প্রকৃতি বা এই ধরণী অসংখ্য প্রাণ ও বৈচিত্র্যের এক অদ্ভূত সংমিশ্রণ। আমরা যদি আমাদের চারপাশে তাকাই, তবে পিঁপড়ে থেকে শুরু করে সুউচ্চ নীল তিমি পর্যন্ত কোটি কোটি প্রজাতির অস্তিত্ব দেখতে পাই। দ্বাদশ শ্রেণির জীববিজ্ঞানের ১৫তম অধ্যায় 'জীববৈচিত্র্য ও সংরক্ষণ' (Biodiversity and Conservation) আমাদের শেখায় কীভাবে এই বিপুল প্রাণসম্পদ আমাদের অস্তিত্বের জন্য জরুরি এবং কেনই বা আমাদের একে রক্ষা করতে হবে।

বিষয়ের ভূমিকা

জীববৈচিত্র্য শব্দটি ল্যাটিন শব্দ 'Bios' (জীবন) এবং 'Diversitas' (বৈচিত্র্য) থেকে এসেছে। ১৯৪৫ সালে এডওয়ার্ড উইলসন প্রথম এই শব্দটি জনপ্রিয় করেন। সহজ কথায়, পৃথিবীর বিভিন্ন স্তরে জীবনের যে বিশাল বৈচিত্র্য বিদ্যমান, তাকেই জীববৈচিত্র্য বলা হয়। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রাণীর সংখ্যা নয়, বরং এটি জিনগত, প্রজাতিগত এবং বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্যের এক সামগ্রিক রূপ।

আমাদের পৃথিবী একটি বিশাল গ্লোবাল নেটওয়ার্কের মতো, যেখানে একটি প্রজাতির অস্তিত্ব অন্য প্রজাতির ওপর নির্ভরশীল। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব জীববৈচিত্র্যের বিন্যাস, এর হ্রাসের কারণ এবং কীভাবে আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্যে একে রক্ষা করতে পারি। এই পাঠটি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির পাশাপাশি পরিবেশ সচেতন নাগরিক হতে সাহায্য করবে।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

জীববৈচিত্র্যকে মূলত তিনটি প্রধান স্তরে ভাগ করা যায়:

  • জিনগত বৈচিত্র্য (Genetic Diversity): এটি একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির মধ্যে বিদ্যমান জিনগত প্রকরণকে বোঝায়। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে ৫০,০০০-এর বেশি ধানের জাত এবং ১,০০০-এর বেশি আমের জাত রয়েছে। হিমালয়ে জন্মানো 'রাউলফিয়া ভমিটোরিয়া' (Rauwolfia vomitoria) উদ্ভিদে রিসারপিন (Reserpine) নামক যে রাসায়নিক পাওয়া যায়, তার গুণগত মান ও ঘনত্বের তারতম্য হলো এই জিনগত বৈচিত্র্যের উদাহরণ।
  • প্রজাতিগত বৈচিত্র্য (Species Diversity): এটি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির সংখ্যাকে বোঝায়। যেমন, ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালার উভচর প্রজাতির বৈচিত্র্য পূর্বঘাট পর্বতমালার তুলনায় অনেক বেশি।
  • বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্য (Ecological Diversity): এটি বিভিন্ন ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্যকে নির্দেশ করে। ভারত একটি বিশাল দেশ হওয়ার কারণে এখানে মরুভূমি, রেইনফরেস্ট, ম্যানগ্রোভ, কোরাল রিফ এবং জলাভূমির মতো বৈচিত্র্যময় পরিবেশ দেখা যায়, যা নরওয়ের মতো স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশের চেয়ে অনেক বেশি।

পৃথিবীতে প্রজাতির সংখ্যা কত?

আইইউসিএন (IUCN, 2004) এর হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীতে মোট বর্ণিত উদ্ভিজ্জ ও প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ১.৫ মিলিয়নের কিছু বেশি। তবে বিজ্ঞানী রবার্ট মে-র (Robert May) মতে, পৃথিবীতে প্রকৃত প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৭ মিলিয়ন। এর মধ্যে মাত্র ২২ শতাংশ প্রজাতি এখনও পর্যন্ত নথিভুক্ত হয়েছে। ভাবুন তো, কত লক্ষ প্রজাতি এখনও আমাদের অজানা!

জীববৈচিত্র্যের বিন্যাস (Patterns of Biodiversity)

জীববৈচিত্র্য সব জায়গায় সমান নয়। এটি প্রধানত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:

  • অক্ষাংশীয় নতিমাত্রা (Latitudinal Gradients): বিষুবরেখার কাছাকাছি অঞ্চলে জীববৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি এবং মেরু অঞ্চলের দিকে তা ক্রমশ কমতে থাকে। এর কারণ হলো ট্রপিক্যাল বা উষ্ণ অঞ্চলে সৌরশক্তি বেশি পাওয়া যায় এবং আবহাওয়া দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল থাকে, যা বিবর্তনে সহায়ক হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমাজন রেইনফরেস্ট বিশ্বের বৃহত্তম জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার।
  • প্রজাতি-এলাকা সম্পর্ক (Species-Area Relationships): জার্মান প্রকৃতিবিদ আলেকজান্ডার ফন হামবোল্ট লক্ষ্য করেন যে, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের অন্বেষণ এলাকা বাড়ালে সেখানে প্রজাতির সংখ্যাও বাড়ে, তবে এটি একটি সীমা পর্যন্ত ঘটে। এর গ্রাফটি গাণিতিকভাবে একটি আয়তাকার অতিবৃত্তাকার (Rectangular Hyperbola) আকার নেয়।

জীববৈচিত্র্য হ্রাসের কারণ: 'দ্য ইভিল কোয়ার্টেট' (The Evil Quartet)

বর্তমানে পৃথিবী তার জীববৈচিত্র্যকে অতি দ্রুত গতিতে হারাচ্ছে। একে মূলত চারটি কারণের জন্য দায়ী করা হয়, যাকে বিজ্ঞানীরা 'The Evil Quartet' বলেন:

  • বাসস্থান ধ্বংস ও খণ্ডবিখণ্ডকরণ (Habitat Loss and Fragmentation): এটি জীববৈচিত্র্য হ্রাসের প্রধান কারণ। জঙ্গল কেটে চাষাবাদ বা নগরায়ন করার ফলে বন্যপ্রাণীদের বাসস্থান হারিয়ে যাচ্ছে। আমাজন অরণ্যকে একসময় 'পৃথিবীর ফুসফুস' বলা হতো, যা এখন সয়াবিন চাষের জন্য কেটে ফেলা হচ্ছে।
  • অতি-ব্যবহার (Over-exploitation): মানুষের লোভ যখন প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস হয়। প্যাসেঞ্জার পায়রা এবং স্টেলার সি কাউ (Steller's Sea Cow) মানুষের অতিরিক্ত শিকারের কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
  • বিদেশি প্রজাতির অনুপ্রবেশ (Alien Species Invasions): যখন কোনো নতুন প্রজাতি কোনো এলাকায় বাইরে থেকে আসে, তখন স্থানীয় প্রজাতি বিপদে পড়ে। যেমন, নীল নদ থেকে আনা 'নীল পার্চ' (Nile Perch) মাছ ভিক্টোরিয়া লেকে ছাড়ার পর সেখানে ২০০-এর বেশি স্থানীয় সিচলিড মাছের প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
  • সহ-বিলুপ্তি (Co-extinctions): যখন কোনো একটি প্রজাতি অন্য প্রজাতির ওপর নির্ভরশীল থাকে এবং প্রধান প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়, তখন তার ওপর নির্ভরশীল প্রজাতিটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়। যেমন, কোনো একটি নির্দিষ্ট মাছ বিলুপ্ত হলে তার শরীরে থাকা পরজীবীগুলোও মারা যায়।

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কেন প্রয়োজন?

সংরক্ষণের কারণগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: সংকীর্ণভাবে উপযোগিতাবাদী (খাদ্য, ওষুধ, তন্তু), ব্যাপকভাবে উপযোগিতাবাদী (অক্সিজেন সরবরাহ, পরাগায়ন, নান্দনিক আনন্দ), এবং নৈতিক কারণ (প্রতিটি জীবের পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে)।

সংরক্ষণ পদ্ধতি (Conservation Methods)

সংরক্ষণ মূলত দুইভাবে করা হয়:

  • ইন-সিটু সংরক্ষণ (In-situ Conservation): যখন জীবকে তার নিজের প্রাকৃতিক বাসস্থানেই সংরক্ষণ করা হয়। যেমন- জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য এবং বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ। ভারতে ১৪টি বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ, ৯০টি জাতীয় উদ্যান এবং ৪৪৮টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রয়েছে।
  • এক্স-সিটু সংরক্ষণ (Ex-situ Conservation): যখন কোনো প্রজাতিকে তার স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে সরিয়ে কোনো বিশেষ স্থানে যত্ন সহকারে রাখা হয়। যেমন- চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, এবং জিন ব্যাংক (Cryopreservation)।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: 'হটস্পট' বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: হটস্পট হলো এমন একটি ভৌগোলিক অঞ্চল যেখানে প্রচুর পরিমাণে এনডেমিক (নির্দিষ্ট এলাকার) প্রজাতি বসবাস করে এবং যা বর্তমানে মারাত্মক হুমকির মুখে। পৃথিবীতে বর্তমানে ৩৬টি জীববৈচিত্র্য হটস্পট রয়েছে, যার মধ্যে ভারতে পশ্চিমঘাট, হিমালয় এবং ইন্দো-বার্মা অঞ্চল উল্লেখযোগ্য।

প্রশ্ন ২: প্রজাতি বিলুপ্তির হার বাড়লে আমাদের কী ক্ষতি হতে পারে?
উত্তর: বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হবে, উদ্ভিদের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাবে এবং রোগবালাই বা খরার মতো পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে বাস্তুতন্ত্রের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে।

প্রশ্ন ৩: আমাজন রেইনফরেস্টকে কেন 'পৃথিবীর ফুসফুস' বলা হয়?
উত্তর: কারণ এটি সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মোট অক্সিজেনের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদন করে।

সারসংক্ষেপ

  • জীববৈচিত্র্য হলো জিনগত, প্রজাতিগত এবং বাস্তুতান্ত্রিক বৈচিত্র্যের সমষ্টি।
  • ভারত বিশ্বের ১৭টি 'মেগা-ডাইভারসিটি' দেশগুলোর মধ্যে একটি।
  • বন্যপ্রাণী ও বনভূমি রক্ষায় বর্তমানে ইন-সিটু এবং এক্স-সিটু পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
  • ২০১০ সালের আর্থ সামিট এবং ২০০২ সালের বিশ্ব সম্মেলনে (World Summit) টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য রক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
  • পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ছোট-বড় প্রতিটি প্রজাতির গুরুত্ব অপরিসীম।