বিষয়ের ভূমিকা
নবম শ্রেণির অর্থনীতির দ্বিতীয় অধ্যায় 'সম্পদ হিসেবে মানুষ' (People as Resource) শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পাঠ। সাধারণত আমরা জনসংখ্যাকে একটি বোঝা হিসেবে দেখি, কিন্তু এই অধ্যায় আমাদের শেখায় যে সঠিক প্রশিক্ষণ, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে একটি দেশের জনসংখ্যাকে অমূল্য সম্পদে পরিণত করা সম্ভব। যখন বিদ্যমান 'মানব সম্পদ' (Human Resource) কে আরও বেশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মাধ্যমে উন্নত করা হয়, তখন তাকে আমরা 'মানব পুঁজি গঠন' (Human Capital Formation) বলি। এটি দেশের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, ঠিক যেভাবে যন্ত্র বা জমি উৎপাদনে সাহায্য করে। এই ব্লগে আমরা এই অধ্যায়ের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খুব সহজভাবে আলোচনা করব যা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে দারুণ সহায়ক হবে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. সম্পদ হিসেবে মানুষ বলতে কী বোঝায়?
একটি দেশের কর্মক্ষম জনগণকে তাদের দক্ষতা এবং উৎপাদনশীল ক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে বর্ণনা করার একটি উপায় হলো 'সম্পদ হিসেবে মানুষ'। উৎপাদনের অন্যান্য উপাদানের মতো (যেমন ভূমি, মূলধন) জনসংখ্যাও একটি সম্পদ—এটি একটি 'মানব সম্পদ'। যখন এই সম্পদের উপর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং চিকিৎসার মাধ্যমে বিনিয়োগ করা হয়, তখন তা 'মানব পুঁজিতে' পরিণত হয়। মানব পুঁজি হলো সেই জ্ঞান এবং দক্ষতার ভাণ্ডার যা মানুষের মধ্যে নিহিত থাকে।
২. মানব পুঁজিতে বিনিয়োগের গুরুত্ব
ভূমি বা ভৌত মূলধনের (Physical Capital) মতো মানব পুঁজিতে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে ভালো রিটার্ন বা ফল পাওয়া যায়। যেমন:
- উচ্চ আয়: শিক্ষিত বা প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা অশিক্ষিত বা অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের তুলনায় বেশি আয় করতে পারেন।
- সামাজিক সুবিধা: শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কেবল নিজের উন্নতি করে না, বরং পরোক্ষভাবে পুরো সমাজের উপকার করে। একটি শিক্ষিত মা তার সন্তানের পুষ্টি ও শিক্ষার বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন থাকেন।
- প্রযুক্তির ব্যবহার: দক্ষ মানব সম্পদ নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ ও উদ্ভাবনে সক্ষম হয়, যা দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
৩. পুরুষ ও মহিলাদের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ
মানুষ যে বিভিন্ন কাজ করে তাকে মূলত তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে ভাগ করা যায়:
- প্রাথমিক ক্ষেত্র (Primary Sector): কৃষি, বনজ সম্পদ, পশুপালন, মাছ ধরা, হাঁস-মুরগি পালন এবং খনি থেকে সম্পদ আহরণ।
- মাধ্যমিক ক্ষেত্র (Secondary Sector): বিভিন্ন প্রকার উৎপাদন ও নির্মাণ কাজ।
- তৃতীয়ক ক্ষেত্র (Tertiary Sector): বাণিজ্য, পরিবহন, যোগাযোগ, ব্যাংকিং, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন এবং পরিষেবা।
৪. জনসংখ্যার গুণমান (Quality of Population)
একটি দেশের জনসংখ্যার গুণমান মূলত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য।
ক) শিক্ষা (Education):শিক্ষা কেবল ব্যক্তিকেই জ্ঞান প্রদান করে না, এটি জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে এবং সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ভারত সরকার শিক্ষার প্রসারের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, যেমন:
- সর্ব শিক্ষা অভিযান: ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ।
- মিড-ডে মিল প্রকল্প: স্কুলে শিশুদের উপস্থিতির হার বাড়ানো এবং তাদের পুষ্টির মান উন্নত করার জন্য এই ব্যবস্থা।
- নবোদয় বিদ্যালয়: প্রতি জেলায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ আবাসিক স্কুল স্থাপন।
একজন অসুস্থ ব্যক্তি কখনোই একটি প্রতিষ্ঠানের বা দেশের জন্য সম্পদ হতে পারে না। সুস্বাস্থ্য মানুষের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে। সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র (PHC), কমিউনিটি হেলথ সেন্টার (CHC) এবং সরকারি হাসপাতালের নেটওয়ার্ক তৈরি করে স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির একটি বড় প্রমাণ।
৫. বেকারত্ব (Unemployment)
বেকারত্ব তখন তৈরি হয় যখন কাজ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা প্রচলিত মজুরিতে কোনো কাজ খুঁজে পান না। ভারতে মূলত দুই ধরনের বেকারত্ব দেখা যায়:
- গ্রামীণ বেকারত্ব: এর মধ্যে রয়েছে 'ঋতুভিত্তিক বেকারত্ব' (Seasonal Unemployment) যেখানে কৃষকরা বছরের কিছু মাস কাজ পান না। আর একটি হলো 'ছদ্মবেশী বেকারত্ব' (Disguised Unemployment) যেখানে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি লোক একটি নির্দিষ্ট জমিতে কাজ করছে।
- শহুরে বেকারত্ব: মূলত 'শিক্ষিত বেকারত্ব' শহরাঞ্চলের প্রধান সমস্যা। যেখানে ডিগ্রিধারী যুবকরা কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: মানব পুঁজি বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: কোনো দেশের নাগরিকদের মধ্যে যে জ্ঞান, দক্ষতা, শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চিত থাকে, তাকেই মানব পুঁজি বলা হয়। এটি উৎপাদনের একটি সক্রিয় উপাদান।
প্রশ্ন ২: ছদ্মবেশী বেকারত্ব বলতে কী বোঝায়? উদাহরণ দাও।
উত্তর: যখন কোনো কাজে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত শ্রমিক নিযুক্ত থাকে, তখন তাকে ছদ্মবেশী বেকারত্ব বলে। উদাহরণস্বরূপ, একটি কৃষি জমিতে ৫ জন শ্রমিকের কাজ থাকলে সেখানে যদি ৮ জন কাজ করে, তবে বাড়তি ৩ জন ছদ্মবেশী বেকার। তাদের সরিয়ে দিলেও মোট উৎপাদনে কোনো প্রভাব পড়ে না।
প্রশ্ন ৩: শিক্ষার মাধ্যমে কীভাবে সম্পদ তৈরি হয়?
উত্তর: শিক্ষা মানুষের দক্ষতা বাড়ায়, আধুনিক চিন্তাভাবনার বিকাশ ঘটায় এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। একজন শিক্ষিত মানুষ উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করে দেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে অবদান রাখেন, যা তাকে একটি মূল্যবান সম্পদে পরিণত করে।
সারসংক্ষেপ
- জনসংখ্যা দেশের বোঝা নয়, এটি একটি মূল্যবান সম্পদ।
- শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের ওপর বিনিয়োগ মানব পুঁজি গঠন করে।
- অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ তিনটি ক্ষেত্রে বিভক্ত: প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয়ক।
- ভারতে বেকারত্বের বিভিন্ন ধরন (ঋতুভিত্তিক, ছদ্মবেশী ও শিক্ষিত) বিদ্যমান যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।
- সরকার শিক্ষার মানোন্নয়নে 'সর্ব শিক্ষা অভিযান' এবং স্বাস্থ্যের জন্য বিভিন্ন জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
এই অধ্যায়টি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্য কেবল খনিজ সম্পদ বা কলকারখানাই যথেষ্ট নয়, বরং শিক্ষিত ও সুস্থ নাগরিকই আসল শক্তি।