বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের চারপাশের জগত অসংখ্য বিভিন্ন প্রকারের পদার্থ দিয়ে গঠিত। এই পদার্থগুলি মূলত কিছু মৌলিক উপাদান বা মৌল (Elements) দিয়ে তৈরি। রসায়নের জগতে এই মৌলগুলিকে তাদের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মের ওপর ভিত্তি করে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে— ধাতু (Metals) এবং অধাতু (Non-metals)। লোহা, তামা, সোনা, রুপো থেকে শুরু করে অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন পর্যন্ত আমরা যা কিছু দেখি, তার সবই এই দুই ভাগের কোনো না কোনোটির অন্তর্ভুক্ত।
অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞানের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি শিক্ষার্থীদের শেখায় কেন কিছু পদার্থ শক্ত এবং উজ্জ্বল হয়, আবার কিছু পদার্থ কেন ভঙ্গুর ও অনুজ্জ্বল হয়। কেন রান্নার কড়াই ধাতুর তৈরি হয় কিন্তু তার হাতল প্লাস্টিক বা কাঠের হয়? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ধাতু ও অধাতুর বৈশিষ্ট্যের মধ্যে। এই ব্লগ পোস্টে আমরা NCERT পাঠ্যসূচি অনুযায়ী এই বিষয়ের প্রতিটি খুঁটিনাটি সহজভাবে আলোচনা করব।
ধাতু ও অধাতুর ভৌত ধর্ম (Physical Properties)
কোনো পদার্থের বাইরের অবস্থা দেখে আমরা যখন তার শ্রেণিবিভাগ করি, তাকেই ভৌত ধর্ম বলা হয়। ধাতু ও অধাতুর ভৌত ধর্মের প্রধান পার্থক্যগুলি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. উজ্জ্বলতা (Lustre)
ধাতু সাধারণত চকচকে এবং উজ্জ্বল হয়। একে ধাতব উজ্জ্বলতা বলা হয়। যেমন— সোনা বা রুপো। অন্যদিকে, অধাতু সাধারণত অনুজ্জ্বল হয় এবং তাদের কোনো নিজস্ব ঔজ্জ্বল্য নেই (ব্যতিক্রম: আয়োডিন ও গ্রাফাইট)।
২. কঠিনতা (Hardness)
বেশিরভাগ ধাতু বেশ শক্ত হয়। তবে সোডিয়াম এবং পটাশিয়ামের মতো কিছু ধাতু এতটাই নরম যে তাদের সাধারণ ছুরি দিয়ে কাটা যায়। অধাতু সাধারণত নরম হয়, কিন্তু হীরা (কার্বনের একটি রূপ) হলো পৃথিবীর কঠিনতম প্রাকৃতিক পদার্থ।
৩. আঘাতসহিষ্ণুতা (Malleability)
ধাতুকে পিটিয়ে পাতলা চাদরে পরিণত করা যায়। এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় আঘাতসহিষ্ণুতা। অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল বা সোনার পাত এর বড় উদাহরণ। অধাতুর ক্ষেত্রে এই গুণটি নেই; এদের পিটলে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায় (যাকে ভঙ্গুরতা বা Brittleness বলা হয়)।
৪. নমনীয়তা (Ductility)
ধাতুকে টেনে সরু তারে পরিণত করা যায়। এই ক্ষমতাকে নমনীয়তা বলে। আমাদের বৈদ্যুতিক তারে যে তামা বা অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করা হয়, তা এই ধর্মের জন্যই সম্ভব। অধাতুগুলি নমনীয় নয়।
৫. পরিবাহিতা (Conductivity)
ধাতু তাপ ও বিদ্যুতের সুপরিবাহী। রুপো হলো বিদ্যুতের শ্রেষ্ঠ পরিবাহী। অধাতুগুলি সাধারণত তাপ ও বিদ্যুতের কুপরিবাহী (ব্যতিক্রম: গ্রাফাইট, যা বিদ্যুত পরিবহন করতে পারে)।
৬. নাদগুণ (Sonority)
ধাতুর ওপর শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করলে একটি ঝনঝন শব্দ তৈরি হয়। একে নাদগুণ বা Sonorous ধর্ম বলা হয়। এই কারণেই স্কুলের ঘণ্টা বা মন্দিরের ঘণ্টা ধাতুর তৈরি হয়। অধাতু এই ধরনের শব্দ উৎপন্ন করে না।
ধাতু ও অধাতুর রাসায়নিক ধর্ম (Chemical Properties)
ধাতু ও অধাতু বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের সাথে কীভাবে বিক্রিয়া করে, তা জানা অত্যন্ত জরুরি।
১. অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া
ধাতু অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে ধাতব অক্সাইড তৈরি করে, যা সাধারণত ক্ষারীয় (Basic) প্রকৃতির হয়।
উদাহরণ: 2Mg + O2 → 2MgO (ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড)।
লোহার মরিচা ধরাও একটি অক্সিডেশন প্রক্রিয়া। লোহার ওপর যে লালচে আস্তরণ পড়ে তা হলো আয়রন অক্সাইড।
অধাতু অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে অধাতব অক্সাইড তৈরি করে, যা মূলত আম্লিক (Acidic) প্রকৃতির। যেমন— সালফার অক্সিজেনে পুড়ে সালফার ডাইঅক্সাইড তৈরি করে, যা জলের সাথে মিশে সালফিউরাস অ্যাসিড উৎপন্ন করে।
২. জলের সাথে বিক্রিয়া
অনেক ধাতু জলের সাথে তীব্রভাবে বিক্রিয়া করে। সোডিয়াম অত্যন্ত সক্রিয় ধাতু, এটি বাতাসের অক্সিজেন ও জলের সাথে দ্রুত বিক্রিয়া করে প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। তাই সোডিয়ামকে কেরোসিনে ডুবিয়ে রাখা হয়। অধাতু সাধারণত জলের সাথে বিক্রিয়া করে না, তাই ফসফরাসের মতো অতি সক্রিয় অধাতুকে জলে ডুবিয়ে রাখা হয় যাতে তা বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে না আসে।
৩. অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া
ধাতু অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া করে লবণের সাথে হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপন্ন করে। এই হাইড্রোজেন গ্যাস 'পপ' (Pop) শব্দ সহ জ্বলে ওঠে। অধাতু সাধারণত লঘু অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া করে না।
প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া (Displacement Reaction)
এটি একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় রাসায়নিক প্রক্রিয়া। যখন একটি অধিক সক্রিয় ধাতু একটি কম সক্রিয় ধাতুকে তার লবণের দ্রবণ থেকে সরিয়ে নিজে সেই স্থান দখল করে, তখন তাকে প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া বলে।
উদাহরণ: কপার সালফেট (নীল) দ্রবণে আয়রন বা লোহা দিলে লোহার উপরিভাগে তামার আস্তরণ পড়ে এবং দ্রবণটি হালকা সবুজ হয়ে যায়।
CuSO4 + Fe → FeSO4 + Cu
ধাতু ও অধাতুর ব্যবহার
- ধাতুর ব্যবহার: কলকারখানা, গাড়ি, বিমান, ট্রেনের ইঞ্জিন, রান্নার সরঞ্জাম এবং বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি তৈরিতে ধাতুর বিকল্প নেই। অলঙ্কার তৈরিতে সোনা ও প্ল্যাটিনাম ব্যবহৃত হয়।
- অধাতুর ব্যবহার: অক্সিজেন আমাদের শ্বাসকার্যের জন্য অপরিহার্য। নাইট্রোজেন ও ফসফরাস উদ্ভিদের সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ক্লোরিন জল পরিশুদ্ধ করতে ব্যবহৃত হয়। আয়োডিন অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে ক্ষতস্থানে ব্যবহার করা হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: সোডিয়াম ও পটাশিয়ামকে কেন কেরোসিনে ডুবিয়ে রাখা হয়?
উত্তর: সোডিয়াম এবং পটাশিয়াম অত্যন্ত সক্রিয় ধাতু। এগুলি বাতাসের অক্সিজেন এবং জলীয় বাষ্পের সংস্পর্শে এলে প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন করে এবং জ্বলে ওঠে। দুর্ঘটনা এড়াতে এদের কেরোসিনে সংরক্ষণ করা হয়।
প্রশ্ন ২: অধাতু হওয়া সত্ত্বেও গ্রাফাইট কেন ইলেকট্রনিক্সে ব্যবহৃত হয়?
উত্তর: গ্রাফাইট কার্বনের একটি রূপান্তর। সাধারণ অধাতু বিদ্যুৎ পরিবহন না করলেও গ্রাফাইটের বিশেষ আণবিক গঠনের কারণে এটি বিদ্যুতের সুপরিবাহী। তাই এটি পেন্সিলের সিস এবং ব্যাটারির ইলেকট্রোড হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
প্রশ্ন ৩: আঘাতসহিষ্ণুতা (Malleability) বলতে কী বোঝো?
উত্তর: যে ধর্মের কারণে ধাতুকে পিটিয়ে পাতলা চাদরে পরিণত করা যায়, তাকে আঘাতসহিষ্ণুতা বলে। অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল এই ধর্মের একটি সার্থক উদাহরণ।
সারসংক্ষেপ
- ধাতু সাধারণত উজ্জ্বল, নমনীয় এবং সুপরিবাহী হয়।
- অধাতু ভঙ্গুর এবং তাপ ও বিদ্যুতের কুপরিবাহী।
- ধাতব অক্সাইড ক্ষারীয় এবং অধাতব অক্সাইড আম্লিক হয়।
- অধিক সক্রিয় ধাতু কম সক্রিয় ধাতুকে প্রতিস্থাপন করতে পারে।
- আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও শিল্পায়নে উভয় প্রকার পদার্থের গুরুত্ব অপরিসীম।