বিষয়ের ভূমিকা

ভারত একটি বিশাল ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের দেশ। আপনি যদি ভারতের মানচিত্রের দিকে তাকান, তবে দেখতে পাবেন যে এখানে কোথাও বরফাবৃত সুউচ্চ পর্বতমালা, কোথাও দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমি, আবার কোথাও উর্বর সমভূমি বা ঢেউখেলানো মালভূমি রয়েছে। নবম শ্রেণির ভূগোলের দ্বিতীয় অধ্যায় 'ভারতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য' (Physical Features of India) আমাদের এই বৈচিত্র্যময় ভূ-প্রকৃতির পিছনের বৈজ্ঞানিক কারণ এবং এর বিভিন্ন বিভাগ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেয়। এই অধ্যায়টি পড়লে আমরা জানতে পারি কীভাবে কোটি কোটি বছর ধরে ভূ-তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আজকের ভারতবর্ষ গঠিত হয়েছে। এটি কেবল পরীক্ষার জন্য নয়, বরং আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে চেনার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. পাত সংস্থান তত্ত্ব (Theory of Plate Tectonics)

ভারতের ভূ-প্রকৃতি বুঝতে গেলে আমাদের প্রথমেই বুঝতে হবে পাত সংস্থান তত্ত্ব। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীর উপরিভাগ বা লিথোস্ফিয়ার কয়েকটি বড় এবং কিছু ছোট পাতে (Plates) বিভক্ত। এই পাতগুলি সর্বদা অত্যন্ত ধীর গতিতে নড়াচড়া করছে। এই নড়াচড়ার ফলে পাতের সীমানায় চাপের সৃষ্টি হয়, যা থেকে ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত এবং পর্বত সৃষ্টি হয়। পাতের এই চলন প্রধানত তিন প্রকারের হয়:

  • অভিসারী সীমানা (Convergent Boundary): যখন দুটি পাত একে অপরের দিকে এগিয়ে আসে এবং সংঘর্ষ ঘটে। হিমালয় পর্বতমালা এভাবেই তৈরি হয়েছে।
  • প্রতিসারী সীমানা (Divergent Boundary): যখন দুটি পাত একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়। এর ফলে নতুন ভূত্বক তৈরি হয়।
  • নিরপেক্ষ সীমানা (Transform Boundary): যখন দুটি পাত একে অপরের পাশ দিয়ে ঘঁষে চলে যায়।

কোটি কোটি বছর আগে ভারত 'গোন্ডোয়ানাল্যান্ড' (Gondwanaland) নামক এক বিশাল মহাদেশের অংশ ছিল। সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইন্দো-অস্ট্রেলীয় পাতটি উত্তর দিকে অগ্রসর হয় এবং বিশাল ইউরেশীয় পাতের সাথে ধাক্কা খায়। এই সংঘর্ষের ফলেই টেথিস সাগরের পলি রাশিতে ভাঁজ পড়ে হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি হয়েছে।

২. হিমালয় পর্বতমালা (The Himalayan Mountains)

হিমালয় ভারতের উত্তর সীমান্তে অবস্থিত একটি নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা। এটি পশ্চিমে সিন্ধু নদ থেকে পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত প্রায় ২,৪০০ কিলোমিটার বিস্তৃত। এর প্রস্থ কাশ্মীরে ৪০০ কিমি এবং অরুণাচল প্রদেশে ১৫০ কিমি। উচ্চতা ও বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে হিমালয়কে তিনটি প্রধান সমান্তরাল ভাগে ভাগ করা যায়:

  • হিমাচল বা হিমাদ্রি (Great or Inner Himalayas): এটি সবচেয়ে উত্তরের এবং সর্বোচ্চ শৃঙ্গ বিশিষ্ট অংশ। এর গড় উচ্চতা ৬,০০০ মিটার। মাউন্ট এভারেস্ট ও কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো বিখ্যাত শৃঙ্গ এখানে অবস্থিত।
  • হিমাচল বা মধ্য হিমালয় (Lesser Himalayas): এটি হিমাদ্রির দক্ষিণে অবস্থিত। এর গড় উচ্চতা ৩,৭০০ থেকে ৪,৫০০ মিটারের মধ্যে। পীর পাঞ্জাল, ধৌলাধর এবং মহাভারত পর্বতশ্রেণি এখানে অবস্থিত। শিমলা, নৈনিতাল ও দার্জিলিংয়ের মতো শৈলশহরগুলি এখানে দেখা যায়।
  • শিবালিক (The Shiwaliks): এটি হিমালয়ের দক্ষিণতম অংশ। এটি বালি, কাদা ও নুড়ি পাথর দিয়ে গঠিত। হিমাচল ও শিবালিকের মাঝখানের উপত্যকাগুলিকে 'দুন' (Dun) বলা হয়, যেমন—দেরাদুন।

৩. উত্তর ভারতের সমভূমি (The Northern Plains)

হিমালয় থেকে নেমে আসা তিনটি প্রধান নদী—সিন্ধু, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র এবং তাদের উপনদীগুলির বয়ে আনা পলি জমার ফলে এই বিশাল সমভূমি গঠিত হয়েছে। এটি প্রায় ৭ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। কৃষিকাজের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম উর্বর অঞ্চল। ভূ-প্রকৃতির তারতম্য অনুযায়ী এই সমভূমিকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়:

  • ভাবর (Bhabar): শিবালিকের পাদদেশে নদীগুলি নুড়ি পাথর জমা করে যে সংকীর্ণ অঞ্চল তৈরি করে।
  • তরাই (Terai): ভাবরের দক্ষিণে অবস্থিত একটি জলাভূমি ও বনাঞ্চল পূর্ণ এলাকা।
  • ভাঙ্গর (Bhangar): এটি সমভূমির পুরাতন পলি মাটি দ্বারা গঠিত অঞ্চল, যা সাধারণত বন্যার প্লাবনভূমির ওপরে থাকে।
  • খদর (Khadar): এটি নদীর তীরবর্তী নবীন পলি মাটি দ্বারা গঠিত অঞ্চল, যা অত্যন্ত উর্বর।

৪. উপদ্বীপীয় মালভূমি (The Peninsular Plateau)

এটি ভারতের প্রাচীনতম ভূখণ্ড, যা আগ্নেয় ও রূপান্তরিত শিলা দ্বারা গঠিত। এটি মূলত একটি ত্রিকোণাকার অঞ্চল। একে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: মধ্য ভারতের উচ্চভূমি (নর্মদা নদীর উত্তরে) এবং দাক্ষিণাত্য মালভূমি (নর্মদা নদীর দক্ষিণে)। পশ্চিমঘাট ও পূর্বঘাট পর্বতমালা এই মালভূমির দুই সীমানা নির্ধারণ করে। পশ্চিমঘাট পর্বতমালা উচ্চতায় বেশি এবং নিরবচ্ছিন্ন।

৫. ভারতীয় মরুভূমি ও উপকূলীয় সমভূমি

ভারতের পশ্চিমে রাজস্থানে অবস্থিত থর মরুভূমি। এখানে বৃষ্টিপাত খুব কম (বছরে ১৫০ মিমি-র কম) এবং বালি দিয়ে ঢাকা থাকে। লুনি এই অঞ্চলের প্রধান নদী। অন্যদিকে, উপদ্বীপীয় মালভূমির দুই পাশে আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে সংকীর্ণ উপকূলীয় সমভূমি অবস্থিত। পশ্চিম উপকূলকে কোঙ্কন, কানাড়া ও মালাবার উপকূলে ভাগ করা যায়। পূর্ব উপকূলকে উত্তর সরকার ও করমন্ডল উপকূল বলা হয়।

৬. দ্বীপপুঞ্জ (The Islands)

ভারতের দুটি প্রধান দ্বীপপুঞ্জ হলো—আরব সাগরের লাক্ষাদ্বীপ (যা প্রবাল দিয়ে গঠিত) এবং বঙ্গোপসাগরের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ (যা আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ফলে সৃষ্ট এবং আয়তনে বড়)।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: ভাঙ্গর ও খদর মাটির মধ্যে মূল পার্থক্য কী?
উত্তর: ভাঙ্গর হলো পুরাতন পলি মাটি যা নদীর প্লাবনভূমি থেকে দূরে অবস্থিত এবং এতে চুনজাতীয় কণা (কঙ্কর) বেশি থাকে। অন্যদিকে, খদর হলো নবীন পলি মাটি যা নদীর একদম কাছে অবস্থিত এবং এটি অত্যন্ত উর্বর ও কৃষিকাজের জন্য আদর্শ।

প্রশ্ন ২: ভারতের কোন অঞ্চলকে 'গোন্ডোয়ানাল্যান্ড'-এর অংশ বলা হয়?
উত্তর: ভারতের উপদ্বীপীয় মালভূমি অঞ্চলটি প্রাচীন গোন্ডোয়ানাল্যান্ড মহাদেশের অংশ ছিল। এটি ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন ও স্থিতিশীল ভূখণ্ড।

প্রশ্ন ৩: পশ্চিমঘাট ও পূর্বঘাট পর্বতমালার মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: পশ্চিমঘাট পর্বতমালা ভারতের পশ্চিম উপকূলের সমান্তরালে অবস্থিত এবং এটি অনেক বেশি উঁচু ও অবিচ্ছিন্ন। অন্যদিকে, পূর্বঘাট পর্বতমালা পূর্ব উপকূলের সমান্তরালে অবস্থিত, উচ্চতা কম এবং বিভিন্ন নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন।

সারসংক্ষেপ

  • ভারত মূলত ছয়টি প্রাকৃতিক বিভাগে বিভক্ত: হিমালয়, উত্তর ভারতের সমভূমি, উপদ্বীপীয় মালভূমি, ভারতীয় মরুভূমি, উপকূলীয় সমভূমি এবং দ্বীপপুঞ্জ।
  • হিমালয় পর্বতমালা ইউরেশীয় ও ইন্দো-অস্ট্রেলীয় পাতের সংঘর্ষের ফলে সৃষ্টি হয়েছে।
  • উত্তর ভারতের সমভূমি ভারতের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত।
  • দাক্ষিণাত্য মালভূমি ভারতের প্রাচীনতম ভূখণ্ড যা খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ।
  • উপকূলীয় অঞ্চল এবং দ্বীপপুঞ্জ ভারতের মৎস্য চাষ ও পর্যটন শিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।