বিষয়ের ভূমিকা

বিশ শতকের বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো 'দ্বিমেরু বিশ্বের অবসান'। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিশ্ব দুটি মহাশক্তিধর শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল—একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী শিবির এবং অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক শিবির। এই ব্যবস্থাকেই বলা হতো দ্বিমেরু ব্যবস্থা। কিন্তু ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতন এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তির মাধ্যমে এই ব্যবস্থার অবসান ঘটে। এই অধ্যায়ে আমরা জানব কেন সোভিয়েত ব্যবস্থার পতন হলো, শক থেরাপি কী ছিল এবং সোভিয়েত পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি কেমন দাঁড়াল।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. সোভিয়েত ব্যবস্থা কী ছিল?

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ওপর ভিত্তি করে সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) গঠিত হয়েছিল। এই ব্যবস্থার কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল:

  • রাষ্ট্রীয় মালিকানা: উৎপাদনের সমস্ত উপাদানের ওপর রাষ্ট্রের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল। ব্যক্তিগত সম্পত্তির কোনো স্থান ছিল না।
  • একদলীয় শাসন: এখানে কেবল কমিউনিস্ট পার্টির শাসন চলত। অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব ছিল না।
  • পরিকল্পিত অর্থনীতি: রাষ্ট্রই ঠিক করত কী উৎপাদিত হবে এবং কীভাবে বিতরণ করা হবে। বেকারত্ব ছিল না বললেই চলে।
  • ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান: শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জনকল্যাণমূলক পরিষেবাগুলোতে সরকার ভর্তুকি দিত, ফলে সাধারণ মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণ হতো।

২. মিখাইল গর্বাচেভ এবং সংস্কারের সূচনা

১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে মিখাইল গর্বাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে সোভিয়েত অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে পশ্চিমের দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। তিনি দুটি প্রধান সংস্কার নীতি গ্রহণ করেন:

  • পেরেস্ত্রোইকা (Perestroika): এর অর্থ হলো 'পুনর্গঠন'। অর্থনীতির আধুনিকীকরণ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোই ছিল এর লক্ষ্য।
  • গ্লাসনস্ত (Glasnost): এর অর্থ হলো 'মুক্তমনা' বা 'স্বচ্ছতা'। রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বাকস্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল।

তবে এই সংস্কারগুলো হিতে বিপরীত হয়। মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হয়।

৩. কেন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটল?

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পিছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট কারণ ছিল না, বরং অনেকগুলো কারণের সমষ্টি ছিল এটি:

  • অর্থনৈতিক স্থবিরতা: সোভিয়েত ইউনিয়ন তার সম্পদের বেশিরভাগ অংশ পারমাণবিক অস্ত্র এবং সামরিক খাতে ব্যয় করত। এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোগ্যপণ্যের অভাব দেখা দেয়।
  • আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি: কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন, যা জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
  • জাতীয়তাবাদের উত্থান: রাশিয়া, বাল্টিক দেশসমূহ (এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া), ইউক্রেন এবং জর্জিয়ার মতো দেশগুলোতে জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রবল হয়ে ওঠে।
  • গর্বাচেভের সংস্কারের গতি: অনেকে মনে করেন গর্বাচেভ খুব দ্রুত সংস্কার করতে চেয়েছিলেন, আবার রক্ষণশীলরা মনে করতেন তিনি সমাজতন্ত্রের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন।

৪. শক থেরাপি (Shock Therapy)

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া ও অন্যান্য উত্তর-সোভিয়েত দেশগুলোতে সমাজতন্ত্র থেকে পুঁজিবাদে রূপান্তরের যে যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়া শুরু হয়, তাকেই বলা হয় 'শক থেরাপি'। এর প্রভাবে:

  • রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে জলের দরে বেসরকারি মালিকানায় বিক্রি করে দেওয়া হয়, যাকে ইতিহাসের 'বৃহত্তম গ্যারেজ সেল' বলা হয়।
  • মুদ্রাস্ফীতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে এবং মানুষের জমানো টাকার মূল্য কমে যায়।
  • সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং একদল মাফিয়া শ্রেণির উদ্ভব হয় যারা অর্থনীতির সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

৫. দ্বিমেরু বিশ্বের অবসানের ফলাফল

সোভিয়েত পতনের ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আসে:

  • শীতল যুদ্ধের অবসান: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে চলা দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমাপ্তি ঘটে।
  • একমেরু বিশ্ব: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একমাত্র মহাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
  • নতুন দেশের জন্ম: সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ১৫টি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
  • পুঁজিবাদের জয়: উদারনৈতিক গণতন্ত্র এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতি বিশ্বজুড়ে প্রাধান্য বিস্তার করে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: বার্লিন প্রাচীর কখন এবং কেন ভেঙে ফেলা হয়েছিল?
উত্তর: ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়। এটি ছিল দ্বিমেরু ব্যবস্থার পতনের সবচেয়ে বড় প্রতীক। পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই প্রাচীর ভেঙে দেয়, যা সাম্যবাদী শাসনের পতনের ইঙ্গিত দেয়।

প্রশ্ন ২: 'বৃহত্তম গ্যারেজ সেল' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: শক থেরাপির সময় রাশিয়া এবং অন্যান্য সাবেক সোভিয়েত দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশাল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো অতি স্বল্প মূল্যে বেসরকারি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। অর্থনীতির ইতিহাসে একেই 'বৃহত্তম গ্যারেজ সেল' বলা হয়।

প্রশ্ন ৩: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর গঠিত সংস্থার নাম কী?
উত্তর: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯১ সালে কমনওয়েলথ অফ ইন্ডিপেনডেন্ট স্টেটস (CIS) গঠিত হয়। রাশিয়া, ইউক্রেন এবং বেলারুশ এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিল।

সারসংক্ষেপ

  • ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে শীতল যুদ্ধের ইতি ঘটে।
  • মিখাইল গর্বাচেভের সংস্কার নীতি (পেরেস্ত্রোইকা ও গ্লাসনস্ত) পতনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছিল।
  • সোভিয়েত পতনের ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন আধিপত্য বা 'একমেরু বিশ্ব' ব্যবস্থার শুরু হয়।
  • শক থেরাপি ছিল একটি কষ্টকর অর্থনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়া যা রাশিয়াকে চরম সংকটে ফেলেছিল।
  • ভারতের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক আজও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।