বিষয়ের ভূমিকা
আঠারো শতকের মধ্যভাগে ইউরোপের মানচিত্রের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব যে, আজকের মতো সুনির্দিষ্ট কোনো 'জাতি-রাষ্ট্র' (Nation-State) তখন বিদ্যমান ছিল না। জার্মানি, ইতালি বা সুইজারল্যান্ড ছোট ছোট রাজ্য, ডাচি এবং ক্যান্টনে বিভক্ত ছিল, যার শাসকরা ছিলেন নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু উনিশ শতকে ইউরোপীয় রাজনীতি ও সমাজে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন সূচিত হয়, যার মূলে ছিল জাতীয়তাবাদ (Nationalism)। NCERT দশম শ্রেণির ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকের প্রথম অধ্যায়, 'ইউরোপে জাতীয়তাবাদের উত্থান' (The Rise of Nationalism in Europe)-এ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে কীভাবে বহুজাতিক সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক ও একক শাসনব্যবস্থাভিত্তিক 'জাতি-রাষ্ট্র' গড়ে উঠেছিল। এই অধ্যায়টি অনুধাবন করা সিবিএসই (CBSE) এবং বিভিন্ন রাজ্য বোর্ডের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. ফরাসি বিপ্লব এবং জাতির ধারণা (The French Revolution and the Idea of the Nation)
১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব ইউরোপে জাতীয়তাবাদের প্রথম সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি হিসেবে গণ্য হয়। এই বিপ্লব রাজতন্ত্রের সমাপ্তি ঘটিয়ে ফরাসি নাগরিকদের হাতে সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর করেছিল। ফরাসি বিপ্লবীরা সাধারণ মানুষের মনে যৌথ পরিচয়ের (Collective Identity) অনুভূতি গড়ে তোলার জন্য একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন:
- পিতৃভূমি ও নাগরিকের ধারণা: 'লা পাত্রি' (La Patrie - পিতৃভূমি) এবং 'লা সিতোয়েন' (Le Citoyen - নাগরিক) ধারণার মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ সম্প্রদায়ের জোর প্রচার করা হয়, যা সংবিধানের অধীনে সমান অধিকার ভোগ করবে।
- নতুন জাতীয় প্রতীক: রাজকীয় পতাকার পরিবর্তে একটি নতুন ফরাসি তেরঙা (Tricolour) পতাকা গ্রহণ করা হয়।
- কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা: পুরো ভূখণ্ডের জন্য একটি সমান আইন ও অভিন্ন পরিমাপ ব্যবস্থা (Uniform System of Weights and Measures) চালু করা হয়।
- ভাষাগত ঐক্য: আঞ্চলিক উপভাষাগুলিকে নিরুৎসাহিত করে প্যারিসে ব্যবহৃত ফরাসি ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করা হয়।
২. নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এবং ১৮০৪ সালের সিভিল কোড (Napoleonic Code)
নেপোলিয়ন ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ রক্ষা করলেও ফ্রান্সে গণতন্ত্র ধ্বংস করে রাজতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন। তবে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তিনি অসাধারণ বৈপ্লবিক সংস্কার সাধন করেন। ১৮০৪ সালে চালু করা তাঁর 'নেপোলিয়নিক কোড' (Civil Code of 1804) জাতীয়তাবাদের বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে:
- জন্মসূত্রে প্রাপ্ত সমস্ত সুবিধা বা বিশেষাধিকার বাতিল করা হয়।
- আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমতা প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষিত করা হয়।
- সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার (Feudal System) অবসান ঘটে এবং কৃষকদের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
- যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল উন্নয়ন ঘটানো হয়।
৩. ইউরোপে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান ও উদারনৈতিক জাতীয়তাবাদ (Liberal Nationalism)
উনিশ শতকের সূচনায় ইউরোপে শিল্পায়নের ফলে একটি নতুন সামাজিক শ্রেণির জন্ম হয়—শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের নিয়ে গঠিত 'মধ্যবিত্ত শ্রেণি'। এই শ্রেণিও উদারনীতি এবং জাতীয় ঐক্যের মূল কান্ডারী হয়ে ওঠে।
উদারনীতি (Liberalism) শব্দটি লাতিন শব্দ 'Liber' থেকে এসেছে, যার অর্থ 'স্বাধীন'। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উদারনীতি বলতে বোঝাত বাজারের স্বাধীনতা এবং পণ্য চলাচলের উপর থেকে রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া। ১৮৩৪ সালে প্রুশিয়ার উদ্যোগে 'জোলভেরাইন' (Zollverein) নামক শুল্ক সংঘ গঠিত হয়, যা শুল্ক বাধা দূর করে এবং মুদ্রার সংখ্যা ৩০টি থেকে কমিয়ে মাত্র ২টিতে নামিয়ে আনে। এটি অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে।
৪. ১৮১৫ পরবর্তী নতুন রক্ষণশীলতাবাদ ও ভিয়েনা কংগ্রেস (Conservatism & Vienna Congress)
১৮১৫ সালে ওয়াটারলু যুদ্ধে নেপোলিয়নের পরাজয়ের পর ইউরোপীয় সরকারগুলি পুনরায় রক্ষণশীল নীতি গ্রহণ করে। প্রুশিয়া, রাশিয়া, অষ্ট্রিয়া এবং ব্রিটেন মিলে 'ভিয়েনা কংগ্রেস' (Vienna Congress - 1815) আয়োজন করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন অষ্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর **মেটারনিক (Metternich)**।
- বুরবোঁ রাজবংশকে ফ্রান্সে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা হয়।
- নেপোলিয়ন বিজিত অঞ্চলগুলি বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়, যাতে ফ্রান্স ভবিষ্যতে সীমানা বাড়াতে না পারে।
- তবে নেপোলিয়ন গঠিত ৩৯টি রাজ্যের 'জার্মান কনফেডারেশন' অক্ষুণ্ণ রাখা হয়।
৫. ইতালি ও জার্মানির একত্রীকরণ (Unification of Italy and Germany)
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ইতালি ও জার্মানির মতো বিভক্ত জাতির সুসংগঠিত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ।
ইতালির একত্রীকরণ:
উনিশ শতকের মাঝামাঝি ইতালি ৭টি রাজ্যে বিভক্ত ছিল, যার মধ্যে কেবল সর্ডিনিয়া-পিডমন্ট ছিল ইতালীয় রাজপরিবারের অধীনে। ইতালি একত্রীকরণে তিন জন মহানায়কের অবদান অনস্বীকার্য:
- জুসেপ্পে ম্যাৎসিনি (Giuseppe Mazzini): 'ইয়ং ইতালি' (Young Italy) গঠন করে তরুণদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার আগুন জ্বালিয়েছিলেন।
- কাউন্ট কাভুর (Count Cavour): সর্ডিনিয়ার প্রধানমন্ত্রী, যিনি সুচতুর কূটনীতির মাধ্যমে ফ্রান্সের সহায়তায় অষ্ট্রিয়াকে পরাজিত করেন।
- জুসেপ্পে গ্যারিবল্ডি (Giuseppe Garibaldi): 'লাল কোর্তা' (Red Shirts) নামে স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী গঠন করে দক্ষিণ ইতালি মুক্ত করেন।
- ১৮৬১ সালে **দ্বিতীয় ভিক্টর ইমানুয়েল** ঐক্যবদ্ধ ইতালির রাজা ঘোষিত হন।
জার্মানির একত্রীকরণ:
জার্মানির একত্রীকরণের মূল কারিগর ছিলেন প্রুশিয়ার প্রধানমন্ত্রী **অটো ভন বিসমার্ক (Otto von Bismarck)**। তিনি 'রক্ত ও লৌহ নীতি' (Blood and Iron Policy) গ্রহণ করেন। সাত বছরের মধ্যে তিনটি যুদ্ধে (ডেনমার্ক, অষ্ট্রিয়া ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে) প্রুশিয়া জয়লাভ করে এবং ১৮৭১ সালে ভার্সাই প্রাসাদে প্রুশিয়ার রাজা **প্রথম উইলিয়ামকে** ঐক্যবদ্ধ জার্মানির কায়জার (সম্রাট) হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
৬. রূপক বা অলঙ্কার তৈরি: জাতির দৃশ্যকল্পায়ন (Visualising the Nation)
উনিশ শতকে শিল্পীরা জাতিকে কোনো মানুষের রূপ দিয়ে তুলে ধরতে শুরু করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীকে রূপক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়:
- মারিয়ান (Marianne): ফ্রান্সের জাতীয় রূপক, যিনি ফরাসি প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতা ও ঐক্যের প্রতীক।
- জার্মেনিয়া (Germania): জার্মান জাতির রূপক, যাঁর মাথায় ওক পাতার মুকুট থাকতো, যা বীরত্বের প্রতীক।
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: 'জোলভেরাইন' (Zollverein) কী এবং এর গুরুত্ব কী ছিল?
উত্তর: ১৮৩৪ সালে প্রুশিয়ার উদ্যোগে গঠিত একটি শুল্ক সংঘ (Customs Union) হলো জোলভেরাইন। এর মাধ্যমে ইউরোপের বিভিন্ন জার্মান রাজ্যগুলির মধ্যকার শুল্ক বাধা (Tariff barriers) দূর করা হয় এবং মুদ্রার সংখ্যা ৩০ থেকে কমিয়ে ২টিতে আনা হয়। এটি জার্মানির অর্থনৈতিক একত্রীকরণ নিশ্চিত করে জাতীয়তাবাদী চেতনা বাড়াতে সাহায্য করেছিল।
প্রশ্ন ২: ইতালি একত্রীকরণে জুসেপ্পে ম্যাৎসিলির অবদান কী ছিল?
উত্তর: জুসেপ্পে ম্যাৎসিনি ছিলেন ইতালীয় জাতীয়তাবাদের মূল পরিকল্পনাকারী। তিনি 'ইয়ং ইতালি' এবং 'ইয়ং ইউরোপ' নামের দুটি গোপন সমাজ গঠন করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ঈশ্বর জাতিকে মানবজাতির স্বাভাবিক একক হিসেবে তৈরি করেছেন, তাই ইতালিকে একক গণপ্রজাতন্ত্রে রূপান্তর করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন ৩: ১৮১৫ সালের ভিয়েনা কংগ্রেসের প্রধান উদ্দেশ্য কী ছিল?
উত্তর: ভিয়েনা কংগ্রেসের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নেপোলিয়নের যুদ্ধের ফলে ইউরোপে সৃষ্ট পরিবর্তনগুলি বাতিল করা, ফ্রান্সে বুরবোঁ রাজবংশ পুনরুদ্ধার করা এবং ইউরোপে পুনরায় এক রক্ষণশীল রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
প্রশ্ন ৪: বিসমার্কের 'রক্ত ও লৌহ নীতি' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: প্রুশিয়ার প্রধানমন্ত্রী অটো ভন বিসমার্ক বিশ্বাস করতেন যে আলাপ-আলোচনা বা প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে জার্মানির একত্রীকরণ সম্ভব নয়, বরং সামরিক শক্তি ও যুদ্ধের মাধ্যমেই তা অর্জন করতে হবে। প্রুশিয়ার সামরিক শক্তি ব্যবহার করে তিনটি যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করার এই কৌশলকেই 'রক্ত ও লৌহ নীতি' বলা হয়।
সারসংক্ষেপ
- ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯): ইউরোপে যৌথ পরিচয় ও জাতীয়তাবাদের ধারণার জন্ম দেয়।
- নেপোলিয়নিক কোড (১৮০৪): আইনি সমতা ও প্রশাসনিক আধুনিকীকরণ আনে, যা পরোক্ষভাবে জাতীয়তাবাদে গতি যোগায়।
- ভিয়েনা সম্মেলন (১৮১৫): রক্ষণশীল ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে, যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইউরোপজুড়ে বিপ্লবের জন্ম হয়।
- ইতালি ও জার্মানি একত্রীকরণ: কাভুর, গ্যারিবল্ডি এবং বিসমার্কের নেতৃত্বে সফলভাবে দুটি নতুন জাতি-রাষ্ট্রের উত্থান ঘটে।
- সাম্রাজ্যবাদ ও বলকান সংকট: উনিশ শতকের শেষের দিকে চরম জাতীয়তাবাদ সাম্রাজ্যবাদে রূপ নেয়, যা পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে।