আচ্ছা, শেষ কবে কাউকে মন খুলে চিঠি লিখেছেন? হোয়াটসঅ্যাপ আর মেসেঞ্জারের যুগে হয়তো আমাদের আর কাগজ-কলমের কাছে বিশেষ দরকারে যেতে হয় না। দুটো ট্যাপ করলেই পছন্দের মানুষের কাছে পৌঁছে যায় রাশি রাশি ইমোজি—কখনো ভালোবাসার লাল হার্ট (❤️), আবার কখনো আদুরে চুমুর (😘) ছড়াছড়ি। আচ্ছা, এই যে আমরা চটজলদ অনুভূতি বোঝাতে একটা ছোট্ট ‘X’ অক্ষরটি ব্যবহার করি, এর মানে যে ‘চুমু’, তা তো আমরা সবাই জানি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কেন বর্ণমালার চব্বিশ নম্বর অক্ষরটির এমন রোম্যান্টিক একটা অর্থ হলো? এর পেছনে যে একটা গোটা ইতিহাস লুকিয়ে আছে, যেখানে বিশ্বাস, শপথ আর ভালোবাসা মিলেমিশে একাকার, তা জানলে আপনি অবাক হবেনই!
শুধু একটা অক্ষর নয়, এক টুকরো ইতিহাস!
গল্পটা শুরু হয় আজ থেকে শত শত বছর আগে, মধ্যযুগে। [2, 3] এমন একটা সময়ে, যখন লেখাপড়া জানা মানুষের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। [1] আজকের মতো সবার নাম সই করার সুযোগ বা দক্ষতা কিছুই ছিল না। রাজা-মহারাজা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, অনেকেই নিজের নাম লিখতে পারতেন না। কিন্তু দরকারি চুক্তি, আইনি কাগজপত্র বা ব্যক্তিগত চিঠিতে তো একটা স্বীকৃতির প্রয়োজন, তাই না? সেই সময়েই ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে আসে ইংরেজি ‘X’ অক্ষরটি।
তবে এই ‘X’ কিন্তু শুধু একটা আঁকিবুকি ছিল না। এর একটা গভীর অর্থ ছিল। খ্রিস্টানদের জন্য এটি ছিল পবিত্র ‘ক্রস’ বা যিশুর প্রতীক। [4, 7] গ্রিক ভাষায় ‘খ্রিস্ট’ (Χριστός) শব্দের প্রথম অক্ষরটিও দেখতে অনেকটা ‘X’-এর মতোই। [2] তাই, যখন কেউ কোনো কাগজে এই চিহ্নটি আঁকতেন, তার মানে হতো, তিনি যিশুকে সাক্ষী রেখে কথা দিচ্ছেন বা শপথ করছেন। [6] এটা ছিল সততা, বিশ্বাস আর আস্থার প্রতীক।
আশ্চর্যজনক সত্যিটা হলো: ‘X’ অক্ষরের সাথে চুম্বনের সম্পর্কটা শুরু হয়েছিল নিরক্ষরতার যুগে। যখন মানুষ কোনো দলিলে নিজের নামের বদলে ‘X’ চিহ্ন দিত, তখন সেই শপথকে আরও পাকা করতে তারা চিহ্নটির ওপর literalmente একটি চুমু খেত! [1, 5] এই "শপথ це مهر" করার রীতি থেকেই ধীরে ধীরে ‘X’ অক্ষরটি চুম্বনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
যেভাবে একটি শপথ হয়ে উঠলো ভালোবাসার প্রতীক
ভাবুন একবার সেই দৃশ্যটা! একজন সাধারণ মানুষ, হয়তো লিখতে জানেন না, কিন্তু তার কথার দাম অনেক। তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ কাগজে ‘X’ আঁকলেন এবং তারপর সবার সামনে সেই চিহ্নের ওপর আলতো করে চুমু খেলেন। এর মানে হলো, "আমি এই পবিত্র ক্রসের নামে শপথ করছি এবং আমার এই শপথকে একটি চুম্বনের মাধ্যমে সত্যি বলে প্রমাণ করছি।" [5] এই কাজটি এতটাই আন্তরিক আর বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে ধীরে ধীরে মানুষ ‘X’ চিহ্নটিকেই ওই চুম্বনের সমার্থক বলে ভাবতে শুরু করে।
সময়ের সাথে সাথে এর ব্যবহারও বদলে যেতে থাকে। যা ছিল একসময় আইনি বা ধর্মীয় শপথের প্রতীক, তা-ই ঢুকে পড়ল ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে। মানুষ তার প্রিয়জনকে চিঠি লেখার শেষেও এই ‘X’ চিহ্ন ব্যবহার করতে শুরু করল। এখানে এর অর্থ আর শপথ রইল না, হয়ে গেল pure ভালোবাসা, স্নেহ আর আদরের প্রকাশ। ভাবা যায়, যে চিহ্ন দিয়ে একসময় রাজ্যের চুক্তিপত্র সই হতো, সেই চিহ্নই অষ্টাদশ শতকে এসে প্রেমিক-প্রেমিকার চিঠিতে গোপন ভালোবাসার ভাষা হয়ে উঠল! [1] ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ গিলবার্ট হোয়াইট ১৭৬৩ সালে লেখা একটি চিঠিতে প্রথমবার ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে এর ব্যবহার করেন বলে জানা যায়। [1]
তারপর তো বাকিটা ইতিহাস। বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈনিকরা যখন দূর দেশ থেকে তাদের প্রিয়জনদের চিঠি লিখতেন, তখন খামের ওপর ‘SWAK’ (Sealed With A Kiss) কথাটি লিখে দিতেন, যার সাথে জুড়ে দেওয়া থাকতো এক বা একাধিক ‘X’। [3] এইভাবেই একটা সাধারণ অক্ষর লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে ভালোবাসার উষ্ণতা পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হয়ে ওঠে।
আজকের ‘XOXO’-তে সেই পুরনো ভালোবাসার ছোঁয়া
আজ যখন আমরা মেসেজের শেষে চট করে ‘xx’ বা ‘xoxo’ লিখে ফেলি, আমরা হয়তো নিজের অজান্তেই শত শত বছরের পুরনো একটা ঐতিহ্যকে বয়ে নিয়ে চলি। আমরা হয়তো সেই মধ্যযুগের মানুষটির মতো কোনো কাগজে চুমু খাই না, কিন্তু আমাদের অনুভূতির আন্তরিকতাটা কি খুব বদলেছে? সেই ‘X’ যেমন ছিল বিশ্বাসের প্রতীক, আজকের ‘X’-ও তো প্রিয় মানুষের প্রতি আমাদের ভালোবাসা আর আস্থারই প্রকাশ।
তাই পরেরবার যখন কাউকে ভালোবাসার বার্তা পাঠাতে গিয়ে ‘X’ টাইপ করবেন, একবার এই মিষ্টি ইতিহাসটার কথা ভেবে দেখতে পারেন। একটা ছোট্ট অক্ষরের পেছনে লুকিয়ে থাকা এত গভীর আর রোম্যান্টিক গল্প আপনার মুখে হাসি ফোটাবেই। ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা হয়তো বদলেছে, কিন্তু ভালোবাসার অনুভূতিটা সেই আগের মতোই আছে, তাই না?