বিষয়ের ভূমিকা

আজ আমরা ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করব। অষ্টম শ্রেণির NCERT ইতিহাস বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় – 'বাণিজ্য থেকে সাম্রাজ্য'। এই অধ্যায়ের মূল বিষয়বস্তু হলো, কীভাবে একটি বিদেশী বাণিজ্যিক সংস্থা, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, শুধুমাত্র ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে ভারতে এসে ধীরে ধীরে সমগ্র উপমহাদেশের শাসক হয়ে উঠল। এই গল্পটি কেবল কয়েকটি যুদ্ধ বা চুক্তির বিবরণ নয়, বরং এটি কূটনীতি, ষড়যন্ত্র, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের এক জটিল মিশ্রণ।

আমরা অনেকেই জানি যে ব্রিটিশরা প্রায় ২০০ বছর ধরে ভারত শাসন করেছে। কিন্তু এই শাসনের সূচনা কীভাবে হয়েছিল? মুঘল সাম্রাজ্যের মতো এক বিশাল শক্তির পতনের পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে একদল ব্যবসায়ী শাসকের আসনে বসল? এই অধ্যায়ে আমরা সেই ঐতিহাসিক যাত্রার প্রতিটি ধাপ বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করব। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে পলাশীর যুদ্ধ, বক্সারের যুদ্ধ এবং বিভিন্ন রাজ্য দখলের নীতির মাধ্যমে কোম্পানির ক্ষমতা বিস্তারের সম্পূর্ণ কাহিনী আমরা জানব। চলুন, এই রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক সফরে যাওয়া যাক এবং জেনে নেওয়া যাক কীভাবে বাণিজ্যের আড়ালে সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

পূর্ব ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমন ও বাণিজ্য শুরু

গল্পের শুরুটা হয় ১৬০০ সালে। ইংল্যান্ডের রানী প্রথম এলিজাবেথ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামক একটি বাণিজ্যিক সংস্থাকে পূর্বের দেশগুলির সাথে বাণিজ্য করার জন্য একটি রাজকীয় সনদ বা চার্টার প্রদান করেন। এই সনদের মাধ্যমে কোম্পানি একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে, অর্থাৎ ইংল্যান্ডের অন্য কোনো সংস্থা তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারত না।

কোম্পানির জাহাজগুলি তখন নতুন দেশের সন্ধানে সমুদ্র পাড়ি দেয়। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সস্তায় মশলা, কাপড়, নীল এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিস কিনে ইউরোপে চড়া দামে বিক্রি করে 엄청 মুনাফা অর্জন করা। ১৬০৮ সালে তারা ভারতের পশ্চিম উপকূলে সুরাটে প্রথম বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের চেষ্টা করে এবং অবশেষে ১৬১২ সালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে অনুমতি লাভ করে।

তবে আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো পূর্ব ভারত, বিশেষ করে বাংলা। ১৬৫১ সালে, বাংলার সুবেদার শাহ শুজার অনুমতি নিয়ে হুগলি নদীর তীরে কোম্পানি তাদের প্রথম কারখানা বা বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। এখানে 'কারখানা' বা 'ফ্যাক্টরি' বলতে কিন্তু কোনো উৎপাদন কেন্দ্র বোঝায় না। এই ফ্যাক্টরিগুলি ছিল মূলত গুদামঘর, যেখানে রপ্তানির জন্য পণ্য মজুত করে রাখা হতো। কোম্পানির বণিক এবং কর্মচারীরা, যাদের 'ফ্যাক্টর' বলা হতো, এখানেই কাজ করত।

ব্যবসা বাড়ার সাথে সাথে কোম্পানির উচ্চাকাঙ্ক্ষাও বাড়তে থাকে। ১৬৯৬ সালের মধ্যে তারা হুগলির কুঠিটির চারপাশে একটি দুর্গ নির্মাণ শুরু করে। এর কিছু পরেই, তারা তিনটি গ্রাম – সুতানুটি, গোবিন্দপুর এবং কলকাতা – এর জমিদারি স্বত্ব কিনে নেয়, যা পরবর্তীকালে কলকাতা শহর হিসেবে গড়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় সুযোগটি আসে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কাছ থেকে। তিনি একটি ফরমান বা রাজকীয় আদেশ জারি করেন, যা কোম্পানিকে বাংলায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্য করার অধিকার দেয়। অর্থাৎ, তাদের আমদানি বা রপ্তানির জন্য কোনো কর দিতে হতো না।

সংঘাতের সূচনা: নবাব ও কোম্পানির দ্বন্দ্ব

ঔরঙ্গজেবের দেওয়া শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অধিকার শুধুমাত্র কোম্পানির বাণিজ্যের জন্য প্রযোজ্য ছিল। কিন্তু কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা এই সুবিধার অপব্যবহার করতে শুরু করে। তারা তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসার ক্ষেত্রেও এই শুল্ক ছাড়ের সুবিধা নিত, যার ফলে বাংলার কোষাগারে বিশাল অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছিল।

অষ্টাদশ শতকের শুরুতে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য দুর্বল হতে শুরু করে এবং বাংলার নবাবরা যেমন মুর্শিদকুলি খাঁ, আলীবর্দী খাঁ এবং তারপর সিরাজ-উদ-দৌলা নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন। তারা ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং স্বাধীনচেতা শাসক। তারা কোম্পানির এই বেআইনি কার্যকলাপ মেনে নিতে রাজি ছিলেন না।

দ্বন্দ্বের মূল কারণগুলি ছিল:

  • রাজস্ব ক্ষতি: কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসার কারণে নবাবের কোষাগার খালি হয়ে যাচ্ছিল।
  • ক্ষমতাকে অসম্মান: কোম্পানি নবাবকে প্রাপ্য সম্মান দিত না এবং কর দিতে অস্বীকার করত।
  • দুর্গ নির্মাণ: নবাবের অনুমতি ছাড়াই কলকাতায় দুর্গ নির্মাণ ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা হচ্ছিল।
  • দস্তকের অপব্যবহার: 'দস্তক' বা শুল্ক ছাড়ের অনুমতিপত্র ব্যক্তিগত ব্যবসার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল।
  • নবাবের শত্রুদের আশ্রয়: কোম্পানি নবাবের শত্রুদের কলকাতায় আশ্রয় দিত।

এই কারণগুলির জন্য নবাব এবং কোম্পানির মধ্যে সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হতে থাকে। আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর তার নাতি সিরাজ-উদ-দৌলা যখন বাংলার নবাব হন, তখন এই সংঘাত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়।

পলাশীর যুদ্ধ: এক ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা (১৭৫৭)

সিরাজ-উদ-দৌলা ছিলেন একজন তরুণ এবং স্বাধীনচেতা নবাব। তিনি কোম্পানির ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ সহ্য করতে পারেননি। তিনি কোম্পানিকে দুর্গ নির্মাণ বন্ধ করতে, আইন মেনে চলতে এবং বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করতে বলেন। কিন্তু কোম্পানি তার কথায় কর্ণপাত না করায়, সিরাজ প্রায় ৩০,০০০ সৈন্য নিয়ে কলকাতার কাশিমবাজার কুঠি এবং ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করে নেন।

এই খবর মাদ্রাজে পৌঁছালে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে একদল সৈন্য কলকাতায় পাঠানো হয়। ক্লাইভ বুঝতে পেরেছিলেন যে সামরিক শক্তিতে সিরাজকে হারানো কঠিন। তাই তিনি ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেন। তিনি সিরাজের প্রধান সেনাপতি মীরজাফর-এর সাথে একটি গোপন চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধে মীরজাফর নিষ্ক্রিয় থাকবেন এবং এর বিনিময়ে সিরাজকে সরিয়ে তাকে বাংলার নবাব করা হবে। এই ষড়যন্ত্রে আরও যোগ দেন জগৎ শেঠ (বাংলার সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী) এবং রায়দুর্লভের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।

১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন, ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর প্রান্তরে নবাব এবং কোম্পানির বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। নবাবের প্রায় ৫০,০০০ সৈন্যের বিপরীতে ক্লাইভের সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৩,০০০। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। মীরজাফর এবং তার অনুগত সৈন্যরা যুদ্ধ না করে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। মীরমদন এবং মোহনলালের মতো কিছু বিশ্বস্ত সেনাপতি সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করলেও তারা পরাজিত ও নিহত হন। সিরাজ-উদ-দৌলা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন কিন্তু ধরা পড়েন এবং পরে তাকে হত্যা করা হয়।

পলাশীর যুদ্ধকে ঠিক যুদ্ধ বলা যায় না, এটি ছিল একটি বিশ্বাসঘাতকতা। এই ঘটনার পর ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

  • ফলাফল:
  • মীরজাফরকে বাংলার 'পুতুল' নবাব বানানো হয়।
  • কোম্পানি বাংলা থেকে প্রচুর অর্থ ও সম্পদ লাভ করে।
  • কলকাতা সংলগ্ন ২৪ পরগনার জমিদারি লাভ করে।
  • বাংলায় কোম্পানির রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

বক্সারের যুদ্ধ এবং কোম্পানির 'দেওয়ানি' লাভ (১৭৬৪)

মীরজাফর কোম্পানির ক্রমবর্ধমান অর্থের দাবি মেটাতে পারছিলেন না। তাই কোম্পানি তাকে সরিয়ে তার জামাতা মীরকাসিম-কে নবাব বানায়। মীরকাসিম ছিলেন একজন যোগ্য শাসক। তিনি কোম্পানির প্রভাব থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিলেন। তিনি তার রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে স্থানান্তর করেন, নিজের সেনাবাহিনীকে ইউরোপীয় ধাঁচে প্রশিক্ষণ দেন এবং কোম্পানির দস্তকের অপব্যবহার বন্ধ করার চেষ্টা করেন।

মীরকাসিমের এই স্বাধীনচেতা মনোভাব কোম্পানির পছন্দ হয়নি। ফলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং ১৭৬৪ সালে বক্সারের প্রান্তরে যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধ ছিল পলাশীর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে কোনো বিশ্বাসঘাতকতা ছিল না, ছিল সরাসরি সামরিক লড়াই। একপক্ষে ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি (নেতৃত্বে হেক্টর মুনরো) এবং অন্যপক্ষে ছিল তিনটি সম্মিলিত শক্তি:

  1. বাংলার ক্ষমতাচ্যুত নবাব মীরকাসিম
  2. অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা
  3. মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম

এই যুদ্ধে ব্রিটিশদের সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী সম্মিলিত ভারতীয় বাহিনীকে बुरी तरह পরাজিত করে। বক্সারের যুদ্ধ ছিল কোম্পানির জন্য একটি নির্ণায়ক বিজয়। এই জয় প্রমাণ করে যে তারা কেবল ষড়যন্ত্রেই নয়, সামরিক শক্তিতেও ভারতীয় শাসকদের চেয়ে श्रेष्ठ।

এই যুদ্ধের পর ১৭৬৫ সালে রবার্ট ক্লাইভ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সাথে এলাহাবাদের চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি অনুযায়ী, মুঘল সম্রাট কোম্পানিকে বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার 'দেওয়ানি' প্রদান করেন।

'দেওয়ানি' কী? দেওয়ানি হলো রাজস্ব আদায়ের অধিকার। এর ফলে কোম্পানি আইনত এই তিনটি প্রদেশ থেকে সমস্ত কর আদায়ের অধিকারী হয়ে গেল। এটি ছিল এক বিশাল ক্ষমতা। কারণ এখন ভারতের সম্পদ দিয়েই তারা তাদের সেনাবাহিনী, প্রশাসন এবং ব্যবসার খরচ চালাতে পারত। ব্রিটেন থেকে সোনা বা রুপা আনার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল। ভারতের টাকা দিয়েই ভারত দখলের প্রক্রিয়া শুরু হলো।

কোম্পানির শাসন বিস্তার: বিভিন্ন নীতি ও কৌশল

দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানির মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় সমগ্র ভারতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করা। এর জন্য তারা শুধুমাত্র যুদ্ধ নয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কৌশলও অবলম্বন করে।

১. অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance)

এই নীতির প্রবর্তক ছিলেন গভর্নর-জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি। এটি ছিল একটি আপাতদৃষ্টিতে বন্ধুত্বপূর্ণ কিন্তু বাস্তবে রাজ্য দখলের এক সূক্ষ্ম ফাঁদ। এই নীতির শর্তগুলি ছিল:

  • ভারতীয় শাসকদের নিজের রাজ্যে একদল ব্রিটিশ সৈন্য রাখতে হতো।
  • সেই সৈন্যদের ভরণপোষণের জন্য শাসককে কোম্পানিকে অর্থ বা নিজের রাজ্যের একটি অংশ ছেড়ে দিতে হতো।
  • শাসককে তার দরবারে একজন ব্রিটিশ প্রতিনিধি বা 'রেসিডেন্ট' রাখতে হতো, যিনি রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নজরদারি করতেন।
  • শাসক অন্য কোনো ইউরোপীয় শক্তি বা ভারতীয় রাজ্যের সাথে কোম্পানির অনুমতি ছাড়া কোনো সম্পর্ক রাখতে পারতেন না।

এর বিনিময়ে কোম্পানি সেই শাসককে বহিরাগত আক্রমণ থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিত। বাস্তবে, এই নীতি গ্রহণ করার অর্থ ছিল নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া। হায়দ্রাবাদের নিজাম প্রথম এই নীতি গ্রহণ করেন। এরপর অযোধ্যা, মহীশূর এবং অনেক মারাঠা সর্দার এই ফাঁদে পা দেন।

২. স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse)

এই আগ্রাসী নীতির প্রবর্তক ছিলেন গভর্নর-জেনারেল লর্ড ডালহৌসি। এই নীতি অনুযায়ী, যদি কোনো অধীনস্থ রাজ্যের শাসকের কোনো পুত্র সন্তান না থাকত, তাহলে তার মৃত্যুর পর সেই রাজ্য সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত। দত্তক পুত্রকে উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকার করা হতো না। এই নীতির মাধ্যমে সাতারা (১৮৪৮), সম্বলপুর (১৮৫০), উদয়পুর (১৮৫২), নাগপুর (১৮৫৩) এবং ঝাঁসি (১৮৫৪)-এর মতো রাজ্যগুলিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করা হয়। ১৮৫৬ সালে 'অপশাসন'-এর অজুহাতে অযোধ্যাকেও দখল করা হয়, যা সেখানকার জনগণ এবং সিপাহিদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

৩. সরাসরি সামরিক সংঘাত

যেসব শক্তিধর রাজ্য সহজে বশ্যতা স্বীকার করেনি, তাদের বিরুদ্ধে কোম্পানি সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে।

  • অ্যাংলো-মহীশূর যুদ্ধ: দক্ষিণ ভারতে হায়দার আলি এবং তার পুত্র টিপু সুলতানের নেতৃত্বে মহীশূর রাজ্য ছিল কোম্পানির জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। টিপু সুলতান ছিলেন একজন দূরদর্শী শাসক যিনি ফরাসিদের সাথে মিত্রতা স্থাপন করেছিলেন এবং নিজের সেনাবাহিনীকে আধুনিকীকরণ করেছিলেন। কোম্পানির সাথে তার চারটি যুদ্ধ হয়। অবশেষে ১৭৯৯ সালে চতুর্থ অ্যাংলো-মহীশূর যুদ্ধে, শ্রীঙ্গাপত্তনমের পতনের সাথে সাথে টিপু সুলতান বীরের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেন।
  • অ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধ: অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে মারাঠারা ছিল ভারতের অন্যতম প্রধান শক্তি। কিন্তু তাদের অভ্যন্তরীণ বিবাদের সুযোগ নিয়ে কোম্পানি হস্তক্ষেপ করে। তিনটি যুদ্ধের (১৭৭৫-১৮১৮) মাধ্যমে কোম্পানি মারাঠা শক্তিকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেয় এবং পেশোয়ার শাসন শেষ করে তাদের সাম্রাজ্যের大部分 দখল করে নেয়।

নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা স্থাপন

সাম্রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথে কোম্পানিকে একটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে হয়েছিল। ওয়ারেন হেস্টিংস (প্রথম গভর্নর-জেনারেল) এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

  • বিচার ব্যবস্থা: প্রতিটি জেলায় দুটি আদালত স্থাপন করা হয় – একটি ফৌজদারি আদালত (অপরাধমূলক মামলার জন্য) এবং একটি দেওয়ানি আদালত (জমি ও রাজস্ব সংক্রান্ত মামলার জন্য)। দেওয়ানি আদালতের প্রধান হতেন ইউরোপীয় ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর, এবং তাকে সাহায্য করার জন্য হিন্দু পণ্ডিত ও মুসলিম মৌলবীরা স্থানীয় আইন ব্যাখ্যা করতেন। ফৌজদারি আদালতগুলি তখনও কাজী ও মুফতির অধীনে ছিল, কিন্তু কালেক্টররা তার উপর নজরদারি করতেন। পরবর্তীতে আইনগুলিকে সংকলন করে একটি অভিন্ন আইন ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা করা হয়।
  • সেনাবাহিনী: কোম্পানির সেনাবাহিনী ছিল তাদের ক্ষমতার মূল ভিত্তি। মুঘলদের মতো অশ্বারোহী বাহিনীর উপর নির্ভর না করে, কোম্পানি একটি পেশাদার পদাতিক (Infantry) সেনাবাহিনী গড়ে তোলে। সিপাহিদের বার্মিজ এবং আফগান যুদ্ধে ব্যবহৃত মাস্কেট (বন্দুক) ও ম্যাচলক (বিশেষ ধরনের বন্দুক) দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। একটি অভিন্ন সামরিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা হলেও, প্রায়শই সিপাহিদের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুভূতিতে আঘাত করা হতো, যা পরবর্তীকালে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: পলাশীর যুদ্ধকে 'বিশ্বাসঘাতকতার যুদ্ধ' বলা হয় কেন?

উত্তর: পলাশীর যুদ্ধকে 'বিশ্বাসঘাতকতার যুদ্ধ' বলা হয় কারণ এই যুদ্ধের ফলাফল সামরিক শক্তি দ্বারা নির্ধারিত হয়নি, বরং হয়েছিল ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার প্রধান সেনাপতি মীরজাফর, রায়দুর্লভ এবং জগৎ শেঠের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রবার্ট ক্লাইভের সাথে গোপন চুক্তি করে যুদ্ধের ময়দানে নবাবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। তাদের সৈন্যরা যুদ্ধ না করায় নবাবের বিশাল বাহিনী অসহায় হয়ে পড়ে এবং সহজেই পরাজিত হয়। তাই এটি একটি সম্মুখ সমর না হয়ে একটি সাজানো ঘটনা ছিল।

প্রশ্ন ২: 'দেওয়ানি' লাভের ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কী সুবিধা হয়েছিল?

উত্তর: ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এক 엄청 আর্থিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হয়। প্রধান সুবিধাগুলি হলো: (ক) তারা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার বিশাল পরিমাণ রাজস্ব বা কর আদায়ের আইনগত অধিকার লাভ করে। (খ) এই অর্থ দিয়ে তারা ভারতে তাদের সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের সমস্ত খরচ চালাতে সক্ষম হয়। (গ) ভারতীয় পণ্য কেনার জন্য তাদের আর ইংল্যান্ড থেকে সোনা বা রুপা আনতে হতো না, যা তাদের দেশের সম্পদ রক্ষা করে। এক কথায়, ভারতের টাকা দিয়েই ভারতকে দখল এবং শোষণ করার পথ খুলে যায়।

প্রশ্ন ৩: অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি এবং স্বত্ববিলোপ নীতির মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী ছিল?

উত্তর: দুটি নীতিই ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের কৌশল, কিন্তু তাদের প্রয়োগের পদ্ধতিতে পার্থক্য ছিল। অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি ছিল একটি রাজনৈতিক চুক্তি, যার মাধ্যমে ভারতীয় শাসকরা নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হারিয়ে কোম্পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ত, কিন্তু তাদের শাসন ক্ষমতায় বহাল থাকত। অন্যদিকে, স্বত্ববিলোপ নীতি ছিল সরাসরি রাজ্য দখলের একটি নীতি। এই নীতি প্রয়োগ করে কোনো শাসকের স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী না থাকলে তার রাজ্য সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হতো, শাসকের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যেত। প্রথমটি ছিল পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ, আর দ্বিতীয়টি ছিল প্রত্যক্ষ দখল।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায় থেকে আমরা জানতে পারলাম যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল প্রায় এক শতাব্দীর এক দীর্ঘ এবং পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার ফল। আসুন মূল বিষয়গুলি আরেকবার দেখে নিই:

  • ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি বাণিজ্যিক সংস্থা হিসেবে ভারতে এসেছিল, কিন্তু এখানকার রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারা ধীরে ধীরে শাসকে পরিণত হয়।
  • পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) ছিল এক বিশ্বাসঘাতকতার ফল, যা ভারতে কোম্পানির রাজনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তি স্থাপন করে।
  • বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪) ছিল একটি নির্ণায়ক সামরিক বিজয়, যা কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার এনে দেয়।
  • অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি এবং স্বত্ববিলোপ নীতির মতো কূটনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করে কোম্পানি বিনা যুদ্ধে বা স্বল্প যুদ্ধে বহু রাজ্য দখল করে।
  • মহীশূর ও মারাঠাদের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে সরাসরি যুদ্ধে পরাজিত করে কোম্পানি সমগ্র ভারতে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
  • অবশেষে, একটি নতুন প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থা স্থাপন করে কোম্পানি ভারতে নিজেদের শাসনকে সুসংহত করে, যা প্রায় পরবর্তী ২০০ বছর স্থায়ী হয়েছিল।