি ল্যাটিন শব্দ 'Sedimentum' থেকে এসেছে, যার অর্থ 'থিতিয়ে পড়া'। বাতাসে, জলে বা বরফের স্রোতে ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাকণা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বাহিত হয়ে জমা হয়। এই সঞ্চিত পলি বছরের পর বছর চাপে জমাট বেঁধে পাললিক শিলা তৈরি করে। উদাহরণ: বেলেপাথর (Sandstone)। পাললিক শিলায় প্রায়শই উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীবের জীবাশ্ম (Fossils) পাওয়া যায়।
- রূপান্তরিত শিলা (Metamorphic Rocks): 'Metamorphic' শব্দটি গ্রীক শব্দ 'Metamorphose' থেকে এসেছে, যার অর্থ 'রূপ পরিবর্তন'। প্রচণ্ড তাপ ও চাপের প্রভাবে আগ্নেয় ও পাললিক শিলা পরিবর্তিত হয়ে নতুন বৈশিষ্ট্যের শিলা গঠন করে। যেমন: কাদা পাথর (Shale) রূপান্তরিত হয়ে স্লেট (Slate)-এ পরিণত হয় এবং চুনাপাথর (Limestone) রূপান্তরিত হয়ে মার্বেল (Marble)-এ পরিণত হয়।
৩. শিলা চক্র (Rock Cycle)
একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় এক ধরনের শিলা অন্য ধরনের শিলায় রূপান্তরিত হওয়ার চক্রাকার পদ্ধতিকে শিলা চক্র বলা হয়। যখন গলিত ম্যাগমা ঠান্ডা হয়, তা আগ্নেয় শিলায় পরিণত হয়। এই আগ্নেয় শিলা ভেঙে ছোট ছোট কণায় পরিণত হয়ে বাহিত হয় এবং পাললিক শিলা গঠন করে। পরবর্তীতে চরম তাপ ও চাপে এই আগ্নেয় ও পাললিক শিলা পরিবর্তিত হয়ে রূপান্তরিত শিলায় রূপ নেয়। উচ্চ তাপ ও চাপে রূপান্তরিত শিলা পুনরায় গলে গিয়ে তরল ম্যাগমা তৈরি করে, যা আবার ঠান্ডা হয়ে আগ্নেয় শিলায় পরিণত হতে পারে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: 'শিয়াল' (SiAl) এবং 'সিমা' (SiMa) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: মহাদেশীয় ভূত্বক সিলিকা (Si) ও অ্যালুমিনা (Al) দিয়ে গঠিত বলে একে সংক্ষেপে 'শিয়াল' বলা হয়। অপরদিকে মহাসাগরীয় ভূত্বক প্রধানত সিলিকা (Si) ও ম্যাগনেসিয়াম (Ma) দিয়ে গঠিত হওয়ায় একে 'সিমা' বলা হয়।
প্রশ্ন ২: জীবাশ্ম (Fossils) কী এবং এটি কোন শিলায় পাওয়া যায়?
উত্তর: প্রাচীনকালের উদ্ভিদ, প্রাণী ও অন্যান্য অণুজীবের মৃতদেহের ছাপ বা অবশিষ্টাংশ যা শিলার স্তরে আটকে থাকে, তাকে জীবাশ্ম বলে। এটি প্রধানত পাললিক শিলায় পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ৩: আগ্নেয় শিলাকে কেন প্রাথমিক শিলা বলা হয়?
উত্তর: পৃথিবীর বুকে প্রথম গঠিত শিলা হলো আগ্নেয় শিলা। অন্যান্য সমস্ত শিলা (পাললিক ও রূপান্তরিত) প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই আগ্নেয় শিলার ক্ষয় ও রূপান্তরের মাধ্যমে তৈরি হয়। তাই একে প্রাথমিক শিলা বলে।
সারসংক্ষেপ
- পৃথিবী তিনটি স্তরে বিভক্ত: ভূত্বক (Crust), গুরুমণ্ডল (Mantle) এবং কেন্দ্রমণ্ডল (Core)।
- শিয়াল (SiAl) মহাদেশীয় এবং সিমা (SiMa) মহাসাগরীয় ভূত্বক গঠন করে।
- উৎপত্তি অনুযায়ী শিলা তিন প্রকার: আগ্নেয়, পাললিক এবং রূপান্তরিত শিলা।
- শিলা চক্রের মাধ্যমে এক শিলা প্রতিনিয়ত অন্য শিলায় রূপান্তরিত হচ্ছে।
- খনিজ হলো প্রাকৃতিক পদার্থ যার সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক গঠন রয়েছে এবং যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য।