বিষয়ের ভূমিকা

আজ আমরা অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং রোমাঞ্চকর অধ্যায় নিয়ে আলোচনা করব - 'যখন জনগণ বিদ্রোহ করে: ১৮৫৭ এবং তার পরে'। এই অধ্যায়টি শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক জ্বলন্ত মাইলফলক। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের সূচনা হয়েছিল, ঠিক ১০০ বছর পর, ১৮৫৭ সালে সেই শাসনের বিরুদ্ধে এক বিশাল বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে।

এই বিদ্রোহ প্রথমে সিপাহীদের মধ্যে শুরু হলেও, দ্রুত এটি ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষ, কৃষক, জমিদার এবং রাজাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাই একে শুধুমাত্র 'সিপাহী বিদ্রোহ' বললে ভুল হবে; এটি ছিল ভারতের প্রথম সংগঠিত গণ-বিদ্রোহ বা স্বাধীনতা সংগ্রাম। এই অধ্যায়ে আমরা জানব কেন এই বিদ্রোহ হয়েছিল, কারা এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, কীভাবে এটি বিস্তার লাভ করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত এর ফলাফল কী হয়েছিল। এই ঘটনা কীভাবে ভারতের ভবিষ্যৎ এবং ব্রিটিশ শাসনের চরিত্রকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল, তা আমরা বিস্তারিতভাবে বুঝব।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. ব্রিটিশ নীতি এবং জনগণের উপর তার প্রভাব

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এর পিছনে ছিল ১০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের ফলে জমে থাকা ক্ষোভ, অপমান এবং শোষণ। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ কোম্পানির নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

ক) রাজা এবং নবাবদের ক্ষমতা হ্রাস

ব্রিটিশরা ভারতে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছিল। এর মধ্যে দুটি কুখ্যাত নীতি ছিল:

  • অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance): এই নীতির মাধ্যমে ব্রিটিশরা ভারতীয় রাজাদের সুরক্ষার নামে তাদের রাজ্যে নিজেদের সেনা মোতায়েন করত এবং এর বিনিময়ে রাজাদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ বা রাজ্যের অংশ নিত। ফলস্বরূপ, রাজারা কার্যত তাদের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলতেন।
  • স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse): গভর্নর-জেনারেল লর্ড ডালহৌসির এই নীতি অনুযায়ী, কোনো রাজার পুত্রসন্তান না থাকলে, তার রাজ্য সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত। এই নীতির মাধ্যমে সাতারা, সম্বলপুর, উদয়পুর, নাগপুর এবং বিশেষ করে ঝাঁসি-কে ব্রিটিশরা দখল করে নেয়। ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাই তাঁর দত্তক পুত্রকে উত্তরাধিকারী হিসেবে 인정 করাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ব্রিটিশরা তা মানতে অস্বীকার করে।

এছাড়াও, অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের উপর 'কুশাসন'-এর অভিযোগ এনে ১৮৫৬ সালে তাঁর রাজ্য কেড়ে নেওয়া হয়। কানপুরের কাছে বিঠুরে বসবাসকারী পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাও-এর দত্তক পুত্র নানা সাহেব-এর পেনশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বংশধররা আর 'সম্রাট' উপাধি ব্যবহার করতে পারবেন না এবং তাদের লালকেল্লা ছেড়ে দিল্লির অন্য কোথাও থাকতে হবে। এই সমস্ত ঘটনাগুলি দেশীয় রাজপরিবারগুলিকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল।

খ) কৃষক এবং জমিদারদের অসন্তোষ

ব্রিটিশদের ভূমি রাজস্ব নীতিগুলি গ্রামীণ জীবনে বিপর্যয় নিয়ে এসেছিল।

  • অত্যধিক কর: কোম্পানি কৃষকদের উপর চড়া হারে কর চাপিয়েছিল। কর আদায়ের পদ্ধতিও ছিল অত্যন্ত কঠোর।
  • জমির মালিকানা হারানো: যারা সময়মতো কর দিতে পারত না, তাদের জমি কেড়ে নেওয়া হত। বহু কৃষক মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হত এবং ঋণের জালে জড়িয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যেত।
  • জমিদারদের দুর্দশা: অনেক পুরোনো জমিদারও ব্রিটিশদের নীতির শিকার হয়েছিলেন। তারাও সময়মতো রাজস্ব জমা দিতে না পারলে তাদের জমিদারি নিলামে উঠত।

গ) সিপাহীদের ক্ষোভ

যারা কোম্পানির সেনাবাহিনীতে কাজ করত, সেই ভারতীয় সিপাহীদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছিল।

  • বেতন ও সুযোগ-সুবিধা: ভারতীয় সিপাহীদের বেতন, ভাতা এবং চাকরির শর্তাবলী ব্রিটিশ সৈন্যদের তুলনায় অনেক খারাপ ছিল। তাদের পদোন্নতির সুযোগও ছিল সীমিত।
  • ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত: অনেক সিপাহী মনে করত যে কোম্পানি তাদের ধর্ম এবং জাত নষ্ট করার চেষ্টা করছে। যেমন, ১৮৫৬ সালের 'General Service Enlistment Act' অনুযায়ী, নতুন নিযুক্ত সিপাহীদের প্রয়োজনে সমুদ্রপথে বিদেশেও যুদ্ধ করতে যেতে হবে। তৎকালীন হিন্দু সমাজে সমুদ্রযাত্রা 'ধর্মনাশা' বলে মনে করা হত।
  • তাৎক্ষণিক কারণ (The Immediate Cause): ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে নতুন এনফিল্ড রাইফেল (Enfield Rifle)-এর প্রবর্তন। এই রাইফেলের জন্য যে কার্তুজ ব্যবহার করা হত, সেটির উপরের অংশটি দাঁত দিয়ে কেটে রাইফেলে ভরতে হত। গুজব রটে যায় যে এই কার্তুজের খোলসটি গরু এবং শূকরের চর্বি দিয়ে তৈরি। এটি হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সিপাহীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে তীব্র আঘাত হানে, কারণ গরুকে হিন্দুরা পবিত্র মনে করে এবং শূকর মুসলিমদের জন্য হারাম।

২. একটি বিদ্রোহ গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়

চর্বি মাখানো কার্তুজের ঘটনাটি বারুদের স্তূপে আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে।

মঙ্গল পান্ডের বিদ্রোহ

২৯শে মার্চ, ১৮৫৭ সালে, ব্যারাকপুর সেনানিবাসে মঙ্গল পান্ডে নামক এক তরুণ সিপাহী এই নতুন কার্তুজ ব্যবহার করতে অস্বীকার করেন এবং তাঁর ব্রিটিশ অফিসারদের উপর আক্রমণ করেন। তাঁকে গ্রেফতার করে ৮ই এপ্রিল ফাঁসি দেওয়া হয়। এই ঘটনা সিপাহীদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুনকে আরও উস্কে দেয়।

মীরাট থেকে দিল্লি

৯ই মে, ১৮৫৭ সালে, মীরাটের কিছু সিপাহী নতুন কার্তুজ নিয়ে মহড়া দিতে অস্বীকার করলে, তাদের দশ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর প্রতিক্রিয়ায়, পরের দিন, ১০ই মে, মীরাটের অন্যান্য সিপাহীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা জেলখানা আক্রমণ করে তাদের সহকর্মীদের মুক্ত করে, ব্রিটিশ অফিসারদের হত্যা করে এবং অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করে। এরপর তারা দিল্লির দিকে যাত্রা করে।

১১ই মে সকালে তারা দিল্লিতে পৌঁছায়। দিল্লির সিপাহীরাও তাদের সাথে যোগ দেয়। তারা মুঘল সম্রাট ৮২ বছর বয়সী বাহাদুর শাহ জাফর-কে ভারতের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করে এবং তাঁর নেতৃত্বে বিদ্রোহ পরিচালনার জন্য অনুরোধ করে। প্রথমে ইতস্তত করলেও, পরে বাহাদুর শাহ জাফর এই প্রস্তাবে রাজি হন। এই ঘটনাটি বিদ্রোহকে একটি রাজনৈতিক বৈধতা দেয় এবং সারা দেশের রাজাদের কাছে একটি বার্তা পাঠায় যে মুঘল শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিকল্প শক্তি তৈরি হয়েছে।

বিদ্রোহের বিস্তার

দিল্লির পতনের পর বিদ্রোহ দ্রুতগতিতে উত্তর ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন কেন্দ্রে স্থানীয় নেতারা বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন:

  • কানপুর: এখানে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন নানা সাহেব। তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি ছিলেন তাঁতিয়া টোপি এবং আজিমুল্লাহ খান
  • লক্ষ্ণৌ: অযোধ্যার ক্ষমতাচ্যুত নবাবের বেগম, বেগম হজরত মহল তাঁর নাবালক পুত্র বিরজিস কদরকে নবাব ঘোষণা করে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন।
  • ঝাঁসি: রানী লক্ষ্মীবাই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেন এবং তাঁতিয়া টোপির সাথে মিলে গোয়ালিয়র দখল করেন। তাঁর বীরত্ব আজও কিংবদন্তি হয়ে আছে।
  • বিহার: বিহারের আরা অঞ্চলে, এক বৃদ্ধ জমিদার কুনওয়ার সিং বিদ্রোহে যোগ দেন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সফলভাবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
  • অন্যান্য কেন্দ্র: বেরেলিতে বখত খান, ফৈজাবাদে মৌলভি আহমদুল্লাহ শাহ-এর মতো নেতারাও বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এটি লক্ষণীয় যে, অনেক জায়গায় সাধারণ মানুষ, কৃষক, কারিগর এবং উপজাতিরাও সিপাহীদের সাথে যোগ দিয়েছিল। তারা ব্রিটিশ শাসন এবং তাদের শোষকদের (যেমন মহাজন ও জমিদার) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল।

৩. কোম্পানির পাল্টা আক্রমণ এবং বিদ্রোহ দমন

বিদ্রোহের ব্যাপকতায় ব্রিটিশরা প্রথমে হতচকিত হয়ে গেলেও, তারা দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নেয় এবং নির্মমভাবে বিদ্রোহ দমনের জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করে।

  • শক্তিবৃদ্ধি: ইংল্যান্ড থেকে আরও সেনা আনা হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে টেলিগ্রাফ, ব্রিটিশদের দ্রুত খবর আদান-প্রদান করতে এবং সেনা পাঠাতে সাহায্য করেছিল।
  • দিল্লি পুনরুদ্ধার: ব্রিটিশদের জন্য দিল্লি পুনরুদ্ধার করা ছিল সম্মানের প্রশ্ন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর, ১৮৫৭ সালের সেপ্টেম্বরে তারা দিল্লি পুনর্দখল করে। বাহাদুর শাহ জাফরকে গ্রেফতার করে রেঙ্গুনে (বর্তমান মায়ানমার) নির্বাসনে পাঠানো হয়, যেখানে ১৮৬২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর পুত্রদের তাঁর চোখের সামনেই হত্যা করা হয়।
  • নির্মম দমন: ব্রিটিশরা বিদ্রোহ দমনের জন্য চরম নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নেয়। হাজার হাজার বিদ্রোহী সিপাহী এবং সাধারণ মানুষকে বিনা বিচারে ফাঁসি দেওয়া হয় বা কামানের মুখে উড়িয়ে দেওয়া হয়।
  • নেতাদের পতন: লক্ষ্ণৌ ১৮৫৮ সালের মার্চে এবং ঝাঁসি জুনে ব্রিটিশদের দখলে আসে। রানী লক্ষ্মীবাই যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেন। তাঁতিয়া টোপি জঙ্গলে পালিয়ে গেলেও পরে ধরা পড়েন এবং ১৮৫৯ সালে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। নানা সাহেব নেপালে পালিয়ে যান এবং তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

১৮৫৯ সালের শেষের দিকে, ব্রিটিশরা ভারতে তাদের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

৪. বিদ্রোহের পরবর্তী প্রভাব (Aftermath)

১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও, এটি ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিল। ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল যে শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে ভারত শাসন করা সম্ভব নয়। তাই, তারা ভারতীয়দের মন জয় করতে এবং भविष्यে এই ধরনের বিদ্রোহ এড়াতে শাসনব্যবস্থায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে।

  1. কোম্পানির শাসনের অবসান: ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮৫৮ সালে 'ভারত শাসন আইন' (Government of India Act 1858) পাস করে। এর মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ রাজ বা মহারানীর (Queen Victoria) হাতে চলে যায়।
  2. নতুন প্রশাসনিক কাঠামো: ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার একজন সদস্যকে 'ভারত সচিব' (Secretary of State for India) পদে নিযুক্ত করা হয়, যিনি ভারতের শাসন সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়ের জন্য দায়ী থাকতেন। তাঁকে সাহায্য করার জন্য একটি 'ভারত পরিষদ' (India Council) গঠন করা হয়। ভারতের গভর্নর-জেনারেলকে 'ভাইসরয়' (Viceroy) উপাধি দেওয়া হয়, যিনি ছিলেন ভারতে মহারানীর ব্যক্তিগত প্রতিনিধি।
  3. দেশীয় রাজাদের প্রতি নীতি পরিবর্তন: মহারানী ভিক্টোরিয়া ঘোষণা করেন যে ব্রিটিশ সরকার আর কোনো ভারতীয় রাজ্য দখল করবে না। স্বত্ববিলোপ নীতি বাতিল করা হয় এবং দেশীয় রাজাদের তাদের রাজ্যে শাসন করার অধিকার দেওয়া হয়, তবে শর্ত ছিল যে তারা ব্রিটিশ মহারানীকে তাদের সর্বোচ্চ শাসক হিসেবে মেনে নেবে।
  4. সেনাবাহিনীর পুনর্গঠন: সেনাবাহিনীতে ভারতীয় সিপাহীদের সংখ্যা কমানো হয় এবং ব্রিটিশ সৈন্যদের সংখ্যা বাড়ানো হয়। গোলন্দাজ বাহিনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলি সম্পূর্ণরূপে ব্রিটিশদের হাতে রাখা হয়। এছাড়াও, 'ভাগ করো ও শাসন করো' (Divide and Rule) নীতির অংশ হিসেবে, জাতি ও ধর্মের ভিত্তিতে রেজিমেন্ট গঠন করা হয় (যেমন- শিখ রেজিমেন্ট, গোর্খা রেজিমেন্ট) যাতে সিপাহীদের মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠতে না পারে।
  5. ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি: ব্রিটিশরা প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা ভারতের জনগণের ধর্মীয় এবং সামাজিক রীতিনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না।
  6. জমিদার ও ভূস্বামীদের প্রতি নীতি: ব্রিটিশরা জমিদার এবং ভূস্বামীদের প্রতি তাদের পুরোনো অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে এবং তাদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে।

এই পরিবর্তনগুলির মাধ্যমে ব্রিটিশরা ভারতে তাদের শাসনকে আরও মজবুত করার চেষ্টা করেছিল। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ভারতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে, যা পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের পথ প্রশস্ত করেছিল।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রধান রাজনৈতিক কারণগুলি কী ছিল?

উত্তর: প্রধান রাজনৈতিক কারণগুলির মধ্যে ছিল: (ক) লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি, যার মাধ্যমে ঝাঁসি, সাতারা, নাগপুরের মতো অনেক রাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। (খ) অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির মাধ্যমে দেশীয় রাজাদের স্বাধীনতা হরণ। (গ) অযোধ্যার মতো রাজ্যকে কুশাসনের অজুহাতে দখল করা। (ঘ) নানা সাহেবের মতো শাসকদের পেনশন বন্ধ করে দেওয়া এবং মুঘল সম্রাটের অপমান। এই সমস্ত ঘটনাগুলি ভারতীয় শাসকদের ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল।

প্রশ্ন ২: চর্বি মাখানো কার্তুজের ঘটনাটি বিদ্রোহের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল কেন?

উত্তর: চর্বি মাখানো কার্তুজের ঘটনাটি ছিল বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ বা তাৎক্ষণিক কারণ। সিপাহীদের মধ্যে আগে থেকেই বেতন, পদোন্নতি, এবং ধর্মীয় রীতিনীতিতে হস্তক্ষেপ নিয়ে ক্ষোভ ছিল। যখন গুজব ছড়ায় যে নতুন এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন তা হিন্দু ও মুসলিম উভয় সিপাহীদের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানে। এটি তাদের মনে এই বিশ্বাসকে দৃঢ় করে যে ব্রিটিশরা পরিকল্পিতভাবে তাদের ধর্ম নষ্ট করতে চাইছে। এই ঘটনাটি জমে থাকা সমস্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এবং বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

প্রশ্ন ৩: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছিল কেন?

উত্তর: বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার কয়েকটি প্রধান কারণ হল: (ক) সংগঠনের অভাব: বিদ্রোহটি সুসংগঠিত ছিল না এবং এর কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না। বিভিন্ন নেতারা নিজ নিজ অঞ্চলে যুদ্ধ করছিলেন। (খ) সীমিত বিস্তার: বিদ্রোহটি মূলত উত্তর ও মধ্য ভারতে সীমাবদ্ধ ছিল। দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের বেশিরভাগ অংশ এবং বাংলা ও পাঞ্জাব মূলত শান্ত ছিল। (গ) সম্পদের অভাব: বিদ্রোহীদের কাছে ব্রিটিশদের মতো আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, অর্থ এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা (টেলিগ্রাফ, রেল) ছিল না। (ঘ) সকলের সমর্থনের অভাব: অনেক দেশীয় রাজা, জমিদার এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী এই বিদ্রোহকে সমর্থন করেনি, বরং কেউ কেউ ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিল।

প্রশ্ন ৪: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা ভারতের শাসনব্যবস্থায় কী কী বড় পরিবর্তন এনেছিল?

উত্তর: বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা ভারতে তাদের শাসনকে সুরক্ষিত করতে বেশ কিছু বড় পরিবর্তন আনে। প্রধান পরিবর্তনগুলি হল: (ক) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতের শাসনভার সরাসরি ব্রিটিশ মহারানীর হাতে তুলে দেওয়া হয় (ভারত শাসন আইন, ১৮৫৮)। (খ) গভর্নর-জেনারেলকে 'ভাইসরয়' উপাধি দেওয়া হয়। (গ) ব্রিটিশরা রাজ্য দখলের নীতি ত্যাগ করে এবং দেশীয় রাজাদের শাসনের অধিকার ফিরিয়ে দেয়। (ঘ) সেনাবাহিনীতে ব্রিটিশ সৈন্যের সংখ্যা বাড়ানো হয় এবং ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্য জাতিভিত্তিক রেজিমেন্ট তৈরি করা হয়। (ঙ) ভারতীয়দের ধর্মীয় ও সামাজিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি গ্রহণ করা হয়।

সারসংক্ষেপ

এই অধ্যায়টি মনে রাখার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচে দেওয়া হলো:

  • বিদ্রোহের কারণ: রাজনৈতিক (স্বত্ববিলোপ নীতি), অর্থনৈতিক (চড়া ভূমি রাজস্ব), সামাজিক-ধর্মীয় (সতীদাহ প্রথা রদ, বিধবা বিবাহ আইন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত) এবং সামরিক (সিপাহীদের প্রতি বৈষম্য, চর্বিযুক্ত কার্তুজ) কারণ।
  • বিদ্রোহের সূচনা: ২৯শে মার্চ, ১৮৫৭ (মঙ্গল পান্ডের ঘটনা) এবং ১০ই মে, ১৮৫৭ (মীরাটে আনুষ্ঠানিক সূচনা)।
  • প্রধান কেন্দ্র ও নেতা: দিল্লি (বাহাদুর শাহ জাফর), কানপুর (নানা সাহেব), লক্ষ্ণৌ (বেগম হজরত মহল), ঝাঁসি (রানী লক্ষ্মীবাই), বিহার (কুনওয়ার সিং)।
  • বিদ্রোহের দমন: ব্রিটিশরা উন্নত অস্ত্র ও রণকৌশলের মাধ্যমে ১৮৫৯ সালের মধ্যে বিদ্রোহ পুরোপুরি দমন করে।
  • ফলাফল: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান, ব্রিটিশ রাজের প্রত্যক্ষ শাসনের সূচনা, সেনাবাহিনী পুনর্গঠন এবং দেশীয় রাজাদের প্রতি নীতির পরিবর্তন। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।