ভালোবাসা প্রকাশের জন্য মানুষ কত কিছুই না করে! কেউ তাজমহল গড়ে, কেউ লেখে প্রেমের কবিতা। কিন্তু জানেন কি, সমুদ্রের গভীরে এমন এক প্রেমিক আছে, যে তার প্রেমিকাকে জয় করার জন্য কোনো কবিতা লেখে না, বরং তৈরি করে এক অবিশ্বাস্য শিল্পকর্ম? হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন! এই শিল্পী কোনো মানুষ নয়, একটি ছোট্ট পাফারফিশ।
সাগরের তলার শিল্পী: সাদা-ছোপ পাফারফিশ
ভাবুন তো, সমুদ্রের নিচে বালির ওপর তৈরি করা হয়েছে নিখুঁত জ্যামিতিক নকশা, যা দেখে মনে হবে কোনো শিল্পী তার মনের মাধুরী মিশিয়ে এঁকেছেন। ১৯৯৫ সালে জাপানের আমামি ওশিমা দ্বীপের কাছে ডুবুরিরা প্রথম এই অদ্ভুত বৃত্তাকার নকশাগুলো আবিষ্কার করেন। প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি একটি রহস্য ছিল। অনেকেই ভাবতেন, হয়তো এটি কোনো ভিনগ্রহের প্রাণীর কাজ বা இயற்கার অদ্ভুত কোনো খেলা। কিন্তু ২০১১ সালে আসল রহস্যের সমাধান হয়। জানা যায়, এই অসাধারণ শিল্পকর্মের স্রষ্টা হলো ছোট্ট একটি পুরুষ পাফারফিশ (বৈজ্ঞানিক নাম: Torquigener albomaculosus)।
ভালোবাসার সঙ্গীকে আকৃষ্ট করার জন্য পুরুষ পাফারফিশ সমুদ্রের তলদেশে তার শরীরের চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বড় এবং নিখুঁত জ্যামিতিক নকশার বালি দিয়ে আল্পনা তৈরি করে।
মাত্র ১২ সেন্টিমিটার বা প্রায় ৫ ইঞ্চি লম্বা এই পুরুষ মাছটি তার পাখনা ব্যবহার করে একটানা ৭ থেকে ৯ দিন ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রায় ৭ ফুট ব্যাসের একটি বৃত্তাকার নকশা তৈরি করে। এই নকশা শুধু সুন্দরই নয়, এর গঠনও বেশ জটিল। বৃত্তের বাইরের দিকে উঁচু-নিচু খাঁজ এবং মাঝখানে মসৃণ বালির স্তর থাকে। পুরুষ মাছটি এই শিল্পকর্মকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে ঝিনুক এবং প্রবালের টুকরো দিয়ে সাজিয়ে তোলে। ভাবা যায়, প্রেমিকার মন পেতে কী পরিমাণ নিষ্ঠা আর পরিশ্রম!
এই পুরো প্রক্রিয়াটি আসলে একটি প্রেম নিবেদনের অভিনব উপায়। যখন নকশাটি তৈরি হয়ে যায়, তখন স্ত্রী পাফারফিশেরা সেই এলাকা ঘুরে দেখে এবং যার শিল্পকর্ম সবচেয়ে সুন্দর ও নিখুঁত হয়, তাকেই সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়। স্ত্রী মাছটি নকশার মাঝখানে ডিম পাড়ে এবং পুরুষ মাছটি সেই ডিম নিষিক্ত করে। এরপর স্ত্রী মাছটি চলে গেলেও, প্রেমিক পুরুষটি সেখানেই থেকে যায়। সে পরবর্তী ছয় দিন ধরে ডিমগুলোকে পাহারা দেয়, যাতে অন্য কোনো প্রাণী সেগুলোর ক্ষতি করতে না পারে। এই নকশা শুধু প্রেমিকার মন জয় করতেই সাহায্য করে না, বরং ডিমগুলোকে সমুদ্রের স্রোত থেকেও রক্ষা করে। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, এই নকশার গঠন এমনভাবে তৈরি যা জলের প্রবাহকে প্রায় ২৫% কমিয়ে দেয় এবং ডিমগুলোকে সুরক্ষিত রাখে।
মানুষের ভালোবাসার গল্প তো আমরা হামেশাই শুনি, কিন্তু সমুদ্রের তলার এই ছোট্ট শিল্পীর ভালোবাসার প্রকাশ সত্যিই অবাক করার মতো। সে তার সঙ্গীর জন্য কোনো বিশাল অট্টালিকা বানায় না, কিন্তু যা বানায় তা নিষ্ঠা, পরিশ্রম আর ভালোবাসার এক নিখুঁত প্রতিফলন। পরেরবার যখন ভালোবাসার কোনো নিদর্শনের কথা ভাববেন, তখন এই ছোট্ট পাফারফিশের কথা মনে করতে ভুলবেন না যেন!