বিষয়ের ভূমিকা

আমরা যখন ওপরের দিকে কোনো বস্তু ছুড়ে দিই, সেটি আবার নিচে ফিরে আসে কেন? কেন পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে বা চাঁদ কেন পৃথিবীর চারদিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘুরে চলেছে? এই সব প্রশ্নের মূলে রয়েছে একটি শক্তিশালী বল, যার নাম মহাকর্ষ (Gravitation)। এই অধ্যায়ে আমরা শিখব কীভাবে এই অদৃশ্য বল মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকে একে অপরের সাথে বেঁধে রাখে। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র থেকে শুরু করে ভর, ওজন এবং আর্কিমিডিসের নীতি পর্যন্ত প্রতিটি ধারণা সহজভাবে আলোচনা করা হয়েছে, যা নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা

১. মহাকর্ষের সর্বজনীন সূত্র (Universal Law of Gravitation)

স্যার আইজ্যাক নিউটন মহাকর্ষের ধারণাটি প্রথম বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু অন্য প্রতিটি বস্তুকে একটি নির্দিষ্ট বল দিয়ে আকর্ষণ করে। এই বলটি হলো মহাকর্ষ বল

সূত্রের মূল কথা: দুটি বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ বল বস্তুদুটির ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।

  • ধরি, দুটি বস্তুর ভর M এবং m, এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব d। তাহলে আকর্ষণ বল F = G * (M * m / d²)।
  • এখানে G হলো মহাকর্ষীয় ধ্রুবক, যার মান হলো 6.673 × 10⁻¹¹ N m²/kg²।
  • এই সূত্রটি 'সর্বজনীন' বলা হয় কারণ এটি মহাবিশ্বের ছোট-বড় সব বস্তুর ক্ষেত্রে এবং যেকোনো স্থানে সমানভাবে প্রযোজ্য।

২. অবাধে পতন (Free Fall) এবং অভিকর্ষজ ত্বরণ (g)

যখন কোনো বস্তু কেবল পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের প্রভাবে নিচে পড়ে, তখন তাকে 'অবাধে পতন' বলা হয়। পড়ার সময় বস্তুর বেগের পরিবর্তন ঘটে, অর্থাৎ ত্বরণ সৃষ্টি হয়। এই ত্বরণকেই বলা হয় অভিকর্ষজ ত্বরণ (g)

  • পৃথিবীর পৃষ্ঠে 'g'-এর গড় মান হলো ৯.৮ মিটার/সেকেন্ড² (9.8 m/s²)।
  • লক্ষ্যণীয় যে, g-এর মান বস্তুর ভরের ওপর নির্ভর করে না। অর্থাৎ, বায়ুশূন্য স্থানে একটি পালক এবং একটি পাথর একসাথে ফেললে তারা একই সাথে নিচে পৌঁছাবে।
  • পৃথিবীর আকৃতি সম্পূর্ণ গোল না হওয়ায় মেরু অঞ্চলে g-এর মান বিষুবীয় অঞ্চলের তুলনায় কিছুটা বেশি হয়।

৩. ভর এবং ওজনের পার্থক্য (Mass vs Weight)

অনেকেই ভর এবং ওজনকে এক মনে করেন, কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় এদের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে:

  • ভর (Mass): কোনো বস্তুর মধ্যে থাকা পদার্থের পরিমাণকে ভর বলে। এটি একটি ধ্রুবক রাশি, যা মহাবিশ্বের যেকোনো জায়গায় একই থাকে। এর একক কেজি (kg)।
  • ওজন (Weight): কোনো বস্তুকে পৃথিবী যে বল দ্বারা নিজের কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করে, তাকে ওজন বলে। ওজন (W) = ভর (m) × অভিকর্ষজ ত্বরণ (g)। এর একক নিউটন (N)। যেহেতু g-এর মান পরিবর্তিত হয়, তাই স্থানভেদে বস্তুর ওজনও পরিবর্তিত হতে পারে।

৪. চাঁদে কোনো বস্তুর ওজন

চাঁদের ভর পৃথিবীর ভরের তুলনায় অনেক কম। তাই চাঁদের অভিকর্ষ বলও পৃথিবীর তুলনায় কম। হিসাব করলে দেখা যায়, চাঁদে কোনো বস্তুর ওজন পৃথিবীর ওজনের মাত্র ১/৬ ভাগ হয়। অর্থাৎ পৃথিবীতে কারোর ওজন ৬০ কেজি হলে, চাঁদে তার ওজন হবে মাত্র ১০ কেজি।

৫. ধাক্কা, চাপ এবং তরলে প্লবতা

মহাকর্ষের পর এই অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তরল পদার্থের ধর্ম।

  • চাপ (Pressure): একক ক্ষেত্রফলের ওপর প্রযুক্ত লম্ব বলকে চাপ বলে। চাপ = বল / ক্ষেত্রফল। ক্ষেত্রফল কম হলে চাপ বেশি হয় (যেমন পেরেকের মাথা সুচালো হওয়া)।
  • প্লবতা (Buoyancy): যখন কোনো বস্তুকে তরল বা গ্যাসে আংশিক বা পূর্ণ নিমজ্জিত করা হয়, তখন ওই তরল বস্তুর ওপর ওপরের দিকে একটি বল প্রয়োগ করে। একেই প্লবতা বল বলে। এ কারণেই জলের ভেতরে কোনো বস্তুকে হালকা মনে হয়।

৬. আর্কিমিডিসের নীতি (Archimedes' Principle)

বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস বলেছিলেন, "যখন কোনো বস্তুকে কোনো স্থির তরলে আংশিক বা সম্পূর্ণ নিমজ্জিত করা হয়, তখন বস্তুটি কিছুটা ওজন হারায় বলে মনে হয়। বস্তুর এই হারানো ওজন বস্তুটির দ্বারা অপসারিত তরলের ওজনের সমান।"

প্রয়োগ: জাহাজ কেন জলে ভাসে কিন্তু লোহার ছোট টুকরো ডুবে যায়? জাহাজ এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে সেটি বিশাল পরিমাণ জল অপসারণ করতে পারে, ফলে উৎপন্ন প্লবতা বল জাহাজটিকে ভাসিয়ে রাখে।

প্রশ্নোত্তর (Q&A)

প্রশ্ন ১: মহাকর্ষীয় ধ্রুবক (G) এবং অভিকর্ষজ ত্বরণ (g)-এর মধ্যে পার্থক্য কী?

উত্তর: G হলো একটি সর্বজনীন ধ্রুবক যার মান মহাবিশ্বের সব জায়গায় সমান। অন্যদিকে, g হলো পৃথিবীর আকর্ষণজনিত ত্বরণ যার মান স্থানভেদে (যেমন মেরু বনাম বিষুবরেখা) পরিবর্তিত হয়।

প্রশ্ন ২: চাঁদে মানুষের ওজন কমে যায় কেন?

উত্তর: কারণ চাঁদের ভর এবং ব্যাসার্ধ পৃথিবীর তুলনায় কম, ফলে চাঁদের অভিকর্ষজ বল পৃথিবীর তুলনায় ১/৬ গুণ। যেহেতু ওজন অভিকর্ষজ বলের ওপর নির্ভরশীল, তাই চাঁদে ওজন কমে যায়।

প্রশ্ন ৩: আপেক্ষিক ঘনত্ব বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: কোনো পদার্থের ঘনত্ব এবং ৪° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জলের ঘনত্বের অনুপাতকে ওই পদার্থের আপেক্ষিক ঘনত্ব বলে। এর কোনো একক নেই।

সারসংক্ষেপ

  • মহাকর্ষ বল বস্তুর ভরের গুণফলের সমানুপাতিক এবং দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।
  • g-এর মান ৯.৮ মি/সে² এবং এটি পৃথিবীর কেন্দ্রে শূন্য হয়।
  • ভর কখনো পরিবর্তন হয় না, কিন্তু ওজন স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়।
  • আর্কিমিডিসের নীতি জাহাজ নির্মাণ এবং ল্যাক্টোমিটার বা হাইড্রোমিটারের মতো যন্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
  • প্লবতা বলের কারণেই ভারী বস্তুও জলে ভাসানো সম্ভব হয়।