বিষয়ের ভূমিকা
আমাদের পৃথিবী এক বিশেষ গ্রহ, কারণ এখানে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত উপাদান রয়েছে। আর এই উপাদানগুলির মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো বায়ু। আমরা শ্বাস নেওয়ার জন্য যে বাতাস গ্রহণ করি, তা আসলে কী? এটি কোথা থেকে আসে? আমাদের চারপাশের এই অদৃশ্য বায়ুর চাদরকেই বলা হয় বায়ুমণ্ডল (Atmosphere)। সপ্তম শ্রেণির ভূগোল বইয়ের চতুর্থ অধ্যায়, 'বায়ু', আমাদের এই জীবনদায়ী বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সাহায্য করে।
এই অধ্যায়ে আমরা জানব বায়ুমণ্ডল কী দিয়ে তৈরি, এর বিভিন্ন স্তরগুলি কী কী এবং কীভাবে এই স্তরগুলি আমাদের পৃথিবীকে সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে রক্ষা করে। এছাড়াও, আমরা আবহাওয়া ও জলবায়ুর মতো গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, বায়ুর চাপ, বাতাসের চলাচল এবং আর্দ্রতা বা বৃষ্টিপাতের মতো বিষয়গুলি সম্পর্কেও একটি পরিষ্কার ধারণা তৈরি করব। বায়ুমণ্ডল ছাড়া পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনা করাও অসম্ভব। এটি শুধুমাত্র আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে না, বরং পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী তাপমাত্রায় রাখে এবং মহাকাশ থেকে আসা বিভিন্ন বিপদ থেকে রক্ষা করে। চলুন, এই আকর্ষণীয় অধ্যায়টির গভীরে প্রবেশ করে আমাদের চারপাশের বায়ুর রহস্য উদঘাটন করি।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
বায়ুমণ্ডলের গঠন (Composition of the Atmosphere)
আমরা যে বায়ুকে শ্বাস হিসেবে গ্রহণ করি, তা আসলে একটিমাত্র গ্যাস নয়, বরং এটি বিভিন্ন গ্যাসের মিশ্রণ। এই মিশ্রণটিই আমাদের বায়ুমণ্ডলকে তৈরি করেছে। বায়ুমণ্ডলের প্রধান উপাদানগুলি হলো:
- নাইট্রোজেন (Nitrogen - 78%): বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে বেশি পরিমাণে উপস্থিত গ্যাস হলো নাইট্রোজেন। সরাসরি প্রাণীরা এই গ্যাস গ্রহণ করতে না পারলেও, উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য এটি অপরিহার্য। মাটির কিছু ব্যাকটেরিয়া এবং উদ্ভিদের মূল বায়ুমণ্ডল থেকে নাইট্রোজেন গ্রহণ করে সেটিকে এমন একটি রূপে পরিবর্তন করে, যা উদ্ভিদ ব্যবহার করতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে নাইট্রোজেন ফিক্সেশন বলা হয়।
- অক্সিজেন (Oxygen - 21%): মানুষসহ পৃথিবীর প্রায় সমস্ত জীব বেঁচে থাকার জন্য শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করে। এটি আমাদের জীবনের জন্য দ্বিতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অক্সিজেন তৈরি করে, যা বায়ুমণ্ডলে এর ভারসাম্য বজায় রাখে।
- অন্যান্য গ্যাস (Other Gases - 1%): বাকি এক শতাংশের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন গ্যাস, যেমন -
- আর্গন (Argon - 0.93%): এটি একটি নিষ্ক্রিয় গ্যাস।
- কার্বন ডাই অক্সাইড (Carbon Dioxide - 0.04%): পরিমাণে খুব কম হলেও কার্বন ডাই অক্সাইড পৃথিবীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় খাদ্য তৈরির জন্য এই গ্যাস ব্যবহার করে। এছাড়াও, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রীনহাউস গ্যাস। এটি পৃথিবী থেকে বিকিরিত তাপ শোষণ করে বায়ুমণ্ডলকে উষ্ণ রাখে, যা পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী করে তোলে। তবে এর পরিমাণ বেড়ে গেলে বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর মতো সমস্যার সৃষ্টি হয়।
- নিয়ন, হিলিয়াম, মিথেন, ক্রিপটন, হাইড্রোজেন এবং ওজোন: এই গ্যাসগুলিও খুব সামান্য পরিমাণে বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত থাকে।
এই গ্যাসীয় উপাদানগুলি ছাড়াও বায়ুমণ্ডলে রয়েছে জলীয় বাষ্প এবং ধূলিকণা। এই ধূলিকণা মেঘ তৈরিতে সাহায্য করে এবং জলীয় বাষ্প বৃষ্টিপাতের মূল উৎস।
বায়ুমণ্ডলের স্তরবিন্যাস (Structure of the Atmosphere)
আমাদের বায়ুমণ্ডল একটিমাত্র স্তর নয়, বরং পেঁয়াজের খোসার মতো এটি বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত। ঘনত্ব এবং তাপমাত্রার উপর ভিত্তি করে বায়ুমণ্ডলকে প্রধানত পাঁচটি স্তরে ভাগ করা হয়। পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে উপরের দিকে এই স্তরগুলি হলো:
১. ট্রপোস্ফিয়ার (Troposphere)
এটি বায়ুমণ্ডলের সর্বনিম্ন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর। আমরা এই স্তরেই বাস করি।
- উচ্চতা: ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এই উচ্চতা মেরু অঞ্চলে প্রায় ৮ কিমি এবং নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রায় ১৮ কিমি পর্যন্ত হতে পারে।
- বৈশিষ্ট্য: আমরা শ্বাস নেওয়ার জন্য যে বায়ু ব্যবহার করি, তা এই স্তরেই পাওয়া যায়। মেঘ, বৃষ্টি, কুয়াশা, ঝড়, বজ্রপাত-সহ আবহাওয়ার প্রায় সমস্ত ঘটনা এই স্তরেই ঘটে।
- তাপমাত্রা: এই স্তরে উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে তাপমাত্রা কমতে থাকে। প্রতি ১ কিলোমিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতে প্রায় ৬.৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রা হ্রাস পায়। একে 'নরমাল ল্যাপ্স রেট' (Normal Lapse Rate) বলা হয়।
- ট্রপোপজ (Tropopause): ট্রপোস্ফিয়ারের উপরের সীমানাকে ট্রপোপজ বলা হয়, যা ট্রপোস্ফিয়ারকে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার থেকে আলাদা করে।
২. স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার (Stratosphere)
ট্রপোস্ফিয়ারের ঠিক উপরেই এই স্তরটি অবস্থিত।
- উচ্চতা: ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
- বৈশিষ্ট্য: এই স্তরে মেঘ বা আবহাওয়ার কোনো গোলযোগ থাকে না, তাই আকাশ সাধারণত পরিষ্কার থাকে। এই কারণে জেট বিমানগুলো এই স্তরের মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে পছন্দ করে, কারণ এখানে তারা ঝড় বা বায়ুর আলোড়ন এড়িয়ে মসৃণভাবে উড়তে পারে।
- ওজোন স্তর (Ozone Layer): স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ওজোন গ্যাসের একটি স্তর এখানে উপস্থিত থাকে। এই ওজোন স্তর সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি (Ultraviolet Ray) শোষণ করে নেয় এবং আমাদের ত্বক ও স্বাস্থ্যের সুরক্ষা করে। ওজোন স্তর না থাকলে পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়ত।
- তাপমাত্রা: এই স্তরে উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, কারণ ওজোন স্তর সূর্যরশ্মি শোষণ করে উত্তপ্ত হয়।
৩. মেসোস্ফিয়ার (Mesosphere)
স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের উপরে অবস্থিত এটি বায়ুমণ্ডলের তৃতীয় স্তর।
- উচ্চতা: ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
- বৈশিষ্ট্য: মহাকাশ থেকে ছুটে আসা উল্কাপিণ্ডগুলি (Meteors) এই স্তরে প্রবেশ করার সাথে সাথেই বায়ুর সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে জ্বলে ওঠে এবং ছাই হয়ে যায়। আমরা রাতের আকাশে যে 'তারা খসা' দেখি, তা আসলে এই স্তরেই ঘটে।
- তাপমাত্রা: এই স্তরে উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে তাপমাত্রা আবার কমতে শুরু করে এবং প্রায় -১০০° সেলসিয়াসে পৌঁছায়। এটি বায়ুমণ্ডলের শীতলতম স্তর।
৪. থার্মোস্ফিয়ার (Thermosphere)
মেসোস্ফিয়ারের উপরে এই স্তরটি অবস্থিত।
- উচ্চতা: ৮০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
- বৈশিষ্ট্য: এই স্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আয়নোস্ফিয়ার (Ionosphere)। এখানকার বায়ুর কণাগুলি বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত (ionized) থাকে। এই আয়নগুলো রেডিও তরঙ্গ প্রতিফলিত করতে পারে, যা আমাদের বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থায় (Radio Communication) সাহায্য করে। পৃথিবী থেকে পাঠানো রেডিও সংকেত এই স্তর থেকে প্রতিফলিত হয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে, যার ফলে আমরা রেডিও শুনতে পাই।
- তাপমাত্রা: এই স্তরে উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে তাপমাত্রা খুব দ্রুত বাড়তে থাকে এবং ১০০০° সেলসিয়াসেরও বেশি হতে পারে। তবে বায়ুর ঘনত্ব খুব কম হওয়ায় এই উষ্ণতা আমরা অনুভব করতে পারি না।
৫. এক্সোস্ফিয়ার (Exosphere)
এটি বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে উপরের স্তর।
- উচ্চতা: ৪০০ কিলোমিটারের উপর থেকে শুরু হয়ে এটি ধীরে ধীরে মহাকাশে মিশে যায়। এর কোনো নির্দিষ্ট ঊর্ধ্বসীমা নেই।
- বৈশিষ্ট্য: এই স্তরে বায়ু অত্যন্ত হালকা এবং পাতলা। হিলিয়াম এবং হাইড্রোজেন-এর মতো হালকা গ্যাসগুলি এখানে ভেসে বেড়ায় এবং অবশেষে মহাকাশে হারিয়ে যায়। কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটগুলো সাধারণত এই স্তরেই পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে।
আবহাওয়া এবং জলবায়ু (Weather and Climate)
আমরা প্রায়শই 'আবহাওয়া' এবং 'জলবায়ু' শব্দ দুটিকে এক করে ফেলি, কিন্তু এ দুটির মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
আবহাওয়া (Weather): আবহাওয়া হলো কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানের নির্দিষ্ট সময়ের (যেমন - এক ঘন্টা, এক দিন বা এক সপ্তাহ) বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা। এটি খুব দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে। যেমন, সকালে হয়তো রোদ ঝলমলে আবহাওয়া, কিন্তু বিকেলে হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হতে পারে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আমরা শুনি আজকের তাপমাত্রা কত থাকবে, বৃষ্টি হবে কি না বা বাতাস বইবে কি না। এগুলি সবই আবহাওয়ার উপাদান।
জলবায়ু (Climate): জলবায়ু হলো কোনো একটি বিশাল অঞ্চলের বহু বছরের (সাধারণত ৩০-৩৫ বছর) আবহাওয়ার গড় অবস্থা। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী ধারণা এবং সহজে পরিবর্তন হয় না। যেমন, আমরা বলি ভারতের জলবায়ু মৌসুমি প্রকৃতির, বা মরুভূমির জলবায়ু উষ্ণ ও শুষ্ক। এটি সেই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের আবহাওয়ার গড় প্যাটার্নের উপর ভিত্তি করে বলা হয়।
সুতরাং, আবহাওয়া হলো ক্ষণস্থায়ী, আর জলবায়ু হলো দীর্ঘস্থায়ী। আবহাওয়া হলো আপনি প্রতিদিন কী পোশাক পরবেন তার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে, আর জলবায়ু হলো আপনার আলমারিতে কী ধরনের পোশাক থাকবে তা নির্ধারণ করে।
বায়ুমণ্ডলীয় চাপ (Atmospheric Pressure)
আমাদের চারপাশে থাকা বায়ুর ওজন আছে। এই বায়ু তার ওজনের কারণে ভূপৃষ্ঠের উপর যে বল প্রয়োগ করে, তাকেই বায়ুমণ্ডলীয় চাপ বা বায়ুচাপ (Atmospheric Pressure) বলে। আমরা এই চাপ অনুভব করি না, কারণ আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ চাপ বাইরের এই চাপকে প্রতিহত করে।
- চাপের পরিবর্তন: বায়ুচাপ সব জায়গায় সমান নয়। এটি উচ্চতা এবং তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
- উচ্চতার প্রভাব: আমরা যত উপরে যাই, বায়ুর ঘনত্ব তত কমতে থাকে, তাই বায়ুচাপও কমতে থাকে। এই কারণেই পর্বতারোহীদের উঁচু পাহাড়ে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং তাদের অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে যেতে হয়।
- তাপমাত্রার প্রভাব: তাপমাত্রা বাড়লে বায়ু হালকা হয়ে প্রসারিত হয় এবং উপরের দিকে উঠে যায়। এর ফলে সেখানে একটি নিম্নচাপ (Low Pressure) অঞ্চলের সৃষ্টি হয়। নিম্নচাপ সাধারণত মেঘলা আকাশ এবং বৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে, তাপমাত্রা কমলে বায়ু ভারী ও ঘন হয়ে নিচের দিকে নেমে আসে, যার ফলে একটি উচ্চচাপ (High Pressure) অঞ্চলের সৃষ্টি হয়। উচ্চচাপ সাধারণত পরিষ্কার ও রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
বায়ুপ্রবাহ বা বাতাস (Wind)
বাতাস আর কিছুই নয়, এটি হলো বায়ুর চলাচল। বায়ু সবসময় উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। এই বায়ুপ্রবাহকেই আমরা বাতাস বলি। বাতাসের গতিবেগ নির্ভর করে দুটি অঞ্চলের মধ্যে চাপের পার্থক্যের উপর। চাপের পার্থক্য যত বেশি হবে, বাতাসের গতিও তত বাড়বে।
বাতাসকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- স্থায়ী বায়ু (Permanent Winds): এই বায়ুগুলি সারা বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট দিকে নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত হয়। যেমন - আয়ন বায়ু (Trade Winds), পশ্চিমা বায়ু (Westerlies), এবং মেরু বায়ু (Polar Easterlies)।
- ঋতুভিত্তিক বা সাময়িক বায়ু (Seasonal Winds): এই বায়ুগুলি বিভিন্ন ঋতুতে তাদের দিক পরিবর্তন করে। এর সেরা উদাহরণ হলো ভারতের মৌসুমি বায়ু। এটি ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে সমুদ্র থেকে স্থলের দিকে এবং স্থল থেকে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়।
- স্থানীয় বায়ু (Local Winds): এই বায়ুগুলি একটি ছোট অঞ্চলে দিনের বা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রবাহিত হয়। যেমন -
- স্থলবায়ু ও সমুদ্রবায়ু (Land and Sea Breeze): দিনের বেলায় স্থলভাগ সমুদ্রের চেয়ে দ্রুত গরম হয়, ফলে স্থলে নিম্নচাপ এবং সমুদ্রে উচ্চচাপ তৈরি হয়। তাই সমুদ্র থেকে স্থলের দিকে বাতাস বয়, একে সমুদ্রবায়ু বলে। রাতে এর বিপরীত ঘটনা ঘটে এবং স্থল থেকে সমুদ্রের দিকে বাতাস বয়, যাকে স্থলবায়ু বলে।
- লু (Loo): উত্তর ভারতের গ্রীষ্মকালে দিনের বেলায় যে গরম ও শুষ্ক বাতাস বয়, তাকে 'লু' বলা হয়।
আর্দ্রতা (Moisture)
বায়ুতে যে কোনো সময়ে উপস্থিত জলীয় বাষ্পের পরিমাণকে আর্দ্রতা (Humidity) বলা হয়। যখন বায়ুতে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প থাকে, তখন আমরা বলি দিনটি 'আর্দ্র' বা 'স্যাঁতসেঁতে'।
- বাষ্পীভবন (Evaporation): সূর্যরশ্মির তাপে জলাশয়, নদী, সমুদ্র এবং উদ্ভিদ থেকে জল বাষ্পে পরিণত হয়ে বায়ুতে মেশে। এই প্রক্রিয়াকে বাষ্পীভবন বলে।
- ঘনীভবন (Condensation): যখন জলীয় বাষ্পযুক্ত উষ্ণ বায়ু উপরে ওঠে, তখন এটি ঠান্ডা হতে শুরু করে। ঠান্ডা হওয়ার ফলে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে ছোট ছোট জলকণায় পরিণত হয়। এই জলকণাগুলো বায়ুতে ভাসমান ধূলিকণাকে আশ্রয় করে একত্রিত হয়ে মেঘ (Clouds) তৈরি করে।
- অধঃক্ষেপণ (Precipitation): যখন মেঘের মধ্যে জলকণাগুলি খুব ভারী হয়ে যায় এবং আর বায়ুতে ভেসে থাকতে পারে না, তখন সেগুলি বৃষ্টি, তুষার বা শিলাবৃষ্টিরূপে ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে। এই প্রক্রিয়াকে অধঃক্ষেপণ বলে।
বৃষ্টিপাত প্রধানত তিন ধরনের হয়:
- পরিচলন বৃষ্টি (Convectional Rainfall): যখন ভূপৃষ্ঠ খুব গরম হয়ে যায়, তখন তার সংস্পর্শে থাকা বায়ুও গরম ও হালকা হয়ে উপরে উঠে যায়। উপরে উঠে এই বায়ু ঠান্ডা ও ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে এবং বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টিপাত ঘটায়। নিরক্ষীয় অঞ্চলে এই ধরনের বৃষ্টিপাত বেশি দেখা যায়।
- শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টি (Orographic Rainfall): যখন জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু পর্বতে বাধা পায়, তখন সেটি পর্বতের গা বেয়ে উপরে উঠতে বাধ্য হয়। উপরে উঠে এই বায়ু ঠান্ডা হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়। পর্বতের যে ঢালে বৃষ্টি হয় তাকে প্রতিবাত ঢাল (Windward side) বলে। পর্বতের অপর ঢালে বায়ু যখন নামে, তখন তাতে জলীয় বাষ্প প্রায় থাকে না, তাই সেখানে বৃষ্টি খুব কম হয়। এই অঞ্চলকে অনুবাত ঢাল বা বৃষ্টির ছায়া অঞ্চল (Leeward side) বলা হয়।
- ঘূর্ণবাত বৃষ্টি (Cyclonic Rainfall): যখন উষ্ণ এবং শীতল বায়ু মুখোমুখি হয়, তখন উষ্ণ হালকা বায়ু শীতল ঘন বায়ুর উপরে উঠে যায়। এর ফলে ঘূর্ণবাতের সৃষ্টি হয় এবং বৃষ্টিপাত ঘটে। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এই ধরনের বৃষ্টি বেশি হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: বায়ুমণ্ডলের গ্রীনহাউস গ্যাসগুলি, যেমন কার্বন ডাই অক্সাইড, কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: গ্রীনহাউস গ্যাসগুলি বায়ুমণ্ডলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এগুলি পৃথিবীকে উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে। সূর্য থেকে আসা আলোকরশ্মি পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে। পৃথিবী এই তাপকে অবলোহিত রশ্মি (infrared radiation) হিসেবে মহাকাশে ফিরিয়ে দেয়। কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো গ্রীনহাউস গ্যাসগুলি এই বিকিরিত তাপের কিছু অংশ শোষণ করে বায়ুমণ্ডলে ধরে রাখে। এই প্রক্রিয়াটিকে 'গ্রীনহাউস প্রভাব' বলা হয়। এর ফলেই পৃথিবীর তাপমাত্রা এমন একটি স্তরে থাকে যা জীবজগতের বেঁচে থাকার জন্য অনুকূল। এই গ্যাসগুলি না থাকলে পৃথিবী একটি শীতল গ্রহে পরিণত হতো।
প্রশ্ন ২: আবহাওয়া এবং জলবায়ুর মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী? একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝান।
উত্তর: আবহাওয়া এবং জলবায়ুর মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো সময়। আবহাওয়া হলো কোনো স্থানের স্বল্পমেয়াদী বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা, যা প্রতি মুহূর্তে বা প্রতিদিন পরিবর্তিত হতে পারে। অন্যদিকে, জলবায়ু হলো কোনো অঞ্চলের দীর্ঘ সময়ের (৩০-৩৫ বছর) আবহাওয়ার গড় অবস্থা। উদাহরণস্বরূপ, আজকে কলকাতায় আকাশ মেঘলা এবং বৃষ্টি হতে পারে - এটি হলো আজকের আবহাওয়া। কিন্তু আমরা যখন বলি পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র মৌসুমি প্রকৃতির, তখন আমরা এই অঞ্চলের বহু বছরের আবহাওয়ার গড় প্যাটার্নের কথা বলি - এটি হলো জলবায়ু।
প্রশ্ন ৩: আমরা যখন উঁচু পাহাড়ে যাই তখন শ্বাস নিতে কষ্ট হয় কেন?
উত্তর: ভূপৃষ্ঠ থেকে যত উপরে ওঠা যায়, বায়ুর ঘনত্ব এবং বায়ুর চাপ তত কমতে থাকে। এর অর্থ হলো, উঁচু জায়গায় বায়ুর কণাগুলি অনেক দূরে দূরে ছড়িয়ে থাকে। ফলে প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সময় আমরা সমতলের তুলনায় অনেক কম অক্সিজেন অণু গ্রহণ করি। আমাদের শরীর প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পায় না বলেই উঁচু পাহাড়ে গেলে শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা এবং ক্লান্তির মতো সমস্যা দেখা দেয়। এই কারণেই পর্বতারোহীরা অতিরিক্ত অক্সিজেনের জন্য সিলিন্ডার সঙ্গে নিয়ে যান।
প্রশ্ন ৪: ওজোন স্তর আমাদের জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: ওজোন স্তর (Ozone Layer) বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে অবস্থিত একটি পাতলা গ্যাসের আস্তরণ। এটি আমাদের জন্য একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচের মতো কাজ করে। সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি (UV rays) এই স্তর শোষণ করে নেয় এবং সেগুলিকে পৃথিবীতে পৌঁছাতে বাধা দেয়। এই অতিবেগুনি রশ্মি মানুষের ত্বকের ক্যান্সার, চোখের ছানি এবং অন্যান্য মারাত্মক রোগের কারণ হতে পারে। এছাড়াও এটি উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতেরও ক্ষতি করে। ওজোন স্তর এই বিপদ থেকে আমাদের রক্ষা করে, তাই এটি পৃথিবীর জীবজগতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়টি পড়ার পর আমরা যে মূল বিষয়গুলি জানতে পারলাম, সেগুলি একনজরে দেখে নেওয়া যাক:
- আমাদের পৃথিবীকে ঘিরে থাকা বায়ুর অদৃশ্য চাদরকে বায়ুমণ্ডল বলা হয়, যা জীবজগতের জন্য অপরিহার্য।
- বায়ুমণ্ডল মূলত নাইট্রোজেন (৭৮%) এবং অক্সিজেন (২১%) গ্যাস দ্বারা গঠিত। এছাড়াও এতে কার্বন ডাই অক্সাইড, আর্গন, জলীয় বাষ্প এবং ধূলিকণা রয়েছে।
- তাপমাত্রা ও ঘনত্বের ভিত্তিতে বায়ুমণ্ডলকে পাঁচটি প্রধান স্তরে ভাগ করা হয়: ট্রপোস্ফিয়ার, স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার, মেসোস্ফিয়ার, থার্মোস্ফিয়ার এবং এক্সোস্ফিয়ার।
- ট্রপোস্ফিয়ারে আবহাওয়ার সমস্ত ঘটনা ঘটে, এবং স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে থাকা ওজোন স্তর আমাদের সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে রক্ষা করে।
- আবহাওয়া হলো স্বল্প সময়ের বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা, আর জলবায়ু হলো কোনো অঞ্চলের দীর্ঘ সময়ের আবহাওয়ার গড়।
- বায়ুর ওজনের কারণে সৃষ্ট চাপকে বায়ুচাপ বলে। বায়ু সর্বদা উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়, যাকে বাতাস বলা হয়।
- বায়ুতে উপস্থিত জলীয় বাষ্পকে আর্দ্রতা বলে। এই জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে এবং বৃষ্টি, তুষার বা শিলাবৃষ্টিরূপে পৃথিবীতে নেমে আসে।