বিষয়ের ভূমিকা

নমস্কার বন্ধুরা! আজ আমরা দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বইয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মজার অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করব – অধ্যায় ১২, বিদ্যুৎ (Electricity)। একবার ভাবুন তো, বিদ্যুৎ ছাড়া আমাদের একটি দিনও কি চলতে পারে? সকালের অ্যালার্ম ঘড়ি থেকে শুরু করে রাতের লাইট, ফ্যান, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ফ্রিজ, জল তোলার মোটর – আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎকে আধুনিক সভ্যতার চালিকাশক্তি বললে একটুও বাড়িয়ে বলা হয় না।

কিন্তু এই বিদ্যুৎ আসলে কী? এটি কীভাবে তারের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়? কোন কোন বিষয় এই প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে? একটি বাল্ব কেন জ্বলে ওঠে বা একটি হিটার কেন গরম হয়? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তরই লুকিয়ে আছে এই অধ্যায়ে। এই আলোচনায় আমরা বিদ্যুতের একেবারে মৌলিক ধারণাগুলি থেকে শুরু করে এর বিভিন্ন প্রয়োগ পর্যন্ত ধাপে ধাপে বোঝার চেষ্টা করব। আমরা জানব বৈদ্যুতিক প্রবাহ, বিভব পার্থক্য, ও'মের সূত্র, রোধ, বর্তনী এবং বৈদ্যুতিক ক্ষমতার মতো জরুরি বিষয়গুলো সম্পর্কে। চলুন, বিজ্ঞানের এই জাদুকরী দুনিয়ায় প্রবেশ করা যাক এবং বিদ্যুতের রহস্য উন্মোচন করি।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

বৈদ্যুতিক প্রবাহ এবং বর্তনী (Electric Current and Circuit)

বিদ্যুৎ বোঝার প্রথম ধাপ হলো বৈদ্যুতিক প্রবাহ বা Electric Current সম্পর্কে জানা। আমরা জানি, জল উঁচু জায়গা থেকে নিচু জায়গায় প্রবাহিত হয়, হাওয়া উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে বয়। ঠিক একইভাবে, পরিবাহীর (conductor) মধ্যে দিয়ে আধান বা charge-এর প্রবাহকেই বলা হয় বৈদ্যুতিক প্রবাহ।

বৈদ্যুতিক আধান (Electric Charge): এটি পদার্থের একটি মৌলিক ধর্ম। পরমাণুর মধ্যে থাকা ইলেকট্রন (ঋণাত্মক আধান) এবং প্রোটন (ধনাত্মক আধান) এই ধর্মের অধিকারী। সাধারণভাবে, পদার্থের মধ্যে ইলেকট্রনই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাচল করতে পারে। যখন কোনো পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে এই ইলেকট্রনগুলি একটি নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত হয়, তখনই আমরা বলি বিদ্যুৎ প্রবাহিত হচ্ছে। আধানের SI একক হলো কুলম্ব (Coulomb), যাকে ‘C’ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। একটি ইলেকট্রনের আধানের পরিমাণ প্রায় 1.6 x 10⁻¹⁹ C।

বৈদ্যুতিক প্রবাহ (Electric Current): কোনো পরিবাহীর যেকোনো প্রস্থচ্ছেদের মধ্যে দিয়ে একক সময়ে যে পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয়, তাকেই বৈদ্যুতিক প্রবাহ বলে। একে 'I' অক্ষর দ্বারা চিহ্নিত করা হয়।

যদি 't' সময়ে 'Q' পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয়, তাহলে প্রবাহমাত্রা (I) হবে:

I = Q / t

বৈদ্যুতিক প্রবাহের SI একক হলো অ্যাম্পিয়ার (Ampere), যা ফরাসি বিজ্ঞানী আন্দ্রে-মারি অ্যাম্পিয়ারের নামে নামকরণ করা হয়েছে। একে ‘A’ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। উপরের সূত্র অনুযায়ী, যদি কোনো পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে ১ সেকেন্ডে ১ কুলম্ব আধান প্রবাহিত হয়, তাহলে প্রবাহমাত্রাকে ১ অ্যাম্পিয়ার (1A) বলা হয়।

প্রবাহের দিক: মজার বিষয় হলো, যখন বিদ্যুৎ আবিষ্কার হয়েছিল, তখন ইলেকট্রন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল না। তাঁরা মনে করতেন, ধনাত্মক আধানের প্রবাহের কারণেই বিদ্যুৎ তৈরি হয়। তাই, প্রথাগতভাবে বিদ্যুতের প্রবাহের দিক ধরা হয় ধনাত্মক আধানের প্রবাহের দিক, অর্থাৎ ব্যাটারির পজিটিভ (+) প্রান্ত থেকে নেগেটিভ (-) প্রান্তের দিকে। কিন্তু আমরা এখন জানি যে পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে আসলে ইলেকট্রন (ঋণাত্মক আধান) প্রবাহিত হয়, যার দিক হলো ব্যাটারির নেগেটিভ (-) প্রান্ত থেকে পজিটিভ (+) প্রান্তের দিকে। তাই, ইলেকট্রনের প্রবাহের দিক এবং প্রথাগত বিদ্যুতের প্রবাহের দিক ঠিক পরস্পরের বিপরীত।

বৈদ্যুতিক বর্তনী (Electric Circuit): বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্য একটি সম্পূর্ণ এবং অবিচ্ছিন্ন পথ প্রয়োজন। এই অবিচ্ছিন্ন পথকেই বৈদ্যুতিক বর্তনী বা সার্কিট বলা হয়। একটি সাধারণ বৈদ্যুতিক বর্তনীতে কয়েকটি মূল উপাদান থাকে:

  • শক্তির উৎস (Source of Energy): যেমন একটি ব্যাটারি বা সেল, যা বিভব পার্থক্য তৈরি করে আধানকে চলতে সাহায্য করে।
  • পরিবাহী তার (Conducting Wires): যা দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, সাধারণত তামা বা অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি।
  • লোড (Load): যে যন্ত্রটি বিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহার করে কাজ করে, যেমন একটি বাল্ব, ফ্যান বা মোটর।
  • সুইচ (Switch): যা বর্তনীকে প্রয়োজন অনুযায়ী সংযুক্ত (on) বা বিচ্ছিন্ন (off) করতে সাহায্য করে।

যখন সুইচ ‘on’ করা হয়, তখন বর্তনী সম্পূর্ণ হয় এবং বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে শুরু করে, ফলে বাল্ব জ্বলে ওঠে। সুইচ ‘off’ করলে বর্তনীতে একটি ফাঁক তৈরি হয়, প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং বাল্ব নিভে যায়।

বৈদ্যুতিক বিভব এবং বিভব পার্থক্য (Electric Potential and Potential Difference)

আধান নিজে থেকেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় প্রবাহিত হয় না। যেমন একটি অনুভূমিক পাইপে জল নিজে থেকে বয় না, কিন্তু পাইপের এক প্রান্ত উঁচু করে দিলে জলের স্তরের পার্থক্যের কারণে জল প্রবাহিত হতে শুরু করে। ঠিক একইভাবে, পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে আধানকে প্রবাহিত করার জন্য একটি ‘বৈদ্যুতিক চাপ’-এর পার্থক্য প্রয়োজন। এই বৈদ্যুতিক চাপের পার্থক্যকেই বলা হয় বিভব পার্থক্য (Potential Difference)।

সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি তড়িৎক্ষেত্রের মধ্যে একক ধনাত্মক আধানকে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে নিয়ে যেতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়, তাকেই ওই দুই বিন্দুর মধ্যে বিভব পার্থক্য বলা হয়। একে 'V' অক্ষর দ্বারা চিহ্নিত করা হয়।

যদি 'Q' পরিমাণ আধানকে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে নিয়ে যেতে 'W' পরিমাণ কার্য করতে হয়, তাহলে বিভব পার্থক্য (V) হবে:

V = W / Q

বিভব পার্থক্যের SI একক হলো ভোল্ট (Volt), যা ইতালীয় বিজ্ঞানী আলেসান্দ্রো ভোল্টার নামে নামকরণ করা হয়েছে। একে ‘V’ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। উপরের সূত্র অনুযায়ী, যদি ১ কুলম্ব আধানকে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে নিয়ে যেতে ১ জুল কার্য করতে হয়, তাহলে ওই দুই বিন্দুর বিভব পার্থক্যকে ১ ভোল্ট (1V) বলা হয়।

একটি ব্যাটারি বা সেল রাসায়নিক শক্তির মাধ্যমে তার দুটি প্রান্তের মধ্যে এই বিভব পার্থক্য বজায় রাখে। যখন ব্যাটারিকে একটি বর্তনীতে যোগ করা হয়, তখন এই বিভব পার্থক্যের কারণেই ইলেকট্রনগুলি তারের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। বিভব পার্থক্য পরিমাপ করার জন্য যে যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, তাকে ভোল্টমিটার (Voltmeter) বলে। ভোল্টমিটারকে বর্তনীর দুটি বিন্দুর সঙ্গে সমান্তরালভাবে যুক্ত করতে হয়।

বর্তনী চিত্র (Circuit Diagram)

বাস্তবে একটি বৈদ্যুতিক বর্তনী আঁকা বেশ জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। তাই বিজ্ঞানীরা সহজে বর্তনী আঁকার জন্য কিছু প্রথাগত চিহ্ন ব্যবহার করেন। এই চিহ্ন ব্যবহার করে আঁকা বর্তনীর নকশাকে বর্তনী চিত্র বা সার্কিট ডায়াগ্রাম বলা হয়। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের চিহ্ন দেওয়া হলো:

  • বৈদ্যুতিক কোষ (Electric Cell): একটি লম্বা ও একটি ছোট সমান্তরাল রেখা। লম্বা রেখাটি ধনাত্মক (+) প্রান্ত এবং ছোট রেখাটি ঋণাত্মক (-) প্রান্ত বোঝায়।
  • ব্যাটারি (Battery): একাধিক কোষের সমষ্টি।
  • প্ল্যাগ চাবি বা সুইচ (বন্ধ): বন্ধনী এবং তার মধ্যে একটি বিন্দু, যা বোঝায় বর্তনী সম্পূর্ণ।
  • প্ল্যাগ চাবি বা সুইচ (খোলা): বন্ধনী কিন্তু তার মধ্যে কোনো বিন্দু নেই, যা বোঝায় বর্তনী বিচ্ছিন্ন।
  • তারের সংযোগ (A wire joint): একটি বিন্দু যেখানে দুই বা ততোধিক তার মিলিত হয়।
  • সংযোগবিহীন তার (Wires crossing without joining): একটি তার অন্যটির উপর দিয়ে একটি বাঁকানো রেখা দিয়ে দেখানো হয়।
  • বৈদ্যুতিক বাতি (Electric Bulb): একটি বৃত্তের মধ্যে ক্রস চিহ্ন বা একটি বৃত্তের মধ্যে একটি লুপ।
  • রোধক (Resistor): একটি আঁকাবাঁকা রেখা।
  • পরিবর্তনশীল রোধ বা রিওস্ট্যাট (Variable resistance or Rheostat): রোধকের চিহ্নের উপর একটি তিরচিহ্ন।
  • অ্যামিটার (Ammeter): একটি বৃত্তের মধ্যে 'A' লেখা। এটি প্রবাহমাত্রা মাপে এবং বর্তনীতে শ্রেণি সমবায়ে যুক্ত থাকে।
  • ভোল্টমিটার (Voltmeter): একটি বৃত্তের মধ্যে 'V' লেখা। এটি বিভব পার্থক্য মাপে এবং বর্তনীতে সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত থাকে।

ও'মের সূত্র (Ohm's Law)

জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী জর্জ সাইমন ও'ম একটি পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত বিদ্যুৎ এবং তার দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেন, যা ও'মের সূত্র নামে পরিচিত।

সূত্রটি হলো: যদি তাপমাত্রা এবং অন্যান্য ভৌত অবস্থা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে কোনো পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎপ্রবাহের মাত্রা (I) ওই পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্যের (V) সমানুপাতিক হয়।

অর্থাৎ, V ∝ I

বা, V = R * I

এখানে, 'R' হলো একটি ধ্রুবক, যাকে ওই পরিবাহীর রোধ (Resistance) বলা হয়। রোধ হলো পরিবাহীর একটি ধর্ম যা তার মধ্যে দিয়ে তড়িৎপ্রবাহকে বাধা দেয়। এই সূত্র থেকে আমরা রোধের সংজ্ঞা পাই: R = V / I।

রোধের SI একক হলো ও'ম (Ohm), যাকে গ্রিক অক্ষর ওমেগা (Ω) দিয়ে প্রকাশ করা হয়। ও'মের সূত্র অনুযায়ী, যদি কোনো পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য ১ ভোল্ট হয় এবং তার মধ্যে দিয়ে ১ অ্যাম্পিয়ার তড়িৎপ্রবাহ চলে, তবে ওই পরিবাহীর রোধকে ১ ও'ম (1Ω) বলা হয়।

যেসব পরিবাহী ও'মের সূত্র মেনে চলে, তাদের ও'মীয় পরিবাহী (Ohmic conductor) বলা হয়। এদের ক্ষেত্রে বিভব পার্থক্য (V) এবং প্রবাহমাত্রা (I)-এর লেখচিত্র (V-I graph) মূলবিন্দুগামী একটি সরলরেখা হয়।

যে সকল বিষয়ের উপর পরিবাহীর রোধ নির্ভর করে (Factors on which the Resistance of a Conductor Depends)

একটি পরিবাহীর রোধ শুধুমাত্র তার উপাদান দিয়েই নির্ধারিত হয় না, আরও কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। সেগুলি হলো:

  1. পরিবাহীর দৈর্ঘ্য (Length, l): পরিবাহীর রোধ তার দৈর্ঘ্যের সমানুপাতিক। অর্থাৎ, তার যত লম্বা হবে, তার রোধ তত বেশি হবে। একটি লম্বা সরু রাস্তা দিয়ে চলতে যেমন বেশি বাধা পেতে হয়, ঠিক তেমনই লম্বা তারের মধ্যে দিয়ে ইলেকট্রনকে যেতে বেশি বাধা পেতে হয়। (R ∝ l)
  2. পরিবাহীর প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল (Area of cross-section, A): পরিবাহীর রোধ তার প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফলের ব্যস্তানুপাতিক। অর্থাৎ, তার যত মোটা হবে, তার রোধ তত কম হবে। একটি চওড়া রাস্তা দিয়ে যেমন সহজে যাওয়া যায়, তেমনি মোটা তারের মধ্যে দিয়ে ইলেকট্রন সহজে প্রবাহিত হতে পারে। (R ∝ 1/A)
  3. উপাদানের প্রকৃতি (Nature of the material): বিভিন্ন পদার্থের রোধ বিভিন্ন হয়। যেমন, রুপা বিদ্যুতের সবচেয়ে ভালো পরিবাহী (এর রোধ সবচেয়ে কম), তারপর তামা এবং অ্যালুমিনিয়াম। অন্যদিকে, কাচ, রাবার বা প্লাস্টিকের মতো অন্তরক পদার্থের রোধ অনেক বেশি। এই ধর্মটিকে রোধাঙ্ক (Resistivity) দিয়ে প্রকাশ করা হয়।
  4. তাপমাত্রা (Temperature): অধিকাংশ ধাতব পরিবাহীর ক্ষেত্রে, তাপমাত্রা বাড়লে রোধও বৃদ্ধি পায়। কারণ তাপমাত্রা বাড়লে পরিবাহীর পরমাণুগুলি বেশি কম্পিত হতে থাকে, ফলে ইলেকট্রনের প্রবাহে বেশি বাধা সৃষ্টি হয়।

উপরের প্রথম দুটি সম্পর্ককে একত্রিত করে আমরা পাই:

R ∝ l/A

বা, R = ρ (l/A)

এখানে, ‘ρ’ (rho) হলো একটি সমানুপাতিক ধ্রুবক, যাকে পরিবাহীর উপাদানের রোধাঙ্ক (Resistivity) বা আপেক্ষিক রোধ বলা হয়। রোধাঙ্ক হলো কোনো পদার্থের একটি বৈশিষ্ট্যমূলক ধর্ম। এর SI একক হলো ও'ম-মিটার (Ω m)।

রোধাঙ্কের মান থেকে বোঝা যায় কোনো পদার্থ কতটা ভালো পরিবাহী বা অন্তরক। যাদের রোধাঙ্ক খুব কম (যেমন ধাতু ও সংকর ধাতু), তারা সুপরিবাহী। যাদের রোধাঙ্ক খুব বেশি (যেমন কাচ, হীরা), তারা অন্তরক।

রোধকের সংস্থা: শ্রেণি এবং সমান্তরাল সমবায় (System of Resistors: Series and Parallel Combination)

একটি বর্তনীতে প্রায়শই একাধিক রোধককে বিভিন্নভাবে যুক্ত করার প্রয়োজন হয়। এই সংযোগকে সমবায় বলা হয়। প্রধানত দুই ধরনের সমবায় দেখা যায়: শ্রেণি সমবায় এবং সমান্তরাল সমবায়।

শ্রেণি সমবায় (Series Combination)

যখন একাধিক রোধককে এমনভাবে একের পর এক যুক্ত করা হয় যাতে প্রথমটির শেষ প্রান্তের সঙ্গে দ্বিতীয়টির প্রথম প্রান্ত, দ্বিতীয়টির শেষ প্রান্তের সঙ্গে তৃতীয়টির প্রথম প্রান্ত যুক্ত থাকে এবং এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে, তখন সেই সমবায়কে শ্রেণি সমবায় বলা হয়।

বৈশিষ্ট্য:

  • বর্তনীতে মোট তড়িৎপ্রবাহ (I) প্রতিটি রোধকের মধ্যে দিয়ে সমানভাবে প্রবাহিত হয়।
  • বর্তনীতে মোট বিভব পার্থক্য (V) প্রতিটি রোধকের দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্যের যোগফলের সমান হয়। (V = V₁ + V₂ + V₃ + ... )

যদি R₁, R₂, R₃... মানের রোধকগুলিকে শ্রেণি সমবায়ে যুক্ত করা হয়, তবে তাদের তুল্য রোধ (Equivalent Resistance), Rs হবে:

Rs = R₁ + R₂ + R₃ + ...

অর্থাৎ, শ্রেণি সমবায়ে তুল্য রোধ সমবায়ে থাকা পৃথক রোধগুলির যোগফলের সমান হয়। এর ফলে বর্তনীর মোট রোধ বৃদ্ধি পায়।

অসুবিধা: এই সমবায়ে যদি একটি যন্ত্র খারাপ হয়ে যায়, তাহলে পুরো বর্তনীটিই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং কোনো যন্ত্রই কাজ করে না। যেমন, উৎসবের সময় ব্যবহৃত টুনি বাল্বের একটি বাল্ব কেটে গেলে পুরো মালাটিই জ্বলে না।

সমান্তরাল সমবায় (Parallel Combination)

যখন একাধিক রোধকের প্রতিটি রোধকের একটি প্রান্ত একটি সাধারণ বিন্দুতে এবং অপর প্রান্তগুলি অন্য একটি সাধারণ বিন্দুতে যুক্ত থাকে, তখন সেই সমবায়কে সমান্তরাল সমবায় বলা হয়।

বৈশিষ্ট্য:

  • প্রতিটি রোধকের দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্য (V) সমান হয়, যা বর্তনীর মোট বিভব পার্থক্যের সমান।
  • বর্তনীতে মোট তড়িৎপ্রবাহ (I) প্রতিটি রোধকের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হওয়া তড়িৎপ্রবাহের যোগফলের সমান হয়। (I = I₁ + I₂ + I₃ + ... )

যদি R₁, R₂, R₃... মানের রোধকগুলিকে সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত করা হয়, তবে তাদের তুল্য রোধ (Rp)-এর অনোন্যক (reciprocal) হবে:

1/Rp = 1/R₁ + 1/R₂ + 1/R₃ + ...

অর্থাৎ, সমান্তরাল সমবায়ে তুল্য রোধের অনোন্যক, সমবায়ে থাকা পৃথক রোধগুলির অনোন্যকের যোগফলের সমান হয়। এর ফলে বর্তনীর মোট রোধ হ্রাস পায় এবং এটি সমবায়ের ক্ষুদ্রতম রোধের চেয়েও কম হয়।

সুবিধা: আমাদের বাড়ির সমস্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি (লাইট, ফ্যান, টিভি) সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত থাকে। এর কারণ হলো, এই সমবায়ে প্রতিটি যন্ত্রই উৎসের সমান ভোল্টেজ (আমাদের দেশে ২২০ ভোল্ট) পায় এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। একটি যন্ত্র বন্ধ বা খারাপ হয়ে গেলেও অন্য যন্ত্রগুলির উপর কোনো প্রভাব পড়ে না।

বৈদ্যুতিক প্রবাহের তাপীয় ফল (Heating Effect of Electric Current)

যখন কোনো পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, তখন পরিবাহীটি গরম হয়ে ওঠে। একেই বৈদ্যুতিক প্রবাহের তাপীয় ফল বলা হয়। এটি কেন হয়? পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে চলার সময় ইলেকট্রনগুলি পরিবাহীর পরমাণুগুলির সঙ্গে ক্রমাগত সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই সংঘর্ষের ফলে ইলেকট্রনের গতিশক্তির কিছু অংশ তাপশক্তিতে রূপান্তরিত হয়, যা পরিবাহীকে উত্তপ্ত করে।

বিজ্ঞানী জেমস প্রেসকট জুল এই বিষয়ে একটি সূত্র প্রদান করেন, যা জুলের সূত্র (Joule's Law of Heating) নামে পরিচিত।

সূত্রটি হলো: কোনো রোধকের মধ্যে দিয়ে তড়িৎপ্রবাহের ফলে উৎপন্ন তাপ (H) তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে:

  1. প্রবাহমাত্রার (I) বর্গের সমানুপাতিক। (H ∝ I²)
  2. রোধকের রোধের (R) সমানুপাতিক। (H ∝ R)
  3. যে সময় ধরে (t) প্রবাহ চলে, তার সমানুপাতিক। (H ∝ t)

এই তিনটি বিষয়কে একত্রিত করে আমরা পাই:

H = I²Rt

এই সূত্রটি থেকে বোঝা যায়, প্রবাহমাত্রা দ্বিগুণ করলে উৎপন্ন তাপ চারগুণ হয়ে যাবে।

বাস্তব প্রয়োগ:

  • বৈদ্যুতিক হিটার, ইস্ত্রি, টোস্টার: এই যন্ত্রগুলিতে নাইক্রোম (নিকেল ও ক্রোমিয়ামের সংকর ধাতু)-এর মতো উচ্চ রোধাঙ্ক ও উচ্চ গলনাঙ্কের তার ব্যবহার করা হয়। যখন এর মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ যায়, তখন প্রচুর তাপ উৎপন্ন হয়, যা আমরা কাজে লাগাই।
  • বৈদ্যুতিক বাল্ব: বাল্বের ফিলামেন্ট টাংস্টেন ধাতু দিয়ে তৈরি, যার গলনাঙ্ক অত্যন্ত বেশি (প্রায় ৩৩৮০°C)। বিদ্যুৎ প্রবাহের ফলে এটি উত্তপ্ত হয়ে শ্বেততপ্ত হয় এবং আলো বিকিরণ করে।
  • বৈদ্যুতিক ফিউজ: এটি একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা। ফিউজ তার টিন ও সিসার সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি, যার গলনাঙ্ক কম। বর্তনীতে অতিরিক্ত প্রবাহ (ওভারলোডিং বা শর্ট সার্কিটের কারণে) হলে জুলের সূত্র অনুযায়ী ফিউজ তারটি উত্তপ্ত হয়ে গলে যায় এবং বর্তনীকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে দামি যন্ত্রপাতিগুলি সুরক্ষিত থাকে।

বৈদ্যুতিক ক্ষমতা (Electric Power)

কার্য করার হারকে ক্ষমতা বলে। একইভাবে, যে হারে বৈদ্যুতিক শক্তি অন্য শক্তিতে (যেমন তাপ, আলো, যান্ত্রিক শক্তি) রূপান্তরিত বা ব্যয়িত হয়, তাকে বৈদ্যুতিক ক্ষমতা (Electric Power) বলা হয়। একে 'P' দ্বারা চিহ্নিত করা হয়।

যদি 't' সময়ে 'W' পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যয়িত হয়, তবে ক্ষমতা:

P = W / t

আমরা জানি, W = VQ। সুতরাং, P = VQ/t। আবার, I = Q/t।

অতএব, P = V * I

ও'মের সূত্র (V = IR) ব্যবহার করে আমরা ক্ষমতার আরও দুটি রূপ পাই:

P = (IR) * I = I²R

এবং P = V * (V/R) = V²/R

বৈদ্যুতিক ক্ষমতার SI একক হলো ওয়াট (Watt), যাকে ‘W’ দিয়ে প্রকাশ করা হয়। ১ ভোল্ট বিভব পার্থক্যের মধ্যে দিয়ে ১ অ্যাম্পিয়ার তড়িৎপ্রবাহ চললে ব্যয়িত ক্ষমতাকে ১ ওয়াট বলা হয়।

ওয়াট একটি ছোট একক, তাই বড় একক হিসেবে কিলোওয়াট (kW) ব্যবহার করা হয় (1 kW = 1000 W)।

ব্যয়িত বৈদ্যুতিক শক্তি (Electrical Energy): শক্তি = ক্ষমতা × সময়। বৈদ্যুতিক শক্তির বাণিজ্যিক একক হলো কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kilowatt-hour), যা সাধারণত ‘ইউনিট’ নামে পরিচিত।

যদি ১ কিলোওয়াট ক্ষমতার কোনো যন্ত্র ১ ঘণ্টা ধরে চলে, তবে যে পরিমাণ শক্তি ব্যয় হয়, তাকে ১ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বা ১ ইউনিট বলে।

1 kWh = 1000 Watt × 3600 second = 3,600,000 Watt-second = 3.6 × 10⁶ Joule.

আমাদের বাড়িতে যে ইলেকট্রিক বিল আসে, তা এই ‘ইউনিট’-এর হিসাব অনুসারেই করা হয়।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: ও'মের সূত্রটি কী এবং এটি কখন প্রযোজ্য হয়?

উত্তর: ও'মের সূত্র অনুযায়ী, যদি তাপমাত্রা এবং অন্যান্য ভৌত অবস্থা (যেমন চাপ) অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে কোনো পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎপ্রবাহের মাত্রা (I) ওই পরিবাহীর দুই প্রান্তের বিভব পার্থক্যের (V) সমানুপাতিক হয়। গাণিতিকভাবে, V = IR, যেখানে R হলো পরিবাহীর রোধ। এই সূত্রটি শুধুমাত্র ধাতব পরিবাহীর মতো ও'মীয় পরিবাহীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং এর প্রধান শর্ত হলো তাপমাত্রা স্থির থাকতে হবে। তাপমাত্রা পরিবর্তিত হলে রোধের মানও পরিবর্তিত হয়, তখন এই সূত্রটি সঠিকভাবে কাজ করে না।

প্রশ্ন ২: বাড়ির বৈদ্যুতিক বর্তনীতে যন্ত্রপাতিগুলো শ্রেণি সমবায়ের পরিবর্তে সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত করা হয় কেন?

উত্তর: বাড়ির যন্ত্রপাতি সমান্তরাল সমবায়ে যুক্ত করার বেশ কিছু কারণ আছে:

  • সমান ভোল্টেজ: সমান্তরাল সমবায়ে প্রতিটি যন্ত্র লাইনের সমান ভোল্টেজ (যেমন ২২০ ভোল্ট) পায়, যা তাদের সঠিকভাবে কাজ করার জন্য জরুরি। শ্রেণি সমবায়ে ভোল্টেজ ভাগ হয়ে যায়, ফলে কোনো যন্ত্রই সঠিক ভোল্টেজ পায় না।
  • স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ: সমান্তরাল সমবায়ে প্রতিটি যন্ত্রের জন্য আলাদা সুইচ থাকে। তাই একটি যন্ত্রকে চালু বা বন্ধ করলে অন্য যন্ত্রগুলির উপর কোনো প্রভাব পড়ে না। শ্রেণি সমবায়ে একটি সুইচ দিয়ে সব যন্ত্র নিয়ন্ত্রিত হয়।
  • নির্ভরযোগ্যতা: যদি একটি যন্ত্র খারাপ হয়ে যায় বা ফিউজ হয়ে যায়, সমান্তরাল সমবায়ের বাকি যন্ত্রগুলি কাজ করতে থাকে। কিন্তু শ্রেণি সমবায়ে একটি যন্ত্র খারাপ হলে পুরো বর্তনীটিই অকেজো হয়ে পড়ে।
  • কম তুল্য রোধ: সমান্তরাল সমবায়ে বর্তনীর মোট রোধ কমে যায়, ফলে উৎস থেকে বেশি তড়িৎপ্রবাহ টানা সম্ভব হয়।

প্রশ্ন ৩: বৈদ্যুতিক ফিউজ কী এবং এটি কীভাবে কাজ করে?

উত্তর: বৈদ্যুতিক ফিউজ হলো একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা যা বৈদ্যুতিক বর্তনী এবং যন্ত্রপাতিকে অতিরিক্ত তড়িৎপ্রবাহের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। এটি সাধারণত সিসা এবং টিনের একটি সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি একটি ছোট তার, যার গলনাঙ্ক খুব কম এবং রোধ তুলনামূলকভাবে বেশি। ফিউজকে সর্বদা বর্তনীর সঙ্গে শ্রেণি সমবায়ে লাইভ তারে (live wire) যুক্ত করা হয়। যখন কোনো কারণে (যেমন শর্ট সার্কিট বা ওভারলোডিং) বর্তনীতে নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি তড়িৎপ্রবাহ শুরু হয়, তখন জুলের তাপীয় ফল (H = I²Rt) অনুযায়ী ফিউজ তারটি খুব দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে গলে যায়। এর ফলে বর্তনীটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং তড়িৎপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, যা আগুন লাগা বা যন্ত্রপাতির ক্ষতি হওয়া থেকে রক্ষা করে।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায় থেকে আমরা বিদ্যুৎ সম্পর্কে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি শিখলাম, তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক:

  • বৈদ্যুতিক প্রবাহ হলো পরিবাহীর মধ্যে দিয়ে আধান প্রবাহের হার (I = Q/t), যার SI একক অ্যাম্পিয়ার (A)।
  • বিভব পার্থক্য (V) হলো একক আধানকে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে সরাতে কৃতকার্য (V = W/Q), যার SI একক ভোল্ট (V)।
  • ও'মের সূত্র অনুযায়ী, স্থির তাপমাত্রায় V = IR, যেখানে R হলো পরিবাহীর রোধ, যার SI একক ও'ম (Ω)।
  • পরিবাহীর রোধ তার দৈর্ঘ্য (l), প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল (A), উপাদান (রোধাঙ্ক ρ) এবং তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে। সূত্রটি হলো R = ρ(l/A)।
  • শ্রেণি সমবায়ে তুল্য রোধ (Rs) পৃথক রোধগুলির যোগফলের সমান: Rs = R₁ + R₂ + ...
  • সমান্তরাল সমবায়ে তুল্য রোধের (Rp) অনোন্যক, পৃথক রোধগুলির অনোন্যকের যোগফলের সমান: 1/Rp = 1/R₁ + 1/R₂ + ...
  • বৈদ্যুতিক প্রবাহের তাপীয় ফল জুলের সূত্র দ্বারা নির্ধারিত হয়: H = I²Rt। এর বাস্তব প্রয়োগ হলো হিটার, ইস্ত্রি, বাল্ব এবং ফিউজ।
  • বৈদ্যুতিক ক্ষমতা (P) হলো শক্তি ব্যয়ের হার। P = VI = I²R = V²/R। এর SI একক ওয়াট (W)।
  • বৈদ্যুতিক শক্তির বাণিজ্যিক একক হলো কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kWh) বা ইউনিট। 1 kWh = 3.6 × 10⁶ জুল।