বিষয়ের ভূমিকা

মহাবিশ্বের দিকে তাকালে আমাদের মনে কী প্রশ্ন জাগে? কীভাবে গ্রহগুলো সূর্যের চারপাশে ঘুরছে? কেন চাঁদ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যায় না? অথবা খুব সহজভাবে বললে, কেন আপেলটি গাছ থেকে মাটিতেই পড়ে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এক মৌলিক এবং রহস্যময় শক্তির মধ্যে, যার নাম – মহাকর্ষ।

একাদশ শ্রেণির পদার্থবিদ্যার অষ্টম অধ্যায়, 'মহাকর্ষ' (Gravitation), আমাদের এই মহাজাগতিক আঠার সাথেই পরিচয় করিয়ে দেয়। এটি কেবল একটি অধ্যায় নয়, বরং এটি মহাবিশ্বের কার্যকারিতা বোঝার একটি চাবিকাঠি। স্যার আইজ্যাক নিউটনের সেই বিখ্যাত আপেল পড়ার গল্পটি থেকেই আধুনিক মহাকর্ষ তত্ত্বের জন্ম। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যে বল আপেলকে মাটিতে টেনে নামায়, সেই একই বল চাঁদকে পৃথিবীর চারপাশে ঘোরায় এবং গ্রহদের সূর্যের চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে বাধ্য করে।

এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে কেপলারের গ্রহীয় গতির সূত্রগুলি গ্রহদের কক্ষপথের নিখুঁত বর্ণনা দেয়। আমরা নিউটনের সার্বজনীন মহাকর্ষ সূত্রের গাণিতিক রূপ এবং তার প্রয়োগ সম্পর্কে জানব। পৃথিবী পৃষ্ঠে অভিকর্ষজ ত্বরণ 'g'-এর মান কীভাবে উচ্চতা, গভীরতা এবং পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে পরিবর্তিত হয়, তা আমরা বিশ্লেষণ করব। এছাড়াও, মুক্তিবেগ (Escape Velocity) কী, কেন রকেটকে একটি নির্দিষ্ট গতিতে উৎক্ষেপণ করতে হয়, এবং কৃত্রিম উপগ্রহগুলো কীভাবে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে – এই সমস্ত আকর্ষণীয় বিষয়গুলি নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব।

মহাকর্ষ শুধু মহাজাগতিক বস্তুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এর প্রভাব রয়েছে। আমাদের ওজন থেকে শুরু করে জোয়ার-ভাটা পর্যন্ত সবকিছুই এই অদৃশ্য শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। চলুন, এই আকর্ষণীয় অধ্যায়ের গভীরে প্রবেশ করে মহাবিশ্বের কার্যকারিতার পেছনের বিজ্ঞানকে সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করি।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. কেপলারের গ্রহীয় গতির সূত্র (Kepler's Laws of Planetary Motion)

নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কারের প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে, জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার তার গুরু টাইকো ব্রাহের পর্যবেক্ষণের ডেটা বিশ্লেষণ করে গ্রহদের গতি সম্পর্কিত তিনটি যুগান্তকারী সূত্র প্রদান করেন। এই সূত্রগুলো মহাকর্ষকে গাণিতিকভাবে বোঝার ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

  • প্রথম সূত্র (কক্ষপথের সূত্র - The Law of Orbits): এই সূত্রানুসারে, প্রতিটি গ্রহ সূর্যকে একটি ফোকাসে রেখে উপবৃত্তাকার (elliptical) কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে। প্রাচীনকালে ধারণা করা হতো যে গ্রহরা বৃত্তাকার পথে ঘোরে। কিন্তু কেপলার প্রমাণ করেন যে এই কক্ষপথগুলো আসলে চ্যাপ্টা বৃত্ত বা উপবৃত্ত। এর মানে হলো, গ্রহের কক্ষপথে এমন একটি বিন্দু থাকে যখন সে সূর্যের সবচেয়ে কাছে আসে (অনুসূর বা Perihelion) এবং এমন একটি বিন্দু থাকে যখন সে সবচেয়ে দূরে চলে যায় (অপসূর বা Aphelion)।
  • দ্বিতীয় সূত্র (ক্ষেত্রফলের সূত্র - The Law of Areas): এই সূত্রটি বলে যে, সূর্য এবং কোনো গ্রহের সংযোগকারী কাল্পনিক সরলরেখা সমান সময়ের ব্যবধানে সমান ক্ষেত্রফল অতিক্রম করে। এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থ রয়েছে। যখন গ্রহ সূর্যের কাছাকাছি থাকে (অনুসূর অবস্থানে), তখন তার গতিবেগ বেড়ে যায় এবং যখন দূরে থাকে (অপসূর অবস্থানে), তখন গতিবেগ কমে যায়। এটি কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণ সূত্রের একটি চমৎকার উদাহরণ। সহজ ভাষায়, কাছে এলে গ্রহ দ্রুত চলে এবং দূরে গেলে ধীরে চলে, যাতে নির্দিষ্ট সময়ে অতিক্রান্ত ক্ষেত্রফল সর্বদা সমান থাকে।
  • তৃতীয় সূত্র (পর্যায়কালের সূত্র - The Law of Periods): এই সূত্রটি গ্রহের পর্যায়কাল (একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে যে সময় লাগে) এবং তার কক্ষপথের আকারের মধ্যে একটি গাণিতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। সূত্রটি হলো: গ্রহের পর্যায়কালের বর্গ (T²) তার কক্ষপথের অর্ধ-পরাক্ষের (semi-major axis) ঘনফলের (a³) সমানুপাতিক। অর্থাৎ, T² ∝ a³। এর মানে হলো, যে গ্রহ সূর্য থেকে যত দূরে অবস্থিত, তার সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে তত বেশি সময় লাগে। যেমন, বুধের পর্যায়কাল মাত্র ৮৮ দিন, যেখানে পৃথিবীর ৩৬৫ দিন এবং শনির প্রায় ২৯.৫ বছর।

২. নিউটনের সার্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র (Newton's Universal Law of Gravitation)

কেপলারের সূত্রগুলি 'কীভাবে' গ্রহরা ঘোরে তা বর্ণনা করলেও, 'কেন' ঘোরে তার উত্তর দেয়নি। সেই উত্তরটিই দিয়েছিলেন স্যার আইজ্যাক নিউটন তার সার্বজনীন মহাকর্ষ সূত্রের মাধ্যমে।

সূত্রটি হলো: "মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে একটি বল দ্বারা আকর্ষণ করে, যা কণা দুটির ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।"

গাণিতিকভাবে, যদি m₁ এবং m₂ ভরের দুটি বস্তু r দূরত্বে থাকে, তবে তাদের মধ্যে আকর্ষণ বল (F) হবে:

F = G * (m₁m₂ / r²)

এখানে:

  • F হলো মহাকর্ষীয় বল।
  • m₁ এবং m₂ হলো বস্তু দুটির ভর।
  • r হলো বস্তু দুটির কেন্দ্রদ্বয়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব।
  • G হলো সার্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক (Universal Gravitational Constant)। এর মান প্রায় 6.674 × 10⁻¹¹ N m²/kg²। 'G'-কে সার্বজনীন বলা হয় কারণ এর মান মহাবিশ্বের যেকোনো স্থানে এবং যেকোনো বস্তুর জন্য একই থাকে।

এই সূত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর 'সার্বজনীনতা'। এটি শুধু গ্রহ-নক্ষত্রের জন্যই প্রযোজ্য নয়, আমাদের চারপাশের যেকোনো দুটি বস্তুর (যেমন দুটি বই, বা আপনি এবং আপনার কম্পিউটার) মধ্যেও এই আকর্ষণ বল কাজ করে। তবে বস্তুগুলোর ভর খুব কম হওয়ায় এই বল এতটাই নগণ্য যে আমরা তা অনুভব করতে পারি না। কিন্তু পৃথিবী বা সূর্যের মতো বিশাল ভরের ক্ষেত্রে এই বল অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

৩. অভিকর্ষ (Gravity) এবং অভিকর্ষজ ত্বরণ (g)

প্রায়শই আমরা 'মহাকর্ষ' এবং 'অভিকর্ষ' শব্দ দুটিকে এক করে ফেলি, কিন্তু এদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।

  • মহাকর্ষ (Gravitation): এটি হলো মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুর মধ্যেকার আকর্ষণ বল।
  • অভিকর্ষ (Gravity): যখন দুটি বস্তুর মধ্যে একটি বস্তু পৃথিবী (বা অন্য কোনো বিশাল গ্রহ/নক্ষত্র) হয়, তখন সেই নির্দিষ্ট আকর্ষণ বলকে অভিকর্ষ বলা হয়। অর্থাৎ, অভিকর্ষ হলো মহাকর্ষের একটি বিশেষ রূপ।

অভিকর্ষজ ত্বরণ (Acceleration due to Gravity - g): নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র অনুযায়ী, কোনো বস্তুর উপর বল প্রযুক্ত হলে তার ত্বরণ হয়। পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের প্রভাবে যখন কোনো বস্তু পৃথিবীর দিকে অবাধে পড়তে থাকে, তখন তার মধ্যে যে ত্বরণ সৃষ্টি হয়, তাকেই অভিকর্ষজ ত্বরণ (g) বলে।

ধরা যাক, পৃথিবীর ভর M এবং ব্যাসার্ধ R। পৃথিবীর পৃষ্ঠে m ভরের একটি বস্তু থাকলে, নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী প্রযুক্ত বল,

F = G * (Mm / R²)

আবার, নিউটনের দ্বিতীয় গতিসূত্র অনুযায়ী, F = mg

সুতরাং, mg = G * (Mm / R²) => g = GM / R²

এই সমীকরণ থেকে স্পষ্ট যে, 'g'-এর মান বস্তুর ভরের (m) উপর নির্ভর করে না। তাই একটি ভারী পাথর এবং একটি হালকা পালক (বায়ুর বাধা অগ্রাহ্য করলে) একই উচ্চতা থেকে একই সময়ে মাটিতে পড়বে। পৃথিবী পৃষ্ঠে 'g'-এর গড় মান প্রায় 9.8 m/s²

'g'-এর মানের পরিবর্তন:

অভিকর্ষজ ত্বরণের মান ধ্রুবক নয়। এটি বিভিন্ন কারণে পরিবর্তিত হয়:

  • উচ্চতার সাথে পরিবর্তন: পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে যত উপরে ওঠা যায়, 'g'-এর মান তত কমতে থাকে কারণ কেন্দ্র থেকে দূরত্ব (r) বৃদ্ধি পায়। h উচ্চতায় g'-এর মান হয়, g' = g * (R / (R+h))²।
  • গভীরতার সাথে পরিবর্তন: পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে যত গভীরে যাওয়া যায়, 'g'-এর মান তত কমতে থাকে। কারণ, গভীরতায় কার্যকর ভরের পরিমাণ কমে যায়। d গভীরতায় g'-এর মান হয়, g' = g * (1 - d/R)। এই সূত্র অনুযায়ী, পৃথিবীর কেন্দ্রে (d=R) পৌঁছালে 'g'-এর মান শূন্য হয়ে যায়।
  • পৃথিবীর আকৃতির জন্য: পৃথিবী সম্পূর্ণ গোলাকার নয়, মেরু অঞ্চলে কিছুটা চ্যাপ্টা এবং নিরক্ষীয় অঞ্চলে কিছুটা স্ফীত। ফলে, মেরু অঞ্চলে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ (R) কম হওয়ায় 'g'-এর মান সর্বাধিক হয় এবং নিরক্ষীয় অঞ্চলে ব্যাসার্ধ বেশি হওয়ায় 'g'-এর মান সর্বনিম্ন হয়।
  • পৃথিবীর আহ্নিক গতির জন্য: পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে একটি অপকেন্দ্র বলের সৃষ্টি হয়, যা অভিকর্ষ বলকে কিছুটা প্রতিহত করে। এই প্রভাব নিরক্ষীয় অঞ্চলে সর্বাধিক এবং মেরু অঞ্চলে শূন্য। তাই ঘূর্ণনের কারণেও নিরক্ষীয় অঞ্চলে 'g'-এর মান কমে যায়।

৪. মহাকর্ষীয় বিভব শক্তি এবং মহাকর্ষীয় বিভব (Gravitational Potential Energy and Potential)

মহাকর্ষীয় বিভব শক্তি (Gravitational Potential Energy): কোনো বস্তুকে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে সরাতে যে কার্য করতে হয়, তাকেই ওই দুই বিন্দুর মধ্যে মহাকর্ষীয় বিভব শক্তির পরিবর্তন বলা হয়। অসীম দূরত্ব থেকে কোনো বস্তুকে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে আনতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়, তাকে ওই বিন্দুর মহাকর্ষীয় বিভব শক্তি (U) বলে।

গাণিতিকভাবে, পৃথিবী (ভর M) থেকে r দূরত্বে অবস্থিত m ভরের কোনো বস্তুর মহাকর্ষীয় বিভব শক্তি হলো:

U = - GMm / r

এখানে ঋণাত্মক (-) চিহ্নটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি বোঝায় যে, বস্তুটি মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের দ্বারা আবদ্ধ (bound system)। বস্তুটিকে এই ক্ষেত্র থেকে মুক্ত করে অসীমে পাঠাতে হলে বাইরে থেকে শক্তি (কার্য) সরবরাহ করতে হবে। যেমন, পৃথিবীপৃষ্ঠে থাকা কোনো বস্তুর বিভব শক্তি ঋণাত্মক, যার অর্থ হলো এটি পৃথিবীর আকর্ষণে বাঁধা।

মহাকর্ষীয় বিভব (Gravitational Potential): মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে একক ভরের কোনো বস্তুকে অসীম থেকে আনতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়, তাকে ওই বিন্দুর মহাকর্ষীয় বিভব (V) বলে।

এটি হলো প্রতি একক ভরে বিভব শক্তি। V = U/m

সুতরাং, V = - GM / r

৫. মুক্তিবেগ (Escape Velocity)

মুক্তিবেগ হলো সেই সর্বনিম্ন বেগ, যে বেগে কোনো বস্তুকে ভূপৃষ্ঠ থেকে ওপরের দিকে নিক্ষেপ করলে তা পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের বাইরে চলে যায় এবং আর ফিরে আসে না।

আমরা জানি, কোনো বস্তুকে ওপরে ছুড়ে দিলে তা কিছুক্ষণ পর আবার নিচে ফিরে আসে। এর কারণ পৃথিবীর অভিকর্ষ। কিন্তু যদি বস্তুটির গতিশক্তি এত বেশি হয় যে তা পৃথিবীর ঋণাত্মক বিভব শক্তিকে অতিক্রম করতে পারে, তবে বস্তুটি আর ফিরে আসবে না।

এই শর্তটি ব্যবহার করে মুক্তিবেগের (vₑ) সমীকরণ নির্ণয় করা যায়:

মোট শক্তি (গতিশক্তি + বিভব শক্তি) = 0

½ mvₑ² + (-GMm / R) = 0

½ mvₑ² = GMm / R

vₑ = √(2GM / R)

যেহেতু g = GM / R², তাই GM = gR²। এই মানটি বসিয়ে আমরা পাই:

vₑ = √(2gR)

পৃথিবীর জন্য G, M, এবং R-এর মান বসিয়ে মুক্তিবেগের মান পাওয়া যায় প্রায় 11.2 কিমি/সেকেন্ড। এই 엄청난 গতিতে কোনো রকেট বা মহাকাশযানকে পাঠাতে পারলেই তা পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে মহাশূন্যে পাড়ি দিতে পারে। চাঁদের মুক্তিবেগ অনেক কম (প্রায় 2.4 কিমি/সেকেন্ড), তাই সেখানে বায়ুমণ্ডল নেই, কারণ গ্যাসের অণুগুলো সহজেই চাঁদের আকর্ষণ কাটিয়ে পালিয়ে যায়।

৬. উপগ্রহের গতি (Motion of Satellites)

উপগ্রহ হলো এমন একটি বস্তু যা কোনো গ্রহের চারপাশে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে। চাঁদ হলো পৃথিবীর প্রাকৃতিক উপগ্রহ। মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে যে উপগ্রহগুলো মহাকাশে পাঠিয়েছে, সেগুলোকে কৃত্রিম উপগ্রহ (Artificial Satellites) বলে।

একটি উপগ্রহ কীভাবে তার কক্ষপথে থাকে? এর পেছনে কাজ করে দুটি বলের ভারসাম্য। উপগ্রহটিকে পৃথিবীর মহাকর্ষ বল কেন্দ্রের দিকে টানে। একই সময়ে, উপগ্রহের বৃত্তাকার গতির কারণে একটি অপকেন্দ্র বল (centrifugal force) বাইরের দিকে কাজ করে। যখন এই দুটি বল সমান ও বিপরীত হয়, তখন উপগ্রহটি একটি স্থিতিশীল কক্ষপথে ঘুরতে থাকে।

কক্ষীয় বেগ (Orbital Velocity): কোনো উপগ্রহকে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্থিতিশীলভাবে ঘোরার জন্য যে রৈখিক বেগের প্রয়োজন হয়, তাকে কক্ষীয় বেগ (vₒ) বলে।

ধরা যাক, পৃথিবী (ভর M) থেকে r দূরত্বে m ভরের একটি উপগ্রহ ঘুরছে।

প্রয়োজনীয় অভিকেন্দ্র বল (মহাকর্ষ বল দ্বারা সরবরাহকৃত) = mvₒ² / r

মহাকর্ষ বল = GMm / r²

সুতরাং, mvₒ² / r = GMm / r²

vₒ = √(GM / r)

এখানে r = R+h, যেখানে R হলো পৃথিবীর ব্যাসার্ধ এবং h হলো ভূপৃষ্ঠ থেকে উপগ্রহের উচ্চতা। পৃথিবীর খুব কাছাকাছি কোনো উপগ্রহের জন্য (h<7.9 কিমি/সেকেন্ড হয়।

লক্ষ্য করুন, vₑ = √2 * vₒ। অর্থাৎ, মুক্তিবেগ কক্ষীয় বেগের প্রায় 1.414 গুণ।

উপগ্রহের প্রকারভেদ:

কক্ষপথের প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে কৃত্রিম উপগ্রহ প্রধানত দুই প্রকারের হয়:

  • ভূ-সমলয় বা জিওস্টেশনারি উপগ্রহ (Geostationary Satellites): এই উপগ্রহগুলো পৃথিবীর নিরক্ষীয় তলের উপর একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে। এদের পর্যায়কাল পৃথিবীর আহ্নিক গতির সমান, অর্থাৎ ২৪ ঘন্টা। ফলে, পৃথিবী থেকে দেখলে এই উপগ্রহগুলোকে আকাশের একটি নির্দিষ্ট স্থানে স্থির বলে মনে হয়। এদেরকে প্রায় ৩৬,০০০ কিমি উচ্চতায় স্থাপন করা হয়। যোগাযোগ (যেমন, টিভি সম্প্রচার, ফোন কল) এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য এই ধরনের উপগ্রহ ব্যবহার করা হয়।
  • মেরু উপগ্রহ (Polar Satellites): এই উপগ্রহগুলো উত্তর-দক্ষিণ মেরু বরাবর পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। এরা অনেক কম উচ্চতায় (সাধারণত ৫০০-৮০০ কিমি) থাকে এবং এদের পর্যায়কাল প্রায় ১০০ মিনিট হয়। পৃথিবী যখন নিজের অক্ষের চারপাশে ঘোরে, তখন এই উপগ্রহগুলো পুরো পৃথিবীর পৃষ্ঠকে স্ক্যান করতে পারে। গুপ্তচরবৃত্তি, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, মানচিত্র তৈরি এবং খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের মতো কাজে মেরু উপগ্রহ ব্যবহার করা হয়।

৭. ওজনহীনতা (Weightlessness)

আমরা প্রায়ই মহাকাশচারীদের মহাকাশযানের ভেতরে ভেসে বেড়াতে দেখি এবং মনে করি সেখানে কোনো অভিকর্ষ নেই। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন প্রায় ৪০০ কিমি উচ্চতায় পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। এই উচ্চতায় 'g'-এর মান ভূপৃষ্ঠের মানের প্রায় ৯০%। তাহলে তারা ভাসে কেন?

এর কারণ হলো 'ওজনহীনতা'। ওজন হলো অভিকর্ষ বলের বিরুদ্ধে কোনো পৃষ্ঠ দ্বারা প্রযুক্ত প্রতিক্রিয়া বল। যখন আপনি লিফটে করে নিচে নামেন, তখন নিজেকে কিছুটা হালকা মনে হয়। যদি লিফটের তার ছিঁড়ে যায় এবং এটি অবাধে পড়তে থাকে (free fall), তখন আপনি এবং লিফট একই ত্বরণে নিচে পড়বেন। লিফটের মেঝে আপনার পায়ে কোনো প্রতিক্রিয়া বল দেবে না। তখন আপনি ওজনহীনতা অনুভব করবেন।

মহাকাশে উপগ্রহগুলোও পৃথিবীর চারপাশে ক্রমাগত অবাধে পতনশীল অবস্থায় থাকে। উপগ্রহ এবং তার ভেতরের মহাকাশচারী উভয়েই একই অভিকর্ষজ ত্বরণে ঘুরতে থাকে। ফলে, মহাকাশচারী যানের মেঝের উপর কোনো বল প্রয়োগ করে না এবং একটি আপাত ওজনহীন অবস্থা অনুভব করে। সুতরাং, মহাকাশে ওজনহীনতা মানে অভিকর্ষের অনুপস্থিতি নয়, বরং প্রতিক্রিয়া বলের অনুপস্থিতি।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: মহাকর্ষ (Gravitation) এবং অভিকর্ষ (Gravity)-এর মধ্যে মূল পার্থক্য কী?

উত্তর: মহাকর্ষ হলো একটি সার্বজনীন ধারণা যা মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুর মধ্যকার আকর্ষণ বলকে বোঝায়, তাদের ভর বা আকার যাই হোক না কেন। অন্যদিকে, অভিকর্ষ হলো মহাকর্ষের একটি বিশেষ ক্ষেত্র। যখন আকর্ষণকারী বস্তু দুটির মধ্যে একটি বিশাল আকারের বস্তু (যেমন পৃথিবী, সূর্য বা অন্য কোনো গ্রহ) হয়, তখন সেই আকর্ষণ বলকে সাধারণত অভিকর্ষ বলা হয়। সহজ কথায়, পৃথিবীর কোনো বস্তুর উপর আকর্ষণ বল হলো অভিকর্ষ, যা আসলে পৃথিবী এবং ওই বস্তুর মধ্যকার মহাকর্ষ বল।

প্রশ্ন ২: যদি পৃথিবীর ব্যাসার্ধ হঠাৎ অর্ধেক হয়ে যায় কিন্তু ভর একই থাকে, তাহলে অভিকর্ষজ ত্বরণ 'g'-এর মানের কী পরিবর্তন হবে?

উত্তর: আমরা জানি, অভিকর্ষজ ত্বরণের সূত্র হলো g = GM / R²। এখানে G এবং M (ভর) অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। নতুন ব্যাসার্ধ R' = R/2। সুতরাং, নতুন অভিকর্ষজ ত্বরণ g' হবে: g' = GM / (R/2)² = GM / (R²/4) = 4 * (GM / R²) = 4g। অর্থাৎ, অভিকর্ষজ ত্বরণের মান পূর্বের মানের চারগুণ হয়ে যাবে। এর ফলে আমাদের ওজনও চারগুণ বেড়ে যাবে।

প্রশ্ন ৩: ভূ-সমলয় উপগ্রহগুলিকে কেন প্রায় ৩৬,০০০ কিমি উচ্চতায় স্থাপন করা হয়?

উত্তর: ভূ-সমলয় উপগ্রহের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর পর্যায়কাল পৃথিবীর আহ্নিক গতির সমান, অর্থাৎ ২৪ ঘন্টা। উপগ্রহের পর্যায়কালের সূত্র (কেপলারের তৃতীয় সূত্র থেকে প্রাপ্ত) তার কক্ষপথের ব্যাসার্ধের উপর নির্ভরশীল। গাণিতিক হিসাব করে দেখা যায় যে, ঠিক ২৪ ঘন্টার পর্যায়কাল পাওয়ার জন্য উপগ্রহটিকে পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৬,০০০ কিলোমিটার উচ্চতায় একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্থাপন করতে হয়। এর থেকে কম বা বেশি উচ্চতায় পর্যায়কাল ২৪ ঘন্টার থেকে ভিন্ন হবে, এবং উপগ্রহটি আর ভূ-সমলয় থাকবে না, অর্থাৎ পৃথিবী থেকে দেখলে স্থির মনে হবে না।

প্রশ্ন ৪: ওজনহীনতা মানে কি অভিকর্ষ শূন্য হয়ে যাওয়া? মহাকাশচারীরা কেন ওজনহীন অনুভব করেন?

উত্তর: না, ওজনহীনতা মানে অভিকর্ষ শূন্য হয়ে যাওয়া নয়। মহাকাশ স্টেশন যে উচ্চতায় পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে, সেখানে অভিকর্ষের মান ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৯০%। ওজনহীনতা একটি আপেক্ষিক অনুভূতি যা প্রতিক্রিয়া বলের অনুপস্থিতির কারণে ঘটে। মহাকাশ স্টেশন এবং তার ভেতরের মহাকাশচারী উভয়েই পৃথিবীর আকর্ষণে ক্রমাগত 'অবাধে পতনশীল' (free fall) অবস্থায় থাকে। যেহেতু তারা উভয়েই একই ত্বরণে পৃথিবীর দিকে পড়ছে, তাই মহাকাশচারী যানের মেঝের উপর কোনো বল প্রয়োগ করে না, এবং মেঝে থেকেও কোনো প্রতিক্রিয়া বল অনুভব করে না। এই প্রতিক্রিয়া বলের অনুপস্থিতির কারণেই তারা ওজনহীন অনুভব করে এবং ভেসে থাকে।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়টি ভালোভাবে মনে রাখার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচে তালিকা আকারে দেওয়া হলো:

  • কেপলারের তিনটি সূত্র: গ্রহরা উপবৃত্তাকার পথে ঘোরে (প্রথম সূত্র), সমান সময়ে সমান ক্ষেত্রফল অতিক্রম করে (দ্বিতীয় সূত্র), এবং পর্যায়কালের বর্গ কক্ষপথের অর্ধ-পরাক্ষের ঘনফলের সমানুপাতিক (T² ∝ a³)।
  • নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র: F = G(m₁m₂ / r²), যেখানে G হলো সার্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক।
  • অভিকর্ষজ ত্বরণ (g): g = GM / R²। এর মান উচ্চতা, গভীরতা, পৃথিবীর আকৃতি এবং আহ্নিক গতির সাথে পরিবর্তিত হয়। পৃথিবীর কেন্দ্রে এর মান শূন্য।
  • মহাকর্ষীয় বিভব শক্তি: U = - GMm / r। ঋণাত্মক চিহ্ন আবদ্ধ অবস্থাকে বোঝায়।
  • মুক্তিবেগ (vₑ): vₑ = √(2GM / R) = √(2gR)। এটি হলো সর্বনিম্ন বেগ যা পৃথিবীর আকর্ষণ কাটিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন। পৃথিবীর জন্য এর মান প্রায় 11.2 কিমি/সেকেন্ড।
  • কক্ষীয় বেগ (vₒ): vₒ = √(GM / r)। এটি উপগ্রহকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বেগ।
  • উপগ্রহ: ভূ-সমলয় উপগ্রহ (যোগাযোগের জন্য, ২৪ ঘন্টা পর্যায়কাল, ৩৬,০০০ কিমি উচ্চতা) এবং মেরু উপগ্রহ (পর্যবেক্ষণের জন্য, কম উচ্চতা, প্রায় ১০০ মিনিট পর্যায়কাল)।
  • ওজনহীনতা: এটি অভিকর্ষের অনুপস্থিতি নয়, বরং অবাধে পতনের কারণে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া বলের অনুপস্থিতি।