বিষয়ের ভূমিকা

ভারত একটি বিশাল এবং বৈচিত্র্যময় দেশ। আমরা যদি ভারতের মানচিত্রের দিকে তাকাই, তবে দেখব এর ভূপ্রকৃতি কোথাও অনেক উঁচু পাহাড়, কোথাও বিস্তীর্ণ সমভূমি, আবার কোথাও রুক্ষ মরুভূমি। ভূগোলের ভাষায় ভারতের এই বাহ্যিক রূপকেই বলা হয় 'প্রাকৃতিক বিভাগ'। নবম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা শিখব যে, ভারত কীভাবে বর্তমান অবস্থায় এসেছে এবং এর প্রধান প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো কী কী। টেকটোনিক পাতের গতিবিধি এবং কোটি কোটি বছরের ভৌগোলিক পরিবর্তনের ফলে আজকের এই রূপ গড়ে উঠেছে। এই অধ্যায়টি কেবল পরীক্ষার জন্য নয়, বরং আমাদের মাতৃভূমির ভৌগোলিক গুরুত্ব বোঝার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

ভারতের মূল ভূখণ্ডকে প্রধানত ছয়টি প্রাকৃতিক বিভাগে ভাগ করা যায়। প্রতিটি বিভাগের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব রয়েছে। নিচে এগুলোর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. হিমালয় পর্বতমালা (The Himalayan Mountains)

হিমালয় পৃথিবীর নবীনতম ভঙ্গিল পর্বত। এটি ভারতের উত্তর সীমান্ত বরাবর একটি ধনুকের মতো আকৃতিতে পশ্চিমে সিন্ধু নদ থেকে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত বিস্তৃত।

  • হিমালয়ের সমান্তরাল পর্বতশ্রেণি: হিমালয়কে উত্তর থেকে দক্ষিণে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
  • হিমাদ্রি (Great Himalayas): এটি হিমালয়ের উত্তরতম এবং উচ্চতম অংশ। এর গড় উচ্চতা প্রায় ৬০০০ মিটার। পৃথিবীর বিখ্যাত শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট ও কাঞ্চনজঙ্ঘা এখানেই অবস্থিত।
  • হিমাচল (Lesser Himalayas): হিমাদ্রির দক্ষিণে অবস্থিত এই অংশটি অত্যন্ত বন্ধুর। এখানকার গড় উচ্চতা ৩৭০০ থেকে ৪৫০০ মিটারের মধ্যে। জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র যেমন—শিমলা, কুলু, মানালি এই অঞ্চলে অবস্থিত।
  • শিবালিক (Outer Himalayas): এটি হিমালয়ের দক্ষিণতম প্রান্ত। এর গড় উচ্চতা ৯০০ থেকে ১১০০ মিটার। পলিমাটি ও পাথর দ্বারা গঠিত এই অঞ্চলে 'দুন' উপত্যকা (যেমন—দেরাদুন) দেখা যায়।

২. উত্তর ভারতের সমভূমি অঞ্চল (The Northern Plains)

সিন্ধু, গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র—এই তিনটি প্রধান নদী এবং তাদের উপনদীগুলোর পলি জমে এই সমভূমি গঠিত হয়েছে। এটি বিশ্বের অন্যতম উর্বর সমভূমি অঞ্চল।

  • বিভাগসমূহ: নদীপ্রবাহ এবং পলির প্রকৃতি অনুযায়ী একে ভবর (Bhabar), তরাই (Terai), ভাঙ্গর (Bhangar) এবং খাদর (Khadar)-এ ভাগ করা হয়।
  • খাদর বনাম ভাঙ্গর: প্রাচীন পলি দ্বারা গঠিত উঁচু জমিকে 'ভাঙ্গর' বলে, অন্যদিকে নদীর প্লাবনভূমিতে নতুন পলি দ্বারা গঠিত উর্বর জমিকে 'খাদর' বলে। চাষবাসের জন্য খাদর অত্যন্ত উপযোগী।

৩. উপদ্বীপীয় মালভূমি (The Peninsular Plateau)

এটি ভারতের প্রাচীনতম ভূখণ্ড। এটি আগ্নেয় শিলা এবং রূপান্তরিত শিলা দ্বারা গঠিত। এটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত:

  • মধ্য ভারত উচ্চভূমি (Central Highlands): নর্মদা নদীর উত্তরে বিন্ধ্য পর্বত এবং আরাবল্লী পর্বতের মধ্যবর্তী অংশ।
  • দাক্ষিণাত্য মালভূমি (Deccan Plateau): নর্মদা নদীর দক্ষিণে অবস্থিত ত্রিভুজাকৃতি মালভূমি। এটি পশ্চিম দিকে উঁচু এবং পূর্ব দিকে ঢালু। এই অঞ্চলের কালো মাটি (Black Soil) তুলা চাষের জন্য বিখ্যাত।

৪. ভারতীয় মরুভূমি (The Indian Desert)

রাজস্থানের আরাবল্লী পর্বতের পশ্চিম দিকে থর মরুভূমি অবস্থিত। এটি বালিয়াড়ি এবং বালুকাময় সমভূমি দ্বারা গঠিত। এখানে বৃষ্টিপাত অত্যন্ত কম (বছরে ১৫০ মিলিমিটারের কম) এবং লুনি হলো এই অঞ্চলের একমাত্র বড় নদী।

৫. উপকূলীয় সমভূমি (The Coastal Plains)

উপদ্বীপীয় মালভূমির দুই পাশে সংকীর্ণ উপকূলীয় সমভূমি রয়েছে।

  • পশ্চিম উপকূল: আরব সাগরের তীরে অবস্থিত। এর উত্তর অংশকে কঙ্কন, মধ্যভাগকে কানাড়া এবং দক্ষিণ ভাগকে মালাবার উপকূল বলে।
  • পূর্ব উপকূল: বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত। এর উত্তর অংশকে উত্তর সরকার এবং দক্ষিণ অংশকে করমন্ডল উপকূল বলে।

৬. দ্বীপপুঞ্জ (The Islands)

ভারতের দুটি প্রধান দ্বীপপুঞ্জ রয়েছে:

  • লাক্ষাদ্বীপ: আরব সাগরে অবস্থিত প্রবাল দ্বারা গঠিত দ্বীপপুঞ্জ। এর প্রশাসনিক কেন্দ্র হলো কাভারাট্টি।
  • আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ: বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জ আকারে বড় এবং সংখ্যায় অনেক। ভারতের একমাত্র সক্রিয় আগ্নেয়গিরি 'ব্যারেন দ্বীপ' এখানেই অবস্থিত।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: টেকটোনিক পাতের গতিবিধি বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: পৃথিবীর উপরিভাগ কতগুলো বড় বড় অংশে বিভক্ত, যাদের টেকটোনিক পাত বলে। ভূ-অভ্যন্তরের তাপের কারণে এই পাতগুলো ধীরগতিতে নড়াচড়া করে। এদের সংঘর্ষ বা প্রসারণের ফলেই হিমালয়ের মতো পর্বত বা আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হয়।

প্রশ্ন ২: ভাঙ্গর এবং খাদর-এর মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: ভাঙ্গর হলো নদীর প্লাবন সমভূমির ওপরের দিকের প্রাচীন পলিমাটি যুক্ত এলাকা, যা তুলনামূলক কম উর্বর। অন্যদিকে, খাদর হলো নদীর তীরবর্তী নতুন পলি দ্বারা গঠিত নিচু এলাকা, যা প্রতি বছর বন্যার পলি পেয়ে অত্যন্ত উর্বর থাকে।

প্রশ্ন ৩: ভারতের জলবায়ুতে হিমালয়ের প্রভাব কী?
উত্তর: হিমালয় পর্বতমালা মধ্য এশিয়া থেকে আসা অতি শীতল বাতাসকে ভারতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়, ফলে ভারত প্রচণ্ড শীতের হাত থেকে রক্ষা পায়। আবার দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুকে বাধা দিয়ে ভারতের সমভূমি অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।

সারসংক্ষেপ

  • ভারত একটি ভূতাত্ত্বিকভাবে বৈচিত্র্যময় দেশ।
  • উত্তরে হিমালয় পর্বতমালা একটি শক্তিশালী প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
  • গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র সমভূমি ভারতের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত।
  • দাক্ষিণাত্য মালভূমি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ।
  • উপকূলীয় সমভূমি এবং দ্বীপপুঞ্জ ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্যে সাহায্য করে।
  • প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যই ভারতকে এক অনন্য ভৌগোলিক রূপ দান করেছে।