বিষয়ের ভূমিকা

পদার্থবিজ্ঞানের জগতে আমরা যখন গতি নিয়ে আলোচনা শুরু করি, তখন প্রায়শই একটি বস্তুকে একটি বিন্দু কণা (point particle) হিসেবে কল্পনা করে নিই। সরলরৈখিক গতির সমীকরণ বা নিউটনের সূত্রগুলো প্রয়োগ করার সময় এই ধারণাটি বেশ কার্যকর। কিন্তু বাস্তব জগতে আমরা যে সমস্ত বস্তুর সম্মুখীন হই, যেমন একটি ঘুরন্ত লাট্টু, একটি চলন্ত গাড়ি, বা এমনকি গ্রহ-নক্ষত্র, সেগুলি শুধুমাত্র একটি বিন্দু কণা নয়। এগুলি অসংখ্য কণার সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রণালী বা সিস্টেম। এই বস্তুগুলি কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরলরেখায় চলে না, তারা নিজেদের অক্ষের চারপাশে ঘুরতেও পারে। এখানেই কণা প্রণালী (System of Particles) এবং ঘূর্ণন গতির (Rotational Motion) ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একাদশ শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞানের সপ্তম অধ্যায়টি আমাদের এই নতুন এবং আকর্ষণীয় জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কিভাবে একটি বস্তুকে বিন্দুর পরিবর্তে কণার সমষ্টি হিসেবে দেখা হয় এবং কিভাবে তার গতিকে বর্ণনা করা হয়। আমরা ‘ভরকেন্দ্র’ (Centre of Mass) নামক একটি বিশেষ বিন্দুর সাথে পরিচিত হব, যা পুরো সিস্টেমের গতিকে প্রতিনিধিত্ব করে। এরপর আমরা দৃঢ় বস্তুর (Rigid Body) ধারণা এবং তার দুই প্রকার গতি—স্থানান্তর গতি (Translational Motion) এবং ঘূর্ণন গতি (Rotational Motion)—নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। ঘূর্ণন গতির ক্ষেত্রে ভরের সমতুল্য রাশি ‘জড়তার ভ্রামক’ (Moment of Inertia) এবং বলের সমতুল্য রাশি ‘টর্ক’ (Torque) সম্পর্কে জানব। সবশেষে, আমরা কৌণিক ভরবেগের (Angular Momentum) ধারণা এবং এর সংরক্ষণ সূত্রের মতো একটি শক্তিশালী নীতি সম্পর্কে শিখব, যা মহাবিশ্বের গ্রহের গতি থেকে শুরু করে একজন স্কেটারের ঘূর্ণন পর্যন্ত সবকিছু ব্যাখ্যা করতে পারে। চলুন, এই অধ্যায়ের গভীরে প্রবেশ করে কণা প্রণালী এবং ঘূর্ণন গতির রহস্য উন্মোচন করি।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

কণা প্রণালী (System of Particles) এবং ভরকেন্দ্র (Centre of Mass)

যখন আমরা একাধিক কণাকে একসাথে একটি একক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করি, তখন তাকে ‘কণা প্রণালী’ বা ‘System of Particles’ বলা হয়। এই সিস্টেমের কণাগুলো একে অপরের উপর বল প্রয়োগ করতে পারে (অভ্যন্তরীণ বল) এবং সিস্টেমের বাইরে থেকেও তাদের উপর বল প্রযুক্ত হতে পারে (বাহ্যিক বল)। এইরকম একটি জটিল সিস্টেমের গতি বিশ্লেষণ করা বেশ কঠিন হতে পারে। এই কাজটি সহজ করার জন্য পদার্থবিজ্ঞানীরা ‘ভরকেন্দ্র’ বা ‘Centre of Mass’ (CoM) নামক একটি ধারণার অবতারণা করেছেন।

ভরকেন্দ্র কী?

ভরকেন্দ্র হলো একটি কণা প্রণালীর অন্তর্গত বা বাইরের এমন একটি কাল্পনিক বিন্দু, যেখানে সিস্টেমের সমস্ত ভর কেন্দ্রীভূত আছে বলে ধরে নেওয়া যায়। যখন সিস্টেমের উপর কোনো বাহ্যিক বল প্রয়োগ করা হয়, তখন এই ভরকেন্দ্রটি এমনভাবে গতিশীল হয় যেন সিস্টেমের সমস্ত ভর ওই বিন্দুতে পুঞ্জীভূত এবং সমস্ত বাহ্যিক বল ওই বিন্দুতেই প্রযুক্ত হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি একটি স্কেল বা রুলারকে আপনার আঙুলের ডগায় ভারসাম্য বজায় রেখে দাঁড় করাতে চান, তবে আপনাকে ঠিক মাঝখানের একটি বিন্দুতে আঙুল রাখতে হবে। এই বিন্দুটিই হলো রুলারটির ভরকেন্দ্র। আপনি যদি রুলারটিকে বাতাসে ছুঁড়ে দেন, তবে এটি এলোমেলোভাবে ঘুরতে ঘুরতে এগোতে পারে, কিন্তু এর ভরকেন্দ্রটি একটি মসৃণ পরাবৃত্তাকার (parabolic) পথ অনুসরণ করবে, ঠিক যেমনটি একটি বিন্দু কণাকে ছুঁড়ে দিলে হতো।

ভরকেন্দ্রের অবস্থান নির্ণয়:

গাণিতিকভাবে, যদি একটি সিস্টেমে n-সংখ্যক কণা থাকে এবং তাদের ভর যথাক্রমে m₁, m₂, ..., mₙ এবং মূলবিন্দু সাপেক্ষে তাদের অবস্থান ভেক্টর r₁, r₂, ..., rₙ হয়, তবে সিস্টেমের ভরকেন্দ্রের অবস্থান ভেক্টর (R_CM) হবে:

R_CM = (m₁r₁ + m₂r₂ + ... + mₙrₙ) / (m₁ + m₂ + ... + mₙ)

এখানে, (m₁ + m₂ + ... + mₙ) হলো সিস্টেমের মোট ভর (M)। সুতরাং, M * R_CM = Σ(mᵢ * rᵢ)

কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় (x, y, z), ভরকেন্দ্রের স্থানাঙ্কগুলি হবে:

  • X_CM = (Σmᵢxᵢ) / M
  • Y_CM = (Σmᵢyᵢ) / M
  • Z_CM = (Σmᵢzᵢ) / M

প্রতিসম বস্তুর ক্ষেত্রে (যেমন গোলক, ঘনক, সুষম দণ্ড), যাদের ঘনত্ব সর্বত্র সমান, তাদের জ্যামিতিক কেন্দ্রেই ভরকেন্দ্র অবস্থিত হয়। তবে, অসম আকৃতির বা অসম ঘনত্বের বস্তুর ক্ষেত্রে ভরকেন্দ্র ভিন্ন স্থানেও থাকতে পারে, এমনকি বস্তুর বাইরেও। যেমন, একটি রিং বা চুড়ির ভরকেন্দ্র তার জ্যামিতিক কেন্দ্রে অবস্থিত, যেখানে বস্তুর কোনো ভরই নেই।

ভরকেন্দ্রের গতি (Motion of Centre of Mass)

ভরকেন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর গতি। একটি কণা প্রণালীর ভরকেন্দ্রের গতি শুধুমাত্র সিস্টেমের উপর প্রযুক্ত মোট বাহ্যিক বলের (Net External Force) উপর নির্ভর করে। সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ বল (Internal Forces), অর্থাৎ কণাগুলো একে অপরের উপর যে বল প্রয়োগ করে, তা ভরকেন্দ্রের গতিকে প্রভাবিত করতে পারে না। কারণ নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ বলগুলো সর্বদা জোড়ায় জোড়ায় ক্রিয়া করে, যারা মানে সমান এবং বিপরীতমুখী। ফলে তাদের ভেক্টর যোগফল শূন্য হয়ে যায়।

যদি সিস্টেমের মোট ভর M হয় এবং ভরকেন্দ্রের বেগ V_CM হয়, তবে সিস্টেমের মোট রৈখিক ভরবেগ (Total Linear Momentum) P = M * V_CM।

এখন, নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র প্রয়োগ করলে আমরা পাই:

F_ext = dP/dt = d(M * V_CM)/dt = M * (dV_CM/dt) = M * a_CM

এখানে, F_ext হলো মোট বাহ্যিক বল এবং a_CM হলো ভরকেন্দ্রের ত্বরণ।

এই সমীকরণটি নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রের (F = ma) মতোই, কিন্তু এটি একটি সম্পূর্ণ কণা প্রণালীর জন্য প্রযোজ্য। এর অর্থ হলো, সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ গতি যতই জটিল হোক না কেন (যেমন একটি বিস্ফোরিত হওয়া বোমা), এর ভরকেন্দ্রটি এমন পথেই চলতে থাকবে যেন সমস্ত ভর ওই বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত এবং সমস্ত বাহ্যিক বল শুধু ওই বিন্দুতেই প্রযুক্ত হয়েছে। যদি একটি বোমাকে শূন্যে ছোঁড়া হয় এবং সেটি মাঝপথে বিস্ফোরিত হয়, তবে তার টুকরোগুলো বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়লেও, টুকরোগুলোর সামগ্রিক ভরকেন্দ্রটি বিস্ফোরণের আগেও যে পরাবৃত্তাকার পথে চলছিল, পরেও সেই পথেই চলতে থাকবে (বায়ুর বাধা উপেক্ষা করলে)।

দৃঢ় বস্তু (Rigid Body) এবং ঘূর্ণন গতি (Rotational Motion)

এখন পর্যন্ত আমরা সাধারণ কণা প্রণালী নিয়ে আলোচনা করেছি। এবার আমরা এক বিশেষ ধরনের কণা প্রণালী নিয়ে আলোচনা করব, যাকে ‘দৃঢ় বস্তু’ বা ‘Rigid Body’ বলা হয়।

দৃঢ় বস্তু কাকে বলে?

একটি দৃঢ় বস্তু হলো এমন একটি বস্তু যার কণাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব সর্বদা অপরিবর্তিত থাকে। অর্থাৎ, বাহ্যিক বল প্রয়োগ করলেও বস্তুটির আকার বা আকৃতির কোনো পরিবর্তন হয় না। বাস্তবে কোনো বস্তুই পুরোপুরি দৃঢ় নয়, কিন্তু বেশিরভাগ কঠিন বস্তুকে বিশ্লেষণের সুবিধার্থে দৃঢ় হিসেবে ধরা হয়। যেমন, একটি পাথরের টুকরো, একটি টেবিল, বা একটি সাইকেলের চাকা।

একটি দৃঢ় বস্তুর গতি দুই প্রকারের হতে পারে:

  1. স্থানান্তর গতি (Translational Motion): এই গতিতে বস্তুর সকল কণা একই সময়ে একই দিকে সমান দূরত্ব অতিক্রম করে। অর্থাৎ, সকল কণার রৈখিক বেগ সমান থাকে। যেমন, একটি সরলরেখা বরাবর গড়িয়ে না গিয়ে পিছলে যাওয়া বাক্স।
  2. ঘূর্ণন গতি (Rotational Motion): এই গতিতে বস্তুর সকল কণা একটি নির্দিষ্ট স্থির অক্ষকে (Axis of Rotation) কেন্দ্র করে বৃত্তাকার পথে ঘোরে। অক্ষের উপরের কণাগুলো স্থির থাকে, কিন্তু বাকি কণাগুলোর কৌণিক বেগ (Angular Velocity, ω) সমান থাকে, যদিও তাদের রৈখিক বেগ (v = ωr) অক্ষ থেকে দূরত্বের উপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন হয়। যেমন, একটি সিলিং ফ্যানের ব্লেডের গতি বা একটি লাট্টুর গতি।

অনেক সময় একটি বস্তুর মধ্যে এই দুই ধরনের গতি একইসাথে থাকতে পারে, যাকে বলা হয় জটিল গতি (Complex Motion)। যেমন, একটি গাড়ির চাকা যখন রাস্তা দিয়ে গড়িয়ে চলে, তখন তার স্থানান্তর গতি (গাড়ির সাথে এগিয়ে যাওয়া) এবং ঘূর্ণন গতি (নিজের অক্ষের চারপাশে ঘোরা) উভয়ই থাকে।

জড়তার ভ্রামক (Moment of Inertia)

রৈখিক গতির ক্ষেত্রে ‘ভর’ (mass) যেমন কোনো বস্তুর জড়তার পরিমাপ করে, অর্থাৎ তার গতির অবস্থা পরিবর্তনে বাধা দেওয়ার প্রবণতাকে নির্দেশ করে, ঠিক তেমনি ঘূর্ণন গতির ক্ষেত্রে ‘জড়তার ভ্রামক’ বা ‘Moment of Inertia’ (I) সেই ভূমিকা পালন করে।

জড়তার ভ্রামক কী?

জড়তার ভ্রামক হলো কোনো বস্তুর ঘূর্ণন গতির অবস্থা পরিবর্তনে বাধা দেওয়ার প্রবণতার পরিমাপ। যে বস্তুর জড়তার ভ্রামক যত বেশি, তাকে ঘোরানো বা তার ঘূর্ণন থামানো তত কঠিন। এটি শুধুমাত্র বস্তুর ভরের উপর নির্ভর করে না, বরং ঘূর্ণন অক্ষ থেকে সেই ভরের বণ্টনের উপরও নির্ভর করে।

গাণিতিকভাবে, একটি ঘূর্ণন অক্ষ থেকে rᵢ দূরত্বে অবস্থিত mᵢ ভরের একটি কণার জন্য জড়তার ভ্রামক হলো mᵢrᵢ²। একটি সম্পূর্ণ দৃঢ় বস্তুর জন্য, যা অসংখ্য কণার সমষ্টি, মোট জড়তার ভ্রামক (I) হলো সকল কণার জড়তার ভ্রামকের যোগফল:

I = Σ(mᵢ * rᵢ²)

এই সূত্র থেকে স্পষ্ট যে, ঘূর্ণন অক্ষ থেকে কণাগুলো যত দূরে থাকবে, জড়তার ভ্রামক তত বেশি হবে। এই কারণেই একজন সাইক্লিস্ট তার চাকার পরিধির দিকে ভর বেশি রাখতে চায় (স্পোকের মাধ্যমে), কারণ এটি চাকার জড়তার ভ্রামক বাড়িয়ে দেয় এবং চাকাটিকে আরও স্থিতিশীলভাবে ঘুরতে সাহায্য করে।

চক্রগতির ব্যাসার্ধ (Radius of Gyration):

এটি এমন একটি দূরত্ব (k) যা নির্দেশ করে যে, যদি বস্তুর সমস্ত ভরকে ঘূর্ণন অক্ষ থেকে ওই দূরত্বে কেন্দ্রীভূত করা হতো, তাহলেও বস্তুটির জড়তার ভ্রামক একই থাকত।

I = Mk², যেখানে M হলো বস্তুর মোট ভর। সুতরাং, k = √(I/M)।

টর্ক (Torque) এবং কৌণিক ভরবেগ (Angular Momentum)

রৈখিক গতিতে যেমন ‘বল’ (Force) বস্তুর রৈখিক ভরবেগের পরিবর্তন ঘটায়, ঘূর্ণন গতিতে সেই কাজটি করে ‘টর্ক’ (Torque)।

টর্ক (τ):

টর্ক হলো কোনো বলের ঘূর্ণন প্রভাব। কোনো বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করলে যদি বস্তুটি একটি অক্ষের চারপাশে ঘুরতে শুরু করে, তবে বলা হয় বলটি একটি টর্ক তৈরি করেছে। এর মান নির্ভর করে প্রযুক্ত বলের পরিমাণ, ঘূর্ণন অক্ষ থেকে বলের প্রয়োগ বিন্দুর দূরত্ব এবং বল ও দূরত্বের মধ্যবর্তী কোণের উপর।

গাণিতিকভাবে, টর্ক হলো অবস্থান ভেক্টর (r) এবং বল ভেক্টরের (F) ভেক্টর গুণফল:

τ = r × F

এর মান হলো τ = rFsinθ, যেখানে θ হলো r এবং F-এর মধ্যবর্তী কোণ। দরজা খোলার সময় আমরা হাতলটি কব্জা (ঘূর্ণন অক্ষ) থেকে সবচেয়ে দূরে রাখি, কারণ এতে দূরত্ব (r) বেড়ে যায় এবং অল্প বল প্রয়োগ করেই বেশি টর্ক তৈরি করা যায়, ফলে দরজা সহজে খোলে।

ঘূর্ণন গতির জন্য নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রের সমতুল্য রূপটি হলো:

τ_net = I * α

এখানে α হলো কৌণিক ত্বরণ (Angular Acceleration)। অর্থাৎ, মোট বাহ্যিক টর্ক বস্তুর জড়তার ভ্রামক এবং কৌণিক ত্বরণের গুণফলের সমান।

কৌণিক ভরবেগ (L):

কৌণিক ভরবেগ হলো রৈখিক ভরবেগের (p) ঘূর্ণন সমতুল্য। এটি একটি বস্তুর ঘূর্ণনের পরিমাণ পরিমাপ করে। কোনো কণার জন্য, কৌণিক ভরবেগ হলো তার অবস্থান ভেক্টর (r) এবং রৈখিক ভরবেগ ভেক্টরের (p) ভেক্টর গুণফল:

L = r × p

একটি দৃঢ় বস্তুর জন্য যা একটি নির্দিষ্ট অক্ষের চারপাশে ω কৌণিক বেগে ঘুরছে, তার কৌণিক ভরবেগ হলো:

L = I * ω

এই সম্পর্কটি রৈখিক ভরবেগের সূত্র (p = mv) এর সাথে তুলনীয়।

কৌণিক ভরবেগের নিত্যতা সূত্র (Law of Conservation of Angular Momentum)

পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক এবং শক্তিশালী সংরক্ষণ সূত্রগুলির মধ্যে এটি একটি। এই সূত্রটি বলে:

“যদি কোনো ঘূর্ণায়মান সিস্টেমের উপর প্রযুক্ত মোট বাহ্যিক টর্ক শূন্য হয়, তবে সেই সিস্টেমের মোট কৌণিক ভরবেগ সর্বদা সংরক্ষিত বা অপরিবর্তিত থাকবে।”

গাণিতিকভাবে, যদি τ_ext = 0 হয়, তবে dL/dt = 0, যার অর্থ L = ধ্রুবক।

যেহেতু L = Iω, তাই যদি L ধ্রুবক থাকে, তবে Iω = ধ্রুবক। এর মানে হলো, যদি কোনোভাবে সিস্টেমের জড়তার ভ্রামক (I) কমে যায়, তবে তার কৌণিক বেগ (ω) অবশ্যই বেড়ে যাবে, এবং এর বিপরীতটিও সত্য।

এর চমৎকার উদাহরণ দেখা যায় বাস্তব জীবনে:

  • ফিগার স্কেটার: যখন একজন ফিগার স্কেটার বরফের উপর ঘোরার সময় তার হাত দুটি ছড়িয়ে রাখে, তখন তার জড়তার ভ্রামক (I) বেশি থাকে এবং তার ঘূর্ণন গতি (ω) কম থাকে। কিন্তু যেই মুহূর্তে সে তার হাত দুটি শরীরের কাছে নিয়ে আসে, তার ভরের বণ্টন ঘূর্ণন অক্ষের কাছাকাছি চলে আসে, ফলে জড়তার ভ্রামক (I) কমে যায়। কৌণিক ভরবেগ সংরক্ষণ করার জন্য, তার কৌণিক বেগ (ω) নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায় এবং সে খুব দ্রুত ঘুরতে শুরু করে।
  • গ্রহের গতি: সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময় একটি গ্রহ যখন সূর্যের কাছাকাছি আসে (অনুসূর অবস্থান), তখন তার দূরত্ব (r) কমে যায়, ফলে জড়তার ভ্রামকও কমে। কৌণিক ভরবেগ সংরক্ষণ করতে গ্রহটির গতিবেগ বেড়ে যায়। আবার যখন এটি সূর্য থেকে দূরে চলে যায় (অপসূর অবস্থান), তখন এর গতিবেগ কমে যায়। এটি কেপলারের দ্বিতীয় সূত্রের একটি সুন্দর ব্যাখ্যা।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: ভরকেন্দ্র (Centre of Mass) এবং ভারকেন্দ্রের (Centre of Gravity) মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: যদিও সাধারণভাবে এই দুটিকে একই বলে মনে করা হয়, এদের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।

  • ভরকেন্দ্র (CoM): এটি বস্তুর ভরের বণ্টনের উপর নির্ভরশীল একটি জ্যামিতিক বিন্দু। এর সংজ্ঞায় মহাকর্ষ বলের কোনো ভূমিকা নেই।
  • ভারকেন্দ্র (CoG): এটি হলো সেই বিন্দু যেখানে বস্তুর উপর ক্রিয়াশীল মোট মহাকর্ষীয় বল বা ওজন কাজ করে বলে ধরে নেওয়া হয়।

একটি ছোট বস্তুর ক্ষেত্রে, যার উপর অভিকর্ষজ ত্বরণ (g) সর্বত্র সমান, ভরকেন্দ্র এবং ভারকেন্দ্র একই বিন্দুতে অবস্থান করে। কিন্তু একটি বিশাল বস্তুর ক্ষেত্রে (যেমন একটি পাহাড়), যার বিভিন্ন অংশের উপর g-এর মান সামান্য ভিন্ন হতে পারে, সেক্ষেত্রে ভরকেন্দ্র এবং ভারকেন্দ্রের অবস্থান সামান্য আলাদা হতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এদেরকে অভিন্ন হিসেবেই ধরা হয়।

প্রশ্ন ২: জড়তার ভ্রামক কী কী বিষয়ের উপর নির্ভর করে?

উত্তর: জড়তার ভ্রামক (I) মূলত তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে:

  1. বস্তুর মোট ভর (M): ভর বেশি হলে জড়তার ভ্রামক সাধারণত বেশি হয়।
  2. ঘূর্ণন অক্ষ সাপেক্ষে ভরের বণ্টন: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই ভরের দুটি বস্তুর জড়তার ভ্রামক ভিন্ন হতে পারে যদি তাদের ভরের বণ্টন ভিন্ন হয়। ঘূর্ণন অক্ষ থেকে ভর যত দূরে वितरित থাকে, জড়তার ভ্রামক তত বেশি হয়।
  3. ঘূর্ণন অক্ষের অবস্থান এবং দিক: একই বস্তুর জড়তার ভ্রামক ভিন্ন ভিন্ন ঘূর্ণন অক্ষের সাপেক্ষে ভিন্ন ভিন্ন হয়। যেমন, একটি দণ্ডকে তার মাঝখান দিয়ে ঘোরানোর চেয়ে এক প্রান্ত দিয়ে ঘোরানো বেশি কঠিন, কারণ প্রান্তের সাপেক্ষে জড়তার ভ্রامক বেশি।

প্রশ্ন ৩: একজন ডুবুরি বা জিমন্যাস্ট শূন্যে ডিগবাজি খাওয়ার সময় শরীর গুটিয়ে নেয় কেন?

উত্তর: এটি কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণ সূত্রের একটি চমৎকার প্রয়োগ। যখন একজন জিমন্যাস্ট লাফ দেয়, তখন তার উপর শুধুমাত্র অভিকর্ষ বল কাজ করে, যা তার ভরকেন্দ্র দিয়ে যায়। ফলে তার উপর মোট বাহ্যিক টর্ক শূন্য হয় এবং তার কৌণিক ভরবেগ সংরক্ষিত থাকে। লাফ দেওয়ার শুরুতে তার শরীর প্রসারিত থাকে, তাই জড়তার ভ্রামক (I) বেশি এবং কৌণিক বেগ (ω) কম থাকে। ডিগবাজি দেওয়ার জন্য সে দ্রুত শরীর গুটিয়ে (tuck position) নেয়। এতে তার ভর ঘূর্ণন অক্ষের কাছাকাছি চলে আসে এবং জড়তার ভ্রামক (I) অনেক কমে যায়। ফলে, কৌণিক ভরবেগ (L = Iω) স্থির রাখার জন্য তার কৌণিক বেগ (ω) অনেক বেড়ে যায় এবং সে দ্রুত একাধিকবার ঘুরতে বা ডিগবাজি খেতে পারে। মাটিতে নামার আগে সে আবার শরীর প্রসারিত করে তার ঘূর্ণন গতি কমিয়ে ফেলে।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়টি থেকে আমরা যা শিখলাম, তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ভরকেন্দ্র (Centre of Mass): এটি একটি কণা প্রণালীর সেই বিন্দু যেখানে সিস্টেমের সমস্ত ভর কেন্দ্রীভূত আছে বলে মনে করা হয় এবং যার গতি শুধুমাত্র বাহ্যিক বলের উপর নির্ভর করে।
  • দৃঢ় বস্তু (Rigid Body): এমন বস্তু যার কণাগুলোর মধ্যে আপেক্ষিক দূরত্ব অপরিবর্তিত থাকে। এর গতি স্থানান্তর, ঘূর্ণন বা উভয়ের সংমিশ্রণ হতে পারে।
  • জড়তার ভ্রামক (Moment of Inertia, I): এটি ঘূর্ণন গতির ক্ষেত্রে ভরের সমতুল্য। এটি বস্তুর ঘূর্ণন গতির পরিবর্তনে বাধা দেওয়ার পরিমাপ এবং এটি ভর ও ঘূর্ণন অক্ষ থেকে ভরের বণ্টনের উপর নির্ভর করে।
  • টর্ক (Torque, τ): এটি ঘূর্ণন গতির ক্ষেত্রে বলের সমতুল্য। এটি কোনো বলের ঘূর্ণন সৃষ্টি করার ক্ষমতা। τ = Iα।
  • কৌণিক ভরবেগ (Angular Momentum, L): এটি রৈখিক ভরবেগের ঘূর্ণন সমতুল্য। L = Iω।
  • কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণ সূত্র: যদি কোনো সিস্টেমের উপর মোট বাহ্যিক টর্ক শূন্য হয়, তবে তার মোট কৌণিক ভরবেগ অপরিবর্তিত থাকে। এই নীতির মাধ্যমেই গ্রহের গতি থেকে শুরু করে জিমন্যাস্টের ডিগবাজি পর্যন্ত অনেক ঘটনা ব্যাখ্যা করা যায়।