বিষয়ের ভূমিকা
উনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের রাজনৈতিক এবং মানসিক জগতে এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, যার নাম হলো 'জাতীয়তাবাদ'। এই অধ্যায়টি আমাদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে আধুনিক ইউরোপের মানচিত্র এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠিত হয়েছিল। ১৮৪৮ সালে ফরাসি শিল্পী ফ্রেডেরিক সোরিউ (Frédéric Sorrieu) তাঁর চারটি চিত্রের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক এবং সামাজিক প্রজাতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন জাতির মানুষ নিজ নিজ পতাকাসহ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এই স্বপ্নই ছিল আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র বা 'Nation-state'-এর ভিত্তি। দশম শ্রেণির ইতিহাসের এই প্রথম অধ্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি আমাদের ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে জার্মানি ও ইতালির একীকরণ এবং অবশেষে বলকান অঞ্চলের অস্থিরতা পর্যন্ত সমস্ত কিছু বিস্তারিতভাবে জানায়।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. ফরাসি বিপ্লব এবং জাতির ধারণা
জাতীয়তাবাদের প্রথম স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছিল ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে। ফরাসি বিপ্লবীরা এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন যা ফরাসি জনগণের মধ্যে একটি সমষ্টিগত পরিচয়ের বোধ তৈরি করে:
- লা পাত্রি (La Patrie) ও লে সিতোয়েন (Le Citoyen): পিতৃভূমি এবং নাগরিকের ধারণা প্রবর্তন করা হয়, যা একটি সংবিধানের অধীনে সমান অধিকারের ওপর জোর দেয়।
- নতুন জাতীয় পতাকা: রাজকীয় পতাকার পরিবর্তে তেরঙা ফরাসি পতাকা গ্রহণ করা হয়।
- একই ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতি: আঞ্চলিক উপভাষাগুলিকে নিরুৎসাহিত করে প্যারিসে প্রচলিত ফরাসি ভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
২. নেপোলিয়ন কোড (১৮০৪ সালের দেওয়ানি বিধি)
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যখন ইউরোপের বিভিন্ন অংশ জয় করেন, তিনি প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনেন। ১৮০৪ সালের 'নেপোলিয়ন কোড' ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
- জন্মগত বিশেষ সুবিধাগুলি বাতিল করা হয়।
- আইনের চোখে সকলের সমতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা হয়।
- সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং কৃষকদের ভূমিদাসত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
- পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো হয়।
৩. ইউরোপে উদারপন্থী জাতীয়তাবাদ
উদারপন্থা বা 'Liberalism' শব্দটি ল্যাটিন শব্দ 'Liber' থেকে এসেছে, যার অর্থ 'মুক্ত'। রাজনৈতিকভাবে এর অর্থ ছিল আইনের চোখে সাম্য এবং সংবিধান ভিত্তিক সরকার। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এর অর্থ ছিল বাজারের মুক্তি এবং পণ্য ও পুঁজির চলাচলের ওপর থেকে রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া। ১৮৩৪ সালে প্রুশিয়ার উদ্যোগে 'জলভারেইন' (Zollverein) নামক একটি শুল্ক সংঘ গঠিত হয়, যা শুল্ক বাধা দূর করে এবং মুদ্রার সংখ্যা কমিয়ে দেয়।
৪. ১৮১৫ সালের পর নতুন রক্ষণশীলতা
১৮১৫ সালে নেপোলিয়নের পরাজয়ের পর ইউরোপীয় সরকারগুলো রক্ষণশীলতার পথে হাঁটে। ব্রিটেন, রাশিয়া, প্রুশিয়া এবং অস্ট্রিয়ার প্রতিনিধিরা ভিয়েনায় মিলিত হয়ে 'ভিয়েনা চুক্তি' (Treaty of Vienna) স্বাক্ষর করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল নেপোলিয়নের যুদ্ধের সময় হওয়া পরিবর্তনগুলি মুছে ফেলা এবং পুরনো রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনা।
৫. জার্মানি ও ইতালির একীকরণ
জাতীয়তাবাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো দেশগুলোর একীকরণ:
- জার্মানি: প্রুশিয়ার প্রধানমন্ত্রী অটো ফন বিসমার্ক (Otto von Bismarck) আমলাতন্ত্র এবং সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাত বছর ধরে তিনটি যুদ্ধে জয়লাভ করে জার্মানিকে একীভূত করেন। ১৮৭১ সালে প্রুশিয়ার রাজা প্রথম উইলিয়াম জার্মান সম্রাট হিসেবে ঘোষিত হন।
- ইতালি: ইতালি ছিল সাতটি ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত। জিউসেপ মেজিনি (Giuseppe Mazzini), কাউন্ট ক্যভুর (Count Cavour) এবং জিউসেপ গারিবাল্দি (Giuseppe Garibaldi)-র নেতৃত্বে ইতালি একীভূত হয়। ১৮৬১ সালে দ্বিতীয় ভিক্টর ইমানুয়েল একীভূত ইতালির রাজা হন।
৬. জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে জাতীয়তাবাদ আর তার উদার গণতান্ত্রিক আদর্শ ধরে রাখতে পারেনি। এটি সাম্রাজ্যবাদে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। এর প্রধান উদাহরণ হলো বলকান অঞ্চল। স্লাভ জাতিগোষ্ঠীর এই অঞ্চলে জাতিগত সংঘাত এবং বড় শক্তিগুলোর (রাশিয়া, জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি) হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: ১৮০৪ সালের নেপোলিয়ন কোড বা দেওয়ানি বিধির দুটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: ১. এটি জন্মগত সকল বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বাতিল করে এবং আইনের চোখে সবার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। ২. এটি প্রশাসনিক বিভাগগুলিকে সহজ করে এবং সামন্ততান্ত্রিক প্রথার অবসান ঘটায়।
প্রশ্ন ২: জিউসেপ মেজিনি কে ছিলেন?
উত্তর: জিউসেপ মেজিনি ছিলেন একজন ইতালীয় বিপ্লবী। তিনি ইতালির একীকরণের জন্য 'ইয়ং ইতালি' (Young Italy) এবং 'ইয়ং ইউরোপ' (Young Europe) নামক দুটি গোপন সমিতি গঠন করেছিলেন। অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর মেটারনিক তাঁকে 'আমাদের সামাজিক শৃঙ্খলার সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু' বলে বর্ণনা করেছিলেন।
প্রশ্ন ৩: 'জলভারেইন' (Zollverein) কী ছিল?
উত্তর: জলভারেইন ছিল ১৮৩৪ সালে প্রুশিয়ার উদ্যোগে গঠিত একটি শুল্ক সংঘ। এটি বিভিন্ন জার্মান রাজ্যগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক বাধা দূর করেছিল এবং মুদ্রার সংখ্যা ৩০ থেকে কমিয়ে ২-এ নামিয়ে এনেছিল, যা অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে।
সারসংক্ষেপ
- ফরাসি বিপ্লব ইউরোপে জাতি-রাষ্ট্রের ধারণার জন্ম দেয়।
- উদারতাবাদ এবং রোমান্টিকতাবাদ জাতীয়তাবাদী চেতনা ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।
- ভিয়েনা কংগ্রেস (১৮১৫) রাজতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করলেও বিপ্লবের ঢেউ থামানো যায়নি।
- অটো ফন বিসমার্ক এবং কাউন্ট ক্যভুর যথাক্রমে জার্মানি ও ইতালির একীকরণের রূপকার।
- বলকান সংকট প্রমাণ করে যে উগ্র জাতীয়তাবাদ যুদ্ধের পথে নিয়ে যেতে পারে।