বিষয়ের ভূমিকা

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা নানা ধরণের পোশাক এবং বিভিন্ন বস্তু ব্যবহার করি। এই বস্তুগুলির মধ্যে কিছু প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া যায় আবার কিছু মানুষের দ্বারা পরীক্ষাগারে বা কারখানায় তৈরি হয়। অষ্টম শ্রেণি বিজ্ঞান বিষয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে আমরা শিখব কৃত্রিম আঁশ (Synthetic Fibres) এবং প্লাস্টিক (Plastics) সম্পর্কে। এই উপাদানগুলি আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে এবং এদের ভালো ও মন্দ দিকগুলি কী কী, তা এই অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে কৃত্রিম উপাদানের ব্যবহার আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করে তুলেছে, কিন্তু এর সাথে পরিবেশগত কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

কৃত্রিম আঁশ ও প্লাস্টিক বোঝার জন্য আমাদের প্রথমে কিছু মৌলিক রাসায়নিক ধারণা পরিষ্কার করতে হবে। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. পলিমার কী? (What is a Polymer?)

প্রাকৃতিক আঁশ যেমন তুলা বা পাট উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায়, কিন্তু কৃত্রিম আঁশ মানুষের তৈরি। কৃত্রিম আঁশ এবং প্লাস্টিক আসলে এক ধরণের পলিমার (Polymer)। 'পলিমার' শব্দটি একটি গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে যেখানে 'পলি' (Poly) মানে বহু এবং 'মার' (Mer) মানে একক বা অংশ। সুতরাং, অনেকগুলি ছোট ছোট একক বা মনুমার (Monomer) একত্রিত হয়ে একটি বিশাল শৃঙ্খল সদৃশ গঠন তৈরি করে, যাকে পলিমার বলে। পলিমার প্রকৃতিতেও পাওয়া যায়, যেমন তুলো এক ধরণের পলিমার যার নাম সেলুলোজ (Cellulose)। সেলুলোজ লক্ষ লক্ষ গ্লুকোজ অণু নিয়ে গঠিত।

২. কৃত্রিম আঁশের প্রকারভেদ

পরীক্ষাগারে রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি আঁশগুলিকে কৃত্রিম আঁশ বলা হয়। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:

  • নাইলন (Nylon): এটি প্রথম সম্পূর্ণরূপে কৃত্রিম আঁশ যা ১৯৩১ সালে তৈরি হয়েছিল। এতে কোনো প্রাকৃতিক কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়নি। এটি অত্যন্ত শক্তিশালী, নমনীয় এবং হালকা। প্যারাস্যুট এবং পর্বতারোহণের দড়ি তৈরিতে এটি ব্যবহৃত হয়।
  • পলিয়েস্টার (Polyester): এটি এমন এক কৃত্রিম আঁশ যা সহজে কুঁচকে যায় না এবং এটি থেকে খুব ভালো পোশাক তৈরি হয়। টেরিলিন একটি জনপ্রিয় পলিয়েস্টার।
  • রেয়ন (Rayon): এটিকে কৃত্রিম রেশমও বলা হয়। কাঠ ও সেলুলোজের রাসায়নিক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এটি তৈরি করা হয়। রেশমের চেয়ে সস্তা হওয়ায় এর চাহিদা খুব বেশি।
  • অ্যাক্রিলিক (Acrylic): এটি কৃত্রিম পশম হিসেবে পরিচিত। শীতের সোয়েটার ও কম্বল তৈরিতে এটি ব্যবহৃত হয়।

৩. প্লাস্টিকের জগৎ

প্লাস্টিকও এক ধরণের পলিমার। সমস্ত প্লাস্টিকের কাঠামোগত বিন্যাস একই রকম হয় না। প্লাস্টিক প্রধানত দুই প্রকার:

  • থার্মোপ্লাস্টিক (Thermoplastics): যে সমস্ত প্লাস্টিক তাপ দিলে সহজে নরম হয়ে যায় এবং ঠান্ডা করলে শক্ত হয়ে যায়, তাদের থার্মোপ্লাস্টিক বলে। যেমন—পলিথিন এবং পিভিসি (PVC)। এগুলি দিয়ে খেলনা, চিরুনি ও জলের পাইপ তৈরি হয়।
  • থার্মোসেটিং প্লাস্টিক (Thermosetting Plastics): যে সমস্ত প্লাস্টিক একবার তৈরি হওয়ার পর আর তাপ দিয়ে নরম করা যায় না, তাদের থার্মোসেটিং প্লাস্টিক বলে। যেমন—ব্যাকোলাইট এবং মেলামাইন। ব্যাকোলাইট দিয়ে বৈদ্যুতিক সুইচ ও পাত্রের হাতল তৈরি হয় কারণ এটি তাপ ও বিদ্যুতের কুপরিবাহী।

৪. পরিবেশের ওপর প্লাস্টিকের প্রভাব

প্লাস্টিক আমাদের জীবনযাত্রাকে আরামদায়ক করে তুললেও এটি পরিবেশের জন্য একটি মারাত্মক হুমকি। কারণ প্লাস্টিক অপচনশীল বা জৈব-অবিশ্লেষ্য (Non-biodegradable)। মাটিতে ফেলে দিলে এটি শত বছরেও পচে মিশে যায় না। এর ফলে মাটি ও জলদূষণ ঘটে। আমাদের সবসময় 'ফোর আর' (4R) নীতি অনুসরণ করা উচিত: Reduce (কমানো), Reuse (পুনর্ব্যবহার), Recycle (পুনঃচক্রায়ন), এবং Recover (পুনরুদ্ধার)।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: পলিমার কাকে বলে? উদাহরণ দাও।

উত্তর: অনেকগুলি ছোট ছোট একক বা মনুমার একত্রিত হয়ে যে বৃহৎ শৃঙ্খল বা অণু গঠন করে তাকে পলিমার বলে। যেমন—প্লাস্টিক, নাইলন এবং সেলুলোজ হলো পলিমারের উদাহরণ। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত সেলুলোজ উদ্ভিদের একটি স্বাভাবিক পলিমার।

প্রশ্ন ২: থার্মোপ্লাস্টিক ও থার্মোসেটিং প্লাস্টিকের মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: থার্মোপ্লাস্টিক তাপ পেলে নরম হয় এবং ইচ্ছামতো আকৃতি পরিবর্তন করা যায় (যেমন পলিথিন)। অন্যদিকে, থার্মোসেটিং প্লাস্টিক একবার তৈরি হওয়ার পর তাপ দিলেও নরম হয় না (যেমন ব্যাকোলাইট)।

প্রশ্ন ৩: কেন আমরা পলিয়েস্টারের পোশাক গরমকালে পরতে স্বচ্ছন্দ বোধ করি না?

উত্তর: পলিয়েস্টার আঁশ খুব বেশি জল শোষণ করে না। গরমকালে আমাদের শরীর থেকে যে ঘাম বের হয়, তা এই আঁশ শোষণ করতে পারে না বলে আমরা অস্বস্তি ও গরম বোধ করি।

প্রশ্ন ৪: পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে আমাদের কী করা উচিত?

উত্তর: আমাদের প্লাস্টিকের ব্যাগের বদলে কাপড়ের বা পাটের তৈরি থলে ব্যবহার করা উচিত এবং পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারে উৎসাহী হওয়া উচিত।

সারসংক্ষেপ

  • পলিমার হলো অসংখ্য ক্ষুদ্র অণুর সমন্বয়ে গঠিত বৃহৎ শৃঙ্খল।
  • নাইলন, পলিয়েস্টার ও রেয়ন হলো বহুল ব্যবহৃত কৃত্রিম আঁশ।
  • প্লাস্টিক দুই প্রকার: থার্মোপ্লাস্টিক এবং থার্মোসেটিং প্লাস্টিক।
  • প্লাস্টিক অপচনশীল হওয়ায় পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করে।
  • পরিবেশ বাঁচাতে আমাদের প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং পুনর্ব্যবহার করা উচিত।