বিষয়ের ভূমিকা

জীববিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো বংশগতিবিদ্যা বা জেনেটিক্স (Genetics)। কেন সন্তানের মুখাবয়ব, গায়ের রং বা গুণাবলী পিতামাতার সাথে মেলে? আবার কেনই বা তারা পিতামাতার থেকে কিছুটা আলাদা হয়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর মেলে এনসিইআরটি (NCERT) দ্বাদশ শ্রেণির জীববিদ্যা পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় ৫: 'বংশগতি ও প্রকরণের নীতি' (Principles of Inheritance and Variation)-তে। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে বৈশিষ্ট্য এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয় এবং কেন একই পিতামাতার সন্তানদের মধ্যেও বৈচিত্র্য বা প্রকরণ (Variation) দেখা যায়। মেন্ডেলের মটর গাছের পরীক্ষা থেকে শুরু করে ক্রোমোজোম তত্ত্ব এবং বংশগত ব্যাধি সম্পর্কে বিশদ আলোচনা শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ বাংলায় নিচে উপস্থাপন করা হলো।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. বংশগতি এবং প্রকরণ (Inheritance and Variation)

বংশগতিবিদ্যা বোঝার জন্য দুটি প্রাথমিক শব্দ জানা জরুরি:

  • বংশগতি (Inheritance/Heredity): যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পিতামাতার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলি জনিতৃ জীব থেকে অপত্য জীবে সঞ্চারিত হয়, তাকে বংশগতি বলে।
  • প্রকরণ (Variation): একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত অপত্য জীবের মধ্যে বা অপত্য ও পিতামাতার মধ্যে যে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য দেখা যায়, তাকে প্রকরণ বলা হয়।

২. গ্রেগর জোহান মেন্ডেল এবং তাঁর বংশগতির পরীক্ষা

অস্ট্রিয়ার ধর্মযাজক ও বিজ্ঞানী গ্রেগর জোহান মেন্ডেলকে বংশগতিবিদ্যার জনক (Father of Genetics) বলা হয়। তিনি ১৮৫৬ থেকে ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত বাগানের মটর গাছ (Pisum sativum) নিয়ে গবেষণা করেন।

মটর গাছ নির্বাচনের কারণ:

  • মটর গাছের জীবনকাল সংক্ষিপ্ত এবং বহু অপত্য সৃষ্টিতে সক্ষম।
  • এরা উভলিঙ্গ ফুল এবং সহজে স্ব-পরাগযোগ ও ইতর-পরাগযোগ ঘটানো যায়।
  • মটর গাছে স্পষ্ট ও বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্য (Contrasting Traits) বিদ্যমান, যেমন: লম্বা/খর্বকায়, হলুদ/সবুজ বীজ ইত্যাদি।

৩. একসংকর জনন (Monohybrid Cross) এবং মেন্ডেলের সূত্র

একটি মাত্র বিপরীতমুখী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিশিষ্ট দুটি উদ্ভিদের মধ্যে সংকরায়নকে একসংকর জনন বলে। যেমন: বিশুদ্ধ লম্বা (TT) ও বিশুদ্ধ খর্বকায় (tt) মটর গাছের সংকরায়ন।

প্রথম অপত্য জনু ($F_1$): সংকরায়নে সকল অপত্য উদ্ভিদ লম্বা ($Tt$) হয়।

দ্বিতীয় অপত্য জনু ($F_2$): $F_1$ জনুর স্ব-পরাগযোগের ফলে সৃষ্ট $F_2$ জনুতে ৩টি লম্বা এবং ১টি খর্বকায় উদ্ভিদ পাওয়া যায়।

  • ফিনোটাইপিক অনুপাত (Phenotypic Ratio): ৩ : ১ (লম্বা : খর্বকায়)
  • জিনোটাইপিক অনুপাত (Genotypic Ratio): ১ : ২ : ১ ($TT : Tt : tt$)

এই পরীক্ষার ভিত্তিতে মেন্ডেল দুটি নীতি প্রদান করেন:

  • প্রকটতার নীতি (Law of Dominance): সংকর জীবে একটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় (প্রকট/Dominant) এবং অন্যটি প্রচ্ছন্ন (Recessive) থাকে।
  • পৃথকভবন সূত্র (Law of Segregation): গ্যামেট সৃষ্টির সময় বিপরীতমুখী জিনজোড়া একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে ভিন্ন গ্যামেটে প্রবেশ করে। এটিকে 'গ্যামেটের পরিচ্ছন্নতার সূত্র'-ও বলা হয়।

৪. দ্বিসংকর জনন (Dihybrid Cross) এবং স্বাধীন সঞ্চারণ সূত্র

দুটি জোড়া বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্য নিয়ে সংকরায়নকে দ্বিসংকর জনন বলা হয়। যেমন: গোলাকার-হলুদ বীজ (RRYY) এবং কুঞ্চিত-সবুজ বীজ (rryy)-এর সংকরায়ন।

$F_2$ জনুতে ফিনোটাইপিক অনুপাত হয় ৯ : ৩ : ৩ : ১

স্বাধীন সঞ্চারণের সূত্র (Law of Independent Assortment): দুই বা ততধিক জোড়া বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যের জিন সঞ্চারণের সময় এরা শুধু পৃথকই হয় না, বরঞ্চ স্বাধীনভাবে যে কোনো বিন্যাসে গ্যামেটে সঞ্চারিত হয়।

৫. অসম্পূর্ণ প্রকটতা এবং সহ-প্রকটতা (Incomplete Dominance and Co-dominance)

মেন্ডেলের সূত্রের কিছু ব্যতিক্রম দেখা যায়:

  • অসম্পূর্ণ প্রকটতা: যখন দুটি প্রকট-প্রচ্ছন্ন অ্যালিলের মধ্যবর্তী বৈশিষ্ট্য ফিনোটাইপে প্রকাশিত হয়। উদাহরণ: স্ন্যাপড্রাগন বা চার-টার ফুল (Antirrhinum majus)। লাল ($RR$) ও সাদা ($rr$) ফুলের সংকরায়নে গোলাপী ($Rr$) ফুল তৈরি হয়। ফিনোটাইপ ও জিনোটাইপ অনুপাত উভয়ই ১:২:১।
  • সহ-প্রকটতা: যখন পিতা ও মাতা উভয়ের অ্যালিলই অপত্যে সমানভাবে প্রকাশিত হয়। উদাহরণ: মানুষের ABO রক্তশ্রেণী। $I^A$ এবং $I^B$ অ্যালিল দুটি সহ-প্রকট হওয়ায় AB রক্তশ্রেণী গঠন করে।

৬. বংশগতির ক্রোমোজোমীয় তত্ত্ব (Chromosomal Theory of Inheritance)

১৯০২ সালে ওয়াল্টার সাটন (Walter Sutton) এবং থিওডোর বোভেরি (Theodor Boveri) মেন্ডেলের নীতিকে ক্রোমোজোমের আচরণের সাথে তুলনা করে বংশগতির ক্রোমোজোমীয় তত্ত্ব প্রদান করেন। পরবর্তীকালে থমাস হান্ট মরগান (T. H. Morgan) ফলমাছি (Drosophila melanogaster)-র ওপর পরীক্ষা করে এই তত্ত্বের পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেন এবং 'লিংকেজ' (Linkage) ও 'পুনর্বিন্যাস' (Recombination) আবিষ্কার করেন।

৭. লিঙ্গ নির্ধারণ (Sex Determination)

বিভিন্ন জীবে লিঙ্গ নির্ধারণের প্রক্রিয়া ভিন্ন:

  • XX-XY প্রক্রিয়া: মানুষ এবং ড্রসোফিলায় দেখা যায়। পুং জীব হেটেরোগ্যামেটিক (XY) এবং স্ত্রী জীব হোমোগ্যামেটিক (XX)।
  • ZZ-ZW প্রক্রিয়া: পাখিদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। এখানে স্ত্রী জীব হেটেরোগ্যামেটিক (ZW) এবং পুং জীব হোমোগ্যামেটিক (ZZ)।
  • XX-XO প্রক্রিয়া: ঘাসফড়িং-এর ক্ষেত্রে পুং জীবে একটি মাত্র X ক্রোমোজোম থাকে।

৮. মিউটেশন বা পরিব্যক্তি এবং বংশগত ব্যাধি

ডিএনএ (DNA) অনুক্রমে আকস্মিক ও স্থায়ী পরিবর্তনকে মিউটেশন বলে। বংশগত ব্যাধি প্রধানত দুই প্রকার:

  • মেণ্ডেলীয় ব্যাধি (Mendelian Disorders): একক জিনের পরিবর্তনের ফলে ঘটে। যেমন: হিমোফিলিয়া (Hemophilia), সিকল সেল অ্যানিমিয়া (Sickle-cell Anemia), ফিনাইলকিটোনিউ্রিয়া (PKU), থ্যালাসেমিয়া।
  • ক্রোমোজোমীয় ব্যাধি (Chromosomal Disorders): ক্রোমোজোমের সংখ্যা বা গঠনের পরিবর্তনের ফলে ঘটে। যেমন: ডাউন সিনড্রোম (Down's Syndrome - 21st Trisomy), টার্নার সিনড্রোম (Turner's Syndrome - 45, XO), ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম (Klinefelter's Syndrome - 47, XXY)।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: টেস্ট ক্রস (Test Cross) কাকে বলে এবং এর গুরুত্ব কী?

উত্তর: কোনো অজ্ঞাত জিনোটাইপের প্রকট ফিনোটাইপযুক্ত উদ্ভিদকে প্রচ্ছন্ন বৈশিষ্ট্যযুক্ত জনিতৃ উদ্ভিদের সাথে সংকরায়ন করানোকে টেস্ট ক্রস বলে। এর মাধ্যমে উক্ত প্রকট ফিনোটাইপযুক্ত জীবটি বিশুদ্ধ (Homozygous) নাকি সংকর (Heterozygous) তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।

প্রশ্ন ২: হেটেরোগ্যামেটিক ও হোমোগ্যামেটিক জীবের মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: যে সকল জীব দুই ভিন্ন প্রকারের গ্যামেট তৈরি করে তাদের হেটেরোগ্যামেটিক বলে (যেমন: মানব পুরুষ XY)। পক্ষান্তরে, যে সকল জীব একই প্রকারের গ্যামেট তৈরি করে তাদের হোমোগ্যামেটিক বলে (যেমন: মানব স্ত্রী XX)।

প্রশ্ন ৩: সিকল সেল অ্যানিমিয়া রোগটি কীভাবে ঘটে?

উত্তর: সিকল সেল অ্যানিমিয়া হলো একটি অটোজোমাল প্রচ্ছন্ন ব্যাধি। এটি হিমোগ্লোবিনের বিটা-গ্লোবিন শৃঙ্খলের ৬ নম্বর অ্যামিনো অ্যাসিডের স্থানে গ্লুটামিক অ্যাসিডের পরিবর্তে ভ্যালিন যুক্ত হওয়ার ফলে ঘটে। এর ফলে লোহিত রক্তকণিকা কাস্তে আকৃতির (Sickle shaped) হয়ে যায়।

সারসংক্ষেপ

  • বংশগতিবিদ্যা হলো জনিতৃ থেকে অপত্যে গুণাবলী সঞ্চারণ এবং প্রকরণের বিজ্ঞান।
  • মেন্ডেল মটর গাছের পরীক্ষার মাধ্যমে পৃথকভবন ও স্বাধীন সঞ্চারণ সূত্র প্রদান করেন।
  • অসম্পূর্ণ প্রকটতা, সহ-প্রকটতা এবং বহু-অ্যালিল মেন্ডেলের সূত্রের ব্যতিক্রম।
  • মরগান ড্রসোফিলার মাধ্যমে ক্রোমোজোম তত্ত্ব এবং লিংকেজ আবিষ্কার করেন।
  • বংশগত ব্যাধি দুই প্রকার: মেণ্ডেলীয় ব্যাধি এবং ক্রোমোজোমীয় ব্যাধি।