বিষয়ের ভূমিকা
গণতন্ত্র মানেই হলো জনগণের শাসন। কিন্তু আধুনিক যুগে যেখানে জনসংখ্যা কোটি কোটি, সেখানে প্রতিটি নাগরিকের পক্ষে সরাসরি দেশ শাসন করা সম্ভব নয়। তাই আমরা আমাদের প্রতিনিধিদের বেছে নিই। এই প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার পদ্ধতিকেই বলা হয় নির্বাচন। নবম শ্রেণির রাষ্ট্রবিজ্ঞান পাঠ্যক্রমের তৃতীয় অধ্যায় 'নির্বাচনী রাজনীতি' (Electoral Politics) আমাদের শেখায় কেন নির্বাচন প্রয়োজন, কীভাবে একটি নির্বাচন গণতান্ত্রিক হয় এবং ভারতের মতো বিশাল দেশে নির্বাচনী প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন করা হয়। এই পাঠটি কেবল পরীক্ষার জন্য নয়, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবেও আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. কেন নির্বাচন প্রয়োজন? (Why do we need Elections?)
নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র কল্পনা করা কঠিন। নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা নিচে আলোচনা করা হলো:
- প্রতিনিধি নির্বাচন: ভোটাররা তাদের পছন্দের মানুষকে আইন প্রণেতা বা শাসক হিসেবে বেছে নিতে পারেন।
- সরকার গঠন: নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় কোন দলটি সরকার গঠন করবে এবং প্রধান সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করবে।
- নীতি নির্ধারণ: ভোটাররা তাদের পছন্দের দলের নীতির ভিত্তিতে ভোট দেন, ফলে সরকার কোন পথে চলবে তা নির্বাচনের মাধ্যমেই ঠিক হয়।
- জবাবদিহিতা: যদি কোনো প্রতিনিধি ভালো কাজ না করেন, তবে পরবর্তী নির্বাচনে ভোটাররা তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে পারেন। এই ভয়ই প্রতিনিধিদের জনগণের জন্য কাজ করতে বাধ্য করে।
২. কী একটি নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক করে তোলে?
সব দেশে নির্বাচন হয়, কিন্তু সব নির্বাচন গণতান্ত্রিক নয়। একটি নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক হতে হলে পাঁচটি প্রধান শর্ত পূরণ করতে হয়:
- সবার ভোটাধিকার: প্রত্যেকের একটি ভোট থাকবে এবং প্রতিটি ভোটের মান সমান হবে (এক ব্যক্তি, এক ভোট, এক মান)।
- বিকল্প পছন্দ: ভোটারদের সামনে একাধিক প্রার্থী এবং রাজনৈতিক দল থাকতে হবে যাতে তারা বেছে নিতে পারেন।
- নিয়মিত বিরতি: নির্বাচন নিয়মিত ব্যবধানে (যেমন ভারতে প্রতি ৫ বছর অন্তর) অনুষ্ঠিত হতে হবে।
- জনগণের পছন্দ: যাকে জনগণ সবচেয়ে বেশি ভোট দেবে, তিনিই নির্বাচিত হবেন।
- মুক্ত ও অবাধ নির্বাচন: কোনো ভয়ভীতি বা প্রলোভন ছাড়া মানুষ যেন স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে।
৩. রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি ভালো? (Is Political Competition Good?)
নির্বাচনের অর্থই হলো বিভিন্ন দল ও প্রার্থীর মধ্যে প্রতিযোগিতা। এর কিছু নেতিবাচক দিক থাকলেও ইতিবাচক দিকটি অনেক বেশি শক্তিশালী:
- নেতিবাচক দিক: এটি সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে, দলীয় কোন্দল বাড়ায় এবং অনেক সময় প্রার্থীরা একে অপরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়ি করেন।
- ইতিবাচক দিক: রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই দলগুলো জনগণকে ভালো পরিষেবা দিতে বাধ্য হয়। তারা জানে যে ভালো কাজ না করলে পরের বার তারা হেরে যাবে। এটি অনেকটা বাজারের মতো—দোকানদাররা যদি ভালো পণ্য না দেয়, ক্রেতারা অন্য দোকানে যাবে। ঠিক তেমনই রাজনীতিতেও কাজ না করলে ভোটাররা অন্য দলকে বেছে নেবে।
৪. ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থা (Our System of Elections)
ভারতে লোকসভা (সংসদ) এবং বিধানসভা (রাজ্য আইনসভা) নির্বাচন প্রতি ৫ বছর অন্তর হয়। ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়া বেশ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
ক) নির্বাচনী এলাকা (Electoral Constituencies)
পুরো দেশকে বিভিন্ন এলাকায় ভাগ করা হয়, যেগুলোকে নির্বাচনী এলাকা বা আসন বলা হয়। লোকসভা নির্বাচনের জন্য ভারতকে ৫৪৩টি নির্বাচনী এলাকায় ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি এলাকা থেকে একজন প্রতিনিধি নির্বাচিত হন, যাকে সাংসদ বা MP বলা হয়। একইভাবে রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে প্রতিটি এলাকা থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে বিধায়ক বা MLA বলা হয়।
খ) সংরক্ষিত নির্বাচনী এলাকা (Reserved Constituencies)
ভারতের সংবিধান রচয়িতারা দুর্বল শ্রেণির (তফসিলি জাতি ও উপজাতি) জন্য নির্দিষ্ট কিছু আসন সংরক্ষিত রেখেছেন। এটি করা হয়েছে যাতে সমাজের সব অংশ সংসদে বা বিধানসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব পায়। বর্তমানে লোকসভায় ৮৪টি আসন তফসিলি জাতির (SC) জন্য এবং ৪৭টি আসন তফসিলি উপজাতির (ST) জন্য সংরক্ষিত।
গ) ভোটার তালিকা (Voters' List)
নির্বাচনের আগে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী সমস্ত নাগরিকের একটি তালিকা তৈরি করা হয়, যাকে বলা হয় 'ভোটার তালিকা' বা 'ইলেক্টোরাল রোল'। ভারতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ভোট দেওয়ার অধিকার পান। এটিই হলো 'সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার' (Universal Adult Franchise)।
ঘ) প্রার্থী মনোনয়ন (Nomination of Candidates)
যে কেউ যিনি ভোটার, তিনি প্রার্থী হতে পারেন (তবে প্রার্থীর বয়স অন্তত ২৫ বছর হতে হবে)। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রার্থীদের মনোনীত করে এবং একে 'টিকিট' দেওয়া বলা হয়। প্রতিটি প্রার্থীকে একটি মনোনয়নপত্র জমা দিতে হয় এবং তার সম্পত্তি ও অপরাধমূলক রেকর্ড সম্পর্কে হলফনামা দিতে হয়।
ঙ) নির্বাচনী প্রচার (Election Campaign)
ভোটের আগে প্রার্থীরা জনগণের কাছে তাদের দাবি ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে যান। এটি নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সময়ে বিভিন্ন স্লোগান যেমন— 'গরিবি হঠাও' (১৯৭১), 'গণতন্ত্র বাঁচাও' (১৯৭৭) ইত্যাদি জনপ্রিয় হয়। তবে প্রচারের ক্ষেত্রে কিছু কঠোর নিয়ম বা 'আচরণবিধি' (Code of Conduct) মেনে চলতে হয়।
৫. ভারত কেন গণতান্ত্রিক নির্বাচনের দেশ?
ভারতে নির্বাচন কেন অবাধ ও সুষ্ঠু হয় তার প্রধান কারণগুলি হলো:
- স্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ECI): ভারতে নির্বাচন পরিচালনা করে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন সংস্থা—নির্বাচন কমিশন। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে দেশের রাষ্ট্রপতির মতো ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং সরকার তার ওপর কোনো প্রভাব খাটাতে পারে না।
- জনগণের অংশগ্রহণ: ভারতে ভোটারদের অংশগ্রহণের হার সাধারণত উন্নত দেশগুলোর তুলনায় বেশি। সাধারণ মানুষ মনে করেন যে তাদের ভোটের মাধ্যমে তারা দেশের নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারেন।
- ফলাফলের স্বীকৃতি: ভারতে পরাজিত দল সাধারণত নির্বাচনের রায় মেনে নেয়, যা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
১. নির্বাচনী আচরণবিধি (Code of Conduct) কী?
উত্তর: এটি হলো নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্য নির্ধারিত কিছু নিয়মের সমষ্টি। যেমন—সরকারি যানবাহন ব্যবহার না করা, ধর্মীয় স্থানে প্রচার না করা এবং ভোটারদের ঘুষ না দেওয়া।
২. উপ-নির্বাচন (By-election) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: যদি কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি মারা যান বা পদত্যাগ করেন, তবে সেই নির্দিষ্ট আসনের শূন্যস্থান পূরণের জন্য যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাকে উপ-নির্বাচন বলা হয়।
৩. নির্বাচন কমিশনের প্রধান কাজ কী?
উত্তর: নির্বাচন কমিশনের প্রধান কাজ হলো ভোটার তালিকা তৈরি করা, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা, আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীকে শাস্তি দেওয়া এবং সম্পূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়াটি অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা।
সারসংক্ষেপ
- নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র যেখানে জনগণ তাদের প্রতিনিধি বেছে নেয়।
- ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম স্বচ্ছ ও সুসংগঠিত প্রক্রিয়া।
- সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক সমতা নিশ্চিত করা হয়।
- স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ভারতের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে তুলেছে।