প্রেম আর ভালোবাসার কত রূপই না আমরা দেখেছি! কেউ তাজমহল গড়ে, কেউ পাহাড় কাটে, আবার কেউবা প্রিয় মানুষটার জন্য লিখে ফেলে কালজয়ী কবিতা। কিন্তু আচ্ছা, যদি বলি এমন এক প্রেমিক আছে যে তার প্রেমিকাকে ইমপ্রেস করার জন্য রীতিমতো চোখের ধাঁধা বা অপটিক্যাল ইল্যুশন তৈরি করে? ভাবছেন তো, এ আবার কেমন প্রেমিক! চলুন, আজ সেই শিল্পীর গল্পই শোনাবো, যে ভালোবাসা আর শিল্পের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।
কে এই জাদুকর প্রেমিক?
এই জাদুকরের নাম গ্রেট বাওয়ারবার্ড (Great Bowerbird)। নিউ গিনি এবং অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা এই পাখিটি ভালোবাসার জন্য যা করে, তা শুনলে আপনি অবাক না হয়ে পারবেন না। অন্য পাখিরা যখন বাসা বানানোর জন্য সুন্দর পালক বা চকচকে পাথর খোঁজে, তখন এই গ্রেট বাওয়ারবার্ড মশাই ব্যস্ত থাকে তার ভালোবাসার মানুষটির জন্য এক মায়ার জগৎ তৈরি করতে। আর সেই জগৎটা হলো তার নিজের তৈরি করা এক বিশেষ মঞ্চ, যাকে বলে 'বাওয়ার' (Bower)।
প্রেমিকার মন জয় করার জন্য পুরুষ গ্রেট বাওয়ারবার্ড এক বিশেষ ধরনের স্থাপনা তৈরি করে, যা নারী পাখির চোখে এক ধরনের অপটিক্যাল ইল্যুশন বা দৃষ্টিবিভ্রম তৈরি করে।
ব্যাপারটা ঠিক কী, তাই তো? পুরুষ বাওয়ারবার্ড প্রথমে ডালপালা দিয়ে সুড়ঙ্গের মতো একটি পথ তৈরি করে। তারপর সেই পথের শেষে একটি খোলা জায়গা বা উঠোন সাজিয়ে তোলে। কিন্তু এখানেই আসল জাদু! সে তার উঠোন সাজানোর জন্য যে পাথর, শামুক বা রঙিন বস্তু ব্যবহার করে, সেগুলোকে এক বিশেষ পদ্ধতিতে সাজায়। ছোট জিনিসগুলো রাখে সুড়ঙ্গের কাছাকাছি আর বড় জিনিসগুলো রাখে দূরে। যখন প্রেমিকা বাওয়ারবার্ড সেই সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে উঠোনের দিকে তাকায়, তখন তার চোখে এক অদ্ভুত বিভ্রম তৈরি হয়। তার কাছে মনে হয়, উঠোনের সব জিনিস একই আকারের এবং পুরো জায়গাটা বেশ ছিমছাম ও ছোট। আর এই বিভ্রমের কারণেই উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ পাখিটিকে তার প্রেমিকার চোখে অনেক বেশি বড় এবং আকর্ষণীয় মনে হয়।
বিজ্ঞানীরা যখন এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন, তখন তাঁরাও অবাক হয়েছিলেন। তাঁরা পরীক্ষা করার জন্য нарочно বাওয়ারবার্ডের সাজানো জিনিসগুলো এলোমেলো করে দিয়েছিলেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, মাত্র তিন দিনের মধ্যেই পুরুষ পাখিটি আবার সবকিছু আগের মতো নিখুঁতভাবে সাজিয়ে ফেলে। এর থেকেই বোঝা যায়, এই শিল্পকর্ম তার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আসলে, যে পুরুষ বাওয়ারবার্ড যত নিখুঁতভাবে এই চোখের ধাঁধা তৈরি করতে পারে, প্রেমিকা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সে ততটাই এগিয়ে থাকে। অর্থাৎ, এখানে শুধু সৌন্দর্য নয়, বুদ্ধিমত্তারও একটা বড় পরীক্ষা হয়ে যায়।
এই পাখিরা শুধু স্থপতি বা জাদুকরই নয়, তারা খুব ভালো সংগ্রাহকও বটে। ধূসর পাথর, সাদা শামুকের খোল থেকে শুরু করে রঙিন প্লাস্টিকের টুকরো বা বোতলের ছিপি—প্রেমিকার মন ভোলানোর জন্য তারা সবকিছু দিয়ে তাদের ভালোবাসার মঞ্চ সাজিয়ে তোলে। প্রতিটি জিনিস তারা এমনভাবে সাজায়, যাতে তা দেখতে সুন্দর লাগে এবং তাদের জাদুর খেলাটা আরও নিখুঁত হয়।
তাহলে ভাবুন একবার, একটা ছোট্ট পাখি তার ভালোবাসার জন্য কতটা মাথা খাটাচ্ছে! সে শুধু সুন্দর বাসা বানিয়েই থেমে থাকছে না, বরং তার প্রেমিকাকে একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা দেওয়ার জন্য রীতিমতো শিল্পের আশ্রয় নিচ্ছে। ভালোবাসা বোধহয় এমনই। কখনও তা প্রকাশ পায় তাজমহলের বিশালতায়, আবার কখনও বাওয়ারবার্ডের এই ছোট্ট চালাকিতে। আসলে ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট ভাষা নেই, আছে শুধু কিছু সুন্দর অনুভূতি, যা প্রকাশ করার ভঙ্গিটা সবার থেকে আলাদা।