ভালোবাসা আর গান, একে অপরের যেন পরিপূরক। যখন ঠোঁট দিয়ে বলা যায় না, তখন সুরই হয়ে ওঠে মনের কথা। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন, পৃথিবীর বুকে প্রথম প্রেমের গানটা কেমন ছিল? কত বছর আগে, কোন প্রেমিক তার মনের মানুষের জন্য প্রথম সুর বেঁধেছিল? চলুন, আজ সেই গল্পটাই শোনা যাক। এক এমন প্রেমের গল্প, যা পাথরের বুকে খোদাই করা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে!

ভাবছেন, সে তো কবেই হারিয়ে গেছে! এখানেই তো আসল ম্যাজিক। সেই সুর হারায়নি, বরং আজও তা আমাদের অবাক করে দেয়। এটা কোনো মুখে মুখে ফেরা গল্প নয়, একেবারে হাতে-গরম প্রমাণ সহ এক ঐতিহাসিক সত্যি।

ইতিহাসের বুকে প্রথম প্রেমের সুর

সময়টা আজ থেকে প্রায় ৩৫০০ বছর আগের, অর্থাৎ প্রায় ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। সিরিয়ার উগারিত নামের এক প্রাচীন শহরে প্রত্নতাত্ত্বিকরা খুঁজে পান কিছু মাটির ফলক বা ট্যাবলেট। আর তার মধ্যেই এক প্রায় সম্পূর্ণ ট্যাবলেটে কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা ছিল এক অদ্ভুত জিনিস - গানের কথা আর তার সঙ্গে সুরের স্বরলিপি! হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন, স্বরলিপি! এর নাম দেওয়া হয়েছে 'হুরিয়ান হাইম নম্বর ৬'। এটিই আজকের পৃথিবীতে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন সম্পূর্ণ গান।

এই গানটি উৎসর্গ করা হয়েছিল নিক্কাল দেবীকে, যিনি ছিলেন বাগান ও ফলবতী বৃক্ষের দেবী। ভাবুন একবার, প্রকৃতির প্রতি, উর্বরতার প্রতি ভালোবাসাই ছিল সেই গানের মূল সুর। এ যেন প্রকৃতির কাছে মানুষের এক শাশ্বত প্রেম নিবেদন।

এই আবিষ্কারটা কিন্তু সংগীতের ইতিহাস নিয়ে আমাদের সব ধারণাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আগে ভাবা হতো, প্রাচীন সংগীত শুধু মুখে মুখেই ছড়াতো, তাকে লিখে রাখার কোনো পদ্ধতি ছিল না। কিন্তু এই মাটির ফলক প্রমাণ করে দিল, সেই ব্রোঞ্জ যুগেও মানুষ সুরকে লিখে রাখার কৌশল জানত।

কেমন ছিল সেই সুরের ভাষা?

অবশ্যই এখনকার মতো 'সা-রে-গা-মা' ছিল না। সেই ট্যাবলেটে লেখা নির্দেশিকায় বলা ছিল, কীভাবে একটি ৯ তারের লাইর (বীণার মতো এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র) বাজাতে হবে। কোন তারের পর কোন তারে আঙুল ছোঁয়ালে কী সুর উঠবে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা ছিল। যদিও ভাষাটা ছিল হুরিয়ান, যা আজ পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়, তবুও ভাষাবিদ ও সংগীত বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর গবেষণা করে এর সুর উদ্ধার করেছেন।

যখন আধুনিক শিল্পীরা সেই প্রাচীন স্বরলিপি মেনে লাইর বা পিয়ানোতে সেই সুর তোলেন, তখন মনে হয় যেন ৩৫০০ বছরের ব্যবধান এক মুহূর্তে মুছে গেল। এক অদ্ভুত মায়াবী, বিষণ্ণ কিন্তু মিষ্টি সুর ভেসে আসে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় - স্থান, কাল, পাত্র বদলে গেলেও ভালোবাসার অনুভূতিটা হয়তো চিরকাল একইরকম থেকে যায়।

প্রেমের টাইম ট্র্যাভেল

একবার চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন তো! ৩৫০০ বছর আগে উগারিতের কোনো এক মন্দিরে বা রাজসভায়, কোনো এক নাম না জানা শিল্পী তার তারের যন্ত্রে এই সুর বাজাচ্ছেন। হয়তো কোনো প্রেমিক তার প্রেমিকাকে মনে করে এই সুর গুনগুন করছে, অথবা কোনো ভক্ত তার দেবীর চরণে এই সুর উৎসর্গ করছে। সেই সুর, সেই আবেগ মাটির ফলকে বন্দী হয়ে এতদিন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

আজ যখন আমরা ইউটিউবে সেই 'হুরিয়ান হাইম' শুনি, তখন কি আমরা সেই অজানা শিল্পীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাই না? তার ভালোবাসা, তার ভক্তি, তার সৃষ্টিশীলতাকে কুর্নিশ জানাই। এই গানটা শুধু একটা ঐতিহাসিক আবিষ্কার নয়, এ যেন সময়ের ওপারে থাকা এক প্রেমিকের পাঠানো প্রেমপত্র, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় - সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলো কখনও হারায় না, শুধু সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করে। ভালোবাসা আর সুরের মতোই, যা অমর।