বিষয়ের ভূমিকা

ভারতের ইতিহাসে দিল্লির গুরুত্ব অপরিসীম। তবে আমরা যদি দ্বাদশ শতাব্দীর আগের দিকে তাকাই, তবে দেখব যে দিল্লি তখন খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল না। সপ্তম শ্রেণির ইতিহাসের এই তৃতীয় অধ্যায়টিতে আমরা আলোচনা করব কীভাবে দিল্লি একটি ছোট জনপদ থেকে ভারতের বিশাল এক সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হলো। তোমারা রাজপুত এবং চৌহানদের হাত ধরে দিল্লির যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তা সুলতানি আমলে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। এই অধ্যায়টি আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে কীভাবে ১২০৬ থেকে ১৫২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সুলতানি রাজবংশ দিল্লি শাসন করেছিল এবং ভারতের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলেছিল।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. দিল্লির রাজনৈতিক উত্থান

দিল্লি প্রথম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তোমারা রাজপুতদের আমলে, যারা দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে আজমিরের চৌহানদের (চাহমান) কাছে পরাজিত হয়েছিল। তোমারা এবং চৌহানদের আমলেই দিল্লি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। এখানে 'দেহলিওয়াল' নামক মুদ্রার প্রচলন ছিল যা বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু প্রকৃত অর্থে দিল্লির ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে যখন 'দিল্লি সুলতানি' প্রতিষ্ঠিত হয়।

২. দিল্লি সুলতানদের সম্পর্কে জানার উৎস

ইতিহাসবিদরা দিল্লির সুলতানদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য মূলত শিলালিপি, মুদ্রা এবং স্থাপত্যের উপর নির্ভর করেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো 'তওয়ারিখ' (একবচনে তারিখ)। তওয়ারিখ হলো ফারসি ভাষায় লেখা ইতিহাস। এই তওয়ারিখের লেখকরা ছিলেন শিক্ষিত ব্যক্তি—যেমন সচিব, প্রশাসক, কবি এবং দরবারী। তারা মূলত সুলতানদের জন্য শাসন সংক্রান্ত পরামর্শ দিতেন এবং ন্যায়বিচারের গুরুত্ব তুলে ধরতেন।

  • তওয়ারিখের লেখকদের বৈশিষ্ট্য: তারা মূলত শহরে বাস করতেন (বিশেষ করে দিল্লিতে)। তারা সুলতানদের প্রশংসা করে ইতিহাস লিখতেন যাতে তারা অনেক পুরস্কার পেতে পারেন। তারা প্রায়ই সমাজে 'লিঙ্গ বৈষম্য' এবং 'জন্মগত অধিকারের' পক্ষে কথা বলতেন।

৩. সুলতানি শাসনের বিস্তার: গ্যারিসন টাউন থেকে সাম্রাজ্য

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে সুলতানদের নিয়ন্ত্রণ মূলত সুরক্ষিত শহর বা 'গ্যারিসন টাউন' (Garrison Towns)-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। গ্যারিসন টাউন হলো এমন একটি এলাকা যেখানে সেনাবাহিনী বসবাস করত। এই শহরগুলোর বাইরে সুলতানদের নিয়ন্ত্রণ খুব একটা ছিল না, তাই তারা রসদ ও করের জন্য বাণিজ্যের উপর নির্ভর করত।

  • অভ্যন্তরীণ সীমানা (Internal Frontier): সুলতানরা গ্যারিসন টাউনের পেছনের এলাকা বা 'হিন্টারল্যান্ড' দখল করতে শুরু করেন। গঙ্গা-যমুনার দোয়াব অঞ্চল থেকে অরণ্য পরিষ্কার করা হয় এবং কৃষকদের জমি দেওয়া হয়।
  • বাহ্যিক সীমানা (External Frontier): আলাউদ্দিন খলজির আমলে দক্ষিণ ভারতে সামরিক অভিযান শুরু হয় এবং মহম্মদ তুঘলকের আমলে এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। এই অভিযানে সুলতানরা হাতি, ঘোড়া, সোনা এবং মূল্যবান সম্পদ দখল করেন।

৪. দিল্লির পাঁচটি রাজবংশ

দিল্লি সুলতানি আমলে মূলত পাঁচটি প্রধান রাজবংশ শাসন করেছিল:

  • দাস বংশ (Mamluk Dynasty): কুতুবুদ্দিন আইবক থেকে গিয়াসউদ্দিন বলবন।
  • খলজি বংশ (Khalji Dynasty): জালালুদ্দিন খলজি এবং আলাউদ্দিন খলজি।
  • তুঘলক বংশ (Tughluq Dynasty): গিয়াসউদ্দিন তুঘলক, মহম্মদ তুঘলক এবং ফিরোজ শাহ তুঘলক।
  • সৈয়দ বংশ (Sayyid Dynasty): খিজির খাঁ।
  • লোদি বংশ (Lodi Dynasty): বহলুল লোদি এবং ইব্রাহিম লোদি।

৫. প্রশাসন এবং ইকতা ব্যবস্থা

বিশাল সাম্রাজ্য শাসনের জন্য দক্ষ প্রশাসক প্রয়োজন ছিল। প্রথম দিকে সুলতানরা অভিজাতদের পরিবর্তে তাদের বিশেষ ক্রীতদাসদের (যাদের ফারসিতে 'বান্দাগান' বলা হতো) উচ্চ পদে নিয়োগ করতেন।

  • ইকতা ও ইকতাদার: সুলতানরা তাদের সামরিক প্রধানদের বিভিন্ন এলাকার শাসনভার দিতেন, যাকে বলা হতো 'ইকতা'। এই ইক্তার মালিকদের বলা হতো 'মুক্তা' (Muqti) বা ইকতাদার। তাদের কাজ ছিল সেনাবাহিনী পরিচালনা করা এবং রাজস্ব সংগ্রহ করা।
  • রাজস্ব ব্যবস্থা: সুলতানি আমলে চাষীদের উৎপাদনের ৫০ শতাংশ কর বা 'খরাজ' হিসেবে দিতে হতো। এছাড়া গবাদি পশু ও বাড়ির উপর কর নেওয়া হতো।

৬. খলজি বনাম তুঘলক: একটি তুলনামূলক আলোচনা

আলাউদ্দিন খলজি এবং মহম্মদ তুঘলকের শাসন পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। মঙ্গোল আক্রমণের হাত থেকে দিল্লিকে রক্ষা করতে দুজনেই বড় সেনাবাহিনী তৈরি করেছিলেন।

  • আলাউদ্দিন খলজি: তিনি তার সৈন্যদের জন্য 'সিরি' (Siri) নামে একটি নতুন গ্যারিসন শহর তৈরি করেন। তিনি বাজারের পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতেন যাতে সৈন্যরা অল্প বেতনে চলতে পারে। তার প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলো বেশ সফল ছিল।
  • মহম্মদ তুঘলক: তিনি দিল্লি-ই-কুহনা থেকে প্রজাদের সরিয়ে দৌলতাবাদে রাজধানী স্থানান্তরের চেষ্টা করেন, যা ছিল এক বড় ব্যর্থতা। তিনি তামার মুদ্রার (Token Currency) প্রচলন করেন, যা জাল হওয়ার ফলে অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। তার প্রশাসনিক পরিকল্পনাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছিল।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

১. 'তওয়ারিখ' কী এবং এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: 'তওয়ারিখ' হলো সুলতানি আমলের ফারসি ভাষায় লিখিত ইতিহাস। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর মাধ্যমে আমরা সেই সময়ের শাসন ব্যবস্থা, রাজনীতি এবং রাজদরবারের খবরাখবর বিস্তারিত জানতে পারি।

২. ইকতা ব্যবস্থা বলতে কী বোঝো?
উত্তর: সুলতানি আমলে সাম্রাজ্যকে যে ছোট ছোট অঞ্চলে ভাগ করে সামরিক প্রধানদের শাসনের জন্য দেওয়া হতো, তাকে বলা হতো 'ইকতা'। এর প্রধান বা শাসককে বলা হতো ইকতাদার বা 'মুক্তা'।

৩. মঙ্গোল আক্রমণ ঠেকাতে আলাউদ্দিন খলজি কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন?
উত্তর: আলাউদ্দিন খলজি একটি বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করেছিলেন, সিরি নামক গ্যারিসন শহর তৈরি করেছিলেন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন যাতে সেনারা সহজেই জীবনধারণ করতে পারে।

সারসংক্ষেপ

  • দিল্লি দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজপুতদের আমলে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
  • ১২০৬ সালে কুতুবুদ্দিন আইবকের হাত ধরে দিল্লি সুলতানির সূচনা হয়।
  • তওয়ারিখ ছিল সুলতানি ইতিহাস জানার প্রধান মাধ্যম।
  • ইকতা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশাল সাম্রাজ্যের রাজস্ব ও সামরিক কাজ পরিচালিত হতো।
  • আলাউদ্দিন খলজি ও মহম্মদ তুঘলকের আমলে সাম্রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তার ঘটেছিল।
  • ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদির পরাজয়ের মাধ্যমে সুলতানি শাসনের অবসান ঘটে এবং মুঘল সাম্রাজ্য শুরু হয়।