বিষয়ের ভূমিকা
একটি দেশ পরিচালনার জন্য কিছু মৌলিক নিয়ম বা আইনের প্রয়োজন হয়। এই নিয়মগুলিই নির্ধারণ করে সরকারের গঠন কেমন হবে, নাগরিকদের অধিকার কী থাকবে এবং কীভাবে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হবে। নবম শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠ্যক্রমের 'সংবিধানের নকশা' (Constitutional Design) অধ্যায়টি আমাদের শেখায় কীভাবে একটি আধুনিক গণতন্ত্রের সংবিধান তৈরি হয়। এই অধ্যায়ে আমরা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য বিরোধী সংগ্রাম থেকে শুরু করে ভারতীয় সংবিধানের গঠন প্রক্রিয়া, এর অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ এবং প্রস্তাবনার গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত জানব। এটি কেবল একটি পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় নয়, বরং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকার ও কর্তব্যের ভিত্তি বোঝার একটি চাবিকাঠি।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. দক্ষিণ আফ্রিকায় গণতান্ত্রিক সংবিধানের সংগ্রাম
সংবিধানের গুরুত্ব বোঝার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সেখানে 'Apartheid' বা 'বর্ণবৈষম্য' নামক একটি নিষ্ঠুর ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।
- বর্ণবৈষম্য কী? এটি ছিল শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয়দের দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি জাতিগত বৈষম্যের ব্যবস্থা। কৃষ্ণাঙ্গদের ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল না এবং তারা শ্বেতাঙ্গদের এলাকায় থাকতে পারতেন না।
- নেলসন ম্যান্ডেলার ভূমিকা: নেলসন ম্যান্ডেলা এবং আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (ANC) এই অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম করেন। ম্যান্ডেলাকে ২৮ বছর কারাবাস করতে হয়েছিল।
- নতুন সংবিধানের জন্ম: দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৯৪ সালের ২৬ এপ্রিল দক্ষিণ আফ্রিকা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তারা এমন এক সংবিধান তৈরি করে যা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান হিসেবে পরিচিত, কারণ এতে ঘৃণা বা প্রতিশোধের বদলে সাম্য ও ক্ষমার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
২. আমাদের কেন সংবিধানের প্রয়োজন?
একটি গণতান্ত্রিক দেশে সংবিধান থাকা কেন জরুরি, তার প্রধান কারণগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
- বিশ্বাস ও সংহতি: এটি বিভিন্ন ধরণের মানুষের মধ্যে একটি ন্যূনতম বিশ্বাস এবং সমন্বয় তৈরি করে যা একসাথে বসবাসের জন্য অপরিহার্য।
- সরকার গঠন: এটি নির্ধারণ করে কীভাবে সরকার গঠিত হবে এবং কার হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে।
- ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা: সংবিধান সরকারের ক্ষমতার ওপর কিছু সীমা নির্ধারণ করে এবং নাগরিকদের অধিকারগুলি নিশ্চিত করে।
- আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ: এটি একটি ভালো সমাজ গঠনের বিষয়ে মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ব্যক্ত করে।
৩. ভারতীয় সংবিধানের গঠন প্রক্রিয়া
ভারতের সংবিধান তৈরি করা সহজ ছিল না। ভারত ছিল একটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশ, যা সবেমাত্র দেশভাগের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠেছিল।
- পটভূমি: ১৯২৮ সালে মতিলাল নেহেরু এবং আটজন কংগ্রেস নেতা ভারতের জন্য একটি সংবিধানের খসড়া তৈরি করেছিলেন। ১৯৩১ সালের করাচি অধিবেশনেও ভারতের সংবিধানের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়।
- গণপরিষদ (Constituent Assembly): ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে গণপরিষদের নির্বাচন হয়। দেশভাগের পর ভারতের গণপরিষদে ২৯৯ জন সদস্য ছিলেন। ডঃ বি. আর. আম্বেদকর ছিলেন খসড়া কমিটির (Drafting Committee) চেয়ারম্যান।
- গৃহীত ও কার্যকর: ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর সংবিধান অনুমোদিত হয় এবং ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি এটি কার্যকর হয়, যা আমরা 'প্রজাতন্ত্র দিবস' হিসেবে পালন করি।
৪. ভারতীয় সংবিধানের নির্দেশক মূল্যবোধ
সংবিধানের শুরুতেই একটি 'প্রস্তাবনা' (Preamble) থাকে, যা সংবিধানের মূল দর্শনকে প্রকাশ করে। এর প্রধান শব্দগুলি হলো:
- সার্বভৌম (Sovereign): ভারত একটি স্বাধীন দেশ, বাইরের কোনো শক্তি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
- সমাজতান্ত্রিক (Socialist): সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সামাজিক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্য।
- ধর্মনিরপেক্ষ (Secular): রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো ধর্ম নেই। নাগরিকরা যেকোনো ধর্ম পালনে স্বাধীন।
- গণতান্ত্রিক (Democratic): জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে এবং সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে।
- সাধারণতন্ত্র (Republic): রাষ্ট্রের প্রধান (রাষ্ট্রপতি) বংশপরম্পরায় নির্বাচিত হন না, তিনি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জনগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন।
- ন্যায়বিচার (Justice), স্বাধীনতা (Liberty), সাম্য (Equality) এবং ভ্রাতৃত্ব (Fraternity): এগুলি সংবিধানের মূল স্তম্ভ যা প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: সংবিধানের খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান কে ছিলেন?
উত্তর: ডঃ বি. আর. আম্বেদকর ছিলেন ভারতীয় সংবিধানের খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান। তাকে 'ভারতীয় সংবিধানের জনক' বলা হয়।
প্রশ্ন ২: দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধান তৈরির সময় কোন দুটি প্রধান গোষ্ঠী সমঝোতায় এসেছিল?
উত্তর: দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু এবং কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগুরু গোষ্ঠী একমত হয়েছিল যে নতুন সংবিধানে 'এক ব্যক্তি এক ভোট' এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
প্রশ্ন ৩: 'প্রজাতন্ত্র' কথাটির অর্থ কী?
উত্তর: প্রজাতন্ত্র মানে হলো এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে রাষ্ট্রের প্রধান (যেমন ভারতের রাষ্ট্রপতি) নির্বাচিত হন, কোনো রাজপরিবার বা বংশপরম্পরায় সিংহাসন লাভ করেন না।
সারসংক্ষেপ
- সংবিধান হলো একটি দেশের সর্বোচ্চ আইন যা সরকার ও জনগণের সম্পর্ক নির্ধারণ করে।
- দক্ষিণ আফ্রিকার সংগ্রাম আমাদের শেখায় যে চরম বৈষম্যের পর কীভাবে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক সংবিধান শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।
- ভারতীয় সংবিধান দীর্ঘ আলোচনা ও তর্কের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে, যা একে অত্যন্ত শক্তিশালী ও নমনীয় করেছে।
- প্রস্তাবনা হলো সংবিধানের আত্মা, যা আমাদের সাম্য, স্বাধীনতা এবং ন্যায়ের প্রতিশ্রুতি দেয়।
- সংবিধান একটি স্থির দলিল নয়, সময়ের প্রয়োজনে এতে সংশোধন (Constitutional Amendment) করা সম্ভব।