বিষয়ের ভূমিকা

ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল। সমাজ, রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের জোয়ার এসেছিল ইউরোপ জুড়ে। তবে এই পরিবর্তন কীভাবে হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ ছিল। নবম শ্রেণির ইতিহাসের এই দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে ইউরোপে সমাজতন্ত্রের (Socialism) প্রসার ঘটল এবং কীভাবে ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব পুরো বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিল। এই অধ্যায়টি কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, বরং এটি সমসাময়িক রাজনীতির মূল ভিত্তি বোঝার একটি দুর্দান্ত মাধ্যম।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. সামাজিক পরিবর্তনের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি: উদারপন্থী, আমূল পরিবর্তনকামী এবং রক্ষণশীল

ফরাসি বিপ্লবের পর ইউরোপীয় সমাজ তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল:

  • উদারপন্থী (Liberals): এরা এমন এক সমাজ চেয়েছিলেন যেখানে সকল ধর্ম সমান মর্যাদা পাবে। তারা রাজবংশীয় শাসকদের অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার বিরোধী ছিলেন এবং সংসদীয় সরকারের পক্ষে ছিলেন। তবে তারা সম্পূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক ছিলেন না, কারণ তারা বিশ্বাস করতেন যে কেবল সম্পদশালী পুরুষদেরই ভোট দেওয়ার অধিকার থাকা উচিত।
  • আমূল পরিবর্তনকামী (Radicals): এরা চেয়েছিলেন দেশের সরকার এমন হোক যা জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে গঠিত হবে। তারা বড় জমিদার বা শিল্পপতিদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধার বিরোধী ছিলেন এবং নারীদের ভোটাধিকারের পক্ষে আন্দোলন করতেন।
  • রক্ষণশীল (Conservatives): ১৮শ শতাব্দীতে এরা পরিবর্তনের বিরোধী থাকলেও ফরাসি বিপ্লবের পর বুঝতে পারেন যে পরিবর্তন অনিবার্য। তবে তারা মনে করতেন যে পরিবর্তন ধীরগতিতে হওয়া উচিত এবং অতীতকে শ্রদ্ধা জানানো দরকার।

২. শিল্প সমাজ ও সামাজিক পরিবর্তন

ঊনবিংশ শতাব্দীতে শিল্পায়নের ফলে ইউরোপে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। নতুন শহর গড়ে ওঠে এবং রেলপথের বিস্তার ঘটে। কিন্তু শিল্পায়নের অন্ধকার দিকও ছিল। কলকারখানায় কাজের সময় ছিল অনেক বেশি এবং মজুরি ছিল নামমাত্র। আবাসন এবং স্যানিটেশনের সমস্যা চরমে পৌঁছেছিল। উদারপন্থী এবং আমূল পরিবর্তনকামীরা এই সমস্যার সমাধান খুঁজছিলেন।

৩. ইউরোপে সমাজতন্ত্রের আগমন

সমাজতন্ত্র ছিল এমন এক ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদনের উপকরণের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে সামাজিক মালিকানা থাকবে। কার্ল মার্ক্স (Karl Marx) এবং ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels) এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন।

  • কার্ল মার্ক্সের মতবাদ: মার্ক্স যুক্তি দেন যে শিল্প সমাজ আসলে 'পুঁজিবাদী'। পুঁজিপতিরা কলকারখানায় মালিকানা বজায় রাখে এবং শ্রমিকদের শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত লভ্যাংশ তারা নিজেরা পকেটে পুরে নেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন শ্রমিকদের নিজেদের মুক্তি পেতে হলে এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ভেঙে 'সমাজতান্ত্রিক সমাজ' গড়তে হবে।
  • সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি: ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সমাজতন্ত্রীরা একজোট হতে থাকেন। ব্রিটেনে লেবার পার্টি এবং ফ্রান্সে সোশ্যালিস্ট পার্টি গঠিত হয়।

৪. রুশ সাম্রাজ্য এবং ১৯০৫ সালের বিপ্লব

১৯১৪ সালে জারের শাসনাধীন রাশিয়া ছিল ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী কিন্তু অনুন্নত রাষ্ট্র। রাশিয়ার প্রায় ৮৫% মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৯০৫ সালে 'রক্তক্ষয়ী রবিবার' (Bloody Sunday)-এর ঘটনার মাধ্যমে রুশ বিপ্লবের প্রথম স্পন্দন অনুভূত হয়। ফাদার গেপনের নেতৃত্বে শ্রমিকরা যখন জারের প্রাসাদে দাবি জানাতে যায়, তখন পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। এর ফলে সারা দেশে ধর্মঘট শুরু হয় এবং জার প্রথমবার একটি নির্বাচিত সংসদ বা 'ডুমা' (Duma) গঠনে রাজি হন।

৫. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও রাশিয়ার দুরবস্থা

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়া জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধের ময়দানে রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু এবং খাদ্য সংকট রাশিয়ার সাধারণ মানুষকে জারের শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এটিই ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করে।

৬. পেত্রোগ্রাদে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব (১৯১৭)

১৯১৭ সালের শীতকালে পেত্রোগ্রাদ শহরে খাদ্যের তীব্র অভাব দেখা দেয়। শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে রাস্তায় নেমে আসে। সৈন্যরাও শ্রমিকদের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করে এবং তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। শেষ পর্যন্ত ২রা মার্চ জার দ্বিতীয় নিকোলাস পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।

৭. অক্টোবর বিপ্লব: বলশেভিকদের উত্থান

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে বলশেভিক নেতা ভ্লাদিমির লেনিনের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। লেনিন তাঁর বিখ্যাত 'এপ্রিল থিসিস' (April Theses)-এ তিনটি দাবি জানান: যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে, জমি কৃষকদের দিতে হবে এবং ব্যাংক রাষ্ট্রীয়করণ করতে হবে। ১৯১৭ সালের অক্টোবরে বলশেভিকরা পেত্রোগ্রাদের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং রাশিয়ায় বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

৮. গৃহযুদ্ধ এবং স্টালিনবাদ

বিপ্লবের পর রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয় 'লাল' (বলশেভিক), 'সাদা' (জারপন্থী) এবং 'সবুজ' (সমাজতন্ত্রী বিপ্লবী)-দের মধ্যে। ১৯২০ সালের মধ্যে বলশেভিকরা অধিকাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে আনে। পরবর্তীকালে জোসেফ স্টালিন রাশিয়ার ক্ষমতা দখল করেন এবং কৃষিতে 'যৌথ খামার' (Collectivisation) পদ্ধতি চালু করেন, যা কৃষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: লেনিনের 'এপ্রিল থিসিস' কী ছিল?
উত্তর: ১৯১৭ সালে নির্বাসন থেকে ফিরে বলশেভিক নেতা লেনিন তিনটি প্রধান দাবি পেশ করেন, যা 'এপ্রিল থিসিস' নামে পরিচিত। সেগুলি হলো— ১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বন্ধ করা, ২. জমি কৃষকদের হাতে হস্তান্তর করা এবং ৩. সমস্ত ব্যাংক রাষ্ট্রীয়করণ করা।

প্রশ্ন ২: ১৯০৫ সালের 'রক্তক্ষয়ী রবিবার' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ১৯০৫ সালের ২২শে জানুয়ারি ফাদার গেপনের নেতৃত্বে হাজার হাজার শ্রমিক দাবিদাওয়া নিয়ে জারের উইন্টার প্যালেসের দিকে এগোলে পুলিশ ও কস্যাকরা তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে বহু শ্রমিক নিহত ও আহত হন। এই রক্তক্ষয়ী ঘটনাই ইতিহাসে 'রক্তক্ষয়ী রবিবার' নামে পরিচিত যা ১৯০৫ সালের বিপ্লবের সূচনা করেছিল।

প্রশ্ন ৩: বলশেভিক এবং মেনশেভিকদের মধ্যে পার্থক্য কী ছিল?
উত্তর: বলশেভিকরা ছিল লেনিনের নেতৃত্বে একটি সুশৃঙ্খল দল যারা বিশ্বাস করত পার্টিতে সদস্য সংখ্যা সীমিত এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। অন্যদিকে, মেনশেভিকরা মনে করত পার্টির দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত (যেমন জার্মানিতে ছিল)।

সারসংক্ষেপ

  • ইউরোপে ফরাসি বিপ্লবের পর উদারপন্থী, আমূল পরিবর্তনকামী এবং রক্ষণশীল চিন্তাধারার উদ্ভব ঘটে।
  • কার্ল মার্ক্স পুঁজিবাদ দূর করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ডাক দেন।
  • ১৯০৫ সালের ঘটনা রাশিয়ার বিপ্লবী মানসিকতার ভিত্তি তৈরি করে।
  • ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে জারের শাসনের অবসান ঘটে।
  • অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে বলশেভিকরা ক্ষমতায় আসে এবং সমাজতন্ত্রের প্রয়োগ শুরু হয়।
  • রাশিয়ার এই বিপ্লব সারা বিশ্বের ঔপনিবেশিক দেশগুলোকে স্বাধীনতার ও সাম্যের নতুন স্বপ্ন দেখায়।