ভালোবাসা নাকি একাকীত্ব?
আচ্ছা, একা থাকতে কার ভালো লাগে বলুন তো? সঙ্গীহীন জীবন, ঠিক যেন লবণ ছাড়া রান্না। আমাদের জীবনে যেমন বন্ধু, পরিবার বা ভালোবাসার মানুষের প্রয়োজন হয়, তেমনই কি পশু-পাখিদেরও হয়? আমরা হয়তো ভাবি, ওদের আবার কিসের একাকীত্ব! কিন্তু সুইজারল্যান্ডের মতো একটি দেশ আছে, যেখানে এই একাকীত্বকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয় যে, তা রীতিমতো শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। তবে এই আইন মানুষের জন্য নয়, বরং পৃথিবীর অন্যতম মিষ্টি আর আদুরে এক প্রাণীর জন্য।
সুইজারল্যান্ড: যেখানে একাকীত্ব বেআইনি!
ভাবুন তো একবার, আপনি এমন একটি দেশে বাস করছেন যেখানে একা থাকাটা আইনত দণ্ডনীয়! সুইজারল্যান্ডে ঠিক এমনটাই নিয়ম, তবে তা গিনিপিগদের জন্য। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। এই ছোট্ট, আদুরে প্রাণীটিকে যদি কেউ একা পোষেন, তাহলে তাকে আইনের চোখে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হয়। [2, 4, 6] সুইজারল্যান্ডের পশু সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, সামাজিক প্রাণীদের একা রাখা তাদের প্রতি ظلم করার সামিল। [2, 5] আর গিনিপিগরা অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী। বন্য পরিবেশে ওরা দল বেঁধে বা হার্ডে থাকতে ভালোবাসে। [10, 15] একা থাকলে ওরা মানসিক কষ্টে ভোগে, এমনকি ডিপ্রেশনেও চলে যেতে পারে। [4, 8] তাই, দেশের সরকার আইন করে এই একাকীত্বকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
“সুইজারল্যান্ডে একটি মাত্র গিনিপিগ পোষা বেআইনি। কারণ ওরা একা থাকলে সঙ্গীহীনতায় কষ্ট পায় এবং এটি পশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা হিসেবে বিবেচিত হয়।” [3, 11]
এই আইনটি ২০০৮ সালে পাশ হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল পশুদের ‘সামাজিক অধিকার’ নিশ্চিত করা। [6, 11] বিষয়টা কতটা গভীর ভেবে দেখুন! একটা দেশ তাদের পশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা এতটাই ভাবছে যে, তাদের জন্য সঙ্গী থাকা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। ভালোবাসার এমন রূপ शायद আগে কেউ দেখেনি। এই আইন শুধু গিনিপিগের ক্ষেত্রেই নয়, টিয়াপাখি বা গোল্ডফিশের মতো সামাজিক প্রাণীদের জন্যও প্রযোজ্য। [6]
যদি একজন সঙ্গী মারা যায়? তাহলে উপায়?
এখন মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, যদি দুটি গিনিপিগের মধ্যে একটি মারা যায়, তখন কী হবে? মালিক তো তখন আইনত অপরাধী হয়ে পড়বেন! কারণ তার কাছে তখন একটি মাত্র গিনিপিগ থাকবে। এই সমস্যার সমাধানও করেছে সুইজারল্যান্ড, আর সেই সমাধানটা আরও বেশি মজার এবং মানবিক।
এই পরিস্থিতিতে একা হয়ে যাওয়া গিনিপিগের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। সেখানে এমন কিছু সংস্থা আছে, যারা ‘ভাড়ায় গিনিপিগ’ দেয়! [3, 6] হ্যাঁ, আপনি চাইলে আপনার একা হয়ে যাওয়া গিনিপিগের জন্য একজন সঙ্গী ভাড়া করতে পারবেন। এই সংস্থাগুলো অনেকটা ‘ম্যাচমেকিং’ বা ‘ডেটিং’ এজেন্সির মতো কাজ করে। তারা আপনার নিঃসঙ্গ গিনিপিগের জন্য সঠিক সঙ্গী খুঁজে দেয়, যাতে সে তার জীবনের বাকি দিনগুলো আর একা অনুভব না করে। [3] এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে, কোনো গিনিপিগকেই যেন জীবনের শেষ দিনগুলো একা কাটাতে না হয়।
ভালোবাসার অন্য নাম ‘সঙ্গ’
সুইজারল্যান্ডের এই অদ্ভুত কিন্তু সুন্দর আইন আমাদের কী শেখায়? এটা শুধু পশুদের প্রতি ভালোবাসা বা দয়ার উদাহরণ নয়, এর থেকে বড় শিক্ষাও রয়েছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনে সঙ্গ বা বন্ধুত্বের গুরুত্ব কতটা। একটা ছোট্ট প্রাণীও যদি একাকীত্বে কষ্ট পেতে পারে, তাহলে মানুষ তো পেতেই পারে।
পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দেশগুলোর তালিকায় সুইজারল্যান্ড কেন উপরের দিকে থাকে, তা এই একটি আইন থেকেই বোঝা যায়। যে দেশ একটা ছোট্ট প্রাণীর একাকীত্ব দূর করার জন্য আইন তৈরি করতে পারে, তারা মানুষের সম্পর্কের মূল্য কতটা দেয়, তা সহজেই অনুমেয়। ভালোবাসা মানে শুধু রোমান্টিক সম্পর্ক নয়, ভালোবাসা মানে পাশে থাকা, সঙ্গ দেওয়া। তাই পরেরবার যখনই কোনো পোষ্য ঘরে আনার কথা ভাববেন, তখন সুইজারল্যান্ডের এই গিনিপিগদের কথা একবার মনে করবেন। ওরা আমাদের শিখিয়ে দেয়, জীবনটা একা কাটানোর জন্য নয়, একসঙ্গে কাটানোর মধ্যেই আসল আনন্দ।