বিষয়ের ভূমিকা
বিশ্বের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে যা কেবল একটি দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সমগ্র মানব সভ্যতার গতিপথকে প্রভাবিত করে। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব (The French Revolution) ঠিক তেমনই একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এটি ছিল কেবল একটি দেশের রাজার বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ নয়; এটি ছিল সামন্ততন্ত্র, স্বৈরাচার এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক বিরাট বিস্ফোরণ। এই বিপ্লবের মূলমন্ত্র ছিল – 'স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব' (Liberty, Equality, and Fraternity), যা পরবর্তীকালে বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
নবম শ্রেণির ইতিহাসের প্রথম অধ্যায়ে আমরা এই ঐতিহাসিক বিপ্লবের গভীরে প্রবেশ করব। আমরা জানব, কোন পরিস্থিতিতে ফরাসি জনগণ তাদের শত শত বছরের পুরোনো রাজতন্ত্রকে উৎখাত করতে বাধ্য হয়েছিল। আমরা সেই সময়ের সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সংকট এবং দার্শনিকদের যুগান্তকারী চিন্তাভাবনা নিয়ে আলোচনা করব। বাস্তিল দুর্গের পতনের মতো নাটকীয় ঘটনা থেকে শুরু করে সন্ত্রাসের রাজত্ব এবং নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্থান পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়কে আমরা খুঁটিয়ে দেখব। এই অধ্যায়টি আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে কীভাবে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের ধারণাগুলো সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। চলুন, ইতিহাসের এই রোমাঞ্চকর যাত্রায় শামিল হওয়া যাক।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি সমাজ: এক গভীর বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি
ফরাসি বিপ্লবকে বুঝতে হলে, সবার আগে সেই সময়ের ফরাসি সমাজ বা 'পুরাতন ব্যবস্থা' (Ancien Régime) সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। এই সমাজ মূলত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল, যা 'এস্টেট' (Estate) নামে পরিচিত। এই বিভাজন জন্মসূত্রে নির্ধারিত হতো এবং এর মধ্যে ছিল আকাশ-পাতাল বৈষম্য।
- প্রথম এস্টেট (The First Estate): যাজক সম্প্রদায় (Clergy)
- এরা ছিলেন চার্চের কর্মকর্তা, অর্থাৎ পাদ্রী ও যাজকগণ। জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশেরও কম হয়েও তারা দেশের প্রায় ১০ শতাংশ জমির মালিক ছিলেন।
- তাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল যে, তারা রাষ্ট্রকে কোনো প্রত্যক্ষ কর (যেমন 'Taille') দিতেন না। বরং, তারা কৃষকদের কাছ থেকে 'টিথ' (Tithe) বা ধর্মকর আদায় করতেন, যা ছিল ফসলের এক-দশমাংশ।
- এই এস্টেটের মধ্যেও বিভেদ ছিল। উচ্চপদস্থ যাজকরা (বিশপ, আর্চবিশপ) অভিজাত পরিবার থেকে আসতেন এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন, অন্যদিকে গ্রামের সাধারণ পাদ্রীদের জীবনযাপন ছিল সাধারণ মানুষের মতোই।
- দ্বিতীয় এস্টেট (The Second Estate): অভিজাত সম্প্রদায় (Nobility)
- এরা ছিলেন দেশের জমিদার এবং রাজপরিবারের সদস্যরা। জনসংখ্যার প্রায় ২ শতাংশ হয়েও তারা দেশের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ জমির মালিক ছিলেন।
- যাজকদের মতো তারাও করমুক্ত জীবন উপভোগ করতেন। এছাড়াও, তারা সামন্ততান্ত্রিক বিশেষ অধিকার (feudal privileges) ভোগ করতেন। যেমন, কৃষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সামন্ত কর আদায় করা এবং তাদের দিয়ে বেগার খাটানো।
- রাষ্ট্রের সমস্ত উচ্চপদ, যেমন - সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনে তাদের একচেটিয়া অধিকার ছিল।
- তৃতীয় এস্টেট (The Third Estate): সাধারণ জনগণ (Commoners)
- ফ্রান্সের প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষই ছিল এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে তারা ছিল সবচেয়ে বঞ্চিত। এই এস্টেটের মধ্যে বৈচিত্র্য ছিল অনেক।
- বুর্জোয়া (Bourgeoisie): এরা ছিলেন তৃতীয় এস্টেটের উচ্চস্তর। এর মধ্যে ছিলেন বড় ব্যবসায়ী, আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক এবং সরকারি কর্মচারী। তারা শিক্ষিত এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল হলেও, সামাজিক মর্যাদা এবং রাজনৈতিক অধিকারের দিক থেকে অভিজাতদের থেকে পিছিয়ে ছিলেন। বিপ্লবের আগুন জ্বালাতে এই শ্রেণিই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিল।
- কৃষক (Peasants): এরা ছিল তৃতীয় এস্টেটের সবচেয়ে বড় অংশ, জনসংখ্যার প্রায় ৮০ শতাংশ। তাদের ওপরই ছিল করের সবচেয়ে বেশি বোঝা। তাদের রাষ্ট্রকে 'Taille' (ভূমি কর), চার্চকে 'Tithe' এবং জমিদারকে বিভিন্ন সামন্ত কর দিতে হতো। এছাড়াও, লবণের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ওপর চাপানো 'গ্যাবেল' (Gabelle) কর তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল।
- শহুরে শ্রমিক ও কারিগর (Urban Workers and Artisans): এদের 'সাঁ-কুলোৎ' (Sans-culottes) বলা হতো, কারণ তারা অভিজাতদের মতো হাঁটু পর্যন্ত ব্রিচিস (knee-breeches) পরত না। তারা শহরের কারখানা ও ওয়ার্কশপে কাজ করত। তাদের মজুরি ছিল কম, কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, বিশেষ করে পাউরুটির দাম ছিল আকাশছোঁয়া। খাদ্যের দাম সামান্য বাড়লেই তাদের জীবনে সংকট নেমে আসত।
এই গভীর সামাজিক বৈষম্য, যেখানে প্রথম দুই এস্টেট সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত আর তৃতীয় এস্টেট সমস্ত দায়িত্ব ও করের বোঝা বহন করত, তা জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভই ছিল ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম প্রধান কারণ।
২. বিপ্লবের কারণসমূহ: কেন জ্বলেছিল বিদ্রোহের আগুন?
ফরাসি বিপ্লব কোনো একটি কারণে ঘটেনি। এর পিছনে ছিল একাধিক সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং বৌদ্ধিক কারণের সম্মিলিত প্রভাব।
ক) অর্থনৈতিক কারণ (Economic Causes)
- রাজকোষ শূন্য: রাজা ষোড়শ লুই (Louis XVI) যখন ১৭৭৪ সালে সিংহাসনে বসেন, তখন তিনি একটি প্রায় শূন্য রাজকোষ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, বিশেষ করে আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্রিটেনকে পরাস্ত করার জন্য ফ্রান্সের অংশগ্রহণ, দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল।
- বিলাসবহুল জীবনযাপন: ভার্সাইয়ের বিশাল রাজপ্রাসাদে রাজা ও রানী মারি আঁতোয়ানেত (Marie Antoinette)-এর বিলাসবহুল জীবন এবং রাজসভার অত্যধিক খরচ জনগণের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। রানীকে অনেকেই 'মাদাম ডেফিসিট' বা 'ঘাটতির রানী' বলে বিদ্রূপ করত।
- ত্রুটিপূর্ণ কর ব্যবস্থা: আগেই বলা হয়েছে, করের সমস্ত বোঝা ছিল তৃতীয় এস্টেটের ওপর। প্রথম দুই এস্টেট করমুক্ত থাকায় রাষ্ট্র পর্যাপ্ত রাজস্ব আদায় করতে পারছিল না। এই অন্যায় ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছিল।
- জীবনযাত্রার সংকট (Subsistence Crisis): অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছিল, কিন্তু খাদ্যশস্যের উৎপাদন সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে, খাদ্যের প্রধান উপাদান পাউরুটির দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। এর উপর, খরার বা শিলাবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠত। গরিব শ্রমিক ও কৃষকদের জন্য দুবেলা খাবার জোটানোই কঠিন হয়ে পড়েছিল। এই খাদ্য সংকট প্রায়ই দাঙ্গার সৃষ্টি করত।
খ) রাজনৈতিক কারণ (Political Causes)
- স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র: ফ্রান্সের বুরবোঁ (Bourbon) রাজারা ঐশ্বরিক ক্ষমতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তারা নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে মনে করতেন এবং তাদের ক্ষমতা ছিল অবাধ। জনগণের কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিল না।
- ষোড়শ লুই-এর দুর্বল শাসন: রাজা ষোড়শ লুই ছিলেন একজন দয়ালু কিন্তু দুর্বল এবং সিদ্ধান্তহীন শাসক। তিনি প্রায়শই তার স্ত্রী মারি আঁতোয়ানেত এবং придворের অভিজাতদের দ্বারা প্রভাবিত হতেন। দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে তিনি বারবার ব্যর্থ হন।
- প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা: সমগ্র ফ্রান্সে কোনো সুসংহত আইন ব্যবস্থা ছিল না। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের আইন প্রচলিত ছিল, যা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল।
গ) বৌদ্ধিক কারণ (Intellectual Causes)
অষ্টাদশ শতাব্দী ছিল জ্ঞানদীপ্তি বা আলোকায়নের যুগ (Age of Enlightenment)। এই সময়ে জন লক, জ্যাঁ-জ্যাক রুশো, এবং মন্তেস্কুর মতো দার্শনিকদের লেখনী ফরাসি সমাজে এক নতুন চেতনার জন্ম দেয়।
- জন লক (John Locke): তার 'টু ট্রিটিজেস অফ গভর্নমেন্ট' (Two Treatises of Government) গ্রন্থে তিনি রাজার ঐশ্বরিক এবং অবাধ ক্ষমতার তত্ত্বকে खंडन করেন। তিনি বলেন যে, সরকার জনগণের সম্মতির ওপর ভিত্তি করে গঠিত হওয়া উচিত।
- জ্যাঁ-জ্যাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau): তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'দ্য সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট' (The Social Contract)-এ তিনি এক নতুন ধরনের সরকারের প্রস্তাব দেন, যা জনগণ এবং তাদের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি সামাজিক চুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। তার 'সাধারণ ইচ্ছার' (General Will) ধারণা গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করে।
- মন্তেস্কু (Montesquieu): 'দ্য স্পিরিট অফ দ্য লজ' (The Spirit of the Laws) গ্রন্থে তিনি ক্ষমতার বিভাজন নীতির (separation of powers) কথা বলেন। তিনি সরকারের ক্ষমতাকে আইনসভা (legislative), নির্বাহী বিভাগ (executive), এবং বিচার বিভাগ (judicial)-এর মধ্যে ভাগ করার প্রস্তাব দেন, যাতে কোনো এক বিভাগ স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে।
এই দার্শনিকদের চিন্তাভাবনা বই, সংবাদপত্র, এবং সেলুন (salon) বা কফি হাউসের আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে উৎসাহিত করে।
৩. বিপ্লবের বিস্ফোরণ এবং তার বিভিন্ন পর্যায়
ফরাসি বিপ্লব ছিল একটি দীর্ঘ এবং জটিল প্রক্রিয়া, যা বেশ কয়েকটি পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়েছিল।
ক) বিপ্লবের সূচনা (The Outbreak of the Revolution)
- এস্টেটস-জেনারেলের অধিবেশন (Estates-General): অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় নতুন কর আরোপের জন্য রাজা ষোড়শ লুই ১৭৮৯ সালের ৫ই মে, ১৭৫ বছর পর, এস্টেটস-জেনারেলের অধিবেশন ডাকতে বাধ্য হন।
- ভোটাধিকার নিয়ে বিতর্ক: পুরোনো নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি এস্টেটের একটিমাত্র ভোট ছিল। এর ফলে, প্রথম ও দ্বিতীয় এস্টেট একজোট হয়ে সহজেই তৃতীয় এস্টেটের দাবিকে নাকচ করে দিতে পারত। তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা দাবি করেন যে, প্রত্যেক প্রতিনিধির একটি করে ভোট থাকা উচিত (voting by head)। রাজা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেন।
- জাতীয় সভা এবং টেনিস কোর্টের শপথ (National Assembly and the Tennis Court Oath): রাজার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে তৃতীয় এস্টেটের প্রতিনিধিরা ২০শে জুন, ১৭৮৯ তারিখে ভার্সাইয়ের একটি টেনিস কোর্টে সমবেত হন। তারা নিজেদের 'জাতীয় সভা' (National Assembly) বলে ঘোষণা করেন এবং শপথ নেন যে, ফ্রান্সের জন্য একটি নতুন সংবিধান রচনা না করা পর্যন্ত তারা একত্রিত থাকবেন। এই ঘটনাটি 'টেনিস কোর্টের শপথ' নামে পরিচিত।
- বাস্তিল দুর্গের পতন (Storming of the Bastille): এদিকে প্যারিসে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, রাজা সেনাবাহিনী দিয়ে জাতীয় সভাকে ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। উত্তেজিত জনতা ১৪ই জুলাই, ১৭৮৯ তারিখে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের প্রতীক বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ করে। তারা দুর্গটি ধ্বংস করে দেয় এবং সেখানকার বন্দিদের মুক্ত করে। এই ঘটনাটি ফরাসি বিপ্লবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে গণ্য হয় এবং ফ্রান্সে আজও ১৪ই জুলাই জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হয়।
খ) ফ্রান্সের সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে রূপান্তর (France becomes a Constitutional Monarchy)
- সামন্ততন্ত্রের বিলুপ্তি: বাস্তিলের পতনের পর গ্রামাঞ্চলে কৃষকরা জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে, যা 'মহান আতঙ্ক' (Great Fear) নামে পরিচিত। এই পরিস্থিতিতে, জাতীয় সভা ৪ঠা আগস্ট, ১৭৮৯ তারিখে একটি আইন পাশ করে সামন্ততান্ত্রিক কর, বিশেষ অধিকার এবং চার্চের টিথ কর বিলুপ্ত করে।
- ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণা (Declaration of the Rights of Man and of the Citizen): ২৬শে আগস্ট, ১৭৮৯ তারিখে জাতীয় সভা একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রকাশ করে। এতে জীবন, স্বাধীনতা, সম্পত্তি, এবং নিরাপত্তার মতো नैसर्गिक অধিকারগুলিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আইনের চোখে সকলকে সমান বলে ঘোষণা করা হয় এবং বাকস্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
- ১৭৯১ সালের সংবিধান: জাতীয় সভা সংবিধান রচনার কাজ সম্পন্ন করে। এই সংবিধানের মাধ্যমে ফ্রান্সকে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। রাজার ক্ষমতা সীমিত করে আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। তবে, ভোটাধিকার সকলের জন্য ছিল না। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট পরিমাণ কর প্রদানকারী 'সক্রিয় নাগরিক' (active citizens)-রাই ভোট দেওয়ার অধিকার পায়, যা অনেককে হতাশ করে।
গ) রাজতন্ত্রের অবসান ও প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা
ষোড়শ লুই নতুন ব্যবস্থাকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেননি। ১৭৯১ সালের জুন মাসে তিনি সপরিবারে দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেন কিন্তু ধরা পড়ে যান। এই ঘটনা রাজার প্রতি জনগণের বিশ্বাস সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়।
- রাজনৈতিক ক্লাবগুলির উত্থান: এই সময়ে, জ্যাকোবিন (Jacobins) এবং জিরোন্ডিন (Girondins)-দের মতো রাজনৈতিক ক্লাবগুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ম্যাক্সিমিলিয়েন রোবসপিয়ের (Maximilien Robespierre)-এর নেতৃত্বে জ্যাকোবিনরা ছিল সবচেয়ে উগ্রপন্থী। তারা রাজতন্ত্রের সম্পূর্ণ অবসান এবং একটি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়।
- প্রজাতন্ত্রের ঘোষণা: ১৭৯২ সালের এপ্রিলে ফ্রান্স অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে ফরাসি বাহিনীর পরাজয় ঘটলে প্যারিসের জনতা আরও উগ্র হয়ে ওঠে। তারা রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করে রাজাকে বন্দি করে। এরপর নতুন নির্বাচিত সভা 'কনভেনশন' (Convention) ২১শে সেপ্টেম্বর, ১৭৯২ তারিখে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায় এবং ফ্রান্সকে একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে।
- রাজার মৃত্যুদণ্ড: কনভেনশন ষোড়শ লুইয়ের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগে বিচার শুরু করে এবং তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। ২১শে জানুয়ারি, ১৭৯৩ তারিখে গিলোটিনে (Guillotine) ষোড়শ লুইয়ের শিরশ্ছেদ করা হয়।
ঘ) সন্ত্রাসের রাজত্ব (The Reign of Terror)
রাজার মৃত্যুদণ্ডের পর ফ্রান্স অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ এবং বৈদেশিক আক্রমণের সম্মুখীন হয়। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে, জ্যাকোবিনরা ক্ষমতা দখল করে। ১৭৯৩ থেকে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত রোবসপিয়েরের নেতৃত্বে চলা এই শাসনকাল 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' নামে পরিচিত।
- জননিরাপত্তা কমিটি (Committee of Public Safety): রোবসপিয়েরের নেতৃত্বে এই কমিটি গঠিত হয়, যার হাতে ছিল অবাধ ক্ষমতা।
- দমন-পীড়ন: প্রজাতন্ত্রের 'শত্রু' হিসেবে বিবেচিত যে কোনো ব্যক্তিকে – যেমন অভিজাত, যাজক, এমনকি ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক দলের সদস্য – গ্রেপ্তার করে বিপ্লবী আদালতে বিচার করা হতো। দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের গিলোটিনে হত্যা করা হতো। এই সময়ে রানী মারি আঁতোয়ানেত সহ হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়।
- রোবসপিয়েরের পতন: রোবসপিয়েরের নীতিগুলি এতটাই কঠোর ছিল যে, তার নিজের দলের লোকেরাও ভীত হয়ে পড়ে। অবশেষে, ১৭৯৪ সালের জুলাই মাসে, রোবসপিয়েরকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরের দিন তাকেও গিলোটিনে পাঠানো হয়। এর সাথে সাথেই সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটে।
ঙ) ডিরেক্টরির শাসন এবং নেপোলিয়নের উত্থান
জ্যাকোবিনদের পতনের পর ফ্রান্সের ক্ষমতা আবার অবস্থাপন্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে চলে যায়। তারা একটি নতুন সংবিধান রচনা করে, যেখানে পাঁচজন সদস্যের একটি কার্যনির্বাহী পরিষদ বা 'ডিরেক্টরি' (Directory)-র হাতে শাসনভার দেওয়া হয়। কিন্তু ডিরেক্টরদের মধ্যে প্রায়ই মতবিরোধ দেখা দিত এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা লেগেই থাকত। এই রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই ফরাসি সেনাবাহিনীর একজন তরুণ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী জেনারেল, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (Napoleon Bonaparte), ১৭৯৯ সালে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের (coup d'état) মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। এর মধ্য দিয়ে ফরাসি বিপ্লবের একটি পর্যায়ের সমাপ্তি ঘটে এবং নেপোলিয়নের যুগের সূচনা হয়।
৪. বিপ্লবের উত্তরাধিকার (Legacy of the French Revolution)
ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী এবং বিশ্বব্যাপী।
- গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রের আদর্শ: এই বিপ্লব বিশ্বকে 'স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব'-এর মতো শক্তিশালী আদর্শ উপহার দিয়েছে। এটি স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে জনগণের সার্বভৌমত্বের (popular sovereignty) ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করে, যা পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক সরকার গঠনে অনুপ্রেরণা জোগায়।
- সামন্ততন্ত্রের অবসান: বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সে এবং পরে ইউরোপের অন্যান্য অংশেও সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটে। এটি সামাজিক গতিশীলতা বাড়ায় এবং পুঁজিবাদের বিকাশের পথ প্রশস্ত করে।
- জাতীয়তাবাদের উত্থান: বিপ্লবের সময় ফরাসি জনগণের মধ্যে যে ঐক্য ও দেশপ্রেমের জন্ম হয়েছিল, তা আধুনিক জাতীয়তাবাদের (nationalism) ধারণার জন্ম দেয়। 'রাজার প্রজা' থেকে 'দেশের নাগরিক'-এ রূপান্তরের ধারণাটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
- মানবাধিকারের ধারণা: 'ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণা' ছিল মানবাধিকারের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এটি বিশ্বের বহু দেশের সংবিধান এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রকে প্রভাবিত করেছে।
- নারীর ভূমিকা: বিপ্লবের সময় নারীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল – তারা রাজনৈতিক ক্লাব গঠন করেছিল, মিছিলে হেঁটেছিল এবং নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করেছিল। যদিও বিপ্লব তাদের ভোটাধিকার দেয়নি, তবুও তাদের অংশগ্রহণ নারী অধিকার আন্দোলনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
- উপনিবেশে প্রভাব: ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ ভারতের টিপু সুলতান এবং রামমোহন রায়ের মতো ব্যক্তিদেরও অনুপ্রাণিত করেছিল। এটি বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: ফরাসি সমাজে 'তিনটি এস্টেট' বলতে কী বোঝানো হতো?
উত্তর: ফরাসি বিপ্লবের আগে ফরাসি সমাজ তিনটি শ্রেণিতে বা এস্টেটে বিভক্ত ছিল। প্রথম এস্টেট ছিল যাজক সম্প্রদায়, যারা করমুক্ত ছিল এবং বিশেষ সুবিধা ভোগ করত। দ্বিতীয় এস্টেট ছিল অভিজাত শ্রেণি, তারাও করমুক্ত ছিল এবং রাষ্ট্রের উচ্চপদ ও সামন্ততান্ত্রিক অধিকার ভোগ করত। তৃতীয় এস্টেট ছিল দেশের বাকি সমস্ত সাধারণ মানুষ (প্রায় ৯৭%), যার মধ্যে বুর্জোয়া, কৃষক এবং শ্রমিকরা অন্তর্ভুক্ত ছিল। করের সমস্ত বোঝা এবং সামাজিক বৈষম্যের শিকার ছিল এই তৃতীয় এস্টেট।
প্রশ্ন ২: 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' বা 'Reign of Terror' কী ছিল?
উত্তর: 'সন্ত্রাসের রাজত্ব' ছিল ফরাসি বিপ্লবের একটি চরম পর্যায় (১৭৯৩-১৭৯৪), যখন ম্যাক্সিমিলিয়েন রোবসপিয়েরের নেতৃত্বে জ্যাকোবিনরা ক্ষমতায় ছিল। এই সময়ে, প্রজাতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শত্রুদের দমন করার নামে কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়। হাজার হাজার মানুষকে 'প্রজাতন্ত্রের শত্রু' সন্দেহে গ্রেপ্তার করে বিপ্লবী আদালতের মাধ্যমে বিচার করে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এই সময়কালটি বিপ্লবের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।
প্রশ্ন ৩: বাস্তিল দুর্গের পতন এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
উত্তর: ১৪ই জুলাই, ১৭৮৯ তারিখে বাস্তিল দুর্গের পতন ফরাসি বিপ্লবের একটি প্রতীকী ঘটনা। বাস্তিল ছিল একটি মধ্যযুগীয় দুর্গ যা কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং এটি রাজার স্বৈরাচারী ক্ষমতার প্রতীক ছিল। উত্তেজিত জনতার দ্বারা এই দুর্গের পতন রাজার ক্ষমতার উপর একটি সরাসরি আঘাত ছিল। এটি বিপ্লবের সূচনাকে চিহ্নিত করে এবং দেখিয়ে দেয় যে, সাধারণ মানুষ আর রাজার অত্যাচার সহ্য করতে প্রস্তুত নয়। এই ঘটনাটি সমগ্র ফ্রান্সে বিপ্লবের বার্তা ছড়িয়ে দেয় এবং রাজতন্ত্রের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
প্রশ্ন ৪: ফরাসি বিপ্লবের প্রধান উত্তরাধিকার বা ফলাফল কী ছিল?
উত্তর: ফরাসি বিপ্লবের প্রধান উত্তরাধিকার হলো 'স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব'-এর আদর্শ, যা বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছে। এর ফলে ফ্রান্সে রাজতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটে এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি আধুনিক জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয় এবং মানবাধিকারের ধারণাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। এক কথায়, এটি আধুনিক বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
সারসংক্ষেপ
এই অধ্যায়টি ভালোভাবে মনে রাখার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচে তালিকাভুক্ত করা হলো:
- বিপ্লব-পূর্ববর্তী সমাজ: তিনটি এস্টেটে বিভক্ত, যেখানে প্রথম দুটি এস্টেট (যাজক ও অভিজাত) সমস্ত সুবিধা ভোগ করত এবং তৃতীয় এস্টেট (সাধারণ মানুষ) সমস্ত করের বোঝা বহন করত।
- বিপ্লবের মূল কারণ: সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক সংকট (শূন্য রাজকোষ, ত্রুটিপূর্ণ কর ব্যবস্থা), রাজনৈতিক দুর্বলতা (স্বৈরাচারী রাজা ষোড়শ লুই) এবং জ্ঞানদীপ্তির দার্শনিকদের প্রভাব।
- গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাক্রম:
- ১৭৮৯: এস্টেটস-জেনারেলের অধিবেশন, টেনিস কোর্টের শপথ, এবং বাস্তিল দুর্গের পতন।
- ১৭৯১: সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং নতুন সংবিধান রচনা।
- ১৭৯২-৯৩: রাজতন্ত্রের অবসান, ফ্রান্স প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত এবং রাজা ষোড়শ লুইয়ের মৃত্যুদণ্ড।
- ১৭৯৩-৯৪: রোবসপিয়েরের নেতৃত্বে 'সন্ত্রাসের রাজত্ব'।
- ১৭৯৫-৯৯: ডিরেক্টরির শাসন।
- ১৭৯৯: নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ক্ষমতা দখল।
- বিপ্লবের মূল আদর্শ: স্বাধীনতা, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্ব।
- সুদূরপ্রসারী প্রভাব: বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং মানবাধিকারের ধারণার প্রসার।