বিষয়ের ভূমিকা

আলো! আমাদের চারপাশের জগৎকে রঙিন, প্রাণবন্ত এবং দৃশ্যমান করে তোলার পেছনের জাদুকরী শক্তি। সকালের নরম রোদ হোক বা রাতের উজ্জ্বল বাতি, আলো ছাড়া আমাদের জীবন কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এই আলো আসলে কী? এটি কীভাবে কাজ করে? কীভাবে আমরা বিভিন্ন বস্তু দেখতে পাই? দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের দশম অধ্যায়, 'আলো – প্রতিফলন ও প্রতিসরণ', আমাদের এই মৌলিক প্রশ্নগুলির গভীরে নিয়ে যায় এবং আলোর আকর্ষণীয় দুনিয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

এই অধ্যায়ে আমরা কেবল আলোর প্রকৃতি সম্পর্কেই জানব না, বরং দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম - প্রতিফলন (Reflection) এবং প্রতিসরণ (Refraction) - সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে শিখব। আমরা দেখব কীভাবে এই ধর্মগুলি দর্পণ (mirror) এবং লেন্স (lens) তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। গাড়ির আয়না থেকে শুরু করে আমাদের চশমা, ক্যামেরা, টেলিস্কোপ পর্যন্ত সবকিছুই আলোর এই নীতিগুলির উপর ভিত্তি করে কাজ করে। এই অধ্যায়টি পদার্থবিজ্ঞানের একটি অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর, যা আমাদের মহাবিশ্বের কার্যকারিতা বোঝার জন্য একটি নতুন জানালা খুলে দেয়। চলুন, আলোর এই রহস্যময় এবং আকর্ষণীয় জগতে ডুব দেওয়া যাক এবং এর গোপনীয়তাগুলি উন্মোচন করি।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

আলোর আচরণ বোঝার জন্য আমাদের কয়েকটি মূল ধারণা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। এই অধ্যায়টি মূলত আলোর প্রতিফলন এবং প্রতিসরণ নিয়ে আলোচনা করে। আমরা এই দুটি বিষয়কে ধাপে ধাপে এবং বিস্তারিতভাবে বুঝব।

আলোর প্রতিফলন (Reflection of Light)

যখন আলোক রশ্মি কোনো তলের উপর পড়ে এবং সেই তলে বাধা পেয়ে আবার প্রথম মাধ্যমে ফিরে আসে, তখন এই ঘটনাটিকে আলোর প্রতিফলন বলা হয়। সহজ কথায়, কোনো কিছুতে ধাক্কা খেয়ে আলোর ফিরে আসাই হলো প্রতিফলন। আমরা যে কোনো বস্তু দেখতে পাই, তার মূল কারণই হলো এই প্রতিফলন। আলো বস্তুটির উপর পড়ে, প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে এবং তখনই আমরা বস্তুটি দেখতে পাই।

প্রতিফলনের সূত্র (Laws of Reflection):

প্রতিফলন দুটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে, যা প্রতিফলনের সূত্র নামে পরিচিত। এই সূত্র দুটি হলো:

  • প্রথম সূত্র: আপতন কোণ (angle of incidence) এবং প্রতিফলন কোণ (angle of reflection) সর্বদা সমান হয়। অর্থাৎ, আলো যে কোণে এসে পড়ে, ঠিক সেই কোণেই প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যায়। (∠i = ∠r)
  • দ্বিতীয় সূত্র: আপতিত রশ্মি (incident ray), প্রতিফলিত রশ্মি (reflected ray) এবং আপতন বিন্দুতে প্রতিফলক তলের উপর অঙ্কিত অভিলম্ব (normal) একই সমতলে অবস্থান করে।

এই সূত্রগুলো মসৃণ বা অমসৃণ সব ধরনের তলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

দর্পণ এবং প্রতিবিম্ব গঠন

দর্পণ হলো একটি মসৃণ তল যা আলোর নিয়মিত প্রতিফলন ঘটায়। দর্পণ মূলত দুই প্রকারের হয়: সমতল দর্পণ এবং গোলীয় দর্পণ।

১. সমতল দর্পণ (Plane Mirror):

আমরা প্রতিদিন নিজেদের চেহারা দেখার জন্য যে আয়না ব্যবহার করি, তা হলো সমতল দর্পণ। সমতল দর্পণ দ্বারা গঠিত প্রতিবিম্বের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে:

  • অসদবিম্ব ও সমশীর্ষ: প্রতিবিম্বটি অসদ (virtual) হয়, অর্থাৎ এটিকে পর্দায় ফেলা যায় না। এটি সর্বদা সোজা বা সমশীর্ষ (erect) হয়।
  • সমান আকার: বস্তুর আকার এবং প্রতিবিম্বের আকার সমান হয়।
  • সমান দূরত্ব: দর্পণ থেকে বস্তুর যা দূরত্ব, দর্পণ থেকে প্রতিবিম্বেরও ঠিক তাই দূরত্ব হয়।
  • পার্শ্বীয় পরিবর্তন (Lateral Inversion): প্রতিবিম্বের পার্শ্বীয় পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ, আপনার ডান হাতকে আয়নায় বাম হাত বলে মনে হবে।

২. গোলীয় দর্পণ (Spherical Mirror):

যে দর্পণের প্রতিফলক তল কোনো গোলকের অংশবিশেষ, তাকে গোলীয় দর্পণ বলে। এটি দুই প্রকারের হয়:

ক) অবতল দর্পণ (Concave Mirror):

যদি গোলকের ভেতরের অবতল অংশটি প্রতিফলক তল হিসেবে কাজ করে, তবে তাকে অবতল দর্পণ বলে। চামচের ভেতরের অংশের মতো। এই দর্পণ আলোকে একটি বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত (converge) করে, তাই একে অভিসারী দর্পণও বলা হয়।

খ) উত্তল দর্পণ (Convex Mirror):

যদি গোলকের বাইরের উত্তল অংশটি প্রতিফলক তল হিসেবে কাজ করে, তবে তাকে উত্তল দর্পণ বলে। চামচের বাইরের অংশের মতো। এই দর্পণ আলোকে ছড়িয়ে দেয় (diverge), তাই একে অপসারী দর্পণও বলা হয়।

গোলীয় দর্পণ সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা:

  • মেরু (Pole, P): গোলীয় দর্পণের প্রতিফলক তলের কেন্দ্রবিন্দুকে মেরু বলে।
  • বক্রতা কেন্দ্র (Centre of Curvature, C): গোলীয় দর্পণটি যে গোলকের অংশ, সেই গোলকের কেন্দ্রকে বক্রতা কেন্দ্র বলে।
  • বক্রতা ব্যাসার্ধ (Radius of Curvature, R): দর্পণের মেরু থেকে বক্রতা কেন্দ্রের দূরত্বকে বক্রতা ব্যাসার্ধ বলে।
  • প্রধান অক্ষ (Principal Axis): দর্পণের মেরু এবং বক্রতা কেন্দ্রের মধ্যে দিয়ে যাওয়া সরলরেখাকে প্রধান অক্ষ বলে।
  • মুখ্য ফোকাস (Principal Focus, F): প্রধান অক্ষের সমান্তরাল আলোক রশ্মিগুচ্ছ প্রতিফলনের পর প্রধান অক্ষের উপর যে বিন্দুতে মিলিত হয় (অবতল দর্পণে) বা যে বিন্দু থেকে আসছে বলে মনে হয় (উত্তল দর্পণে), তাকে মুখ্য ফোকাস বলে।
  • ফোকাস দূরত্ব (Focal Length, f): মেরু থেকে মুখ্য ফোকাসের দূরত্বকে ফোকাস দূরত্ব বলে। বক্রতা ব্যাসার্ধ এবং ফোকাস দূরত্বের মধ্যে সম্পর্কটি হলো: R = 2f

অবতল দর্পণ দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন (Image formation by Concave Mirror)

অবতল দর্পণের সামনে বিভিন্ন অবস্থানে বস্তু রাখলে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের প্রতিবিম্ব গঠিত হয়।

  • বস্তু অসীমে থাকলে: প্রতিবিম্ব ফোকাসে (F) গঠিত হয়। এটি অত্যন্ত ছোট, সদ (real) এবং উল্টো (inverted) হয়।
  • বস্তু বক্রতা কেন্দ্রের (C) বাইরে থাকলে: প্রতিবিম্ব ফোকাস (F) এবং বক্রতা কেন্দ্রের (C) মধ্যে গঠিত হয়। এটি ছোট, সদ এবং উল্টো হয়।
  • বস্তু বক্রতা কেন্দ্রে (C) থাকলে: প্রতিবিম্ব বক্রতা কেন্দ্রেই (C) গঠিত হয়। এটি বস্তুর সমান আকারের, সদ এবং উল্টো হয়।
  • বস্তু বক্রতা কেন্দ্র (C) ও ফোকাসের (F) মধ্যে থাকলে: প্রতিবিম্ব বক্রতা কেন্দ্রের (C) বাইরে গঠিত হয়। এটি বিবর্ধিত (magnified), সদ এবং উল্টো হয়।
  • বস্তু ফোকাসে (F) থাকলে: প্রতিবিম্ব অসীমে গঠিত হয়। এটি অত্যন্ত বিবর্ধিত, সদ এবং উল্টো হয়।
  • বস্তু মেরু (P) ও ফোকাসের (F) মধ্যে থাকলে: এটি একটি বিশেষ অবস্থা। এক্ষেত্রে প্রতিবিম্ব দর্পণের পেছনে গঠিত হয়। এটি বিবর্ধিত, অসদ (virtual) এবং সোজা (erect) হয়।

ব্যবহার: টর্চলাইট, সার্চলাইট, গাড়ির হেডলাইটে শক্তিশালী সমান্তরাল রশ্মি পেতে; দাড়ি কামানোর আয়না (shaving mirror) এবং দন্ত চিকিৎসকদের দ্বারা দাঁতের বিবর্ধিত প্রতিবিম্ব দেখার জন্য অবতল দর্পণ ব্যবহৃত হয়।

উত্তল দর্পণ দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন (Image formation by Convex Mirror)

উত্তল দর্পণের সামনে বস্তু যেখানেই রাখা হোক না কেন, প্রতিবিম্ব সর্বদা মেরু (P) এবং ফোকাসের (F) মধ্যে, দর্পণের পেছনে গঠিত হয়। এই প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্য হলো:

  • সর্বদা অসদ (virtual) এবং সোজা (erect) হয়।
  • সর্বদা বস্তুর চেয়ে ছোট (diminished) হয়।

ব্যবহার: গাড়ির ভিউ-ফাইন্ডার বা রিয়ার-ভিউ মিরর হিসেবে উত্তল দর্পণ ব্যবহৃত হয় কারণ এটি একটি বিস্তৃত এলাকার সোজা এবং ছোট প্রতিবিম্ব গঠন করে, যা চালককে পেছনের ট্র্যাফিক দেখতে সাহায্য করে।

গোলীয় দর্পণের জন্য চিহ্ন প্রথা এবং দর্পণের সূত্র

কার্তেসীয় চিহ্ন প্রথা (New Cartesian Sign Convention):

সঠিকভাবে হিসাব করার জন্য একটি নির্দিষ্ট চিহ্ন প্রথা অনুসরণ করা হয়:

  1. সমস্ত দূরত্ব দর্পণের মেরু (P) থেকে প্রধান অক্ষ বরাবর মাপা হয়।
  2. আপতিত রশ্মির অভিমুখে মাপা দূরত্বকে ধনাত্মক (+) এবং তার বিপরীত অভিমুখে মাপা দূরত্বকে ঋণাত্মক (-) ধরা হয়। (সহজ কথায়, দর্পণের বাম দিকের দূরত্ব ঋণাত্মক এবং ডান দিকের দূরত্ব ধনাত্মক)।
  3. প্রধান অক্ষের উপরের দিকের উচ্চতাকে ধনাত্মক (+) এবং নিচের দিকের উচ্চতাকে ঋণাত্মক (-) ধরা হয়।

এই প্রথা অনুযায়ী, অবতল দর্পণের ফোকাস দূরত্ব (f) ঋণাত্মক এবং উত্তল দর্পণের ফোকাস দূরত্ব (f) ধনাত্মক হয়। বস্তুর দূরত্ব (u) সর্বদা ঋণাত্মক হয় কারণ বস্তুকে সবসময় দর্পণের বাম দিকে রাখা হয়।

দর্পণের সূত্র (Mirror Formula):

বস্তুর দূরত্ব (u), প্রতিবিম্বের দূরত্ব (v) এবং ফোকাস দূরত্বের (f) মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনকারী সূত্রটি হলো:

1/v + 1/u = 1/f

বিবর্ধন (Magnification, m):

প্রতিবিম্বের উচ্চতা (h') এবং বস্তুর উচ্চতার (h) অনুপাতকে রৈখিক বিবর্ধন বলে।

m = h'/h = -v/u

  • যদি m ঋণাত্মক হয়, তবে প্রতিবিম্ব সদ ও উল্টো।
  • যদি m ধনাত্মক হয়, তবে প্রতিবিম্ব অসদ ও সোজা।
  • যদি |m| > 1 হয়, তবে প্রতিবিম্ব বিবর্ধিত।
  • যদি |m| < 1 হয়, তবে প্রতিবিম্ব ছোট।
  • যদি |m| = 1 হয়, তবে প্রতিবিম্ব বস্তুর সমান আকারের।

আলোর প্রতিসরণ (Refraction of Light)

যখন আলোক রশ্মি একটি স্বচ্ছ মাধ্যম থেকে অন্য স্বচ্ছ মাধ্যমে তির্যকভাবে প্রবেশ করে, তখন দুই মাধ্যমের বিভেদতলে তার গতির অভিমুখের পরিবর্তন ঘটে। এই ঘটনাকে আলোর প্রতিসরণ বলা হয়।

প্রতিসরণের কারণ: বিভিন্ন মাধ্যমে আলোর বেগ ভিন্ন ভিন্ন হয়। যখন আলো এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে প্রবেশ করে, তখন তার বেগের পরিবর্তন হয়, যার ফলে তার পথের অভিমুখ বেঁকে যায়। আলো যখন লঘু মাধ্যম (যেমন: বায়ু) থেকে ঘন মাধ্যমে (যেমন: জল বা কাচ) প্রবেশ করে, তখন এটি অভিলম্বের দিকে বেঁকে যায়। বিপরীতভাবে, যখন ঘন মাধ্যম থেকে লঘু মাধ্যমে প্রবেশ করে, তখন এটি অভিলম্ব থেকে দূরে সরে যায়।

প্রতিসরণের সূত্র (Laws of Refraction):

  1. প্রথম সূত্র: আপতিত রশ্মি, প্রতিসৃত রশ্মি এবং দুই মাধ্যমের বিভেদতলের উপর আপতন বিন্দুতে অঙ্কিত অভিলম্ব একই সমতলে থাকে।
  2. দ্বিতীয় সূত্র (স্নেলের সূত্র - Snell's Law): দুটি নির্দিষ্ট মাধ্যম এবং একটি নির্দিষ্ট বর্ণের আলোর জন্য, আপতন কোণের সাইন (sin i) এবং প্রতিসরণ কোণের সাইন (sin r) এর অনুপাত সর্বদা ধ্রুবক থাকে। এই ধ্রুবকটিকে প্রথম মাধ্যমের সাপেক্ষে দ্বিতীয় মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক (refractive index) বলা হয়।

অর্থাৎ, sin i / sin r = n₂₁ (ধ্রুবক), যেখানে n₂₁ হলো মাধ্যম ১ এর সাপেক্ষে মাধ্যম ২ এর প্রতিসরাঙ্ক।

প্রতিসরাঙ্ক (Refractive Index):

কোনো মাধ্যমে আলোর বেগ কতটা কমবে, তা প্রতিসরাঙ্ক নির্দেশ করে। পরম প্রতিসরাঙ্ক (absolute refractive index) হলো শূন্য মাধ্যমের (vacuum) সাপেক্ষে কোনো মাধ্যমের প্রতিসরাঙ্ক। n = c/v, যেখানে c হলো শূন্য মাধ্যমে আলোর বেগ এবং v হলো ওই নির্দিষ্ট মাধ্যমে আলোর বেগ। প্রতিসরাঙ্ক যত বেশি, মাধ্যমটি তত বেশি ঘন এবং তাতে আলোর বেগ তত কম।

গোলীয় লেন্স দ্বারা প্রতিসরণ

লেন্স হলো দুটি তল দ্বারা সীমাবদ্ধ একটি স্বচ্ছ প্রতিসারক মাধ্যম, যার অন্তত একটি তল গোলীয় হয়। লেন্স দুই প্রকারের:

১. উত্তল লেন্স (Convex Lens):

এই লেন্সের মধ্যভাগ মোটা এবং প্রান্তভাগ সরু হয়। এটি সমান্তরাল আলোক রশ্মিগুচ্ছকে প্রতিসরণের পর একটি বিন্দুতে মিলিত করে, তাই একে অভিসারী লেন্সও (converging lens) বলা হয়।

২. অবতল লেন্স (Concave Lens):

এই লেন্সের মধ্যভাগ সরু এবং প্রান্তভাগ মোটা হয়। এটি সমান্তরাল আলোক রশ্মিগুচ্ছকে প্রতিসরণের পর অপসৃত করে, অর্থাৎ ছড়িয়ে দেয়। তাই একে অপসারী লেন্সও (diverging lens) বলা হয়।

উত্তল লেন্স দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন

উত্তল লেন্স দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন অনেকটা অবতল দর্পণের মতোই।

  • বস্তু অসীমে থাকলে: প্রতিবিম্ব দ্বিতীয় মুখ্য ফোকাসে (F₂) গঠিত হয়। এটি অত্যন্ত ছোট, সদ ও উল্টো।
  • বস্তু 2F₁ এর বাইরে থাকলে: প্রতিবিম্ব F₂ এবং 2F₂ এর মধ্যে গঠিত হয়। এটি ছোট, সদ ও উল্টো।
  • বস্তু 2F₁ তে থাকলে: প্রতিবিম্ব 2F₂ তে গঠিত হয়। এটি সমান আকারের, সদ ও উল্টো।
  • বস্তু F₁ ও 2F₁ এর মধ্যে থাকলে: প্রতিবিম্ব 2F₂ এর বাইরে গঠিত হয়। এটি বিবর্ধিত, সদ ও উল্টো।
  • বস্তু ফোকাসে (F₁) থাকলে: প্রতিবিম্ব অসীমে গঠিত হয়। এটি অত্যন্ত বিবর্ধিত, সদ ও উল্টো।
  • বস্তু আলোক কেন্দ্র (O) ও ফোকাসের (F₁) মধ্যে থাকলে: প্রতিবিম্ব বস্তুর দিকেই গঠিত হয়। এটি বিবর্ধিত, অসদ ও সোজা হয়। এই নীতির উপর ভিত্তি করেই বিবর্ধক কাচ (magnifying glass) কাজ করে।

অবতল লেন্স দ্বারা প্রতিবিম্ব গঠন

অবতল লেন্সের সামনে বস্তু যেখানেই রাখা হোক না কেন, প্রতিবিম্ব সর্বদা আলোক কেন্দ্র (O) এবং ফোকাসের (F₁) মধ্যে গঠিত হয়। এই প্রতিবিম্বের বৈশিষ্ট্য হলো:

  • সর্বদা অসদ (virtual) এবং সোজা (erect) হয়।
  • সর্বদা বস্তুর চেয়ে ছোট (diminished) হয়।

লেন্সের সূত্র ও ক্ষমতা

লেন্সের ক্ষেত্রেও দর্পণের মতো চিহ্ন প্রথা ব্যবহার করা হয়, তবে সমস্ত দূরত্ব আলোক কেন্দ্র (O) থেকে মাপা হয়। উত্তল লেন্সের ফোকাস দূরত্ব (f) ধনাত্মক এবং অবতল লেন্সের ফোকাস দূরত্ব (f) ঋণাত্মক হয়।

লেন্সের সূত্র (Lens Formula):

1/v - 1/u = 1/f (এখানে দর্পণের সূত্রের সাথে চিহ্নের পার্থক্য লক্ষ্য করুন)

বিবর্ধন (Magnification, m):

m = h'/h = v/u (এখানে দর্পণের সূত্রের সাথে চিহ্নের পার্থক্য লক্ষ্য করুন, কোনো ঋণাত্মক চিহ্ন নেই)

লেন্সের ক্ষমতা (Power of a Lens):

কোনো লেন্সের আলোক রশ্মিকে অভিসারী বা অপসারী করার মাত্রাকে তার ক্ষমতা বলে। এটি লেন্সের ফোকাস দূরত্বের (মিটারে) অন্যোন্যক (reciprocal)।

P = 1/f (যখন f মিটারে)

লেন্সের ক্ষমতার একক হলো ডায়োপ্টার (Dioptre, D)। 1 D হলো সেই লেন্সের ক্ষমতা যার ফোকাস দূরত্ব 1 মিটার। উত্তল লেন্সের ক্ষমতা ধনাত্মক এবং অবতল লেন্সের ক্ষমতা ঋণাত্মক হয়।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: গাড়িতে রিয়ার-ভিউ মিরর হিসেবে উত্তল দর্পণ ব্যবহার করা হয় কেন?

উত্তর: দুটি প্রধান কারণে গাড়িতে রিয়ার-ভিউ মিরর হিসেবে উত্তল দর্পণ ব্যবহার করা হয়:

  1. বিস্তৃত দৃষ্টি ক্ষেত্র (Wider field of view): উত্তল দর্পণ বাইরের দিকে বাঁকানো হওয়ায় এটি একটি অনেক বড় এলাকার প্রতিবিম্ব গঠন করতে পারে। ফলে চালক তার পেছনের বিস্তৃত রাস্তা এবং অন্যান্য যানবাহন দেখতে পান, যা নিরাপত্তা বাড়ায়।
  2. সোজা প্রতিবিম্ব (Erect image): উত্তল দর্পণ সর্বদা বস্তুর একটি সোজা (সমশীর্ষ) প্রতিবিম্ব গঠন করে। যদি অবতল দর্পণ ব্যবহার করা হতো, তবে কিছু ক্ষেত্রে পেছনের গাড়ির উল্টো প্রতিবিম্ব দেখা যেত, যা চালকের জন্য বিভ্রান্তিকর হতো। যদিও প্রতিবিম্বটি বস্তুর চেয়ে ছোট হয়, তবুও এর সোজা প্রকৃতি এবং বিস্তৃত দর্শন চালনার জন্য অত্যন্ত সহায়ক।

প্রশ্ন ২: সদবিম্ব ও অসদবিম্বের মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: সদবিম্ব (Real image) এবং অসদবিম্বের (Virtual image) মধ্যে মূল পার্থক্যগুলি হলো:

  • গঠন: যখন প্রতিফলিত বা প্রতিসৃত রশ্মিগুলি প্রকৃতপক্ষে কোনো বিন্দুতে মিলিত হয়, তখন সদবিম্ব গঠিত হয়। অন্যদিকে, যখন রশ্মিগুলিকে পেছনের দিকে বাড়ালে কোনো বিন্দুতে মিলিত হচ্ছে বলে মনে হয়, তখন অসদবিম্ব গঠিত হয়।
  • পর্দায় গঠন: সদবিম্বকে পর্দায় ফেলা যায় (যেমন সিনেমার পর্দায় ছবি)। কিন্তু অসদবিম্বকে পর্দায় ফেলা যায় না (যেমন সমতল আয়নায় আমাদের প্রতিবিম্ব)।
  • প্রকৃতি: সদবিম্ব সর্বদা বস্তুর সাপেক্ষে উল্টো (inverted) হয়। অসদবিম্ব সর্বদা বস্তুর সাপেক্ষে সোজা (erect) হয়।
  • উদাহরণ: অবতল দর্পণ বা উত্তল লেন্স দ্বারা গঠিত বেশিরভাগ প্রতিবিম্বই সদ। সমতল দর্পণ, উত্তল দর্পণ এবং অবতল লেন্স সর্বদা অসদবিম্ব গঠন করে।

প্রশ্ন ৩: একটি লেন্সের ক্ষমতা -2.0 D হলে তার ফোকাস দূরত্ব কত এবং এটি কী ধরনের লেন্স?

উত্তর: আমরা জানি, লেন্সের ক্ষমতা (P) এবং ফোকাস দূরত্বের (f) মধ্যে সম্পর্ক হলো P = 1/f।

এখানে, P = -2.0 D।

সুতরাং, f = 1/P = 1 / (-2.0) মিটার = -0.5 মিটার।

সেন্টিমিটারে প্রকাশ করলে, f = -0.5 × 100 সেমি = -50 সেমি।

যেহেতু লেন্সের ক্ষমতা এবং ফোকাস দূরত্ব উভয়ই ঋণাত্মক (-), তাই এটি একটি অবতল লেন্স (Concave Lens)। এই লেন্সটি অপসারী প্রকৃতির এবং এর ফোকাস দূরত্ব ৫০ সেমি।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়টি ভালোভাবে বোঝার জন্য কয়েকটি মূল বিষয় মনে রাখা জরুরি:

  • আলোর প্রতিফলন: আলো কোনো তলে বাধা পেয়ে ফিরে আসার ঘটনা। এটি দুটি সূত্র মেনে চলে: ∠i = ∠r এবং আপতিত রশ্মি, প্রতিফলিত রশ্মি ও অভিলম্ব একই সমতলে থাকে।
  • গোলীয় দর্পণ: অবতল দর্পণ (অভিসারী) এবং উত্তল দর্পণ (অপসারী)। অবতল দর্পণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সদ ও উল্টো প্রতিবিম্ব গঠন করে, তবে একটি বিশেষ ক্ষেত্রে অসদ ও সোজা প্রতিবিম্ব গঠন করে। উত্তল দর্পণ সর্বদা অসদ, সোজা ও ছোট প্রতিবিম্ব গঠন করে।
  • দর্পণের সূত্র: 1/v + 1/u = 1/f এবং বিবর্ধন m = -v/u।
  • আলোর প্রতিসরণ: এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে যাওয়ার সময় আলোর পথ বেঁকে যাওয়ার ঘটনা। এটি স্নেলের সূত্র (sin i / sin r = ধ্রুবক) মেনে চলে।
  • গোলীয় লেন্স: উত্তল লেন্স (অভিসারী) এবং অবতল লেন্স (অপসারী)। উত্তল লেন্সের আচরণ অবতল দর্পণের মতো এবং অবতল লেন্সের আচরণ উত্তল দর্পণের মতো।
  • লেন্সের সূত্র: 1/v - 1/u = 1/f এবং বিবর্ধন m = v/u।
  • লেন্সের ক্ষমতা: P = 1/f (মিটারে)। এর একক ডায়োপ্টার (D)। উত্তল লেন্সের ক্ষমতা ধনাত্মক এবং অবতল লেন্সের ক্ষমতা ঋণাত্মক।

আলোর এই ধর্মগুলি শুধুমাত্র পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং আমাদের চারপাশের প্রযুক্তি, যেমন ক্যামেরা, মাইক্রোস্কোপ, টেলিস্কোপ এবং মানুষের চোখের কার্যকারিতা বোঝার জন্যও অপরিহার্য। এই অধ্যায়ের ধারণাগুলি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারলে পদার্থবিজ্ঞানের উচ্চতর বিষয়গুলি বোঝা অনেক সহজ হয়ে যাবে।