বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের চারপাশে আমরা যা কিছু জীবন্ত দেখি, তা সে বিশাল আকারের হাতি হোক বা চোখে দেখা যায় না এমন ব্যাকটেরিয়া, সবকিছুরই মূলে রয়েছে একটি ক্ষুদ্র একক, যার নাম 'কোষ'। ঠিক যেমন একটি বাড়ি লক্ষ লক্ষ ইট দিয়ে তৈরি হয়, তেমনই প্রতিটি জীবদেহ এক বা একাধিক কোষ দিয়ে গঠিত। কোষ হলো জীবনের মৌলিক, গঠনগত এবং কার্যকরী একক। এই অধ্যায়ে আমরা কোষের রহস্যময় জগতের গভীরে প্রবেশ করব, এর আবিষ্কারের ইতিহাস জানব এবং কোষের বিভিন্ন অংশ ও তাদের অবিশ্বাস্য কাজকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে শিখব। নবম শ্রেণির বিজ্ঞানের এই অধ্যায়টি জীববিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে, তাই এর প্রতিটি ধারণা পরিষ্কারভাবে বোঝা অত্যন্ত জরুরি। চলুন, জীবনের এই ক্ষুদ্রতম কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এককটির সাথে পরিচিত হওয়া যাক।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
কোষ কী? জীবনের ভিত্তি
কোষ (Cell) শব্দটি ল্যাটিন শব্দ 'cellula' থেকে এসেছে, যার অর্থ 'একটি ছোট ঘর'। ১৬৬৫ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী রবার্ট হুক নিজের তৈরি একটি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে কর্কের একটি পাতলা অংশ পরীক্ষা করার সময় মৌচাকের মতো ছোট ছোট কুঠুরি দেখতে পান। তিনিই প্রথম এই কুঠুরিগুলোর নাম দেন 'কোষ'। যদিও তিনি মৃত কোষ দেখেছিলেন, তাঁর এই আবিষ্কারই কোষবিদ্যা বা সাইটোলজির (Cytology) দরজা খুলে দেয়।
পরবর্তীতে, লিউয়েনহুক প্রথমবারের মতো জীবন্ত কোষ পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর জার্মান বিজ্ঞানী স্লেইডেন (Schleiden) এবং সোয়ান (Schwann) কোষ তত্ত্ব (Cell Theory) প্রস্তাব করেন, যা জীববিজ্ঞানের একটি অন্যতম ভিত্তি। কোষ তত্ত্বের মূল কথাগুলো হলো:
- সমস্ত জীব এক বা একাধিক কোষ দ্বারা গঠিত।
- কোষ হলো জীবনের মৌলিক গঠনগত ও কার্যকরী একক।
- পূর্ববর্তী কোষ থেকেই নতুন কোষের সৃষ্টি হয়।
কোষ এতই ছোট যে খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর মধ্যেই জীবনের সমস্ত রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া সংগঠিত হয়। এটি পুষ্টি গ্রহণ করে, শক্তি উৎপাদন করে, বর্জ্য পদার্থ ত্যাগ করে এবং নিজের প্রতিরূপ তৈরি করে বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
কোষের প্রকারভেদ: প্রোক্যারিওটিক বনাম ইউক্যারিওটিক
নিউক্লিয়াসের গঠনের উপর ভিত্তি করে কোষকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: প্রোক্যারিওটিক (Prokaryotic) বা আদি কোষ এবং ইউক্যারিওটিক (Eukaryotic) বা আদর্শ কোষ।
১. প্রোক্যারিওটিক কোষ (Prokaryotic Cell)
গ্রিক শব্দ 'Pro' মানে 'আদি' এবং 'karyon' মানে 'নিউক্লিয়াস'। এই কোষগুলোর নিউক্লিয়াস সুগঠিত নয়। অর্থাৎ, নিউক্লীয় বস্তুগুলো কোনো পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে না, বরং সাইটোপ্লাজমে ভাসমান অবস্থায় থাকে। এই অঞ্চলটিকে নিউক্লিওয়েড (Nucleoid) বলা হয়। ব্যাকটেরিয়া এবং সায়ানোব্যাকটেরিয়া (নীলাভ-সবুজ শৈবাল) হলো প্রোক্যারিওটিক কোষের উদাহরণ।
বৈশিষ্ট্য:- আকারে সাধারণত ছোট (১-১০ মাইক্রোমিটার)।
- সুগঠিত নিউক্লিয়াস অনুপস্থিত।
- পর্দাবৃত কোষ অঙ্গাণু (যেমন মাইটোকন্ড্রিয়া, গলগি বস্তু) থাকে না।
- রাইবোসোম (70S প্রকৃতির) উপস্থিত থাকে।
- ক্রোমোজোম একটি এবং বৃত্তাকার হয়।
২. ইউক্যারিওটিক কোষ (Eukaryotic Cell)
গ্রিক শব্দ 'Eu' মানে 'প্রকৃত' এবং 'karyon' মানে 'নিউক্লিয়াস'। এই কোষগুলোতে একটি সুগঠিত, পর্দাবৃত নিউক্লিয়াস থাকে, যার মধ্যে ক্রোমোজোমগুলো সুরক্ষিত থাকে। সমস্ত উন্নত উদ্ভিদ, প্রাণী, ছত্রাক এবং প্রোটিস্টা জগতের জীবদের দেহ ইউক্যারিওটিক কোষ দ্বারা গঠিত।
বৈশিষ্ট্য:- আকারে তুলনামূলকভাবে বড় (৫-১০০ মাইক্রোমিটার)।
- সুগঠিত নিউক্লিয়াস উপস্থিত।
- পর্দাবৃত কোষ অঙ্গাণু (মাইটোকন্ড্রিয়া, গলগি বস্তু, এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম ইত্যাদি) উপস্থিত থাকে।
- রাইবোসোম (80S প্রকৃতির) উপস্থিত থাকে।
- একাধিক রৈখিক ক্রোমোজোম থাকে।
কোষের গঠন: একটি ক্ষুদ্র জগতের বিস্তারিত পরিচয়
একটি আদর্শ ইউক্যারিওটিক কোষকে প্রধানত তিনটি অংশে ভাগ করা যায়: কোষপর্দা, নিউক্লিয়াস এবং সাইটোপ্লাজম। সাইটোপ্লাজমের মধ্যে বিভিন্ন কোষ অঙ্গাণু ভাসমান থাকে।
১. কোষপর্দা বা প্লাজমা মেমব্রেন (Plasma Membrane)
কোষের সবচেয়ে বাইরের নমনীয়, সজীব এবং পাতলা আবরণটিকে কোষপর্দা বলে। এটি প্রাণী কোষের বাইরের স্তর হলেও উদ্ভিদ কোষে কোষ প্রাচীরের নিচে অবস্থান করে।
- গঠন: এটি প্রধানত প্রোটিন এবং লিপিড (ফসফোলিপিড) দ্বারা গঠিত। একে 'প্রভেদক ভেদ্য পর্দা' (Selectively Permeable Membrane) বলা হয়।
- কাজ: এর প্রধান কাজ হলো কোষকে বাইরের পরিবেশ থেকে আলাদা রাখা এবং কোষের ভেতরে ও বাইরের মধ্যে পদার্থের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা। এটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু প্রয়োজনীয় পদার্থকে কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে এবং বর্জ্য পদার্থকে বাইরে বের হতে দেয়।
অভিস্রবণ (Osmosis) ও ব্যাপন (Diffusion): কোষপর্দার মাধ্যমে পদার্থের চলাচল দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে।
- ব্যাপন: কোনো পদার্থের অণুগুলো যখন বেশি ঘনত্বের স্থান থেকে কম ঘনত্বের স্থানের দিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাকে ব্যাপন বলে। কোষে অক্সিজেন প্রবেশ এবং কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন ব্যাপন প্রক্রিয়ার উদাহরণ।
- অভিস্রবণ: এটি এক বিশেষ ধরনের ব্যাপন, যেখানে শুধুমাত্র জলের অণু একটি প্রভেদক ভেদ্য পর্দার মাধ্যমে বেশি ঘনত্বের জলীয় দ্রবণ থেকে কম ঘনত্বের জলীয় দ্রবণের দিকে যায়। কিশমিশকে জলে রাখলে ফুলে ওঠা অভিস্রবণের একটি চমৎকার উদাহরণ। দ্রবণের ঘনত্বের ওপর নির্ভর করে কোষের পরিবর্তন হয়:
- হাইপোটনিক দ্রবণ (Hypotonic Solution): দ্রবণের ঘনত্ব কোষের ভেতরের ঘনত্বের চেয়ে কম হলে, জল কোষের ভেতরে প্রবেশ করে এবং কোষটি ফুলে ওঠে।
- আইসোটনিক দ্রবণ (Isotonic Solution): দ্রবণের ঘনত্ব কোষের ভেতরের ঘনত্বের সমান হলে, জল প্রবেশ ও নির্গমনের হার সমান থাকে, ফলে কোষের আকারের কোনো পরিবর্তন হয় না।
- হাইপারটনিক দ্রবণ (Hypertonic Solution): দ্রবণের ঘনত্ব কোষের ভেতরের ঘনত্বের চেয়ে বেশি হলে, কোষ থেকে জল বেরিয়ে যায় এবং কোষটি সংকুচিত হয়ে যায়।
২. কোষ প্রাচীর (Cell Wall)
এটি শুধুমাত্র উদ্ভিদ, ছত্রাক এবং ব্যাকটেরিয়ার কোষে কোষপর্দার বাইরে একটি অতিরিক্ত, দৃঢ় এবং মৃত আবরণ।
- গঠন: উদ্ভিদ কোষের প্রাচীর প্রধানত সেলুলোজ নামক এক প্রকার শর্করা দিয়ে তৈরি, যা একে কাঠিন্য প্রদান করে।
- কাজ: এটি কোষকে একটি নির্দিষ্ট আকৃতি দেয়, যান্ত্রিক আঘাত থেকে রক্ষা করে এবং কোষকে অতিরিক্ত জল শোষণ করে ফেটে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচায়।
৩. নিউক্লিয়াস (Nucleus)
ইউক্যারিওটিক কোষের কেন্দ্রে অবস্থিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং পর্দাবৃত অঙ্গাণু হলো নিউক্লিয়াস। একে কোষের 'মস্তিষ্ক' বা 'নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র' বলা হয় কারণ এটি কোষের সমস্ত জৈবনিক ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
- নিউক্লীয় পর্দা (Nuclear Membrane): এটি দ্বিস্তরীয় আবরণ যা নিউক্লিয়াসকে সাইটোপ্লাজম থেকে পৃথক রাখে। এর গায়ে ছোট ছোট ছিদ্র (Nuclear Pore) থাকে, যা নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজমের মধ্যে বস্তু বিনিময়ে সাহায্য করে।
- নিউক্লিওপ্লাজম (Nucleoplasm): নিউক্লিয়াসের ভেতরে থাকা জেলির মতো তরল।
- নিউক্লিওলাস (Nucleolus): নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকা একটি ঘন গোলাকার বস্তু, যা রাইবোসোম সংশ্লেষে সহায়তা করে।
- ক্রোমাটিন জালিকা (Chromatin Network): নিউক্লিওপ্লাজমে অবস্থিত সুতোর মতো জট পাকানো অংশ। কোষ বিভাজনের সময় এগুলি ঘনীভূত হয়ে ক্রোমোজোম গঠন করে। ক্রোমোজোমের মধ্যে ডিএনএ (Deoxyribonucleic Acid) থাকে, যা বংশগতির ধারক ও বাহক। ডিএনএ-র কার্যকরী অংশকে জিন (Gene) বলে, যা জীবের বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণ করে।
৪. সাইটোপ্লাজম (Cytoplasm)
নিউক্লিয়াস এবং কোষপর্দার মধ্যবর্তী জেলির মতো অর্ধতরল, সজীব পদার্থটিকে সাইটোপ্লাজম বলে। এর মধ্যেই বিভিন্ন কোষ অঙ্গাণু ভাসমান থাকে। এটি কোষের বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার স্থান।
কোষ অঙ্গাণু: কোষের ভেতরের কর্মীরা
সাইটোপ্লাজমের মধ্যে অবস্থিত বিভিন্ন পর্দাবৃত বা পর্দাবিহীন সজীব বস্তু, যারা নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করে, তাদের কোষ অঙ্গাণু (Cell Organelles) বলে।
১. এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম (Endoplasmic Reticulum - ER)
এটি সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত অসংখ্য পরস্পর সংযুক্ত নালিকার জালক। এটি নিউক্লীয় পর্দা থেকে উৎপন্ন হয়ে কোষপর্দা পর্যন্ত বিস্তৃত থাকতে পারে। এটি দুই প্রকার:
- মসৃণ এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম (Smooth ER - SER): এর গায়ে রাইবোসোম থাকে না। এর প্রধান কাজ হলো লিপিড বা ফ্যাট সংশ্লেষ করা এবং বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থকে নিষ্ক্রিয় করা।
- অমসৃণ এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম (Rough ER - RER): এর গায়ে রাইবোসোম দানা লেগে থাকে। এর প্রধান কাজ হলো রাইবোসোমের সাহায্যে প্রোটিন সংশ্লেষ করা এবং সেগুলোকে কোষের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো।
২. গলগি বস্তু (Golgi Apparatus)
বিজ্ঞানী ক্যামিলো গলগির নামে নামকরণ করা এই অঙ্গাণুটি চ্যাপ্টা, থলির মতো সিস্টারনি (Cisternae) দ্বারা গঠিত। এর প্রধান কাজ হলো এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলামে সংশ্লেষিত প্রোটিন ও লিপিডকে গ্রহণ করা, সেগুলোকে পরিবর্তন করা, প্যাকেজিং করা এবং কোষের ভেতরে বা বাইরে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠানো। তাই একে কোষের 'ট্র্যাফিক পুলিশ' বা 'পোস্ট অফিস' বলা হয়। এটি লাইসোজোম তৈরিতেও সাহায্য করে।
৩. লাইসোজোম (Lysosomes)
এগুলি সাইটোপ্লাজমে ভাসমান ছোট থলির মতো অঙ্গাণু, যার মধ্যে শক্তিশালী পাচক উৎসেচক (Digestive Enzymes) থাকে।
- কাজ: এর প্রধান কাজ হলো কোষের মধ্যে প্রবেশকারী ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের মতো বহিরাগত বস্তুকে এবং কোষের পুরনো বা ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গাণুগুলোকে হজম করে কোষকে পরিষ্কার রাখা। তাই একে কোষের 'পরিচ্ছন্নতাকর্মী' বলা হয়।
- আত্মঘাতী থলি (Suicidal Bag): কোনো কারণে কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা বিপাকীয় কাজে সমস্যা হলে লাইসোজোম ফেটে যায় এবং এর উৎসেচকগুলো বেরিয়ে এসে নিজের কোষকেই হজম করে ফেলে। এই কারণে একে 'আত্মঘাতী থলি' বলা হয়।
৪. মাইটোকন্ড্রিয়া (Mitochondria)
এটি একটি দ্বিস্তরীয় পর্দাবৃত অঙ্গাণু। বাইরের পর্দাটি মসৃণ কিন্তু ভেতরের পর্দাটি আঙুলের মতো ভাঁজ হয়ে ক্রিস্টি (Cristae) গঠন করে।
- কাজ: মাইটোকন্ড্রিয়ার প্রধান কাজ হলো कोशिकীয় শ্বসন (Cellular Respiration) প্রক্রিয়ায় খাদ্যবস্তুকে (গ্লুকোজ) জারিত করে শক্তি উৎপাদন করা। এই শক্তি এটিপি (ATP - Adenosine Triphosphate) অণুর মধ্যে সঞ্চিত থাকে। ATP-কে 'শক্তির মুদ্রা' বা 'Energy Currency' বলা হয়। কোষের সমস্ত কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি এখান থেকেই সরবরাহ হয়, তাই মাইটোকন্ড্রিয়াকে কোষের 'শক্তিঘর' (Powerhouse of the cell) বলা হয়।
- মাইটোকন্ড্রিয়ার নিজস্ব ডিএনএ এবং রাইবোসোম থাকায় এটি নিজের জন্য কিছু প্রোটিন তৈরি করতে পারে।
৫. প্লাস্টিড (Plastids)
এই অঙ্গাণুটি শুধুমাত্র উদ্ভিদ কোষে এবং কিছু প্রোটিস্টা (যেমন ইউগ্লিনা)-র কোষে পাওয়া যায়। প্রাণী কোষে প্লাস্টিড থাকে না। এদেরও নিজস্ব ডিএনএ এবং রাইবোসোম আছে। কাজের ভিত্তিতে প্লাস্টিড তিন প্রকার:
- ক্লোরোপ্লাস্ট (Chloroplast): এদের মধ্যে ক্লোরোফিল নামক সবুজ রঞ্জক থাকে। ক্লোরোফিল সূর্যের আলোক শক্তি শোষণ করে সালোকসংশ্লেষ (Photosynthesis) প্রক্রিয়ায় শর্করা জাতীয় খাদ্য তৈরি করে। তাই ক্লোরোপ্লাস্টকে কোষের 'রান্নাঘর' বলা হয়।
- ক্রোমোপ্লাস্ট (Chromoplast): এরা রঙিন প্লাস্টিড (সবুজ ছাড়া)। এদের মধ্যে ক্যারোটিন (কমলা) এবং জ্যান্থোফিল (হলুদ) রঞ্জক থাকে। ফুল ও ফলের রঙিন বর্ণের জন্য এরাই দায়ী।
- লিউকোপ্লাস্ট (Leucoplast): এরা বর্ণহীন প্লাস্টিড। এদের প্রধান কাজ হলো খাদ্য সঞ্চয় করা। এরা শ্বেতসার, প্রোটিন বা ফ্যাট সঞ্চয় করে।
৬. ভ্যাকুওল (Vacuoles)
সাইটোপ্লাজমে অবস্থিত পর্দাবৃত থলির মতো অংশ হলো ভ্যাকুওল বা কোষগহ্বর।
- উদ্ভিদ কোষে: একটি বড় কেন্দ্রীয় ভ্যাকুওল থাকে, যা কোষের প্রায় ৫০-৯০% স্থান দখল করে। এটি কোষরসে পূর্ণ থাকে এবং কোষকে দৃঢ়তা প্রদান করে। এটি জল, খনিজ লবণ এবং বর্জ্য পদার্থ সঞ্চয় করে।
- প্রাণী কোষে: ভ্যাকুওল আকারে খুব ছোট বা অনুপস্থিত থাকে।
উদ্ভিদ কোষ বনাম প্রাণী কোষ: মূল পার্থক্যগুলি
যদিও উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয়ই ইউক্যারিওটিক কোষ দ্বারা গঠিত, তাদের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে যা তাদের জীবনযাত্রার ভিন্নতার কারণে তৈরি হয়েছে।
- কোষ প্রাচীর: উদ্ভিদ কোষে সেলুলোজ নির্মিত কোষ প্রাচীর থাকে, যা প্রাণী কোষে অনুপস্থিত।
- প্লাস্টিড: উদ্ভিদ কোষে প্লাস্টিড (বিশেষত ক্লোরোপ্লাস্ট) থাকে যা সালোকসংশ্লেষে সাহায্য করে। প্রাণী কোষে প্লাস্টিড থাকে না।
- ভ্যাকুওল: উদ্ভিদ কোষে একটি বড় কেন্দ্রীয় ভ্যাকুওল থাকে, কিন্তু প্রাণী কোষে ভ্যাকুওল খুব ছোট বা অনুপস্থিত।
- সেন্ট্রোজোম: প্রাণী কোষে সেন্ট্রোজোম নামক অঙ্গাণু থাকে যা কোষ বিভাজনে সাহায্য করে। উন্নত উদ্ভিদ কোষে এটি সাধারণত অনুপস্থিত।
- আকৃতি: কোষ প্রাচীরের উপস্থিতির কারণে উদ্ভিদ কোষের একটি নির্দিষ্ট, প্রায়শই চতুর্ভুজাকার আকৃতি থাকে। প্রাণী কোষের কোনো নির্দিষ্ট আকৃতি থাকে না, এটি সাধারণত গোলাকার বা অনিয়মিত হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: কেন মাইটোকন্ড্রিয়াকে কোষের 'শক্তিঘর' (Powerhouse of the cell) বলা হয়?
উত্তর: মাইটোকন্ড্রিয়াকে কোষের 'শক্তিঘর' বলা হয় কারণ এটি कोशिकীয় শ্বসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খাদ্য কণা (যেমন গ্লুকোজ) থেকে শক্তি নির্গত করে। এই শক্তি অ্যাডিনোসিন ট্রাইফসফেট (ATP) নামক একটি অণুর মধ্যে রাসায়নিক শক্তি হিসাবে সঞ্চিত হয়। কোষের সমস্ত জৈবনিক কাজ, যেমন পেশী সংকোচন, স্নায়ু সংবেদন প্রেরণ, প্রোটিন সংশ্লেষণ ইত্যাদির জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি এই ATP অণু সরবরাহ করে। যেহেতু কোষের যাবতীয় শক্তির যোগান মাইটোকন্ড্রিয়া থেকে আসে, তাই একে শক্তিঘর বলা হয়।
প্রশ্ন ২: লাইসোজোমকে 'আত্মঘাতী থলি' (Suicidal Bag) বলা হয় কেন?
উত্তর: লাইসোজোমের মধ্যে শক্তিশালী পাচক উৎসেচক থাকে যা কোষের বর্জ্য পদার্থ বা বহিরাগত জীবাণু ধ্বংস করে। কিন্তু যখন কোনো কোষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা তার বিপাকীয় ক্রিয়াকলাপ ব্যাহত হয়, তখন লাইসোজোমগুলো ফেটে যায়। এর ফলে এর ভেতরের পাচক উৎসেচকগুলো বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ কোষটিকেই হজম করে ফেলে, যার ফলে কোষের মৃত্যু ঘটে। নিজের কোষকে ধ্বংস করার এই ক্ষমতার জন্যই লাইসোজোমকে 'আত্মঘাতী থলি' বলা হয়।
প্রশ্ন ৩: প্রোক্যারিওটিক এবং ইউক্যারিওটিক কোষের মধ্যে প্রধান দুটি পার্থক্য কী?
উত্তর: প্রোক্যারিওটিক এবং ইউক্যারিওটিক কোষের মধ্যে প্রধান দুটি পার্থক্য হলো:
- নিউক্লিয়াস: প্রোক্যারিওটিক কোষে কোনো সুগঠিত, পর্দাবৃত নিউক্লিয়াস থাকে না; জেনেটিক উপাদান সাইটোপ্লাজমে ভাসমান থাকে (নিউক্লিওয়েড)। অন্যদিকে, ইউক্যারিওটিক কোষে একটি সুগঠিত, দ্বিস্তরীয় পর্দাবৃত নিউক্লিয়াস থাকে।
- কোষ অঙ্গাণু: প্রোক্যারিওটিক কোষে মাইটোকন্ড্রিয়া, গলগি বস্তু, এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলামের মতো কোনো পর্দাবৃত কোষ অঙ্গাণু থাকে না। কিন্তু ইউক্যারিওটিক কোষে এই সমস্ত পর্দাবৃত কোষ অঙ্গাণু উপস্থিত থাকে।
প্রশ্ন ৪: কোষপর্দা কেন একটি 'প্রভেদক ভেদ্য পর্দা' (Selectively Permeable Membrane)?
উত্তর: কোষপর্দাকে 'প্রভেদক ভেদ্য পর্দা' বলা হয় কারণ এটি সব পদার্থকে কোষের ভেতরে বা বাইরে যাতায়াত করতে দেয় না। এটি একটি দ্বাররক্ষীর মতো কাজ করে, যা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট এবং প্রয়োজনীয় পদার্থ (যেমন জল, অক্সিজেন, পুষ্টি) কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয় এবং কোষের ভেতর থেকে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট বর্জ্য পদার্থকে (যেমন কার্বন ডাই অক্সাইড) বাইরে বের হতে দেয়। পদার্থের এই নিয়ন্ত্রিত চলাচল কোষের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায় থেকে আমরা যা কিছু শিখলাম, তা কয়েকটি মূল বিন্দুতে সংক্ষিপ্ত করা যেতে পারে:
- কোষ হলো সমস্ত জীবের গঠনগত ও কার্যকরী মৌলিক একক।
- কোষ প্রধানত দুই প্রকার: প্রোক্যারিওটিক (আদি) এবং ইউক্যারিওটিক (আদর্শ)।
- একটি আদর্শ কোষের প্রধান অংশগুলি হলো কোষপর্দা, সাইটোপ্লাজম এবং নিউক্লিয়াস।
- নিউক্লিয়াসকে কোষের 'মস্তিষ্ক' বলা হয় কারণ এটি কোষের সমস্ত কাজ নিয়ন্ত্রণ করে এবং বংশগতির তথ্য বহন করে।
- সাইটোপ্লাজমে বিভিন্ন কোষ অঙ্গাণু থাকে, যেমন মাইটোকন্ড্রিয়া (শক্তিঘর), রাইবোসোম (প্রোটিন ফ্যাক্টরি), গলগি বস্তু (প্যাকেজিং কেন্দ্র), এবং লাইসোজোম (পরিচ্ছন্নতাকর্মী)।
- উদ্ভিদ কোষে কোষ প্রাচীর, প্লাস্টিড এবং একটি বড় কেন্দ্রীয় ভ্যাকুওল থাকে, যা প্রাণী কোষে অনুপস্থিত।
- কোষের গঠন এবং তার বিভিন্ন অঙ্গাণুর সমন্বিত ক্রিয়াকলাপই জীবনকে সম্ভব করে তোলে।