বিষয়ের ভূমিকা
পৃথিবীতে প্রতিটি জীবই তার নিজের মতো আরও জীব সৃষ্টি করতে চায়। এই প্রক্রিয়াকে আমরা জনন (Reproduction) বলি। আমাদের চারপাশের সবুজ পৃথিবী যে টিকে আছে, তার প্রধান কারণ হলো উদ্ভিদের জনন। উদ্ভিদরা কীভাবে বংশবৃদ্ধি করে, তা বোঝা বিজ্ঞানের এক অত্যন্ত রোমাঞ্চকর অধ্যায়। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে একটি ছোট্ট বীজ থেকে বিশাল মহীরুহ জন্ম নেয়, আবার কখনো কখনো বীজ ছাড়াই কীভাবে নতুন চারা গাছ তৈরি হয়। এনসিইআরটি (NCERT) সপ্তম শ্রেণির বিজ্ঞান পাঠ্যক্রমের এই ১২তম অধ্যায়টি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি জীববিজ্ঞানের মৌলিক ভিত্তি তৈরি করতে সাহায্য করে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
উদ্ভিদের জনন প্রধানত দুই প্রকারের হয়: অযৌন জনন (Asexual Reproduction) এবং যৌন জনন (Sexual Reproduction)। নিচে এই প্রক্রিয়াগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. অযৌন জনন (Asexual Reproduction)
অযৌন জনন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে বীজ ছাড়াই নতুন চারা গাছ উৎপন্ন হয়। এতে কোনো পুরুষ ও স্ত্রী গ্যামেটের মিলনের প্রয়োজন হয় না। এর বিভিন্ন ধরন নিচে আলোচনা করা হলো:
- অঙ্গজ বিস্তার (Vegetative Propagation): এটি এক ধরণের অযৌন জনন যেখানে উদ্ভিদের মূল, কাণ্ড, পাতা বা মুকুল থেকে নতুন উদ্ভিদের সৃষ্টি হয়। যেমন:
- কাণ্ডের মাধ্যমে: গোলাপ বা জবা গাছের ডাল কেটে মাটিতে পুঁতলে সেখান থেকে নতুন গাছ বের হয়। আলুর গায়ে যে ছোট ছোট গর্ত বা 'চোখ' দেখা যায়, তা থেকে নতুন আলুর চারা জন্মায়।
- মূলের মাধ্যমে: মিষ্টি আলু বা ডালিয়ার মূল থেকে নতুন গাছ তৈরি হতে পারে।
- পাতার মাধ্যমে: পাথরকুচি (Bryophyllum) গাছের পাতার কিনারে ছোট ছোট মুকুল থাকে, যা মাটিতে পড়লে নতুন চারা জন্মে।
- কোরকোদ্গম (Budding): ইস্ট (Yeast) নামক এককোষী ছত্রাক এই পদ্ধতিতে বংশবৃদ্ধি করে। ইস্টের কোষ থেকে ছোট ছোট বাল্বের মতো অংশ বের হয়, যাকে 'কোরক' (Bud) বলে। এটি মূল কোষ থেকে আলাদা হয়ে নতুন স্বতন্ত্র কোষে পরিণত হয়।
- খণ্ডীভবন (Fragmentation): শৈবাল বা স্পাইরোগাইরা (Spirogyra) যখন পূর্ণ বৃদ্ধি পায়, তখন তারা দুই বা ততোধিক খণ্ডে বিভক্ত হয়ে যায়। প্রতিটি খণ্ড থেকে আবার নতুন শৈবাল তৈরি হয়।
- রেণু উৎপাদন (Spore Formation): ছত্রাক বা মস-ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ বাতাসে ভেসে থাকা অত্যন্ত সূক্ষ্ম রেণুর মাধ্যমে জনন ঘটায়। এই রেণুগুলি খুব শক্ত আবরণে ঢাকা থাকে যা প্রতিকূল পরিবেশে তাদের রক্ষা করে। অনুকূল পরিবেশে এগুলি থেকে নতুন উদ্ভিদ জন্মে।
২. যৌন জনন (Sexual Reproduction)
যৌন জনন প্রক্রিয়ায় বীজ থেকে নতুন উদ্ভিদের সৃষ্টি হয়। এই প্রক্রিয়ায় ফুলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ ফুল হলো উদ্ভিদের জনন অঙ্গ।
- ফুলের গঠন: একটি ফুলে সাধারণত পুংকেশর (Stamen) এবং গর্ভকেশর (Pistil) থাকে। পুংকেশর হলো পুরুষ অংশ (যা পরাগ উৎপন্ন করে) এবং গর্ভকেশর হলো স্ত্রী অংশ (যার ভেতরে ডিম্বাশয় থাকে)।
- পরাগযোগ (Pollination): ফুলের পরাগধানী থেকে পরাগরেণু যখন গর্ভমুণ্ডে স্থানান্তরিত হয়, তাকে পরাগযোগ বলে। এটি দুই প্রকারের হয়:
- স্ব-পরাগযোগ: একই ফুলের মধ্যে বা একই গাছের দুটি ফুলের মধ্যে পরাগযোগ ঘটলে তাকে স্ব-পরাগযোগ বলে।
- ইতর-পরাগযোগ: যখন বাতাসের মাধ্যমে, পতঙ্গের মাধ্যমে বা জলের মাধ্যমে একটি উদ্ভিদের ফুলের পরাগ অন্য উদ্ভিদের ফুলের গর্ভমুণ্ডে পড়ে।
- নিষেক (Fertilization): পরাগরেণু এবং ডিম্বাণুর মিলনের ফলে 'জাইগোট' (Zygote) তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়াকে নিষেক বলে। নিষেকের পর ডিম্বাশয় ফলে পরিণত হয় এবং ডিম্বক বীজে রূপান্তরিত হয়।
৩. ফলের গঠন এবং বীজের বিস্তার
নিষেক সম্পন্ন হওয়ার পর ফুলের অন্যান্য অংশ ঝরে যায় এবং ডিম্বাশয় বৃদ্ধি পেয়ে ফল তৈরি করে। বীজের বিস্তার (Seed Dispersal) প্রকৃতির জন্য খুবই জরুরি। যদি সব বীজ একই গাছের নিচে পড়ত, তবে আলো, জল ও খনিজের অভাব দেখা দিত। তাই বাতাস, জল এবং প্রাণীর মাধ্যমে বীজ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
- বাতাসের মাধ্যমে: শিমুল বা ম্যাপেল বীজের ডানা থাকে, যা তাদের উড়তে সাহায্য করে।
- জলের মাধ্যমে: নারকেলের মতো ফল জলের স্রোতে ভেসে দূরে চলে যায়।
- প্রাণীর মাধ্যমে: কাঁটাযুক্ত বীজ প্রাণীর গায়ে আটকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায় (যেমন: জ্যান্থিয়াম)।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. যৌন ও অযৌন জননের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: অযৌন জননে বীজের প্রয়োজন হয় না এবং একটি মাত্র জনিতৃ থেকে নতুন চারা উৎপন্ন হয়। অন্যদিকে, যৌন জননে বীজের মাধ্যমে নতুন উদ্ভিদ জন্মায় এবং এতে পুরুষ ও স্ত্রী উভয় গ্যামেটের প্রয়োজন হয়।
২. পরাগযোগের গুরুত্ব কী?
উত্তর: পরাগযোগ হলো যৌন জননের প্রথম ধাপ। পরাগযোগ না ঘটলে নিষেক সম্ভব নয় এবং নিষেক ছাড়া ফল বা বীজ উৎপন্ন হবে না, ফলে উদ্ভিদের বংশধারা বিলুপ্ত হবে।
৩. কেন বীজ বিস্তার গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: বীজ বিস্তার চারাগাছগুলোর মধ্যে সূর্যালোক, জল এবং খনিজের জন্য প্রতিযোগিতা কমায় এবং উদ্ভিদকে নতুন নতুন ভৌগোলিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে।
সারসংক্ষেপ
- উদ্ভিদের জনন বংশরক্ষার জন্য অপরিহার্য।
- অযৌন জননে অঙ্গজ বিস্তার, খণ্ডীভবন এবং রেণু উৎপাদন লক্ষ্য করা যায়।
- ফুল হলো যৌন জননের প্রধান অঙ্গ; যেখানে পুংকেশর ও গর্ভকেশর অংশ নেয়।
- পরাগযোগ হলো পরাগরেণুর স্থানান্তর প্রক্রিয়া।
- নিষেক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাইগোট গঠিত হয় এবং অবশেষে ফল ও বীজ তৈরি হয়।
- বীজ বিস্তারের মাধ্যমে উদ্ভিদের অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।