বিষয়ের ভূমিকা
এনসিইআরটি (NCERT) অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ের নাম হলো 'গ্রামীণ এলাকায় শাসন চালানো' (Ruling the Countryside)। এই অধ্যায়ে আমরা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঔপনিবেশিক শাসনের প্রাথমিক দিনগুলো সম্পর্কে জানতে পারি। ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট মুঘল সম্রাট শাহ আলম দ্বিতীয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ান নিযুক্ত করেন। এর ফলে কোম্পানি বাংলার অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রধান অধিকারী হয়ে ওঠে। কিন্তু কোম্পানি কেবল একটি বাণিজ্যিক সংস্থা হিসেবে থাকতে চায়নি, তারা বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কৃষকদের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল যাতে ব্রিটিশ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব এবং কাঁচামাল সহজে সংগ্রহ করা যায়। এই অধ্যায়ে আমরা দেখব কীভাবে ব্রিটিশরা বাংলার এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের গ্রামীণ সমাজকে তাদের স্বার্থে পরিবর্তন করেছিল এবং তার পরিণতি কী হয়েছিল।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
ব্রিটিশরা ভারতে আসার পর তাদের মূল লক্ষ্য ছিল কীভাবে রাজস্ব বা কর সংগ্রহ বৃদ্ধি করা যায়। এ জন্য তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভূমি রাজস্ব নীতি বা বন্দোবস্ত চালু করেছিল। নিচে এই নীতিগুলির বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. দেওয়ানি লাভের ফলাফল
১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভ করার পর ব্রিটিশদের জন্য বাংলার রাজস্ব সংগ্রহের পথ সুগম হয়। এর আগে তারা ব্রিটেন থেকে সোনা ও রূপো এনে ভারতীয় পণ্য কিনত। কিন্তু দেওয়ানি লাভের পর ভারতের রাজস্ব থেকেই ভারতীয় পণ্য কেনার খরচ মেটানো শুরু হয়। এর ফলে খুব দ্রুত বাংলার অর্থনীতি দুর্বল হতে শুরু করে এবং কৃষকরা নিঃস্ব হয়ে পড়তে থাকে। ১৭৭০ সালে বাংলায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় (ছিয়াত্তরের মন্বন্তর), যাতে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়, কিন্তু কোম্পানি রাজস্ব আদায় কমানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
২. চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement, 1793)
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলায় 'চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত' চালু করেন। এই ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
- রাজস্বের হার নির্ধারণ: এই ব্যবস্থায় রাজা এবং তালুকদারদের 'জমিদার' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করে কোম্পানির কাছে জমা দেওয়ার জন্য।
- স্থায়ী হার: রাজস্বের পরিমাণ স্থায়ীভাবে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। ঠিক করা হয় যে ভবিষ্যতে এই পরিমাণ আর বাড়ানো হবে না। ব্রিটিশদের আশা ছিল এর ফলে জমিদাররা কৃষির উন্নয়নে অর্থ বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হবে।
- সূর্যমুখী আইন (Sunset Law): জমিদারদের একটি নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে সূর্যাস্তের আগে রাজস্ব জমা দিতে হতো। ব্যর্থ হলে তাদের জমিদারি কেড়ে নিয়ে তা নিলামে বিক্রি করা হতো।
- সমস্যা: বাস্তবে দেখা গেল জমিদাররা কৃষির উন্নয়নে কোনো বিনিয়োগ করছে না। কারণ রাজস্বের হার এত বেশি ছিল যে তা পরিশোধ করতেই জমিদারদের অবস্থা খারাপ হয়ে যেত। অনেক সময় জমিদাররা জমি হারাচ্ছিল এবং কৃষকরাও মহাজনদের ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছিল।
৩. নতুন রাজস্ব ব্যবস্থা: মহওয়ারি ও রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত
উনিশ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ কোম্পানির অনেক কর্মকর্তা বুঝতে পেরেছিলেন যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সব জায়গায় কাজ করছে না এবং এর ফলে কোম্পানির রাজস্ব আয়ও সীমিত হয়ে যাচ্ছে। তাই তারা নতুন ব্যবস্থা চালু করেন:
- মহওয়ারি বন্দোবস্ত (Mahalwari Settlement): উত্তর-পশ্চিম প্রদেশের (বর্তমানে উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও পাঞ্জাবের কিছু অংশ) জন্য হ্যল্ট ম্যাকেঞ্জি এই ব্যবস্থা চালু করেন। এখানে গ্রামের একটি নির্দিষ্ট অংশ বা 'মহল'-এর সমগ্র গ্রামবাসীর উপর রাজস্ব ধার্য করা হতো। গ্রামের মোড়ল বা প্রধান এই রাজস্ব আদায় করে কোম্পানির কাছে জমা দিতেন। এখানেও সময়ের সাথে সাথে রাজস্বের হার বাড়ানো হতো।
- রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত (Ryotwari Settlement): দক্ষিণ ভারতে (মাদ্রাজে এবং বোম্বাইয়ের কিছু অংশে) আলেকজান্ডার রিড এবং থমাস মুনরো এই ব্যবস্থা চালু করেন। এটিকে দক্ষিণ ভারতে 'মুন্রো ব্যবস্থা'ও বলা হয়। এই ব্যবস্থায় কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা জমিদার রাখা হয়নি। সরাসরি কৃষকদের বা 'রায়ত'-দের সাথে সরকারের চুক্তি হতো। কৃষকরা সরাসরি সরকারের কাছে রাজস্ব জমা দিত। তবে জমির উর্বরতা বিচার করে অত্যন্ত চড়া হারে রাজস্ব ধার্য করা হয়েছিল।
৪. বাণিজ্যিক ফসলের চাষ (Crops for Europe)
ব্রিটিশরা কেবল রাজস্ব দিয়েই সন্তুষ্ট ছিল না। তারা এমন কিছু ফসলের চাষ করাতে চেয়েছিল যা ইউরোপীয় বাজারে বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করা যায়। বাংলার কৃষকদের জোর করে আফিম এবং নীল (Indigo) চাষ করতে বাধ্য করা হয়:
- নীল চাষের সংকট: নীল কাপড়ের রঙ করার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ছিল। বাংলার নীল চাষীরা 'নিজ' এবং 'রিয়তি' পদ্ধতিতে নীল চাষ করতে বাধ্য হতো। কিন্তু নীল চাষের জন্য জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যেত এবং কৃষকরা খাদ্য শস্য ফলাতে পারত না। এর ফলে ১৮৫৯ সালে বাংলায় বিখ্যাত 'নীল বিদ্রোহ' (Indigo Rebellion) সংঘটিত হয়। কৃষকরা নীল চাষ করতে অস্বীকার করে এবং কুঠিয়ালদের আক্রমণ করে।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কবে এবং কার দ্বারা প্রবর্তিত হয়েছিল?
উত্তর: ১৭৯৩ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেছিলেন।
প্রশ্ন ২: 'সূর্যমুখী আইন' (Sunset Law) কী?
উত্তর: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অধীনে জমিদারদের নির্দিষ্ট একটি দিনের মধ্যে সূর্যাস্তের পূর্বে কোম্পানির কাছে রাজস্ব জমা দিতে হতো। ব্যর্থ হলে তাদের জমিদারি নিলামে বিক্রি করা হতো। একেই সূর্যমুখী আইন বলা হয়।
প্রশ্ন ৩: রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত কোথায় চালু করা হয়েছিল?
উত্তর: রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত মূলত দক্ষিণ ভারতের ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলিতে, বিশেষ করে মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে চালু করেছিলেন আলেকজান্ডার রিড এবং থমাস মুনরো।
প্রশ্ন ৪: নীল বিদ্রোহ কবে হয়েছিল এবং এর মূল কারণ কী ছিল?
উত্তর: ১৮৫৯ সালে বাংলায় নীল বিদ্রোহ শুরু হয়। কৃষকদের জোর করে লাভজনক খাদ্যশস্যের পরিবর্তে নীল চাষে বাধ্য করা এবং তাদের ওপর অত্যাচার ও শোষণের প্রতিবাদেই এই বিদ্রোহ হয়েছিল।
সারসংক্ষেপ
- ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভ করার পর গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ শুরু হয়।
- ১৭৯৩ সালে বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করা হয়, যা জমিদার ও কৃষকদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
- উত্তর-পশ্চিমে মহওয়ারি এবং দক্ষিণ ভারতে রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের মাধ্যমে নতুন রাজস্ব নীতি প্রবর্তন করা হয়।
- ইউরোপের বাজারের চাহিদার কথা মাথায় রেখে ব্রিটিশরা কৃষকদের নীল ও আফিম চাষে বাধ্য করে, যার ফলে বাংলায় নীল বিদ্রোহের মতো জনরোষ তৈরি হয়।