বিষয়ের ভূমিকা
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো নিয়মনীতি এবং সমতা। একটি গণতান্ত্রিক দেশে সরকার কীভাবে পরিচালিত হবে, নাগরিকদের কী কী অধিকার থাকবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার কীভাবে রোধ করা যাবে—এই সমস্ত বিষয় পরিচালনা করার জন্য কিছু মৌলিক নিয়মের প্রয়োজন হয়। এই লিখিত নিয়মের সমষ্টিকেই আমরা বলি সংবিধান (Constitution)।
NCERT নবম শ্রেণির গণতান্ত্রিক রাজনীতি (Democratic Politics) বিষয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় 'সংবিধান প্রণয়ন' (Constitutional Design) অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি অধ্যায়। এই অধ্যায়ে আমরা জানব কীভাবে একটি দেশের জন্য সংবিধান অত্যন্ত জরুরি হয়ে ওঠে, কীভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা তার বর্ণবাদের কালো ইতিহাস পেছনে ফেলে একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করেছিল এবং কীভাবে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের সংবিধাতারগণ এক যুগান্তকারী ও দূরদর্শী দলিল তৈরি করেছিলেন। এই নিবন্ধটি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি সংবিধানের মূল ধারণাগুলো সহজ ভাষায় বুঝতে সাহায্য করবে।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য এবং গণতন্ত্রের উদয়
সংবিধানের প্রয়োজনীয়তা ও এর গঠন প্রক্রিয়া বোঝার জন্য আমাদের প্রথমে দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাস লক্ষ্য করতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকায় দীর্ঘকাল ধরে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে চরম বৈষম্য বিদ্যমান ছিল, যা 'বর্ণবৈষম্য' (Apartheid) নামে পরিচিত।
- বর্ণবৈষম্য নীতি কী?: এটি ছিল শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু শাসকগোষ্ঠী দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় কৃষ্ণাঙ্গদের নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছিল না। তারা শ্বেতাঙ্গদের এলাকায় বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করতে পারত না।
- পৃথকীকরণ (Segregation): ট্রেন, বাস, ট্যাক্সি, হোটেল, হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, গ্রন্থাগার, সিনেমা হল এবং এমনকি গির্জা পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য আলাদা ছিল।
- নেলসন ম্যান্ডেলার সংগ্রাম: এই নির্মম ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন নেলসন ম্যান্ডেলা (Nelson Mandela) এবং তাঁর দল 'আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস' (ANC)। বর্ণবাদের বিরোধিতা করার অপরাধে ১৯৬৪ সালে ম্যান্ডেলাসহ আটজন নেতাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি দীর্ঘ ২৮ বছর রবেন দ্বীপের (Robben Island) ভয়াবহ কারাগারে বন্দি ছিলেন।
- নতুন সংবিধান গঠন: তীব্র আন্দোলনের মুখে অবশেষে ১৯৯৪ সালের ২৬ এপ্রিল মধ্যরাতে দক্ষিণ আফ্রিকায় গণতন্ত্রের নতুন সূর্য উদিত হয়। কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ নেতারা একসাথে বসে তৈরি করেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সর্বজনীন সংবিধান। যেখানে উভয় পক্ষই অতীতের তিক্ততা ভুলে সমতা ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে এক নতুন দক্ষিণ আফ্রিকা গড়ার অঙ্গীকার করে।
২. আমাদের সংবিধানের প্রয়োজন কেন?
সংবিধান কেবল আইনের বই নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের হৃদস্পন্দন। একটি দেশের সংবিধান মূলত নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করে:
- বিশ্বাস ও সমন্বয় রক্ষা: সংবিধানে এমন কিছু নিয়ম থাকে যা দেশের বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতা গড়ে তোলে।
- সরকার গঠন ও ক্ষমতা নির্ধারণ: সরকার কীভাবে গঠিত হবে, কার হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে এবং ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কী হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে সংবিধানে লেখা থাকে।
- নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা: সংবিধান নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেয় এবং সরকারের স্বৈরাচারী ক্ষমতার ওপর রাশ টানে।
- সুন্দর সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা: সংবিধানের মাধ্যমে জনগণ তাদের আদর্শ ও একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলার যৌথ স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
৩. ভারতীয় সংবিধান প্রণয়নের পথ
ভারতের মতো এক বিশাল, বহুভাষী এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশের জন্য সংবিধান তৈরি করা কোনো সহজ কাজ ছিল না। ভারত যখন স্বাধীন হয়, তখন দেশভাগের ক্ষত এবং দেশীয় রাজ্যগুলোর ভারতের সাথে অন্তর্ভুক্তির মতো জটিল সমস্যাগুলো সামনে ছিল।
কিন্তু ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস সংবিধান রচয়িতাদের এক চমৎকার মানসিক প্রস্তুতি দিয়েছিল।
- প্রাথমিক খসড়া (১৯২৮ ও ১৯৩১): ১৯২৮ সালে মতিলাল নেহেরু এবং আটজন কংগ্রেস নেতা ভারতের জন্য প্রথম একটি খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করেন। এরপর ১৯৩১ সালের করাচি অধিবেশনে স্বাধীন ভারতের সংবিধান কেমন হবে, তা নিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়। যেখানে সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার, স্বাধীনতা ও সমতার অধিকার এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারের কথা বলা হয়েছিল।
- গণপরিষদ (Constituent Assembly): ভারতের সংবিধান রচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত এক 'গণপরিষদ'-এর ওপর। ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে গণপরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ডিসেম্বর মাসে এর প্রথম অধিবেশন বসে। দেশভাগের পর গণপরিষদে সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯৯ জন।
- খসড়া কমিটি ও ডঃ বি. আর. আম্বেদকর: সংবিধানের খসড়া তৈরির জন্য ডঃ বি. আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বে একটি 'খসড়া কমিটি' (Drafting Committee) গঠন করা হয়। দীর্ঘ ২ বছর ১১ মাস ১৮ দিন ধরে নিখুঁত আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণের পর ভারতীয় সংবিধান চূড়ান্ত রূপ পায়।
- গৃহীত ও কার্যকর হওয়া: ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর গণপরিষদ কর্তৃক ভারতীয় সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়। এই দিনটিকে সম্মান জানাতেই আমরা প্রতি বছর 'প্রজাতন্ত্র দিবস' (Republic Day) হিসেবে উদযাপন করি।
৪. ভারতীয় সংবিধানের পথনির্দেশক মূল্যবোধ ও প্রস্তাবনা
ভারতীয় সংবিধানের শুরুতে একটি সংক্ষিপ্ত মুখবন্ধ রয়েছে, যাকে বলা হয় 'প্রস্তাবনা' (Preamble)। প্রস্তাবনাকে ভারতীয় সংবিধানের 'আত্মা' বলা হয়। এর প্রতিটি শব্দ আমাদের দেশের লক্ষ্য ও আদর্শকে ধারণ করে:
- সার্বভৌম (Sovereign): ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা রয়েছে একমাত্র ভারতের জনগণের। কোনো বিদেশি শক্তি ভারতকে কোনো নির্দেশ দিতে পারে না।
- সমাজতান্ত্রিক (Socialist): দেশের সম্পদ সামাজিকভাবে উৎপাদিত হবে এবং তা সবার মধ্যে সমতার ভিত্তিতে বণ্টিত হবে। সরকার ভূমি ও শিল্পের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করে সামাজিক বৈষম্য দূর করবে।
- ধর্মনিরপেক্ষ (Secular): দেশের সব ধর্মই সমান মর্যাদা পাবে। রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো সরকারি ধর্ম থাকবে না। নাগরিকরা স্বাধীনভাবে যেকোনো ধর্ম পালন করতে পারবেন।
- গণতান্ত্রিক (Democratic): এমন এক শাসনব্যবস্থা যেখানে দেশের নাগরিকরা সম রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করবেন, নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন এবং সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।
- প্রজাতন্ত্র (Republic): দেশের রাষ্ট্রপ্রধান (যেমন রাষ্ট্রপতি) জনগণের দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হবেন, কোনো বংশানুক্রমিক রাজা বা রানি হবেন না।
- ন্যায়বিচার (Justice): জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের সাথে বৈষম্য করা যাবে না।
- স্বাধীনতা (Liberty): চিন্তা, মতামত প্রকাশ ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নাগরিকদের ওপর কোনো অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞা থাকবে না।
- সমতা (Equality): আইনের চোখে সবাই সমান এবং সকলকে সম সুযোগ প্রদান করা হবে।
- ভ্রাতৃত্ব (Fraternity): আমরা সবাই একই পরিবারের সদস্য হিসেবে বসবাস করব এবং দেশের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখব।
৫. প্রাতিষ্ঠানিক নকশা (Institutional Design)
সংবিধান কোনো অপরিবর্তনীয় বা জড় বস্তু নয়। পরিবর্তনশীল সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য সংবিধানে বদল আনার সুযোগ রাখা হয়েছে। একে বলা হয় 'সংবিধান সংশোধন' (Constitutional Amendment)। তবে ভারতের সংবিধানের মূল কাঠামো বা মৌলিক চরিত্রকে নষ্ট না করে এই সংশোধন প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: 'বর্ণবৈষম্য' (Apartheid) বলতে কী বোঝায়? দক্ষিণ আফ্রিকায় এর প্রভাব কেমন ছিল?
উত্তর: বর্ণবৈষম্য হলো গায়ের রঙের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টির এক কুখ্যাত সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যা দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ শাসকদের দ্বারা কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর প্রভাবে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং বাস, হাসপাতাল, স্কুল ও বিনোদনমূলক স্থানসহ সমস্ত সামাজিক ক্ষেত্রকে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য আলাদা করে দেওয়া হয়েছিল (যা পৃথকীকরণ নীতি নামে পরিচিত)।
প্রশ্ন ২: ভারতীয় সংবিধান রচনায় 'গণপরিষদ'-এর ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: গণপরিষদ হলো স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনার জন্য গঠিত এক প্রতিনিধি সভা। ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বরে প্রথম বৈঠকের পর থেকে দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে ২৯৯ জন সদস্য নিরলস পরিশ্রম করে ভারতীয় সংবিধান তৈরি করেন। তাঁরা দেশের সামাজিক বৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক, উন্মুক্ত এবং সর্বসম্মত উপায়ে সংবিধানের খসড়া তৈরি ও অনুমোদন করেছিলেন।
প্রশ্ন ৩: ভারতীয় সংবিধানের 'প্রস্তাবনা' (Preamble)-কে কেন সংবিধানের আত্মা বলা হয়?
উত্তর: প্রস্তাবনা হলো সংবিধানের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতিমূলক বিবৃতি যা সংবিধানের মূল মূল্যবোধ, আদর্শ এবং লক্ষ্যগুলিকে প্রতিফলিত করে। এটি এমন একটি মাপকাঠি যার সাহায্যে যেকোনো আইন বা সরকারি কাজের ভালো-মন্দ মূল্যায়ন করা যায়। সার্বভৌমত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমতার মতো সমস্ত জীবনদায়ী আদর্শ প্রস্তাবনায় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকায় একে সংবিধানের 'আত্মা' বলা হয়।
প্রশ্ন ৪: ভারতীয় সংবিধানকে একটি 'জীবন্ত দলিল' (Living Document) বলা হয় কেন?
উত্তর: ভারতীয় সংবিধান কোনো অনড় বা পরিবর্তনহীন নিয়মাবলি নয়। সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের চাহিদা ও সমাজের আদর্শ পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য সংবিধানে নিয়মিত সংশোধনের (Amendment) বিধান রাখা হয়েছে। যেহেতু এটি সমসাময়িক বাস্তবতার সাথে নিয়মিত বিকশিত ও অভিযোজিত হতে পারে, তাই একে 'জীবন্ত দলিল' বলা হয়।
সারসংক্ষেপ
- সংবিধান হলো একটি রাষ্ট্রের মৌলিক আইনি কাঠামো যা সরকার ও জনগণের সম্পর্ক নির্ধারণ করে।
- নেলসন ম্যান্ডেলার দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান ঘটে এবং বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণতান্ত্রিক সংবিধান রচিত হয়।
- ডঃ বি. আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বে খসড়া কমিটি ভারতীয় সংবিধানের রূপরেখা তৈরি করে, যা ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি কার্যকর হয়।
- সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সমতা ও ভ্রাতৃত্ব হলো ভারতীয় সংবিধানের মূল ভিত্তি।
- পরিবর্তনশীল সমাজের চাহিদা মেটাতে আমাদের সংবিধানে সংশোধন বা পরিবর্তনের ব্যবস্থা রয়েছে।