আমাদের আধুনিক জীবনযাত্রা তড়িৎ বা বিদ্যুতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ঘরবাড়িতে আলো জ্বালানো, পাখা চালানো, মোবাইল চার্জ দেওয়া থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্পকারখানায় ভারী যন্ত্রপাতি চালনা—সবক্ষেত্রেই বিদ্যুতের ভূমিকা অপরিসীম। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক পরিষদ (NCERT)-এর দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিষয়ের 'তড়িৎ' (Electricity) অধ্যায়টি ভৌতবিজ্ঞানের একটি অত্যন্ত মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই নিবন্ধে আমরা অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় এই অধ্যায়ের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব, যা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে এবং বিষয়টির গভীর অনুধাবন করতে সাহায্য করবে।
বিষয়ের ভূমিকা
তড়িৎ হলো শক্তির একটি অত্যন্ত সুবিধাজনক এবং সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য রূপ। এটি কেবল আমাদের দৈনিক জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তোলেনি, বরং বিজ্ঞানের অগ্রগতিতেও এক যুগান্তকারী বিপ্লব এনেছে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কিভাবে একটি বদ্ধ তারের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হয়? কোন শক্তি ইলেকট্রনগুলোকে প্রবাহিত হতে বাধ্য করে? কেন কিছু পদার্থ বিদ্যুতের ভালো পরিবাহী আর কিছু পদার্থ নয়? এই অধ্যায়ে আমরা মূলত তড়িৎ প্রবাহ, তড়িৎ বিভব, ওহমের সূত্র, পরিবাহীর রোধ, সমবায়, তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল এবং তড়িৎ ক্ষমতা সম্পর্কে গভীরভাবে জানব।
মূল ধারণাগুলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. তড়িৎ আধান এবং তড়িৎ প্রবাহ (Electric Charge and Current)
তড়িৎ প্রবাহকে ভালোভাবে বুঝতে হলে প্রথমেই 'তড়িৎ আধান' বা Electric Charge সম্পর্কে জানতে হবে। আধান হলো পদার্থের একটি মৌলিক গুণ। আধান দুই প্রকারের হয়: ধনাত্মক (Positive) এবং ঋণাত্মক (Negative)। একই ধরনের আধান পরস্পরকে বিকর্ষণ করে এবং বিপরীত ধরনের আধান পরস্পরকে আকর্ষণ করে। আধানের SI একক হলো কুলম্ব (Coulomb, C)। একটি ইলেকট্রনে প্রাক্কলিত ঋণাত্মক আধানের পরিমাণ হলো $1.6 \times 10^{-19}$ কুলম্ব।
কোনো পরিবাহীর (যেমন তামা বা অ্যালুমিনিয়ামের তার) নির্দিষ্ট প্রস্থচ্ছেদের মধ্য দিয়ে একক সময়ে যে পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয়, তাকে তড়িৎ প্রবাহ (Electric Current) বলা হয়। যদি $t$ সময়ে পরিবাহীর মধ্য দিয়ে $Q$ পরিমাণ আধান প্রবাহিত হয়, তবে তড়িৎ প্রবাহ $I$ হবে:
$I = \frac{Q}{t}$
তড়িৎ প্রবাহের SI একক হলো অ্যাম্পিয়ার (Ampere, A), যা ফরাসি বিজ্ঞানী অঁদ্রে-মারি অ্যাম্পিয়ারের নামানুসারে রাখা হয়েছে। যখন কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে ১ সেকেন্ডে ১ কুলম্ব আধান প্রবাহিত হয়, তখন সেই প্রবাহকে ১ অ্যাম্পিয়ার বলে। অর্থাৎ, $1\text{ A} = 1\text{ C} / 1\text{ s}$।
- তড়িৎ প্রবাহ পরিমাপক যন্ত্র: তড়িৎ প্রবাহ পরিমাপ করতে অ্যামিটার (Ammeter) নামক যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এটিকে সর্বদা সার্কিটে শ্রেণী সমবায় (Series Connection)-এ যুক্ত করা হয়।
- প্রবাহের দিক: ঐতিহাসিকভাবে ইলেকট্রন আবিষ্কৃত হওয়ার আগে মনে করা হতো ধনাত্মক আধানের গতিই হলো তড়িৎ প্রবাহ। তাই প্রথাগতভাবে ধনাত্মক আধানের গতির দিককেই (অথবা ইলেকট্রন প্রবাহের বিপরীত দিককে) তড়িৎ প্রবাহের দিক হিসেবে গণ্য করা হয়।
২. তড়িৎ বিভব এবং বিভবপ্রভেদ (Electric Potential and Potential Difference)
পানি যেমন সর্বদা উচ্চ সমতল থেকে নিম্ন সমতলের দিকে প্রবাহিত হয়, ঠিক তেমনই তড়িৎ আধান পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে চালিকাশক্তির প্রয়োজন হয়। এই চালিকাশক্তিকে বলা হয় তড়িৎ বিভবপ্রভেদ (Electric Potential Difference)। কোনো পরিবাহীতে আধান নিজে থেকে প্রবাহিত হয় না; ব্যাটারি বা সেল এই বিভবপ্রভেদ তৈরি করে।
অসীম দূরত্ব থেকে কোনো একক ধনাত্মক আধানকে তড়িৎ ক্ষেত্রের কোনো বিন্দুতে আনতে যে পরিমাণ কার্য করতে হয়, তাকে ওই বিন্দুর তড়িৎ বিভব বলে। অন্যদিকে, একটি পরিবাহী তারের দুটি বিন্দুর মধ্যে একক ধনাত্মক আধানকে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে নিয়ে যেতে যে পরিমাণ কার্য সম্পন্ন হয়, তাকে ওই দুই বিন্দুর মধ্যে বিভবপ্রভেদ বলে।
বিভবপ্রভেদ ($V$) = সম্পন্ন কার্য ($W$) / মোট আধান ($Q$)
$V = \frac{W}{Q}$
বিভবপ্রভেদের SI একক হলো ভোল্ট (Volt, V), যা ইতালীয় বিজ্ঞানী আলসান্দ্রো ভোল্টার নামানুসারে নামাঙ্কিত। ১ কুলম্ব আধানকে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে নিতে যদি ১ জুল কার্য করতে হয়, তবে বিভবপ্রভেদ হবে ১ ভোল্ট। বিভবপ্রভেদ পরিমাপের জন্য ভোোল্টমিটার (Voltmeter) ব্যবহার করা হয়, যা সার্কিটে সমান্তরাল সমবায় (Parallel Connection)-এ যুক্ত থাকে।
৩. ওহমের সূত্র (Ohm's Law)
১৮২৭ সালে জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী জর্জ সাইমন ওহম (Georg Simon Ohm) কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহ এবং তার দুই প্রান্তের বিভবপ্রভেদের মধ্যকার সম্পর্ক আবিষ্কার করেন। এটিই বিজ্ঞানে ওহমের সূত্র নামে পরিচিত।
সূত্র: উষ্ণতা এবং অন্যান্য ভৌত অবস্থা (যেমন পরিবাহীর উপাদান, দৈর্ঘ্য ইত্যাদি) অপরিবর্তিত থাকলে, কোনো পরিবাহীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তড়িৎ প্রবাহ ($I$), পরিবাহীটির দুই প্রান্তের বিভবপ্রভেদের ($V$) সরাসরি সমানুপাতিক।
$V \propto I$
বা, $V = I \times R$
এখানে $R$ হলো একটি ধ্রুবক, যাকে পরিবাহীটির রোধ (Resistance) বলা হয়।
৪. পরিবাহীর রোধ ও রোধকতা (Resistance and Resistivity)
রোধ হলো পরিবাহীর সেই বিশেষ ধর্ম, যার জন্য এটি তার মধ্য দিয়ে তড়িৎ আধানের প্রবাহকে বাধা প্রদান করে। ওহমের সূত্রানুসারে, $R = \frac{V}{I}$। রোধের SI একক হলো ওহম (Ohm, $\Omega$)।
কোনো পরিবাহীর রোধ প্রধানত কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:
- দৈর্ঘ্য ($L$): পরিবাহীর দৈর্ঘ্য বাড়লে রোধ বাড়ে ($R \propto L$)।
- প্রস্থচ্ছেদ ($A$): পরিবাহীর তার যত মোটা হবে, রোধ তত কমবে ($R \propto \frac{1}{A}$)।
- উপাদান: বিভিন্ন উপাদানের পরিবাহিতা ও রোধ ভিন্ন হয়।
- উষ্ণতা: সাধারণত তাপমাত্রা বাড়লে ধাতব পরিবাহীর রোধ বৃদ্ধি পায়।
সুতরাং, $R \propto \frac{L}{A} \implies R = \rho \frac{L}{A}$। এখানে $\rho$ (রো) হলো পরিবাহীর উপাদানের আপেক্ষিক রোধ বা রোধকতা (Resistivity)। রোধকতার SI একক হলো ওহম-মিটার ($\Omega \cdot \text{m}$)। তামা এবং অ্যালুমিনিয়ামের রোধকতা অত্যন্ত কম হওয়ায় এরা উৎকৃষ্ট পরিবাহী। অন্যদিকে, কাচ বা রাবারের রোধকতা অনেক বেশি হওয়ায় এরা অন্তরক (Insulator)।
৫. রোধকের সমবায় (Combination of Resistors)
ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কোনো সার্কিটে কাঙ্ক্ষিত মানের প্রবাহ বা বিভব পাওয়ার জন্য একাধিক রোধকে দুটি প্রধান উপায়ে যুক্ত করা হয়:
(ক) শ্রেণী সমবায় (Series Combination)
যখন একাধিক রোধক পরপর এক সারিতে যুক্ত থাকে, তখন তাকে শ্রেণী সমবায় বলে। এই সমবায়ে প্রতিটি রোধকের মধ্য দিয়ে একই পরিমাণ তড়িৎ প্রবাহিত হয়, তবে প্রতিটি রোধকের দুই প্রান্তে বিভবপ্রভেদ বিভক্ত হয়ে যায়।
তুল্য রোধ ($R_s$) = $R_1 + R_2 + R_3 + \dots$
শ্রেণী সমবায়ে তুল্য রোধের মান যুক্ত থাকা যেকোনো একক রোধের চেয়ে বেশি হয়।
(খ) সমান্তরাল সমবায় (Parallel Combination)
যখন একাধিক রোধক দুটি নির্দিষ্ট বিন্দুর মধ্যে একসাথে যুক্ত থাকে, তখন তাকে সমান্তরাল সমবায় বলে। এই সমবায়ে প্রতিটি রোধকের দুই প্রান্তে বিভবপ্রভেদ একই থাকে, কিন্তু মোট তড়িৎ প্রবাহ বিভক্ত হয়ে যায়।
$\frac{1}{R_p} = \frac{1}{R_1} + \frac{1}{R_2} + \frac{1}{R_3} + \dots$
আমাদের বাসাবাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগ সর্বদা সমান্তরাল সমবায়-এ করা হয়। কারণ এতে একটি যন্ত্র বন্ধ হলেও অন্য যন্ত্রগুলো স্বাধীনভাবে চলতে পারে এবং সব যন্ত্র সমান বিভবপ্রভেদ ($220\text{ V}$) পায়।
৬. তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল (Joule's Heating Effect)
যখন কোনো উচ্চ রোধযুক্ত পরিবাহী (যেমন নাইক্রোম তার)-র মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহিত হয়, তখন পরিবাহীটি অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাপ উৎপন্ন করে। একে তড়িৎ প্রবাহের তাপীয় ফল বলে। জুলের সূত্রানুসারে উৎপন্ন তাপ ($H$):
$H = I^2 R t$
এই নীতির ওপর ভিত্তি করে ইলেকট্রিক হিটার, ইস্ত্রি (Iron), টোস্টার এবং ইলেকট্রিক ফিউজ কাজ করে। ইলেকট্রিক ফিউজ হলো একটি নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা যা অতিরিক্ত প্রবাহের সময় গলে গিয়ে সার্কিটকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
৭. তড়িৎ ক্ষমতা (Electric Power)
কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রের কার্য করার হার বা শক্তি খরচের হারকে তড়িৎ ক্ষমতা বলা হয়।
$P = \frac{W}{t} = V \times I = I^2 R = \frac{V^2}{R}$
ক্ষমতার SI একক হলো ওয়াট (Watt, W)। ১ ওয়াট = ১ ভোল্ট $\times$ ১ অ্যাম্পিয়ার। বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ শক্তি খরচের একক হলো কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kWh), যাকে সাধারণ ভাষায় 'ইউনিট' (Unit) বলা হয়।
$1\text{ kWh} = 1000\text{ W} \times 3600\text{ s} = 3.6 \times 10^6\text{ Joules}$
প্রশ্নোত্তর (Q&A)
প্রশ্ন ১: ওহমের সূত্রের সীমাবদ্ধতা কী?
উত্তর: ওহমের সূত্র সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অর্ধপরিবাহী (যেমন সিলিকন, জার্মেনিয়াম), শূন্যস্থান নল (Vacuum tubes), এবং ডায়োডের ক্ষেত্রে ওহমের সূত্র মেনে চলা হয় না। এছাড়া তাপমাত্রা পরিবর্তিত হলে রোধ পরিবর্তিত হয়, ফলে ওহমের সরল সম্পর্ক বজায় থাকে না।
প্রশ্ন ২: বাসাবাড়িতে কেন শ্রেণী সমবায়ের পরিবর্তে সমান্তরাল সমবায় ব্যবহার করা হয়?
উত্তর: শ্রেণী সমবায়ে সব যন্ত্রের মধ্য দিয়ে একই বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় এবং একটি যন্ত্র খারাপ হলে পুরো সার্কিট বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া প্রতিটি যন্ত্র সমান ভোল্টেজ পায় না। কিন্তু সমান্তরাল সমবায়ে প্রতিটি যন্ত্র সমান ভোল্টেজ পায় এবং প্রতিটি যন্ত্রের আলাদা সুইচ থাকে, তাই বাসাবাড়িতে সমান্তরাল সমবায় ব্যবহৃত হয়।
প্রশ্ন ৩: ফিউজ তারের বৈশিষ্ট্য কী হওয়া উচিত?
উত্তর: ফিউজ তারের গলনাঙ্ক খুব কম এবং রোধ বেশি হওয়া উচিত, যাতে সার্কিটে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রবাহিত হলে এটি সহজেই উত্তপ্ত হয়ে গলে যায় এবং সার্কিট বিচ্ছিন্ন করে বিপদ এড়ায়।
সারসংক্ষেপ
- তড়িৎ প্রবাহ হলো একক সময়ে আধানের প্রবাহের হার ($I = Q/t$), যার একক অ্যাম্পিয়ার।
- বিভবপ্রভেদ হলো প্রতি একক আধানকে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে সরাতে কৃতকার্য ($V = W/Q$), যার একক ভোল্ট।
- ওহমের সূত্র অনুযায়ী, নির্দিষ্ট উষ্ণতায় পরিবাহীর বিভবপ্রভেদ প্রবাহমাত্রার সরাসরি সমানুপাতিক ($V = IR$)।
- সমান্তরাল সমবায়ে তুল্য রোধের মান হ্রাস পায় এবং শ্রেণী সমবায়ে তুল্য রোধের মান বৃদ্ধি পায়।
- জুলের সুত্রানুসারে উৎপন্ন তাপ $H = I^2 R t$।
- বিদ্যুৎ শক্তির বাণিজ্যিক একক হলো kilowatt-hour (kWh), যেখানে $1\text{ kWh} = 3.6 \times 10^6\text{ J}$।