ঘটনার প্রেক্ষাপট
ইতিহাসের পাতা খুললে আমরা কতশত রাজা-মহারাজা আর তাঁদের চোখ ধাঁধানো সমাধিক্ষেত্রের কথা জানতে পারি। মিশরের ফারাওদের পিরামিড থেকে শুরু করে চীনের সম্রাটের টেরাকোটা সেনাবাহিনী—সবখানেই মৃতের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন স্পষ্ট। কিন্তু যদি এমন এক সাম্রাজ্যের কথা শোনেন, যারা তাদের সর্বশক্তিমান রাজাদের জন্য বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করত, কিন্তু সেই কবরগুলো থাকত অবিশ্বাস্যভাবে শূন্য? কোনো কঙ্কাল নেই, মমি নেই, শুধু অপার শূন্যতা।
আজ আমরা পাড়ি দেব ষোড়শ শতকের মেক্সিকোতে, অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের প্রবল প্রতিপক্ষ, তারাঙ্কান বা পুরেপেচা (Purépecha) সাম্রাজ্যের রহস্যময় জগতে। তাদের রাজধানী ছিল সিনসুনসান (Tzintzuntzan), যার অর্থ ‘যেখানে হামিংবার্ডরা থাকে’। এই সিনসুনসানের বুকে দাঁড়িয়ে ছিল পাঁচটি বিশাল, চাবির ছিদ্রের মতো আকৃতির পিরামিড, যা ‘ইয়াকাতাস’ (Yácatas) নামে পরিচিত। এই স্থাপত্যগুলো ছিল পুরেপেচা শক্তির প্রতীক। ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকরা নিশ্চিত ছিলেন যে এই ইয়াকাতাসের গভীরে নিশ্চয়ই লুকিয়ে আছে সম্রাটদের সমাধিক্ষেত্র, যেখানে পাওয়া যাবে অমূল্য সম্পদ আর তাঁদের দেহাবশেষ। বহু বছর ধরে এই রহস্য অধরাই ছিল।
রহস্যের জাল
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা অবশেষে সেই ইয়াকাতাসের গভীরে খননকার্য শুরু করেন। বছরের পর বছর ধরে চলা গবেষণার পর তাঁরা সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত রাজকীয় সমাধির প্রবেশপথ খুঁজে পান। চারপাশের পরিবেশ ছিল থমথমে, বাতাসে যেন কয়েক শতাব্দীর পুরোনো রহস্য ঘনীভূত হয়ে ছিল। তাঁরা সমাধির সিল ভাঙলেন, যা শত শত বছর ধরে অক্ষত ছিল। ভেতরে কী অপেক্ষা করছে, সেই উত্তেজনায় সবার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গিয়েছিল।
কিন্তু সমাধির ভেতরে প্রবেশ করে তাঁরা যা দেখলেন, তার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। মূল সমাধি কক্ষটি ছিল একেবারে ফাঁকা! যেখানে একজন পরাক্রমশালী রাজার দেহ থাকার কথা, সেখানে কেবল শীতল, নিস্তব্ধ শূন্যতা। প্রথমত, সবাই ভেবেছিলেন হয়তো কোনো প্রাচীন কবর চোরেরা সব লুট করে নিয়ে গেছে। কিন্তু এই ধারণা দ্রুত ভুল প্রমাণিত হলো। সমাধির সিল ছিল অক্ষত, এবং ভেতরে লুটপাটের কোনো চিহ্নই ছিল না।
রহস্য আরও ঘনীভূত হলো যখন মূল সমাধিক্ষেত্রের চারপাশে এবং তার নিচে অসংখ্য ছোট ছোট কবরের সন্ধান পাওয়া গেল। আর সেই কবরগুলো সম্পদে ঠাসা ছিল! সোনা, রুপো, টারকোয়েজ, মূল্যবান পাথর, তামা ও অবসিডিয়ানের তৈরি অস্ত্র—কী ছিল না সেখানে! এমনকি রাজার সেবায় উৎসর্গীকৃত বহু মানুষের কঙ্কালও পাওয়া গিয়েছিল। অর্থাৎ, একজন রাজার মৃত্যুর পর যে বিশাল আয়োজন করা হতো, তার সমস্ত প্রমাণই উপস্থিত ছিল। শুধু একজন বাদে— স্বয়ং রাজা!
এই অদ্ভুত ঘটনা প্রত্নতাত্ত্বিকদের এক গভীর ধাঁধায় ফেলে দিল। কেন এত আয়োজন করে তৈরি করা একটি রাজকীয় সমাধি মূল ব্যক্তিকে ছাড়াই সযত্নে সিল করে দেওয়া হবে? রাজার দেহ কোথায় গেল? তারাঙ্কানরা কি তাদের মৃত রাজাদের সম্মান করত না, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর, অচেনা কোনো বিশ্বাস?
সত্যের উন্মোচন
এই রহস্যের জট খুলতে সাহায্য করল স্প্যানিশ বিজেতাদের লেখা কিছু পুরোনো নথি। conquistador-দের আগমনের পর ফ্রান্সিসকান ধর্মযাজক জেরোনিমো দে আলকালা (Jerónimo de Alcalá) তারাঙ্কানদের জীবনযাত্রা এবং সংস্কৃতি নিয়ে বিস্তারিত লিখে রেখেছিলেন। তাঁর লেখা থেকেই এক অদ্ভুত রীতির কথা জানা যায়, যা তৎকালীন অন্য কোনো সভ্যতার সাথে মেলে না।
পুরেপেচারা তাদের রাজাকে ‘কাসোনসি’ (Cazonci) বলত, যিনি ছিলেন একাধারে শাসক এবং প্রধান পুরোহিত। যখন কোনো কাসোনসির মৃত্যু হতো, তখন তাঁর দেহ এক বিশাল চিতার উপর স্থাপন করা হতো। রাজার সাথে তাঁর প্রিয় কিছু সেবক-সেবিকা এবং বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদও সেই চিতায় তুলে দেওয়া হতো। এরপর সেই চিতায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হতো। তারাঙ্কানরা বিশ্বাস করত, এই আগুনের মাধ্যমেই তাদের রাজা দেবতাদের জগতে পাড়ি দেবেন এবং তাঁর প্রয়োজনীয় সবকিছু সঙ্গে নিয়ে যাবেন।
এই তথ্য সামনে আসার পর প্রত্নতাত্ত্বিকরা এক নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন। সিনসুনসানের সেই বিশাল ইয়াকাতাসগুলো আসলে সমাধি ছিল না; ওগুলো ছিল ‘সেনোটাফ’ (Cenotaph) বা স্মৃতিস্তম্ভ। রাজার দাহকার্য সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁর ছাইভস্ম হয়তো কোনো পবিত্র স্থানে লুকিয়ে রাখা হতো বা প্যাৎস্কুয়ারো হ্রদের (Lake Pátzcuaro) জলে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। আর এই শূন্য সমাধিগুলো তৈরি করা হতো রাজার আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং পরলোকে তাঁর যাত্রাপথকে সুরক্ষিত রাখতে।
কাজেই, যেটিকে সবাই এতদিন ধরে কবর ভেবে আসছিল, সেটি আসলে ছিল একটি প্রতীকী স্থাপনা—এক শক্তিশালী রাজার পার্থিব অনুপস্থিতি এবং তাঁর আত্মিক উপস্থিতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। যদিও এই তত্ত্বটিই সবচেয়ে বেশি গৃহীত, তবুও এক প্রশ্ন আজও ইতিহাসপ্রেমীদের মনে উঁকি দেয়—তারাঙ্কানরা কি সত্যিই তাদের রাজাদের ছাইভস্ম সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিত, নাকি আজও মেক্সিকোর কোনো অজানা কোণে লুকিয়ে আছে সেই পরাক্রমশালী সম্রাটদের শেষ চিহ্ন?
(এই বিষয়ে আরও জানতে: Google-এ অনুসন্ধান করুন)