বিষয়ের ভূমিকা

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিদ্যুতের ব্যবহার অপরিসীম। আমরা জানি যে তড়িৎ প্রবাহ তাপ উৎপন্ন করতে পারে, যাকে তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল বলা হয়। কিন্তু আপনি কি জানেন যে তড়িৎ প্রবাহ চুম্বকত্বও সৃষ্টি করতে পারে? ১৮২০ সালে বিজ্ঞানী হাঁস ক্রিস্টিয়ান ওরস্টেড (Hans Christian Oersted) প্রথম আবিষ্কার করেন যে কোনো পরিবাহী তারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে তার চারপাশে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়। NCERT দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিষয়ের এই অধ্যায়টিতে আমরা তড়িৎ প্রবাহের চৌম্বক প্রভাব, চৌম্বক বলরেখা, সোলেনয়েড, ফ্লেমিংয়ের নিয়মাবলী এবং গার্হস্থ্য তড়িৎ বর্তনী সম্পর্কে বিষদ আলোচনা করব।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. ওরস্টেডের পরীক্ষা এবং চৌম্বক ক্ষেত্র

একটি সোজা তামার তারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ চালনা করে তার কাছে একটি কম্পাস শলাকা (magnetic compass) রাখলে দেখা যায় যে শলাকাটি বিক্ষিপ্ত হচ্ছে। তড়িৎ প্রবাহ বন্ধ করে দিলে শলাকাটি আবার তার পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে তড়িৎবাহী পরিবাহীর চারপাশে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র (Magnetic Field) সৃষ্টি হয়। চৌম্বক ক্ষেত্র হলো এমন একটি অঞ্চল যেখানে কোনো চুম্বক বা চৌম্বক পদার্থ বল অনুভব করে। এটি একটি ভেক্টর রাশি, অর্থাৎ এর মান এবং দিক উভয়ই রয়েছে।

২. চৌম্বক বলরেখা (Magnetic Field Lines)

কোনো চুম্বকের চারপাশে চৌম্বক ক্ষেত্রের রূপদর্শনের জন্য কাল্পনিক রেখা ব্যবহার করা হয়, যাকে চৌম্বক বলরেখা বলে। একটি দণ্ড চুম্বকের (Bar Magnet) চারপাশে লোহার গুঁড়ো ছড়িয়ে দিলে তারা একটি নির্দিষ্ট নকশায় সজ্জিত হয়।

  • চৌম্বক বলরেখার বৈশিষ্ট্য:
  • বলরেখাগুলি উত্তর মেরু (North Pole) থেকে নির্গত হয় এবং দক্ষিণ মেরুতে (South Pole) গিয়ে শেষ হয় (চুম্বকের বাইরে)। কিন্তু চুম্বকের ভেতরে এদের দিক হয় দক্ষিণ থেকে উত্তরে।
  • চৌম্বক বলরেখাগুলি বন্ধ লুপ বা আবদ্ধ বক্ররেখা তৈরি করে।
  • চৌম্বক ক্ষেত্রের তীব্রতা যেখানে বেশি, সেখানে বলরেখাগুলি ঘনসন্নিবিষ্ট থাকে।
  • দুটি চৌম্বক বলরেখা কখনোই একে অপরকে ছেদ করে না, কারণ ছেদবিন্দুতে কম্পাস শলাকা দুটি ভিন্ন দিক নির্দেশ করতে পারে না।

৩. সোজা তড়িৎবাহী পরিবাহীর জন্য চৌম্বক ক্ষেত্র ও ম্যাক্সওয়েলের দক্ষিণ হস্ত মুষ্টি নিয়ম

একটি সোজা তারের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে সৃষ্ট চৌম্বক বলরেখাগুলি সমকেন্দ্রিক বৃত্তের (concentric circles) মতো হয়। তড়িৎ প্রবাহের পরিমাণ বাড়ালে চৌম্বক ক্ষেত্রের তীব্রতা বৃদ্ধি পায় এবং পরিবাহী থেকে দূরত্ব বাড়লে ক্ষেত্রটির তীব্রতা হ্রাস পায়।

ডান হাতের বুড়ো আঙুলের নিয়ম (Right-Hand Thumb Rule): আপনি যদি আপনার ডান হাতে একটি তড়িৎবাহী পরিবাহী এমনভাবে ধরেন যাতে বৃদ্ধাঙ্গুলি তড়িৎ প্রবাহের দিক নির্দেশ করে, তবে অন্য আঙুলগুলি পরিবাহীকে যে দিকে পেঁচিয়ে থাকবে, তা-ই হবে চৌম্বক বলরেখার দিক।

৪. সোলেয়নয়েড (Solenoid) এবং তড়িৎচুম্বক (Electromagnet)

ইনসুলেটেড বা অন্তরিত তামার তারকে ঘন করে পেঁচিয়ে চঙের আকার দিলে তাকে সোলেনয়েড বলা হয়। সোলেনয়েডের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে এটি একটি দণ্ড চুম্বকের মতো আচরণ করে। সোলেনয়েডের অভ্যন্তরে চৌম্বক ক্ষেত্র সমরূপ (uniform) হয়।

সোলেনয়েডের ভেতরে কাঁচা লোহা (Soft Iron) প্রবেশ করালে তার চুম্বকত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এই ব্যবস্থাটিকে তড়িৎচুম্বক (Electromagnet) বলে। সাধারণ চুম্বকের মতো এটি স্থায়ী নয়; বিদ্যুৎ প্রবাহ বন্ধ করলেই এর চুম্বকত্ব নষ্ট হয়ে যায়।

৫. চৌম্বক ক্ষেত্রে তড়িৎবাহী পরিবাহীর ওপর বল এবং ফ্লেমিংয়ের বাম হস্ত নিয়ম

ফরাসি বিজ্ঞানী অঁদ্রে মারি অ্যাম্পিয়ার প্রস্তাব করেন যে, চুম্বক যদি তড়িৎবাহী পরিবাহীর ওপর বল প্রয়োগ করে, তবে পরিবাহীটিও চুম্বকের ওপর সমান ও বিপরীত বল প্রয়োগ করবে।

ফ্লেমিংয়ের বাম হস্ত নিয়ম (Fleming's Left-Hand Rule): বাম হাতের তর্জনী, মধ্যমা এবং বৃদ্ধাঙ্গুলিকে পরস্পরের সাথে সমকোণে প্রসারিত করলে — যদি তর্জনী চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক এবং মধ্যমা তড়িৎ প্রবাহের দিক নির্দেশ করে, তবে বৃদ্ধাঙ্গুলি পরিবাহীর গতির দিক বা বলের দিক নির্দেশ করবে। এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই বৈদ্যুতিক মোটর (Electric Motor) কাজ করে।

৬. তড়িৎ চুম্বকীয় আবেশ (Electromagnetic Induction)

১৮৩১ সালে মাইকেল ফ্যারাডে আবিষ্কার করেন যে, কোনো গতিশীল চৌম্বক ক্ষেত্রের সাহায্যে বন্ধ বর্তনীতে বিদ্যুৎপ্রবাহ সৃষ্টি করা যায়। এই ঘটনাকে তড়িৎ চুম্বকীয় আবেশ বলা হয়। উৎপন্ন বিদ্যুৎকে আবিষ্ট তড়িৎ (Induced Current) বলে।

ফ্লেমিংয়ের ডান হস্ত নিয়ম (Fleming's Right-Hand Rule): ডান হাতের তর্জনী, মধ্যমা ও বৃদ্ধাঙ্গুলিকে সমকোণে রাখলে, তর্জনী চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি পরিবাহীর গতির দিক নির্দেশ করলে, মধ্যমা আবিষ্ট তড়িৎ প্রবাহের দিক নির্দেশ করবে।

৭. গার্হস্থ্য তড়িৎ বর্তনী (Domestic Electric Circuits)

আমাদের বাড়িতে যে মূল বিদ্যুৎ সরবরাহ (Mains) আসে, তাতে দুটি প্রধান তার থাকে: লাইভ তার (Live Wire) যা লাল রঙের এবং নিউট্রাল তার (Neutral Wire) যা কালো রঙের। এদের মধ্যে বিভব পার্থক্য সাধারণত ২২০ ভোল্ট হয়। এছাড়া সুরক্ষার জন্য সবুজ রঙের আর্থিং তার (Earth Wire) থাকে।

  • শর্ট সার্কিট (Short Circuit): লাইভ তার ও নিউট্রাল তার কোনোভাবে সরাসরি সংস্পর্শে এলে রোধ শূন্য হয়ে পড়ে এবং প্রচুর বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, একে শর্ট সার্কিট বলে।
  • ওভারলোডিং (Overloading): একটি নির্দিষ্ট সকেটে ক্ষমতার চেয়ে বেশি ক্ষমতার সরঞ্জাম যুক্ত করলে অতিরিক্ত তড়িৎ প্রবাহের ফলে তার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, একে ওভারলোডিং বলে।
  • ফিউজ (Fuse): এটি একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা যা কম গলনাঙ্কের তার দিয়ে তৈরি। অত্যধিক তড়িৎ প্রবাহ হলে এটি গলে গিয়ে বর্তনী ছিন্ন করে দুর্ঘটনা রোধ করে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: দুটি চৌম্বক বলরেখা কেন একে অপরকে ছেদ করতে পারে না?
উত্তর: যদি দুটি বলরেখা একে অপরকে ছেদ করে, তবে ছেদবিন্দুতে দুটি স্পর্শক টানা সম্ভব হবে। এর অর্থ হলো ওই বিন্দুতে চৌম্বক ক্ষেত্রের দুটি দিক থাকবে, যা বাস্তবিকভাবে অসম্ভব। তাই বলরেখাগুলি কখনোই ছেদ করে না।

প্রশ্ন ২: তড়িৎচুম্বকের শক্তি কিভাবে বৃদ্ধি করা যায়?
উত্তর: তড়িৎচুম্বকের শক্তি প্রধানত তিনটি উপায়ে বৃদ্ধি করা যায় — (১) সোলেনয়েডের পাকসংখ্যা (number of turns) বাড়িয়ে, (২) তড়িৎ প্রবাহের পরিমাণ বাড়িয়ে, এবং (৩) সোলেনয়েডের মজ্জা হিসেবে নরম কাঁচা লোহা ব্যবহার করে।

প্রশ্ন ৩: ফ্লেমিংয়ের বাম হস্ত নিয়মটি কিসের জন্য ব্যবহৃত হয়?
উত্তর: কোনো চৌম্বক ক্ষেত্রে অবস্থিত তড়িৎবাহী পরিবাহীর ওপর প্রযুক্ত বলের দিক বা পরিবাহীর গতিপথের দিক নির্ণয় করতে ফ্লেমিংয়ের বাম হস্ত নিয়ম ব্যবহৃত হয়।

সারসংক্ষেপ

  • তড়িৎ প্রবাহের ফলে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়, যা ওরস্টেডের পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত।
  • চৌম্বক বলরেখা উত্তর মেরু থেকে বের হয়ে দক্ষিণ মেরুতে প্রবেশ করে এবং কখনোই ছেদ করে না।
  • ডান হাতের বুড়ো আঙুলের নিয়মের মাধ্যমে সোজা পরিবাহীতে চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক জানা যায়।
  • সোলেনয়েড হলো পেঁচানো অন্তরিত তারের কুণ্ডলী যা দণ্ড চুম্বকের মতো কাজ করে।
  • ফ্লেমিংয়ের বাম হস্ত নিয়ম মোটরের কাজের নীতি বুঝতে এবং ডান হস্ত নিয়ম তড়িৎ চুম্বকীয় আবেশ বুঝতে সাহায্য করে।
  • বাড়িতে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফিউজ এবং আর্থিং তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।