বিষয়ের ভূমিকা
প্রাচীন ভারতের ইতিহাস অনুধাবন করার ক্ষেত্রে সিন্ধু নদ অববাহিকায় গড়ে ওঠা হরপ্পা সভ্যতা বা সিন্ধু সভ্যতা (Indus Valley Civilization) একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। সিবিএসই (NCERT) দ্বাদশ শ্রেণির ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের প্রথম অধ্যায় 'ইট, পুঁতি ও অস্থি' (Bricks, Beads and Bones)-তে এই উন্নত প্রাচীন ব্রোঞ্জযুগীয় সভ্যতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ অব্দের মধ্যে এই সভ্যতা তার চরম বিকাশ লাভ করেছিল। প্রত্নতাত্ত্বিকদের দ্বারা আবিষ্কৃত পোড়ামাটির ইট, নকশাকাটা পুঁতি, সিলমোহর, মৃত্পাত্র এবং মানুষের ও প্রাণীর অস্থির অবশিষ্টাংশ পর্যবেক্ষণ করে হরপ্পার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক আশ্চর্য চিত্র আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। এই নিবন্ধে আমরা অধ্যায়টির মূল বিষয়বস্তু সহজ ও প্রাঞ্জল বাংলায় আলোচনা করব।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. হরপ্পা সভ্যতার সূচনা ও আবিষ্কার
হরপ্পা সভ্যতা ভারত উপমহাদেশের প্রথম প্রাচীন নগর সভ্যতা। ১৯২১ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক দয়ারাম সাহানি পাঞ্জাবের মন্টগোমারি জেলায় (বর্তমান পাকিস্তানে) প্রথম হরপ্পা স্থানটি আবিষ্কার করেন। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯২২ সালে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় মহেনজোদারো আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে 'আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া' (ASI)-র তৎকালীন মহাপরিচালক স্যার জন মার্শাল বিশ্ববাসীর সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন এই সভ্যতার আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করেন।
২. উন্নত নগর পরিকল্পনা ও পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা
হরপ্পা সভ্যতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর সুপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা। নগরগুলিকে প্রধানত দুটি অংশে ভাগ করা হতো:
- দুর্গ বা সিটাডেল (Citadel): এটি নগরের পশ্চিম দিকে কিছুটা উঁচু স্থানে অবস্থিত ছিল। প্রধানত প্রশাসনিক ভবন, শস্যগার এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বসবাসের স্থান হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো।
- নিম্ন নগর (Lower Town): এটি পূব দিকে নিচু এলাকায় অবস্থিত ছিল, যেখানে সাধারণ নাগরিকরা বসবাস করতেন।
মহেনজোদারোর নগর পরিকল্পনায় গ্রিড পদ্ধতি (Grid System) অনুসরণ করা হয়েছিল, যেখানে রাস্তাগুলি একে অপরকে সমকোণে (৯০ ডিগ্রিতে) ছেদ করত। এছাড়া প্রতিটি বাড়ির ড্রেন বা নর্দমা গলি নর্দমার সাথে এবং তা থেকে প্রধান সড়কের নর্দমার সাথে যুক্ত ছিল। নর্দমাগুলি ঢাকা থাকত এবং নিয়মিত পরিষ্কার করার ব্যবস্থা ছিল, যা প্রাচীনকালের স্বাস্থ্য সচেতনতার এক অনন্য নিদর্শন।
৩. মহেনজোদারোর বিশেষ স্থাপত্য: মহা স্নানাগার ও শস্যগার
মহেনজোদারোর দুর্গে প্রাপ্ত মহা স্নানাগার (The Great Bath) ছিল একটি বিশাল আয়তাকার জলাশয়। ইট দিয়ে তৈরি এই স্নানাগারের জল যাতে বাইরে না বেরিয়ে যায়, সে জন্য বিটুমিন ও জিপসামের আস্তর ব্যবহার করা হয়েছিল। ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে এটি যৌথ স্নানের জন্য ব্যবহৃত হতো বলে মনে করা হয়। পাশাপাশি হরপ্পা ও মহেনজোদারোতে বিশালাকার শস্যগারের সন্ধান মিলেছে, যেখানে দুর্যোগের সময় ব্যবহারের জন্য শস্য সঞ্চয় করে রাখা হতো।
৪. জীবিকা সংস্থান ও কৃষিকাজ
হরপ্পার অধিবাসীরা জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রধানত কৃষি ও পশুসংস্থানের উপর নির্ভর করতেন।
- কৃষিজাত পণ্য: গমের পাশাপাশি বার্লি, মসুর, মটর, তিল এবং রাই সরিষা চাষ করা হতো। গুজরাটের কিছু স্থানে বাজরা এবং ধান ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
- কৃষি প্রযুক্তি: রাজস্থানের কালিবঙ্গানে লাঙল চষা জমির সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়া সেচের জন্য জল সঞ্চয় করার উদ্দেশ্যে খালের অবশিষ্টাংশ এবং জলাশয় (যেমন গুজরাটের ধোলাভিরাতে) আবিষ্কৃত হয়েছে।
- পশুপালন: গরু, ভেড়া, ছাগল, মহিষ ও শূকর লালন-পালন করা হতো। পরবর্তীতে বুনো পশু যেমন হরিণ ও শূকরের হাড় পাওয়া যাওয়ায় শিকারেরও প্রমাণ মেলে।
৫. শিল্প ও কারুশিল্প উৎপাদন (পুঁতি ও গয়না তৈরি)
হরপ্পার সমাজ শিল্পকলা ও কারুশিল্পে অত্যন্ত উন্নত ছিল। বিশেষ করে চানহুদারো ছিল পুঁতি ও গয়না তৈরির প্রধান কেন্দ্র। কার্নেলিয়ান (লাল রঙের পাথর), জ্যাসপার, স্ফটিক, কোয়ার্টজ, সোনা, রূপা, তামা ও কাঁসা দিয়ে সুন্দর সুন্দর পুঁতি, গয়না ও সিলমোহর তৈরি হতো। পুঁতিতে সূক্ষ্ম ছিদ্র করার জন্য বিশেষ ড্রিল যন্ত্র ব্যবহার করা হতো, যা চানহুদারো, লোথাল এবং ধোলাভিরাতে পাওয়া গেছে।
৬. দূরবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক
হরপ্পার বণিকরা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় প্রকার বাণিজ্যে যুক্ত ছিলেন। ওমান, বাহরাইন এবং মেসোপটেমিয়ার সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। মেসোপটেমিয়ার লেখাবলীতে এই অঞ্চলকে 'মেলুহা' নামে অভিহিত করা হয়েছে। তামার আমদানির জন্য ওমান এবং রাজস্থানের ক্ষেত্রি অঞ্চলের ওপর তারা নির্ভর করত। সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য গুজরাটের লোথাল একটি প্রধান বন্দর শহর হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
৭. সামাজিক বৈষম্য ও অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া
হরপ্পা সমাজে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল কিনা তা জানার জন্য প্রত্নতাত্ত্বিকরা মূলত দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করেন:
- সমাধি বিশ্লেষণ: হরপ্পার সমাধিগুলিতে ধনীদের কবরে মূল্যবান অলংকার, মৃৎপাত্র এবং তামার আয়না পাওয়া গেছে, যা নির্দেশ করে যে তারা পরলোকে বিশ্বাস করতেন এবং সামাজিক মর্যাদায় পার্থক্য ছিল।
- বিলাসদ্রব্যের ব্যবহার: দৈনন্দিন ব্যবহারের সহজলভ্য সামগ্রী (যেমন ইটের তৈরি জিনিস বা সাধারণ পাত্র) সবার কাছে থাকলেও 'ফাইয়েন্স' (Faience) নামক বিশেষ উপাদানে তৈরি জটিল ও অমূল্য প্রসাধনী পাত্র বা সুন্দর জিনিস কেবল বিত্তশালীদের কাছেই থাকত।
৮. রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ ও লিপি
হরপ্পার সমস্ত অঞ্চলে এক অভিন্ন ওজন ও পরিমাপের ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট পরিমাপের ইট এবং সুসংগঠিত নগর ব্যবস্থা নির্দেশ করে যে সেখানে একটি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বা শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। তবে রাজপ্রাসাদ বা রাজার সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ মেলেনি।
হরপ্পার লিপি এখনো পর্যন্ত পাঠোদ্ধার (Decipher) করা যায়নি। এটি একটি চিত্রলিপি (Pictographic script), যা ডানদিক থেকে বামদিকে লেখা হতো। এই লিপিতে প্রায় ৩৭৫ থেকে ৪০০ টি চিহ্ন বা প্রতিকৃতি রয়েছে।
৯. হরপ্পা সভ্যতার পতন বা অবলুপ্তি
আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৯০০ অব্দের পর থেকে হরপ্পার উন্নত নগরায়নের চিহ্নগুলি ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে শুরু করে। এর সম্ভাব্য কারণগুলির মধ্যে রয়েছে:
- জলবায়ু পরিবর্তন ও দীর্ঘস্থায়ী খরা
- নদীর গতিপথ পরিবর্তন বা নদী শুকিয়ে যাওয়া
- বনভূমির চরম বিনাশ বা বন উজাড়
- অতিরিক্ত বন্যা
- বহিরাগত আক্রমণ (যদিও এই তথ্যটি বিতর্কিত)
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীদের নগর পরিকল্পনার দুটি মূল বৈশিষ্ট্য কী কী?
উত্তর: হরপ্পা সভ্যতার নগর পরিকল্পনার দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:
- গ্রিড পদ্ধতি: শহরের রাস্তাগুলি সোজা ও চওড়া ছিল এবং একে অপরকে সমকোণে ছেদ করে পুরো শহরকে বিভিন্ন ব্লকে বিভক্ত করেছিল।
- উন্নত পয়ঃপ্রণালী: প্রতিটি বাড়ির নর্দমা রাস্তার প্রধান ঢাকা নর্দমার সাথে যুক্ত ছিল এবং স্বাস্থ্য রক্ষায় নিয়মিত তা পরিষ্কার করার চমৎকার ব্যবস্থা ছিল।
প্রশ্ন ২: 'মেলুহা' বলতে মেসোপটেমিয়ার লেখায় কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন শিলালেখ ও লিপিতে 'মেলুহা' শব্দটি সিন্ধু বা হরপ্পা অঞ্চলকে নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়েছে। এখান থেকে তারা তামা, কার্নেলিয়ান, সোনা ও কাঠ আমদানি করত।
প্রশ্ন ৩: হরপ্পার সিলমোহরের গুরুত্ব কী ছিল?
উত্তর: হরপ্পার সিলমোহরগুলি প্রধানত দূরবর্তী বাণিজ্যে পণ্যের বস্তায় সুরক্ষামূলক ছাপ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এগুলিতে প্রাণীর ছবি ও সংকেতচিহ্ন আঁকা থাকত যা প্রেরকের পরিচয় বহন করত এবং পণ্যের গোপনীয়তা নিশ্চিত করত।
প্রশ্ন ৪: হরপ্পা সভ্যতার পতন কীভাবে ঘটেছিল?
উত্তর: কোনো একক কারণে নয়, বরং প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন নদী শুকিয়ে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, মারাত্মক বন্যা, পরিবেশগত অবক্ষয় এবং বাণিজ্য ব্যবস্থার ভেঙে পড়ার যৌথ প্রভাবে হরপ্পা সভ্যতার পতন ঘটেছিল।
সারসংক্ষেপ
- হরপ্পা সভ্যতা প্রাচীন ভারতের প্রথম সুসংগঠিত ব্রোঞ্জযুগীয় নগর সভ্যতা, যা খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০-১৯০০ অব্দে বিকাশ লাভ করে।
- নগরগুলি দুর্গ ও নিম্ন নগরে বিভক্ত ছিল এবং গ্রিডভিত্তিক রাস্তা ও সুপরিকল্পিত নর্দমা ব্যবস্থার জন্য বিখ্যাত।
- কৃষি, পশুপালন, কারুশিল্প এবং দূরবর্তী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য (যেমন মেসোপটেমিয়ার সাথে) ছিল প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি।
- হরপ্পার চিত্রলিপি আজও পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
- বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত কারণের ফলে এই উন্নত সভ্যতার অবসান ঘটে।