বিষয়ের ভূমিকা

সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। এই সময়ে উত্তর, দক্ষিণ এবং মধ্য ভারতে অসংখ্য নতুন রাজবংশের উত্থান ঘটে। NCERT-এর সপ্তম শ্রেণির ইতিহাসের দ্বিতীয় অধ্যায় 'নতুন রাজা ও রাজবংশ' (New Kings and Kingdoms) আমাদের এই বিবর্তনের কাহিনি শোনায়। এই পাঠে আমরা জানব কীভাবে প্রভাবশালী জমিদার বা যোদ্ধা প্রধানরা শক্তিশালী রাজা হয়ে উঠেছিলেন এবং কীভাবে তাঁরা তাঁদের সাম্রাজ্য পরিচালনা করতেন। ভারতের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের এই অংশটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর, কারণ এখানে আমরা বীরত্ব, স্থাপত্যশৈলী এবং গ্রাম্য স্বায়ত্তশাসনের এক অনন্য সমন্বয় দেখতে পাই।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. নতুন রাজবংশের উত্থান

সপ্তম শতাব্দীর মধ্যে উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় জমিদার বা যোদ্ধা প্রধানরা আবির্ভূত হন। বিদ্যমান রাজারা প্রায়ই তাঁদের 'সামন্ত' (Samantas) বা অধস্তন হিসেবে স্বীকৃতি দিতেন। সামন্তদের কাজ ছিল রাজাদের জন্য উপহার আনা, তাঁদের দরবারে উপস্থিত থাকা এবং যুদ্ধের সময় সামরিক সহায়তা প্রদান করা।

  • মহাসামন্ত বা মহামণ্ডলেশ্বর: যখন সামন্তরা অনেক বেশি শক্তি ও সম্পদ অর্জন করতেন, তখন তাঁরা নিজেদের 'মহাসামন্ত' বা 'মহামণ্ডলেশ্বর' (সমগ্র অঞ্চলের মহান অধিপতি) ঘোষণা করতেন। অনেক সময় তাঁরা তাঁদের অধিপতি বা রাজাদের কাছ থেকে স্বাধীনতাও ঘোষণা করতেন।
  • রাষ্ট্রকূটদের উদাহরণ: দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূটরা শুরুতে কর্ণাটকের চালুক্যদের অধীনে ছিলেন। অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে রাষ্ট্রকূট প্রধান দন্তিদুর্গ তাঁর চালুক্য অধিপতিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং 'হিরণ্য-গর্ভ' (সোনার গর্ভ) নামক এক আচার পালন করেন। বলা হতো, এই আচারের মাধ্যমে একজন অ-ক্ষত্রিয় ব্যক্তিও পুনর্জন্মের মাধ্যমে ক্ষত্রিয় হিসেবে গণ্য হতেন।

২. রাজ্য প্রশাসন ও কর ব্যবস্থা

নতুন রাজারা প্রায়শই 'মহারাজাধিরাজ' (রাজাদের রাজা) বা 'ত্রিভুবন-চক্রবর্তিন' (তিন জগতের প্রভু) এর মতো উচ্চকণ্ঠ খেতাব গ্রহণ করতেন। তবে তাঁরা ক্ষমতা ভাগ করে নিতেন সামন্তদের সঙ্গে এবং কৃষক, ব্যবসায়ী ও ব্রাহ্মণদের সংগঠনের সঙ্গে।

  • সম্পদ সংগ্রহ: উৎপাদনকারীদের (কৃষক, পশুপালক, কারিগর) কাছ থেকে তাঁদের উৎপাদনের একটি অংশ দাবি করা হতো। একে অনেক সময় 'ভাড়া' হিসেবে গণ্য করা হতো কারণ জমির মালিক ছিলেন রাজা।
  • চোলদের কর ব্যবস্থা: তামিলনাড়ুর চোল রাজবংশের শিলালিপিতে চার শতাধিক প্রকারের করের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত ছিল 'ভেট্টি' (Vetti), যা নগদে নয় বরং জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে দিতে হতো। এছাড়া ছিল 'কদমাই' (Kadamai) বা ভূমি রাজস্ব।

৩. প্রশস্তিসমূহ এবং ভূমি অনুদান

প্রশস্তি হলো এমন এক ধরনের লিপি যা রাজাদের গুণকীর্তন করার জন্য ব্রাহ্মণদের দ্বারা সংস্কৃত বা অন্যান্য ভাষায় রচিত হতো। এগুলো সব সময় আক্ষরিক অর্থে সত্য না-ও হতে পারে, তবে এগুলো আমাদের বলে দেয় যে রাজারা নিজেদের কীরূপ বীর বা শক্তিশালী যোদ্ধা হিসেবে চিত্রিত করতে চাইতেন।

  • রাজারা প্রায়ই ব্রাহ্মণদের ভূমি অনুদান দিয়ে পুরস্কৃত করতেন। এগুলো তাম্রপটে খোদাই করা থাকত এবং যাঁরা জমি পেতেন তাঁদের এটি প্রদান করা হতো।
  • দ্বাদশ শতাব্দীতে কলহন নামক এক কবি কাশ্মীরের রাজাদের ইতিহাস নিয়ে একটি দীর্ঘ সংস্কৃত কবিতা (রাজতরঙ্গিণী) রচনা করেছিলেন, যা সাধারণ প্রশস্তির চেয়ে ভিন্ন ছিল কারণ তিনি রাজাদের সমালোচনাও করেছিলেন।

৪. ধন-সম্পদের জন্য যুদ্ধ

এই যুগের রাজারা সম্পদ সংগ্রহের জন্য প্রতিবেশী রাজ্যগুলো আক্রমণ করতেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল 'ত্রিপাক্ষিক সংঘর্ষ' (Tripartite Struggle)।

  • কনৌজের লড়াই: গঙ্গা উপত্যকার কনৌজ শহরটি দখলের জন্য তিনটি রাজবংশ—পাল, গুর্জর-প্রতিহার এবং রাষ্ট্রকূট শতাব্দী ধরে লড়াই করেছিল।
  • সুলতান মাহমুদ গজনভি: আফগানিস্তানের গজনির সুলতান মাহমুদ ভারতের মন্দিরগুলোর (যেমন গুজরাটের সোমনাথ মন্দির) বিশাল ধন-সম্পদ লুঠ করার জন্য ১৭ বার অভিযান চালিয়েছিলেন। তাঁর সাথে বিখ্যাত পণ্ডিত আল-বেরুনি ভারতে আসেন এবং 'কিতাব-উল-হিন্দ' নামক গ্রন্থ রচনা করেন।
  • চৌহান বা চহমান বংশ: দিল্লির আজমেরের শাসক পৃথ্বীরাজ চৌহান (তৃতীয়) ১১৯১ সালে সুলতান মহম্মদ ঘুরিকে পরাজিত করেন, কিন্তু পরের বছর ১১৯২ সালে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে তাঁর কাছে পরাজিত হন।

৫. চোল রাজবংশ: একটি গভীর বিশ্লেষণ

দক্ষিণ ভারতের চোল সাম্রাজ্য ছিল অন্যতম শক্তিশালী এবং সুসংগঠিত। বিজয়ালয় থেকে শুরু করে প্রথম রাজরাজ এবং রাজেন্দ্র চোল পর্যন্ত এই বংশের গৌরব ছড়িয়ে ছিল।

  • স্থাপত্য ও ভাস্কর্য: রাজরাজ ও রাজেন্দ্র চোলের তৈরি তাঞ্জাভুর এবং গঙ্গাইকোন্ডচোলপুরমের মন্দিরগুলো ছিল স্থাপত্যের বিস্ময়। চোল আমলের ব্রোঞ্জ মূর্তিশিল্প বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
  • কৃষি ও সেচ: কাবেরী নদীর জল বন্টন এবং বিশাল বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে কৃষিতে বিপ্লব আনা হয়েছিল।
  • প্রশাসন: কৃষকদের বসতি বা গ্রামগুলোকে বলা হতো 'উর' (Ur)। কয়েকটি উর মিলে তৈরি হতো 'নাডু' (Nadu)। গ্রাম পরিষদ এবং নাডু বিচার কাজ ও কর সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করত।
  • উত্তরামেরুর শিলালিপি: এই শিলালিপি থেকে জানা যায় কীভাবে চোল আমলে 'সভা' বা কমিটি গঠন করা হতো। লটারির মাধ্যমে কমিটির সদস্য নির্বাচন করা হতো, যা ছিল এক প্রকার প্রাচীন গণতন্ত্র।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

১. 'ত্রিপাক্ষিক সংঘর্ষ' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: গঙ্গা উপত্যকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ শহর কনৌজ দখলের জন্য তিনটি শক্তিশালী রাজবংশ—পাল, গুর্জর-প্রতিহার এবং রাষ্ট্রকূট বংশের মধ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চলেছিল, তাকেই ইতিহাসে 'ত্রিপাক্ষিক সংঘর্ষ' বলা হয়।

২. চোল মন্দিরগুলো কেন শুধু উপাসনার স্থান ছিল না?
উত্তর: চোল মন্দিরগুলো কেবল পূজার জন্য ছিল না, বরং সেগুলো ছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত থাকতেন অসংখ্য কারিগর, পাচক, নর্তক ও সংগীতজ্ঞ। মন্দিরের জমি থেকে আসা অর্থ দিয়ে এই বিশাল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো।

৩. চোল প্রশাসনে 'নাডু'-র ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: চোল শাসনামলে কয়েকটি গ্রামের সমষ্টিকে বলা হতো 'নাডু'। নাডু বিচার বিভাগীয় কাজ সম্পন্ন করত এবং প্রশাসনিকভাবে কর সংগ্রহের কাজ তদারকি করত। ধনী কৃষকরা (ভেল্লাল জাতি) নাডুর কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।

সারসংক্ষেপ

  • সপ্তম শতাব্দীতে সামন্তদের উত্থান নতুন রাজবংশের পথ প্রশস্ত করে।
  • রাষ্ট্রকূট, পাল এবং গুর্জর-প্রতিহার বংশ ছিল সেই সময়ের প্রধান শক্তি।
  • রাজারা কর এবং প্রশস্তি তৈরির মাধ্যমে তাঁদের ক্ষমতা জাহির করতেন।
  • কনৌজ শহরটি ছিল ক্ষমতার প্রতীক, যা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ চলেছিল।
  • চোল রাজবংশ দক্ষিণ ভারতে এক শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো এবং মন্দির-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল।
  • গ্রাম্য স্বায়ত্তশাসন এবং কৃষি উন্নয়নে চোলদের অবদান চিরস্মরণীয়।