বিষয়ের ভূমিকা
ভারত একটি বিশাল দেশ যেখানে ভূ-প্রকৃতির এক অদ্ভুত বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। আপনি যদি ভারতের মানচিত্রটি দেখেন, তবে দেখবেন যে কোথাও আকাশচুম্বী তুষারবৃত পর্বতমালা রয়েছে, আবার কোথাও মাইলের পর মাইল বিস্তৃত উর্বর সমভূমি। কোথাও আছে উত্তপ্ত বালুকাময় মরুভূমি, আবার কোথাও রয়েছে প্রাচীন শিলায় গঠিত মালভূমি। এই অধ্যায়ে আমরা নবম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায়—'ভারতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য' (Physical Features of India) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। এই পাঠটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে যে কীভাবে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতের বর্তমান ভূ-প্রকৃতি তৈরি হয়েছে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
ভারতের ভূ-প্রকৃতি বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে 'প্লেট টেকটোনিক্স' (Plate Tectonics) বা পাতের সংস্থান তত্ত্ব সম্পর্কে একটু ধারণা থাকতে হবে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে পৃথিবীর উপরিভাগ কয়েকটি বড় এবং ছোট পাতে বিভক্ত। এই পাতগুলি প্রতিনিয়ত ধীর গতিতে নড়াচড়া করছে, যার ফলে ভাঁজ, চ্যুতি এবং আগ্নেয়গিরির মতো ঘটনা ঘটে। ভারতের বর্তমান ভূ-খণ্ডও দীর্ঘকালীন এই প্রক্রিয়ার ফসল।
১. হিমালয় পর্বতমালা (The Himalayan Mountains)
হিমালয় পর্বতমালা হল বিশ্বের নবীনতম ভঙ্গিল পর্বত। এটি ভারতের উত্তর সীমান্ত বরাবর বিস্তৃত। হিমালয়ের কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য নিচে দেওয়া হলো:
- দৈর্ঘ্য ও বিস্তৃতি: এটি সিন্ধু নদ থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত প্রায় ২,৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং এর প্রস্থ ১৫০ থেকে ৪০০ কিলোমিটারের মধ্যে।
- তিনটি সমান্তরাল শ্রেণি: হিমালয়কে লম্বালম্বিভাবে তিনটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:
- হিমাদ্রি (Himadri): এটি সর্বোচ্চ এবং সবচেয়ে উত্তরের শ্রেণি। এর গড় উচ্চতা ৬,০০০ মিটার। মাউন্ট এভারেস্ট ও কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো পর্বতশৃঙ্গ এখানে অবস্থিত।
- হিমাচল (Himachal): এটি হিমাদ্রির দক্ষিণে অবস্থিত। এখানে অনেক জনপ্রিয় পাহাড়ি শহর যেমন সিমলা, মুসৌরি ও মানালি অবস্থিত।
- শিবালিক (Shiwalik): এটি হিমালয়ের সবচেয়ে দক্ষিণের শ্রেণি। এটি মূলত পলিমাটি ও নুড়ি পাথর দিয়ে গঠিত।
২. উত্তর ভারতের সমভূমি (The Northern Plains)
তিনটি প্রধান নদী—সিন্ধু, গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র এবং তাদের উপনদীগুলোর পলি সঞ্চয়ের ফলে এই বিশাল সমভূমি সৃষ্টি হয়েছে। এটি কৃষি কাজের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত এবং ভারতের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চল।
- ভাঙর ও খাদার: পুরনো পলিমাটি দিয়ে গঠিত অঞ্চলকে 'ভাঙর' এবং নতুন উর্বর পলিমাটি দিয়ে গঠিত অঞ্চলকে 'খাদার' বলা হয়।
- ভাবর ও তরাই: শিবালিকের পাদদেশে নুড়ি পাথরের স্তরকে 'ভাবর' এবং তার দক্ষিণে অবস্থিত জলাভূমি অঞ্চলকে 'তরাই' বলা হয়।
৩. উপদ্বীপীয় মালভূমি (The Peninsular Plateau)
এটি ভারতের প্রাচীনতম ভূ-ভাগ। এটি আগ্নেয় এবং রূপান্তরিত শিলা দিয়ে গঠিত। একে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
- মধ্যভাগের উচ্চভূমি (Central Highlands): নর্মদা নদীর উত্তরে মালব মালভূমি অঞ্চলকে এটি নির্দেশ করে।
- দাক্ষিণাত্য মালভূমি (Deccan Plateau): এটি নর্মদা নদীর দক্ষিণে অবস্থিত একটি ত্রিভুজাকার অঞ্চল। পশ্চিম ঘাট এবং পূর্ব ঘাট পর্বতমালা এই মালভূমির দুই সীমানা নির্ধারণ করে।
৪. ভারতীয় মরুভূমি (The Indian Desert)
আরাবল্লী পর্বতের পশ্চিম দিকে অবস্থিত থর মরুভূমি ভারতের প্রধান মরু অঞ্চল। এখানে বালিয়াড়ি বা বালির পাহাড় প্রচুর দেখা যায়। এখানকার জলবায়ু অত্যন্ত শুষ্ক এবং বৃষ্টিপাত খুব কম। 'লুনি' হলো এখানকার একমাত্র প্রধান নদী।
৫. উপকূলীয় সমভূমি (The Coastal Plains)
ভারতের মালভূমি অঞ্চলের দুই পাশে দুটি উপকূলীয় সমভূমি রয়েছে:
- পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমি: এটি আরব সাগর এবং পশ্চিম ঘাট পর্বতের মাঝখানে অবস্থিত। এর উত্তরের অংশকে কোঙ্কণ, মধ্যভাগকে কন্নড় এবং দক্ষিণ ভাগকে মালাবার উপকূল বলে।
- পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি: এটি বঙ্গোপসাগর বরাবর বিস্তৃত। এর উত্তর অংশকে উত্তর সরকার এবং দক্ষিণ অংশকে করমন্ডল উপকূল বলা হয়।
৬. দ্বীপপুঞ্জ (The Islands)
ভারতের প্রধানত দুটি দ্বীপপুঞ্জ রয়েছে:
- লাক্ষাদ্বীপ (Lakshadweep): এটি আরব সাগরে অবস্থিত এবং মূলত প্রবাল (Coral) দিয়ে তৈরি।
- আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ: এটি বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত। এটি তুলনামূলকভাবে আকারে বড় এবং এখানকার জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: ভাঙর ও খাদারের মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: ভাঙর হলো নদীর অববাহিকার প্রাচীন পলিমাটি যা অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে থাকে। অন্যদিকে, খাদার হলো নতুন পলিমাটি যা প্রতি বছর বন্যার মাধ্যমে সঞ্চিত হয় এবং এটি অত্যন্ত উর্বর।
প্রশ্ন ২: হিমালয়ের তিনটি সমান্তরাল প্রধান শ্রেণির নাম লেখো।
উত্তর: হিমালয়ের তিনটি প্রধান শ্রেণি হলো—১. হিমাদ্রি (Great Himalayas), ২. হিমাচল (Lesser Himalayas) এবং ৩. শিবালিক (Outer Himalayas)।
প্রশ্ন ৩: ভারতের কোন অঞ্চলে প্রবাল দ্বীপ দেখা যায়?
উত্তর: ভারতের আরব সাগরে অবস্থিত লাক্ষাদ্বীপ হলো একটি প্রবাল দ্বীপপুঞ্জ।
সারসংক্ষেপ
- ভারত বিভিন্ন ভূ-প্রকৃতি যেমন পর্বত, সমভূমি, মালভূমি, মরুভূমি এবং দ্বীপপুঞ্জের সংমিশ্রণ।
- হিমালয় পর্বতমালা উত্তর সীমানা রক্ষা করে এবং জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- উত্তর ভারতের সমভূমি কৃষি ও জনবসতির প্রধান কেন্দ্র।
- উপদ্বীপীয় মালভূমি ভারতের প্রাচীনতম অংশ এবং খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ।
- উপকূলীয় অঞ্চল এবং দ্বীপপুঞ্জ ভারতের সামুদ্রিক অর্থনীতি ও পর্যটনে সহায়ক।